25/04/2026
#টুপুপুটু
#যাপিত_জীবনের_গল্প
মা, চোখ বন্ধ করো, চোখ বন্ধ করো। তাহারা দুই ভাই মানে আমাদের পুত্রদ্বয় কোনো কিছু মা কিংবা বাবাকে দেখাতে হলে এমনটা বলে। এটা হলো তাদের সারপ্রাইজ। তাদের সারপ্রাইজের কোনো আগামাথা নেই। কখনো দেখা গেলো হোমওয়ার্ক করতে বসছে। পঞ্চাশ পর্যন্ত লিখতে হবে মিহনকে। সে এক, দুই, তিন, করে বড়োজোর দশ পর্যন্ত লিখে বলবে, মা চোখ বন্ধ, চোখ বন্ধ...সাপ্পাইজ! ওমাগোওওও বলে আমাকে বড়ো একটা চিৎকার দিতে হবে। এত্তো সুন্দর... তুমি করেছো! সে খুশি হয়ে যায় এবং দ্বিগুণ উৎসাহে লিখতে থাকে। কথা হলো এই পঞ্চাশ পর্যন্ত লিখতে সে মিনিমাম পাঁচবার আমাকে এই চোখ বন্ধ খোলার কাজ করতে হবে এবং প্রতিবারই আগের বারের চেয়ে বেশি জোরে চিৎকার করে আনন্দ প্রকাশ করত হবে।
তুমি লিখো, আমি দেখি। না তা হবে না, তুমি চোখ বন্ধ করে রাখো। কী মুশকিল! এতক্ষণ চোখ বন্ধ করে রাখা যায়! আচ্ছা অন্য দিকে তাকিয়ে থাকি? না, তা হবে না। মনোযোগ অন্যদিকে! পাগল নাকি! এর ব্যত্তয় হয়েছে কী বুঝবে কত ধানে কত ভাত। হুম। হোমওয়ার্ক তো করবেই না, গাল ফুলানো ঠিক করতে যাবে পাক্কা আধা বেলা। কী দরকার এত দিগদারিতে যেয়ে। তারচেয়ে বরং... তাই সবসময়ই আমরা মিহনকে উইন উইন সিচুয়েশনে রাখি। তারই তো ভাই অহন। সে মাশাল্লাহ যোগ্য বড় ভাই।
হাসপাতাল থেকে ফিরসি। কলিং বেল চাপতেই মা এসেছে মা এসেছে বলতে বলতে দুই ভাই কলকল করে এগিয়ে এলো। চোখ বন্ধ, চোখ বন্ধ... আমাদের সাথে সাথে এসো...। কী যন্ত্রণা, আগে তো ঘরে ঢুকতে দিবি! জানি এসব বলে কোনো লাভ নাই, পড়েছি কাজীর হাতে, খানা খেতে হবে সাথে। অগত্যা কী আর করা, তাদের পিছু পিছু বেডরুমে যেয়ে তো চক্ষু চড়কগাছ! যদিও চড়কগাছ জিনিসটা কী, খায় না মাথায় দেয় আমি জানিনা, আমি শুধু দেখলাম আমার চোখ দুটো তাদের জন্য বরাদ্দকৃত কোটর থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাইছে! আমি চিৎকার করে কৈফিয়তের সুরে বলতে চাইলাম অনেক কিছু, জানতে চাইলাম অনেক প্রশ্নের জবাব কিন্তু আমার মুখ দিয়ে চিঁচিঁ ধ্বনি ছাড়া কিছুই বের হলো না।
ঘটনা হইল, একজোড়া খরগোশ খাঁচা সমেত আমার বেডরুমের সোফায় শোভা পাচ্ছে। খরগোশের শীত তাড়াতে পুত্রদ্বয় তাহাদের মায়ের টাওয়েল দিয়ে ব্লাংকেট বানিয়েছে এবং খাচার নিচে আলাদা করে তাদের মায়ের প্রিয় নকশিকাঁথা ভাজ করে বিছিয়ে রাখা আছে আর সেটাতে মহামান্য খরগোশদ্বয় মনের আনন্দে পি করে যাচ্ছে, একটু পরপর। আমি হাসব না কাঁদবো বুঝতে পারছিলাম না। কয় মাত্রার চিৎকার দিলে আমার রাগ প্রকাশিত হবে! ঘটনার আকস্মিকতায় একদম চুপ মেরে গেলাম। অতিমাত্রায় ঠান্ডা হয়ে খরগোশের প্রশংসা করলাম। আমার প্রিয় রঙ সাদা সেটাও বল্লাম। সাদা রঙের খরগোশ খুব পছন্দ বলতে বলতে লোকটাকে খুঁজতে লাগলাম। আজ তার একদিন কী আমার দুইদিন!
