25/01/2025
মনোরোগী ও দেহরোগী লোকে দেহের পীড়াকেই সাধারণতঃ পীড়া কহে এবং তাহারই চিকিৎসার জন্য চিকিৎসক সমীপে উপস্থিত হয়। মনের সুতাহার জন্যই রোগটির একটা লক্ষ্য জন্য চিড়ি যখন মনের এরূপ পীড়া হয় যে, তাহার জন্য রোগীর দ্বারা আর করোরিক কার্য চলে না অর্থাৎ যাহাকে লোকে মোটা কথায় উন্মাদ রোগ বলে সাংগ্রাই দেখা দেয়, তখনই কেবল তাহাকে আরাম করিবার জন্য উপায় অবলম্বন করে। যদি সাংসারিক কার্যের কোনও অসুবিধা না হয়, অর্থাৎ হিসাবনিকাশ বা লোকজনের সহিত ব্যবহারের বিষয়ে কোনও বিশৃঙ্খলা না ঘটে, তবে মনের যে অবস্থাই হউক না কেন, তাহা কেহই নজর রাখে না অথবা চিকিৎসার প্রয়োজন বলিয়াই মনে করে না। একটু প্রণিধান করিয়া লোক-চরিত্র পর্যবেক্ষণ করিলেই বেশ বুঝিতে পারা যায় যে, সহস্র ব্যক্তির মধ্যে একজনেরও বোধ হয় সুস্থ মন নাই। অথচ মনের রোগ আরোগ্য করিবার জন্য কাহারও বড় কিছু আগ্রহ দেখা যায় না। ইহা সমাজের বড়ই শোচনীয় অবস্থা। শিক্ষক মহাশয়গণ বিশেষভাবেই অবগত আছেন যে, তাঁহার সহস্র চেষ্টা, যত্ন, উপদেশ এবং শাসনাদির সাহায্যে কোনও কোনও ছাত্রের চরিত্র সংশোধন করিতে একেবারে অপারক হয়েন। একই শ্রেণীর ছাত্রগণ একই অধ্যাপকের নিকটে শিক্ষা করিবার সুবিধা লাভ করিয়াও প্রত্যেকে বিভিন্ন ভাবে বিদ্যা অর্জন বা চরিত্র গঠন করিতে সমর্থ হয়। এমন কি একই পিতামাতার সন্তানগণকে বিভিন্ন পথগামী হইতে দেখা যায়। যদি কেহ বার বার অন্যায় কার্য করে, লোকে তাহাকে দুষ্ট কহে। সকলেই বাল্যকাল হইতে প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ পাঠ্য পুস্তকে এবং গুরুজনের উপদেশ পাইতে থাকে- 'সদা সত্য কথা কহিবে', 'অন্যের দ্রব্য না বলিয়া লইও না', 'প্রতিবেশীকে ভালবাসিবে', ইত্যাদি, কিন্তু বিভিন্ন ব্যক্তিতে ঐ সকল উপদেশ বিভিন্নভাবে ফল প্রদান করে। চোরকে চুরি করিও না বলিলে সে কি চুরি ত্যাগ করিতে পারে? কখনই না। সে কেন চুরি করে? যেহেতু সে চুরি না করিয়া থাকিতে পারে না। সাধারণ কথায় লোকে বলিয়া থাকে, সে ব্যক্তি অভ্যাসদোষে ইহা করিয়া থাকে। অভ্যাসদোষ বলিলে প্রকৃত কারণ বলা হইল না। একজন এক প্রকার কার্য করিতে করিতে ক্রমে তাহার অভ্যাস হইয়া যায় সত্য কথা, কিন্তু একজন এক প্রকার অভ্যাস করে, আর একজন অন্য প্রকার অভ্যাস করে কেন? চোর বা মিথ্যাবাদী, চুরি করা বা মিথ্যা কথা বলা দোষ বা পাপ জানা সত্ত্বেও এবং বার বার তাহা হইতে বিরত হইবার চেষ্টা সত্ত্বেও চুরি না করিয়া বা মিথ্যা কথা না বলিয়া থাকিতে পারে না। এই সকলের প্রকৃত কারণ-মনপীড়িত। সুস্থ মনে চুরি করিবার প্রবৃত্তিই আসিবে