05/08/2022
♦♦||||||||||| পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার /
আঘাত পরবর্তী চাপজনিত ব্যাধি |||||||||||||||||♦♦
২০১৩ সাল।২৪ বছরের ছালাম মিয়া (ছদ্মনাম) মাদ্রাসায় পড়াচ্ছিল।হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল ।ছোট ভাই ফোন করেছে।ক্লাসরুম থেকে বাইরে গিয়ে যেই না ফোন ধরেছে--'ওমাগো' বলে রুম থেকে এক দৌড়ে কই যেন সে চলে গেল??
সাভারের রানা প্লাজা নামে একটি ভবন ধসে পড়ার ঘটনা আমাদের অনেকেরই জানা । ঐ ভবনেই কাজ করত ছালাম মিয়ার অতি আদরের ছোট ভাই আলম(ছদ্মনাম)।ছালাম মিয়া যতক্ষণে পৌঁছাল,ততক্ষণে ঐ ভবনটি আরো বেশি ধসে পড়েছে।ছালাম মিয়া আবারও ফোন দিল। সেবার কেবল ফোন বাজল কিন্তু আলম সেটা আর ধরলনা। ছালাম মিয়া খুব কাছ থেকে দেখছিল নিহতদের লাশ, তাদের বিকৃত অবয়ব, শুনতে পাচ্ছিল আহতদের আর্তনাদ আর তাদের স্বজনদের আহাজারি। উদ্ধারকর্মী হিসেবে সেখানে কাজ করে যাচ্ছিল ফায়ার সার্ভিস,পুলিশ ও জনগণ।একবুক চাপা কষ্ট নিয়ে ছালাম মিয়া ধ্বংস-স্তুপের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল মোবাইল বাজিয়ে বাজিয়ে।হঠাৎ এক কোণায় সে তার ছোট ভাইয়ের মোবাইলের শব্দ শুনতে পেল ।তৎক্ষনাৎ আবার রিং দিল এবং তা আবারও বেজে উঠল ।এখানেই তার ভাই আছে-সে বুঝতে পারল। একটা লোহা নিয়ে সে ধ্বংসস্তুপ খুঁড়ে দেখা শুরু করল।অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সে তার ভাইয়ের মাথা আর একটা হাত দেখতে পেল। লোহা দিয়ে ধ্বংসস্তুপে প্রচুর বল প্রয়োগ করা সত্ত্বেও মাথা ও হাত দুটি একটুও বের হল না।তবে সে ঐ মোবাইলটাকে হাতে পেয়ে গিয়েছিল। অনেক চিৎকার করল ছালাম মিয়া।তার আকাশ ভারি কান্না অনেকেই দেখতে পেল।অবশেষে সে বাড়ি ফিরে গেল।সেদিন বাসায় ফেরার পর ছালাম মিয়া-তার মা-বাবাকে ধরে চিৎকার করে কান্নকাটি করল।ভাইটা তার অনেক আদরের ছিল। বুড়া মা-বাবার দিকেও ভাইটার অনেক খেয়াল ছিল। পরদিন বুলডোজারের সাহায্যে ছোট ভাই -আলমের সেই আটকে পড়া লাশটা উদ্ধার করা হল।লাশটিকে মাটি দিতে মাদ্রাসার সকল ছাত্র-শিক্ষকই এল।সবাই পরিবারটিকে সান্ত্বনা দিল।
এভাবে২০ দিন চলে যায়। হঠাৎ একদিন রাতে সে ভয়াবহ এক স্বপ্ন দেখতে পায়। স্বপ্নে তার মনে হচ্ছিল চারদিকে ধ্বংসস্তুপ।তার চারপাশে লাশ আর লাশ, দেখছিল তাদের বিকৃত অবয়ব, সে শুনতে পাচ্ছিল আহতদের আর্তনাদ আর তাদের স্বজনদের চিৎকার । ঘুম ভাঙার পর সে কানে আবার ওই চিৎকার শুনতে পায়-ভাই আমারে বাঁচান। তার শরীর কেঁপে ওঠে,বুক ধড়ফড় করতে থাকে,ঘাম শুরু হয় এবং শ্বাস-প্রশ্বাস ও দ্রুত হয়ে যায়।এক ধরনের অপরাধবোধ তাকে পেয়ে বসে-সে তার ভাইকে বাঁচাতে পারলনা।মানসিক আঘাত থেকে সৃষ্ট মানসিক চাপগুলো ছালাম মিয়াকে এক মাস ধরে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল।অবশেষে মাদ্রাসার আরেক শিক্ষক তাকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাইকিয়াট্রি বিভাগে নিয়ে এলেন।
চিকিৎসক ছালাম মিয়ার সবকিছু বিবেচনা করার পর বললেন যে-ছালাম সাহেব পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারে (পিটিএসডি) ভুগছেন। সাধারণত মানসিক আঘাত পাওয়ার প্রথম তিন মাসের মধ্যেই এটি দেখা দেয়। আঘাত থেকে সৃষ্ট মানসিক চাপের লক্ষণগুলো যদি এক মাসের বেশি সময় ধরে বিদ্যমান থাকে তবে সেটিকে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) বলা হয়।