ভদ্রলোক আরো বেশি ভদ্র হয়ে মনোযোগ সহকারে পেপার পড়ছেন তাহার রুমে, যেনো এক্ষুনি না পড়লে কোনো একটা গুরুত্বপূর্ণ নিউজ মিস হয়ে যাবে। আমাকে দেখে একটু হাসার চেষ্টা করল, মানে কী খবর আর কি!
- রাগে গজগজ করতে করতে বল্লাম, এই জিনিস কেনো কিনেছো?
- আরেহ, তোমার ছেলে এমন শুরু করে দিলো, সে খরগোশ ছাড়া কিছুতেই বাসায় আসবে না। তুমি চাও একজোড়া খরগোশের জন্য তোমার ছেলে...।
- বাজে কথা রাখো, এই জিনিস আমার বেডরুমে কেনো? তাও আবার সোফায়, আমার কাঁথা, টাওয়েল দিয়ে মোড়ানো। ছিঃ কী গন্ধ!
- আরেহ, তোমার বেডেই রাখতে চেয়েছিলো, আমিই তো বুঝিয়ে সরাতে রাজি করেছি।
- কী সাংঘাতিক কথা! বেডে নাকি রাখতে চেয়েছিলো! কী বলছো! তাও ভালো রাখেনি। কিন্তু তাই বলে সোফায়!
- তোমার সাধের সোফা! বলেই লোকটা ফিচ করে হেসে দিলো। গা জ্বলে যায়!
কিছুক্ষণ পর তাহারা বাপ-বেটা তিনজন মিলে খরগোশ দুটোকে পেনটেন শ্যাম্পু ব্রাশ দিয়ে সমানে ঘষাঘষি করতে লাগল। দুয়েকদিনের মধ্যে রেবিস ভ্যাক্সিন দেওয়া হবে যাতে রোগ জীবাণু না ছড়ায়। পুত্রদ্বয় আমার অগোচরে এদেরকে নিয়ে লোফালুফি করে, আয়োজন করে ফুলকপি, বাঁধা কপি খাওয়ায়। একটু দেরী হলে নাকি খাওয়ার জন্য কাড়াকাড়ি করে। আরো কত কী! আমার সংসারে এখন খরগোশ একটা ফ্যাক্টর। সব গল্পেই কেমনে কেমনে যেনো এরা ঢুকে যায়। আর আমি তক্কে তক্কে থাকি কিভাবে বাসা থেকে এগুলোকে তাড়ানো যায়।
একদিন রান্নাঘরে যাচ্ছি, হাতে একটা বাঁধা কপি। কী যেনো হলো আমার... একটা পাতা এগিয়ে দিলাম, ওমা! ওমনি দুটোই লাফিয়ে ওঠল। তারপর কুটকুট করে খেতে লাগল। আমার কেনো যেনো মনে হলো, এরা বোঝে আমি এদের পছন্দ করি না, তাই বেশি মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। না হলে একটু আগেই খেয়ে আবার খাওয়ার চেষ্টা করছে কেনো? অবশ্য আমরা অর্থাৎ প্রাণীরা সবাই আসলে মনোযোগ পেতে পছন্দ করি।
অদ্ভুত দৃশ্য হচ্ছে, খরগোশ খাওয়ার সময় তো বটেই এমনি সময়েও তিরতির করে কাঁপে! দেখতে ভালো লাগে। কী সুন্দর, ধবধবে সাদা! নিরিহ দুটো জীবন। মায়ায় আক্রান্ত হই। আহা! দারুণ তো। আগে কেনো চোখে পড়ে নি। আচ্ছা থাকুক, ঘরেই থাকুক।
না খরগোশ দুটোকে ঘরে রাখা সম্ভব হয় না।