না, বার বার অভ্যাস করিবার কথা ত সুদূরপরাহত। সুস্থ মনে মিথ্যা কথা বলিবার ইচ্ছাই থাকে না। পিতামাতা বা শিক্ষকগণ বালকদিগকে শাসন অথবা উপদেশ দিয়াই যথেষ্ট প্রতিকার করা হইল বলিয়া মনে করেন। এমন কি কোনও কোনও শিক্ষক ও পিতা প্রায়ই দারুণ প্রহার পর্যন্ত করিতে ছাড়েন না, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই সকল পন্থায় প্রতিকার ত হয়ই না বরং অনিষ্টই ঘটিয়া থাকে। আজকাল প্রায়ই স্কুলের ছাত্রকে অতি অল্প বয়স হইতেই ইন্দ্রিয়সেবী হইতে দেখা যায় এবং অবৈধ উপায়ে শরীরটি চিরজীবনের জন্য নষ্ট করিতে থাকে। ইহার কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অসুস্থ মন, তবে অতি অল্প সংখ্যক বালক, যাহারা কেবলমাত্র সঙ্গদোষে এই কার্যে ব্রতী হয় তাহারা অতি শীঘ্রই বিরত হয়, সামান্য উপদেশ উহাদের পক্ষে যথেষ্ট হয়। এমন কি নিজেদের মনেই তাহাদের সমধিক গ্লানি উপস্থিত হইয়া তাহাদিগকে অতি শীঘ্র সংশোধন করিয়া থাকে। আমরা অবশ্যই এই সকল এতটা সূক্ষ্মভাবে দেখি না এবং চিন্তাও করি না। কিন্তু এই কথা অতিমাত্র সত্য যে, সুস্থ মনে কোনও অসৎ কার্য ও অসৎ চিন্তা আসিতে পারে না।
প্রায়ই দেখা যায় যে, কোনও গৃহস্থে হয়ত অতিশয় দুঃখজনক ঘটনা, যেমন কাহারও অকালমৃত্যু বা গৃহদাহ অথবা ধনাপহরণ ঘটিয়াছে, ইহাতে গৃহস্থের মধ্যে সকলের পক্ষে সমান ক্ষতিজনক হইলেও কেহ বা অত্যন্ত অভিভূত হইয়া পড়ে, আবার কেহ বা সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করিতে সমর্থ হয়। যে ব্যক্তি ঐ প্রকার উপেক্ষা করিতে সমর্থ হয়, তাহার মন অপেক্ষাকৃত অনেক সুস্থ, নতুবা সে ব্যক্তি মনকে কখনও দমন করিতে পারিত না। দুর্বল বা পীড়িত মনে সামান্য ঘটনাও বিশেষ ক্ষমতা বিস্তার করিয়া থাকে, কিন্তু সুস্থ মনে ডাহা হয় না। আমরা নিত্যই দেখিয়া থাকি যে, সকলে সমান ক্রোধী নয়, কেহ হয়ত অতি সামান্য কারণে ভয়ানক অগ্নিশর্মা হইয়া উঠে, অন্যের হয়ত সহিষ্ণুতা অতীব প্রশংসনীয়। এই প্রকারের তারতম্য, কেবলমাত্র মনের সুস্থতা ও অসুস্থতার উপর নির্ভর করে। আমি জানি, কোনও একটি মধ্যবিত্ত গৃহস্থের কর্তা (একমাত্র উপার্জনকারী নিজেই) অতি গোপনে স্ত্রীলোকদিগের কাপড় ছিঁড়িয়া দিতেন এবং পরে স্ত্রীলোকদিগকে ভৎর্সনা করিতেন, অন্য পক্ষে তিনি সাধারণতঃ বেশ সুস্থই ছিলেন। কিছুদিন পরে তাঁহার টাইফয়েড পীড়া হয় এবং তাহার চিকিৎসার পর তিনি আমার নিকট ইহা স্বীকার করেন যে কেবল স্ত্রীলোকদিগকে তিরষ্কার করিবার সুযোগ খোঁজা তাঁহার একটি বিশেষ রীতি ছিল, তবে এক্ষণে আর তাহা নাই। তাঁহাকে বোধ হয় টাইফয়েড