11/12/2025
কথা বলতে বলতে হঠাৎ লুটিয়ে পড়া: মৃত্যুর কারণ যখন ‘সাইলেন্ট কিলার’
গাইবান্ধার সেই ঘটনাটি মনে আছে?
একজন ইমাম সাহেব মাহফিলে জোরালো বক্তব্য রাখছিলেন। হঠাৎ থেমে গেলেন... ঢলে পড়লেন... আর উঠতে পারলেন না।
উপস্থিত অনেকে ভেবেছিলেন হার্ট অ্যাটাক বা সাধারণ দুর্বলতা। কিন্তু ডাক্তারি ভাষায় এটি ছিল Brainstem Hemorrhage—স্ট্রোকের সবচেয়ে ভয়াবহ ধরনগুলোর একটি।
মাত্র কয়েক সেকেন্ড। একটি জীবন বদলে যাওয়ার জন্য বা শেষ হয়ে যাওয়ার জন্য সেটুকুই যথেষ্ট।
কেন এমন হয়? আমরা কি আগে থেকে সতর্ক হতে পারি? স্ট্রোক নিয়ে আপনার ধারণা বদলে দিতে এই ৭টি পয়েন্ট মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। 👇
১. ব্রেনস্টেম হেমোরেজ (Brainstem Hemorrhage) আসলে কী?
সহজ কথায়, মস্তিষ্কের গভীরে থাকা কোনো সূক্ষ্ম রক্তনালি বা ধমনী ফেটে রক্তক্ষরণ হওয়া। ব্রেনস্টেম হলো আমাদের ‘লাইফ সাপোর্ট সেন্টার’—যা শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণ করে। সেখানে রক্ত জমে চাপ সৃষ্টি করলে মুহূর্তেই মানুষের মৃত্যু হতে পারে অথবা কোমায় চলে যেতে পারেন।
২. কেন রক্তনালি হঠাৎ ফেটে যায়? (মূল কারণসমূহ)
বাংলাদেশে এই ঘটনার পেছনে প্রধান কিছু ‘ভিলেন’ রয়েছে:
অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ (High BP): এটি সবচেয়ে বড় কারণ। প্রেসার বেড়ে আর্টারির দেয়ালে ধাক্কা দেয়, যা শেষমেশ ফেটে যায়।
অ্যানিউরিজম (Aneurysm) বা AVM: অনেকের মস্তিষ্কের রক্তনালিতে জন্মগত ত্রুটি বা ফোলানো অংশ থাকে, যা কোনো লক্ষণ ছাড়াই সুপ্ত থাকে। হঠাৎ একদিন ফেটে যায়।
ভুল ওষুধ সেবন: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে রক্ত পাতলা করার ওষুধ (যেমন: Aspirin/Blood thinner) খাওয়া।
লাইফস্টাইল: অতিরিক্ত ধূমপান, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ (Stress) এবং ঘুমের তীব্র অভাব।
আঘাত: মাথায় আঘাত পাওয়ার ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা পরেও রক্তক্ষরণ শুরু হতে পারে।
৩. ইমার্জেন্সি: লক্ষণ দেখলেই হাসপাতালে ছুটুন
স্ট্রোকের ক্ষেত্রে "একটু রেস্ট নিলে ঠিক হয়ে যাবে"—এই চিন্তাটিই রোগীর মৃত্যু ডেকে আনে। নিচের লক্ষণগুলো দেখা মাত্রই হাসপাতালে নিতে হবে:
শরীরের এক পাশ হঠাৎ অবশ হয়ে যাওয়া।
কথা জড়িয়ে যাওয়া বা আটকে যাওয়া।
চোখে ঝাপসা বা ডাবল দেখা।
প্রচণ্ড মাথাব্যথা ও মাথা ঘোরা।
শ্বাস-প্রশ্বাস ধীর হয়ে আসা বা অজ্ঞান হয়ে পড়া।
৪. কেন সিটি স্ক্যান (CT Scan) প্রথম ৩০ মিনিটেই জরুরি?
অনেকে স্ট্রোকের রোগীকে প্রথমেই বাড়িতে ‘এসপিরিন’ বা টক পানি খাইয়ে দেন। এটি মারাত্মক ভুল!
স্ট্রোক মূলত দুই ধরনের:
Ischemic Stroke: রক্তনালি ব্লক হয়ে যাওয়া (এখানে রক্ত পাতলা করার ওষুধ জীবন বাঁচায়)।
Hemorrhagic Stroke: রক্তনালি ফেটে যাওয়া (এখানে রক্ত পাতলা করার ওষুধ দিলে রক্তক্ষরণ বেড়ে রোগীর মৃত্যু নিশ্চিত)।
বাইরে থেকে দেখে বোঝা অসম্ভব স্ট্রোকটি কোন ধরনের। তাই সিটি স্ক্যান ছাড়া কোনো ওষুধ দেওয়া মানে অন্ধের মতো গুলি চালানো।
৫. নিজেকে রক্ষা করবেন যেভাবে (Evidence-based Prevention)
স্ট্রোক হঠাৎ হয়, কিন্তু এর ক্ষেত্র তৈরি হয় দীর্ঘদিনের অনিয়মে। আজ থেকেই শুরু করুন:
রক্তচাপ মনিটরিং: প্রেসার সবসময় 120/80 থেকে 130/80 এর মধ্যে রাখার চেষ্টা করুন।
ব্যায়াম: সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট হাঁটুন বা ব্যায়াম করুন।
খাদ্যাভ্যাস: ওজন, ব্লাড সুগার এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন। ধূমপান পুরোপুরি বর্জন করুন।
ঘুম ও বিশ্রাম: দিনে ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করুন। স্ট্রেস কমাতে ইয়োগা বা মেডিটেশন করতে পারেন।
সতর্কতা: ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কখনোই এসপিরিন জাতীয় ওষুধ খাবেন না।
৬. শেষ কথা
“স্ট্রোক এক মুহূর্তের ঘটনা, কিন্তু এর প্রতিরোধ শুরু হয় আজ থেকেই।”
আজ যাদের পরিবারে উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস আছে—তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় এই তথ্যগুলো জানা জরুরি।
⚠️ সতর্ক হোন, সুস্থ থাকুন।
আপনার একটি শেয়ার হয়তো কোনো পরিবারের প্রিয় মানুষটিকে অকাল মৃত্যু বা পঙ্গুত্ব থেকে বাঁচাতে পারে।
সৌজন্যে: MediHealth Global