28/04/2026
দেশে একটি "জাতীয় ডায়াবেটিস ও হরমোন ইন্সটিটিউট" প্রতিষ্ঠা করা কতটা জরুরি?
------------ ------------ -----------
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য এবং মাতৃমৃত্যু হ্রাস—এসব ক্ষেত্রে দেশ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। কিন্তু একই সময়ে একটি নীরব পরিবর্তন ঘটছে—রোগের ধরনে পরিবর্তন। অসংক্রামক রোগ, বিশেষ করে ডায়াবেটিস ও হরমোনজনিত রোগ, দ্রুত বাড়ছে এবং এটি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—যেখানে দেশে কিডনি, হৃদরোগ, ক্যান্সার কিংবা চক্ষু চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত জাতীয় ইনস্টিটিউট রয়েছে, সেখানে কেন এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ “জাতীয় ডায়াবেটিস ও হরমোন ইনস্টিটিউট” প্রতিষ্ঠিত হয়নি? এবং এটি প্রতিষ্ঠা করা কতটা জরুরি?
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে নির্দিষ্ট রোগভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় একটি কার্যকর মডেল গড়ে তুলেছে। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট—এসব প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট রোগের চিকিৎসা, গবেষণা এবং প্রশিক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে এসব রোগের ব্যবস্থাপনায় একটি কাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে এবং রোগীরা বিশেষায়িত সেবা পাচ্ছেন। এই সফল মডেলটি প্রমাণ করে যে, একটি নির্দিষ্ট রোগগুচ্ছকে কেন্দ্র করে বিশেষায়িত জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হলে তা চিকিৎসা ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম।
কিন্তু ডায়াবেটিস ও হরমোনজনিত রোগের ক্ষেত্রে এই ধরনের একটি জাতীয় কাঠামোর অভাব সুস্পষ্ট। বর্তমানে বাংলাদেশে ডায়াবেটিস একটি “নীরব মহামারি” হিসেবে বিস্তার লাভ করছে। International Diabetes Federation এর তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও এর বিস্তার ঘটছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক।
ডায়াবেটিসের পাশাপাশি থাইরয়েড রোগ, স্থূলতা, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS), হরমোনজনিত বন্ধ্যাত্ব এবং পিটুইটারি ও অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির নানা জটিলতা—এসব রোগের প্রকোপও বাড়ছে। এসব রোগের বৈশিষ্ট্য হলো—এগুলো দীর্ঘমেয়াদী, জটিল এবং শরীরের একাধিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে প্রভাবিত করে। ফলে এগুলোর চিকিৎসা কেবল একজন চিকিৎসকের মাধ্যমে সম্ভব নয়; বরং একটি সমন্বিত ও বহুমাত্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রয়োজন।
বর্তমানে বাংলাদেশে ডায়াবেটিস চিকিৎসায় বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি এবং এর অধীনে BIRDEM General Hospital গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এই প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা সেবা প্রদান করে আসছে এবং গবেষণার ক্ষেত্রেও কিছু ভূমিকা রাখছে। তবে এটি মূলত একটি বেসরকারি উদ্যোগভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, যা জাতীয় পর্যায়ের একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি ইনস্টিটিউটের বিকল্প হতে পারে না। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগণের জন্য এই সেবা সহজলভ্য নয়, এবং জাতীয় নীতি নির্ধারণ বা বৃহৎ পরিসরের জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি পরিচালনার জন্য একটি কেন্দ্রীয় কাঠামো এখানে অনুপস্থিত।
একটি জাতীয় ডায়াবেটিস ও হরমোন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে। ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ, যা হৃদরোগ, কিডনি, চোখ, স্নায়ু—প্রায় সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে প্রভাবিত করে। ফলে একজন রোগীর জন্য একাধিক বিশেষজ্ঞের সমন্বিত চিকিৎসা প্রয়োজন হয়। একটি জাতীয় ইনস্টিটিউট এই বহুমাত্রিক চিকিৎসাকে এক ছাদের নিচে নিয়ে আসতে পারে, যা রোগীর জন্য সময়, খরচ এবং জটিলতা—সবই কমিয়ে দেবে।