জ্বরের চিকিৎসার ভিতর কোনও গভীর কার্যকরী ঔষধ দেওয়া হইয়াছিল-তাহার ফলে তাঁহার ঐ প্রকৃতি গিয়াছিল। তিনি আমার নিকট অনেক ধন্যবাদ দেওয়ার পর ঐ কথা অতি সরলভাবে কহিয়াছিলেন। ছোট ছোট ছেলেদের মেজাজ খারাপ হইলে, তাহারা তাহা চাপা দিয়া বাহিরে প্রফুল্লতার ভান করিতেজানে না, কিন্তু বড় হইলে ভিভরের ভার ভিতরে রাখিয়া, বাহিরে ভালোমানুষটি। জানে না, কিন্তু কিন্তু তাই বলিয়া যে তাহারা মানসিক নাই, একথা বলা যায় না। এমন কি চাপা দিয়া 'তাল মানুষ সাজিবার' প্রবৃত্তিটিও মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ। এমন নিই মধ্যথা হ্যানিম্যান প্রকৃতই অনুভব করিয়া কহিয়াছেন যে, 'মানব মাত্রেই আজকাল অভ্যন্তরে কুষ্ঠরোগী।' অতি সত্য কথা। সকলে না হইলেও অনেকেই জানেন যে, যাবতীয় পীড়া, মন হইতেই দেহে বিকাশ পায়। দেহটিকে মনই গঠন করে এমন কি, দেহটি মনেরই স্কুল রূপমাত্র। মনটি যেমন, দেহটিও তেমনই হইবে। মনটি পীড়িত হইলে, দেহটি সুস্থ হইতে পারে না। দেহটিকে সুস্থ রাখিতে হইলে, আগে মনটিকে সুস্থ করিতে হইবে, অন্য উপায় নাই, এইজন্যই আমাদের ত্রিকালদর্শী আর্য ঋষিগণ জীবনে সর্ব প্র প্রথম হইতেই গুরু-গৃহে বাস করিয়া সংযমাদি শিক্ষালাভ করিবার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন এবং আমাদের দেশে যতদিন সেই ব্যবস্থা বলবর্তী ছিল, ততদিন ব্রাহ্মণ সন্তানগণ সর্বোতভাবে সুস্থ মনে, তথা সুস্থদেহে, জীবনযাত্রা নির্বাহ করিয়া মানবজীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধন করিতে সক্ষম হইতেন। তাঁহারা আবার অন্য বর্ণাশ্রমীদিগের কল্যাণ করিয়া তাঁহাদিগকেও প্রকৃত পথে চালিত করিতেন। এখন 'সে রামও নাই, সে অযোধ্যাও নাই।' এখন মনের দিকে কাহারও দৃষ্টি নাই, শরীরটিরও প্রকৃত সুস্থতা কিসে আসিবে, সে দিকেও দৃষ্টি নাই-দৃষ্টি কেবল একেবারে বাহিরে, কেবল বাহির সাফ চাই, 'লেপাফা দুরস্ত' চাই। ভিতরে ভিতরে যাহাই থাক না কেন, বাহিরের চটক থাকিলেই হইল। ভিতরের যথেষ্ট গরল থাকা সত্ত্বেও যদি দেখা হইবামাত্র সামান্যভাবে মৃদু কপট হাস্যের সহিত একটু ঘাড় নাড়া দিতে পারা গেল তবে যথেষ্ট সম্ভাষণ, সদালাপ হইল, ইহাই এখনকার রীতি হইয়া উঠিয়াছে। ভিতর কেহ দেখে না, বাহির লইয়াই ব্যস্ত। ফলে, ভিতরটি অতি ভয়ানক নরক সদৃশ হইয়া উঠিয়াছে ও উঠিতেছে এবং সেই সকল নরক দেহে আসিলে আবার তাহা চাপা দিবার চিকিৎসা অবলম্বিত হওয়ায়, ক্রমাগত নূতন নূতন ব্যাধি নূতন নূতন দুঃখের সৃষ্টি হইতেছে। তখন অদৃষ্টকে ধিক্কার দেওয়া, ভগবানকে দোষী সাব্যস্ত করা ছাড়া কোনও উপায়ান্তর আর কি আছে?
