19/02/2026
রমজান ও ডায়াবেটিস
রমজান মুসলমানদের জন্য খুবই বরকতময় সময়। সবাই চান এই মাসের রহমত ও বরকতে অংশ নিতে। তবে ডায়াবেটিস থাকলে কিছু বিষয় জানা জরুরি, যাতে রোজা নিরাপদে রাখা যায়।
প্রথম কথা হলো—ডায়াবেটিস রোগীদের অনেকেই রোজা রাখতে পারেন, কিন্তু সবার জন্য নিয়ম এক নয়। কারো শারীরিক অবস্থা ভালো থাকলে তিনি রোজা রাখতে পারেন, আবার কারো ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি হতে পারে। তাই রোজা শুরু করার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে যাদের সুগার খুব অনিয়ন্ত্রিত, সুগার কমে গেলে বুঝতে পারেন না, সম্প্রতি ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস হয়েছে, হার্ট-কিডনি-লিভারের জটিল সমস্যা আছে, সাম্প্রতিক হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হয়েছে, খুব দুর্বল বৃদ্ধ, গর্ভবতী বা বুকের দুধ খাওয়ান—তাদের সাধারণত রোজা না রাখাই নিরাপদ।
সঠিকভাবে রোজা রাখলে কিছু উপকারও হতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে শরীরের মেটাবলিজম ভালো হয়, ওজন কমতে সাহায্য করে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং নিয়ম মেনে চলার অভ্যাস তৈরি হয়। কিছু রোগীর ইনসুলিনের কার্যকারিতাও উন্নত হতে পারে।
তবে ঝুঁকিও থাকে। রোজায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো রক্তে সুগার কমে যাওয়া, যাকে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলা হয়। এছাড়া সুগার বেড়ে যাওয়া, পানিশূন্যতা এবং ওজনের অস্বাভাবিক পরিবর্তনও হতে পারে। সুগার কমে গেলে সাধারণত অতিরিক্ত ঘাম, হাত কাঁপা, বুক ধড়ফড়, প্রচণ্ড ক্ষুধা, ঝিমুনি, মাথা ঘোরা বা কথা জড়িয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা যায়। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে রোজা ভেঙে ফেলতে হবে, ইফতারের সময় কাছাকাছি হলেও। তখন দ্রুত এক গ্লাস পানিতে চার থেকে ছয় চামচ চিনি মিশিয়ে খাওয়া বা মিষ্টি কিছু খাওয়া প্রয়োজন।
অনেকেই জানতে চান, রোজা রেখে রক্তে সুগার মাপা যাবে কি না। এতে কোনো সমস্যা নেই—রোজা ভাঙে না। বরং নিয়মিত সুগার মাপা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সেহরির প্রায় দুই ঘণ্টা পর এবং ইফতারের প্রায় এক ঘণ্টা আগে সুগার চেক করা ভালো।
কিছু অবস্থায় রোজা অবশ্যই ভাঙতে হবে। যদি রক্তে সুগার ৩.৯ mmol/L এর নিচে নেমে যায় বা ১৬.৬ mmol/L এর বেশি হয়ে যায়, তাহলে রোজা চালিয়ে যাওয়া বিপজ্জনক।
খাবারের ক্ষেত্রে রমজানে সুষম ও পরিমিত খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখতে হবে। সেহরিতে এমন খাবার খাওয়া ভালো যা ধীরে হজম হয়, যেমন ভাত, রুটি বা ওটসের সঙ্গে ডাল, সবজি, মাছ বা ডিম, দুধ ও ফল। সেহরি যতটা সম্ভব দেরিতে খাওয়াই ভালো। ইফতারে অতিরিক্ত ভাজা ও মিষ্টি খাবার এড়িয়ে চলতে হবে, মিষ্টি শরবত কম খেতে হবে এবং অল্প অল্প করে খাবার গ্রহণ করতে হবে। ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি পান করা খুব জরুরি।
শরীরচর্চার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজ করা যাবে, তবে দিনের বেলা ভারী পরিশ্রম এড়িয়ে চলাই নিরাপদ। ইফতারের পর ৩০ থেকে ৬০ মিনিট হালকা ব্যায়াম করা যেতে পারে। তারাবীহ নামাজকেও শারীরিক কার্যকলাপ হিসেবে ধরা যায়।
ওষুধ ও ইনসুলিনের ব্যাপারটি খুবই ব্যক্তিনির্ভর। তাই নিজের ডাক্তারের পরামর্শই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে অনেক ক্ষেত্রে ওষুধের সময় ইফতার ও সেহরি অনুযায়ী সমন্বয় করা হয়, কিন্তু নিজে নিজে ডোজ পরিবর্তন করা ঠিক নয়।
আপনি ডায়াবেটিস রোগী হোন বা না হোন, লক্ষ্য হওয়া উচিত সুস্থভাবে রোজা পালন করা। যদি শারীরিক কারণে চিকিৎসক রোজা রাখতে নিষেধ করেন, তাহলে মন খারাপ করার কিছু নেই। আল্লাহ নিয়্যাত দেখেন। পরে কাজা আদায় করা যাবে, ইনশাআল্লাহ। এই রমজান হোক আমাদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ রমজান। আমীন।