♦♦♦♦♦কোন ধরনের ঘটনার ফলে এ রোগের উৎপত্তি হতে দেখা যায়? ♦♦♦♦♦♦
তীব্র মানসিক চাপ (mental stress)তৈরি করার মতো ঘটনা থেকে এ রোগ হবার সম্ভাবনা বেশি।এর মধ্যে রয়েছে -
√ বন্যা √ ভবনধস √বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড
√ভূমিকম্প √ধর্ষণ √হত্যাযজ্ঞ
√যুদ্ধ √প্রচণ্ড শারীরিক নির্যাতন
√যে কোনো পরিবহনের মারাত্মক দুর্ঘটনা।
♦♦কাদের মধ্যে এ রোগ হবার সম্ভাবনা বেশি??♦
আমরা জানি,Every person is unique. অর্থাৎ, প্রতিটি মানুষ একে অপরের থেকে ভিন্ন।তেমনি প্রতিটি মানুষের স্নায়ুতন্ত্র এবং চাপ সহ্য করার ক্ষমতাও একে অপরের থেকে ভিন্ন।তাই একই ঘটনা সবার মাঝে সমান তীব্রতার মানসিক চাপ তৈরি করে না।বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে -যাদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে তারা হল-
★নারী ★ শিশু ★ বৃদ্ধ
★যাদের আগেই মানসিক চাপের ইতিহাস থাকে,
★যাদের মধ্যে বিষণ্ণতা রোগের ইতিহাস থাকে,
★যাদের মধ্যে উদ্বেগের ইতিহাস থাকে,
★যাদের মানসিক চাপ সহ্যের ক্ষমতা কম থাকে,
★যাদের বংশে এই রোগের ইতিহাস থাকে,
★যাদের সামাজিক সহায়তা কম থাকে,
★যাদের বুদ্ধিবৃত্তি কম থাকে।
এছাড়াও সরাসরি দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ব্যক্তি ছাড়াও যারা এসব দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষভাবে খুব কাছ থেকে দেখেন, (চিকিৎসক, নিকটাত্মীয়, উদ্ধারকর্মী) তাদেরও এ রোগ হবার সম্ভাবনা রয়েছে ।
|||||||||||||||||||||||||||||♦লক্ষণ♦|||||||||||||||||||||||||||||||||
মানসিক আঘাত পরবর্তী তাদের মানসিক রোগের লক্ষণগুলোও কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। এখানে কয়েকটি লক্ষণ তুলে ধরা হল-
১)জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা।
২)বারবার দুর্ঘটনার সেই কষ্টদায়ক স্মৃতি মনে পড়া।
৩)ঘুমের সমস্যা ও মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া।
৪)অন্যদের এড়িয়ে চলা।
৫) মাঝে মাঝে চমকে ওঠা।
৬)মনোযোগে সমস্যা ও স্মরণশক্তি কমে যাওয়া।
৭)দুর্ঘটনার কথা মনে হলে কিছু শারীরিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়া যেমন-বুক ধড়ফড় করা,ঘেমে যাওয়া, মাংসপেশীতে টান অনুভব করা,বমি বমি ভাব আসা,
শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হওয়া ইত্যাদি।
৮)প্রায়ঃশই দুঃস্বপ্ন দেখা।
৯)নিজেকে ছোট ভাবা এবং নিজের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলা।
১০)হতাশা ও একাকিত্ব অনুভব করা।
♥♦♦♦♦চিকিৎসা পদ্ধতি ♦♦♦♦♦♥
১)মেডিকেশন
২)সাইকোথেরাপিঃ
√কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (CBT)
√এক্সপোজার থেরাপি
√আই মুভমেন্ট ডিসেনসিটাইজেশন অ্যান্ড রিপ্রসেসিং(E.M.D.R)
√ব্রিদিং এক্সারসাইজ
√ রিলাক্সেশন
√স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট
√মাইন্ডফুলনেস
লেখক:ফৌজিয়া শারমীন হোসেন
( কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট ও সাইকোথেরাপিস্ট)
মাইন্ডসেট সাইকোথেরাপি এন্ড কাউন্সেলিং সেন্টার,
পান্থপথ, ঢাকা।
★★দ্বিতীয় শাখাঃ
৫১/এফ হামিদ উদ্দিন রোড(কলেজ রোড)
কাচিজুলি, ময়মনসিংহ।
মোবাইল:01711345291,01991333503