ওদিকে খালা বলে দিয়েছে, খরগোশের হাগুমুতু সে পরিস্কার করতে পারবে না। গন্ধে নাকি টেকা যায় না। আমি দেখলাম, আসলেই গন্ধ। সিদ্ধান্ত হলো গ্যারেজে রাখা হবে। ড্রাইভার এবং দারোয়ান দেখাশোনা করবে। বাচ্চারা বিকেল বেলা খেলতে নামলে সাথে নিয়ে হাঁটবে। তাই করা হলো। আমিও রোজ দুই বেলা খোঁজ নেই। খাবার ঠিকঠাক খাচ্ছে কিনা, গোসল ঠিকমতো হয় কিনা এসব আরকি। গেটের পাশেই খাচায় রাখা থাকে, কখনো কখনো ছাড়াও থাকে। দেখতে দেখতে বেশ নাদুসনুদুস হয়েছে। ভালো লাগে দেখতে। সবচেয়ে ভালো লাগে যখন কুটকুট করে খায় আর তিরতির কাঁপে। ক্রমে ক্রমে এরা আমাকে দখল করে নেয়। আমার সংসারের অংশ হয়ে ওঠে। সব ঠিকঠাক চলছিলো। একদিন সকালে দেখি খাঁচাটা শূন্য পড়ে আছে। গ্যারেজের অদূরে ছোপ ছোপ রক্ত! বেজি! কলোনির গাছপালার জঙ্গলে কয়েকটা বেজির ঘর সংসার। খরগোশ দুটোর বিপদ হতে পারে, এ আশংকা আমি আগেই করেছিলাম। অবশেষে তাই হলো। আহা! খোদা কেনো এমনটা হলো! খুব কষ্ট লাগে। আমার সন্তানরা আকুল হয়ে কাঁদতে থাকে!
একসময় সব কষ্টই থিতিয়ে আসে, দগদগে ক্ষতে ধূলোর প্রলেপ পড়ে। সময়ের পালতোলা নৌকায় করে দিন যায়, মাস যায়। আমরা প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় অনেক কিছু ভুলতে থাকি। তারপরেও টুপুপুটু আমাদের মনের কোনো না কোনো অলিন্দে চুপটি করে বসে থাকে। টুপু-পুটু ছিলো খরগোশ দুটোর নাম। নামকরণ করেছিলো বড়োপুত্র অহন। আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছিল। ছেলে এই কালকেও বলছিল, মা টাইম মেশিন কোথায় কিনতে পাওয়া যায়? কেনো বলো তো? আমি কিনব। কিনে কী করবে? আমি টুপু-পুটুর মৃত্যুর আগের দিনে পৌঁছাবো। তারপর খাঁচাটা শক্ত করে উপরে ঝুলিয়ে রাখব, যত উঁচুতে ঝোলালে বেঁজি নাগাল পাবে না। উল্লেখ টুপু পুটুকে দেখভাল করার দায়িত্বপ্রপ্ত ব্যাক্তি সেদিন এই কাজটি করতে ভুলে গিয়েছিল, ফলে আমাদের জীবন থেকে ওরা হারিয়ে গিয়েছিলো। হারিয়ে গেলেও আমাদের দিন যাপনে টুপুপুটু কে আমরা ভুলি না, ভুলব না।
টুপুপুটুর জন্য এলিজি
-------------------------------
ঝুমুর ঝুমুর বৃষ্টি পড়ে বৃষ্টি পড়ে ঐ
বৃষ্টি পড়ে বৃষ্টি পড়ে অহন মিহন কই?
অহন মিহন খেলছে বসে পুকুরপাড়ে ঐ
সঙ্গে আছে ফিঙে টিয়ে আর পুকুরের কৈ
টুপু-পুটু কোথায় গেলো পরল হৈচৈ
বনবিড়ালে খেয়ে নিয়েছে কষ্টে নীল হই
বিঃদ্রঃ - বছর সাতেক আগের লেখা। মেমোরিতে এলো। ভাবলাম আপনাদের সাথে শেয়ার করি।