গবেষণার ক্ষেত্রেও একটি জাতীয় ইনস্টিটিউট অপরিহার্য। বাংলাদেশে মানুষের খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রা, জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং পরিবেশগত প্রভাব অন্যান্য দেশের থেকে ভিন্ন। ফলে পশ্চিমা দেশগুলোর গাইডলাইন সবসময় আমাদের জন্য উপযোগী হয় না। একটি জাতীয় ইনস্টিটিউট দেশীয় তথ্য সংগ্রহ করে গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশ-উপযোগী চিকিৎসা নীতিমালা তৈরি করতে পারে। এর ফলে চিকিৎসা হবে আরও কার্যকর, বাস্তবসম্মত এবং সাশ্রয়ী।
এছাড়া দক্ষ জনবল তৈরির ক্ষেত্রেও এই ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দেশে এন্ডোক্রাইনোলজিস্টের সংখ্যা খুবই সীমিত। ডায়াবেটিস এডুকেটর, প্রশিক্ষিত নার্স, নিউট্রিশনিস্ট—এসব ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। একটি জাতীয় ইনস্টিটিউট নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ করতে পারে এবং একটি শক্তিশালী মানবসম্পদ তৈরি করতে পারে।
প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ক্ষেত্রেও এই ইনস্টিটিউট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ডায়াবেটিস একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ—এসবের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব। একটি জাতীয় ইনস্টিটিউট দেশব্যাপী স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম চালু করতে পারে, জনসচেতনতা বাড়াতে পারে এবং স্কুল ও কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত লাভজনক। ডায়াবেটিসের জটিলতা—যেমন কিডনি বিকল হয়ে ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হওয়া, হৃদরোগ, অন্ধত্ব—এসব চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এই ব্যয় অনেকাংশে কমানো সম্ভব। ফলে একটি জাতীয় ইনস্টিটিউট দীর্ঘমেয়াদে দেশের স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় কমাতে এবং কর্মক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও এই দাবিকে সমর্থন করে। যুক্তরাষ্ট্রের Joslin Diabetes Center এবং Mayo Clinic কিংবা যুক্তরাজ্যের National Institute for Health and Care Excellence—এসব প্রতিষ্ঠান শুধু চিকিৎসা নয়, বরং গবেষণা, নীতি নির্ধারণ এবং বিশ্বব্যাপী গাইডলাইন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে এসব দেশে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলকভাবে সফলতা দেখা যায়।
বাংলাদেশে একটি আধুনিক জাতীয় ডায়াবেটিস ও হরমোন ইনস্টিটিউট গড়ে তুলতে হলে এতে থাকতে হবে উন্নত ক্লিনিক্যাল সেবা, আধুনিক গবেষণা ল্যাব, প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা কার্যক্রম এবং জনস্বাস্থ্য ইউনিট। পাশাপাশি টেলিমেডিসিন ও ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছেও এই সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। উচ্চ ব্যয়, দক্ষ জনবল সংকট এবং প্রশাসনিক জটিলতা—এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। তবে ধাপে ধাপে পরিকল্পনা, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা সম্ভব।
সবশেষে বলা যায়, ডায়াবেটিস ও হরমোনজনিত রোগ আজ বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকি। ইতোমধ্যে অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রে বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট সফলতা দেখিয়েছে। তাই একটি “জাতীয় ডায়াবেটিস ও হরমোন ইনস্টিটিউট” প্রতিষ্ঠা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের দাবি। অনেক আগেই এই ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করার কাজে হাত দেয়া প্রয়োজন ছিল। এটি প্রতিষ্ঠিত হলে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে, রোগ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অগ্রগতি আসবে এবং সর্বোপরি লাখো মানুষের জীবনমান উন্নত হবে।
-------------- ------- -------
ডা. এম এ হালিম খান
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
ডায়াবেটিস ,থাইরয়েড ও হরমোন বিভাগ ,শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ,ঢাকা।
Website:
Dr MA Halim