যদি মনের সুস্থতার উপরেই শারীরিক সুস্থতা নির্ভর করে, যদি মনকে সুস্থ ও অরোগী করিতে পারাই প্রকৃত প্রয়োজনীয়, তবে কি প্রকারে তাহা করা যাইতে পারে? উপায় কি? কি উপায়ে মনকে নীরোগ করা যায়? অগ্রে দেখা প্রয়োজন যে মনটি রোগী হয় কেন? মন কি জন্য রোগাক্রান্ত হইয়া থাকে। যে কারণে আমাদের শরীরস্থ কোনও যন্ত্র বা অংশ রোগাক্রান্ত হয়, সেই কারণেই মনও (যাহা দেহেরই সূক্ষ্মাবস্থা মাত্র) রোগাক্রান্ত হইয়া থাকে। সোরা, সাইকোসিস ও সিফিলিস দোষ হেতুই যাবতীয়, রোগলক্ষণের উৎপত্তি। এই সকলদোষ মনোরোগেরও জনক বা কারণ। এই সকল দোষের প্রথম উদ্ভব কি প্রকারে হইল, তাহা সম্প্রতি আলোচ্য নয়, এইজন্য সে বিষয়ের অবতারণা করা হইল না। মনোদুষ্টির কারণ ও প্রতিকারই মুখ্যতঃ আলোচনা করা হইতেছে। সোরা, সাইকোসিস ও সিফিলিস-এই তিনটি দোষের জন্য আমাদের শারীরিক ও মানসিক রোগ, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নাই। যে কোনও দোষ বা যে কোনও ঔষধ বা যাহা কিছু আমাদের শরীরে ক্রিয়া করে, সেই ক্রিয়ার প্রথম আঘাত, সর্ব প্রথম ঝঙ্কার বা সর্ব প্রথম স্পর্শ মনে আরম্ভ হইয়া থাকে। মনে করুন, আমি যেন আপনাকে কোনও কারণে বা বিনা কারণে কতকগুলি তীব্র ভৎর্সনা করিলাম। আমার ঐ ভৎর্সনা সর্ব প্রথমে কোথায় আঘাত করে। ভৎর্সনা ও দুর্বাক্য সকল প্রথম আঘাত মনের উপর করে, তাহার পর হয়ত শারীরিক লক্ষণ সকল, যথা ক্রন্দন, হৃৎস্পন্দন, দ্বেষ, এমন কি কম্প, মূর্ছা পর্যন্ত হইয়া থাকে। সেই প্রকার কোনও দোষ যখন ক্রিয়া করে, তখন তাহার প্রাথমিক ক্রিয়া মনেই আরম্ভ হয়। তবে একটা কথা আছে, যে দ্রব্য ক্রিয়া করিবে, তাহা যদি স্কুল হয়, তাহা যদি সূক্ষ্ম না হয়, তবে, তাহার মনের উপর ক্রিয়া করিবার শক্তি থাকিতে পারে না। মন যে স্তরের জিনিস সেই স্তরের দ্রব্য হইলে, তবেই মনে ক্রিয়া আগে দেখা যাইবে। যে দ্রব্য স্থল তাহা ত খাদ্য দ্রব্য। কাজেই স্থল দ্রব্য শরীরে প্রবেশ করিবার যে পথ নির্দিষ্ট আছে; সেই পথ দিয়া তাহাকে যাইতে হইবে এবং স্থল হইতে ক্রমে ক্রমে রূপান্তরিত হইয়া শেষে মনে পৌছিবে। এখানে স্কুলের কথা হইতেছে না। দোষ সকল- অর্থাৎ সোরা, সাইকোসিস ও সিফিলিস ইহারা অতি সূক্ষ্ম, এ কারণে ইহারা সর্বদাই মনের উপর ক্রিয়া করিতে সমর্থ হয়। কোনও হোমিওপ্যাথিক ঔষধ দেখা যায় যে, যদি অতিশয় নিম্ন শক্তির হয় তবে ভাহা আমাদের মানসিক লক্ষণকে পরিবর্তিত করিতে পারে না, কিন্তু যদি উচ্চ শক্তির হয়, তবে আগেই মনের উপর ক্রিয়া করে। ঔষধ সকলের প্রুভিং করিবার সময়েও যথেষ্ট উচ্চ শক্তির দ্বারা প্রুডিং না করিলে ঐ ঔষধের মানসিক লক্ষণ সকল প্রকাশ পায় না। এইজন্য যে সকল ঔষধ এখনও উচ্চতর শক্তিতে লইয়া গিয়া প্রুভিং হয় নাই, তাহাদের এখনও মানসিক লক্ষণ সকল প্রস্ফুটিত হয় নাই। যাহা হউক ইহা সিন্ধ যে, দোষ সকল সর্বাদৌ মনের উপর ক্রিয়া প্রকাশ করিয়া থাকে, এই কারণে 1 মনোদুষ্টিই দোষ সকলের প্রাথমিক ক্রিয়া-একথা স্থির। এই হইল, প্রাথমিক মনোদুষ্টি বা মনোযোগ। কিন্তু আরও আছে, আরও গুরুতর প্রকারের মনোযোগের সৃষ্টি হয়। তাহা পরে কহিতেছি।