09/03/2026
ভাবুন, প্র্যাকটিস করুন
"অনেক দিন হয়ে গেলো টুথপেস্ট স্পর্শ করিনা। আলহামদুলিল্লাহ। যা বুঝলাম টুথপেস্ট আসলে বাহারি বিজ্ঞাপনের ব্রেইনওয়াশ পণ্য ছাড়া আর কিছুই নয়। শরীরে টক্সিন ঢুকানো আর স্রেফ কনজিউমার বানানো হলো উদ্দেশ্য। তাহলে বিকল্প কি? কমন প্রশ্ন। বিকল্প কি? আসলে বাহারি বিজ্ঞাপনের চোটে আমরা সরল পথ হারায়ে ফেলছি। এজন্য সহজ বিকল্পও খুজে পেতে সমস্যা হয়। বলে রাখা ভালো টুথপেস্টের বিকল্প দামি টুথপেষ্ট না। ইদানিং জনপ্রিয় ডাক্তার ও ইউটিউবাররা প্রাকৃতিক খাবারের বিকল্প ফুড সাপ্লিমেন্ট টাবলেট আর টুথপেস্টের বিকল্প দামি টুথপেস্টকে সামনে হাজির করে। এগুলো ভুল।
তাহলে বিকল্প?? একের পর বিকল্প ট্রাই করা শুরু করি। ৭৫ গ্রাম টুথপেস্টের দাম ১০০০-২০০০ টাকা পর্যন্ত যেগুলোতে টক্সিন নেই, প্রাকৃতিক ইত্যাদি বলা হয়। ইউরোপ আমেরিকার তৈরি। সমাধান মনে হয়নি। প্রথমত দাম। দ্বিতীয়ত হয়ত কম কিন্তু ক্ষতিকর কেমিক্যাল অবশ্যই আছে। মেসওয়াক পরিপূর্ণ প্রাকৃতিক সমাধান। কিন্তু অভ্যস্ত হতে পারিনি। কলকাতার জনপ্রিয় একজন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক বলেন লেবুর খোসা দিয়েই নিয়মিত দাঁতের পূর্ণ যত্ন সম্ভব। এটা মাঝে মাঝে করা যেতে পারে। কিন্তু সবসময় বাস্তবসম্মত মনে হয়নি। হলুদ, লবণ, বেকিং সোডা, লবঙ্গ, সরিষার তেল, নারিকেল তেল, লেবুর রস ইত্যাদি দিয়ে ঘরোয়া পদ্ধতিতে তৈরি করা মিশ্রন দিয়েও দারুন কার্যকরী বিকল্প তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু এতো সময় কোথায়! রেডিমেড কিছু দরকার। চন্দন, পুদিনা, দারুচিনি, নিম ইত্যাদি প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি মিসওয়াক পাউডার বাজারে পাওয়া যায়। দাম খুব কম না। তবে ভালো সমাধান। মিসওয়াক অথবা টুথব্রাশ দিয়ে ব্যবহার করা যায়। ব্র্যাশ দিয়ে ট্রাই করা শুরু করি। ব্যাস! টুথপেস্ট আর স্পর্শ করতে হয়নি। টাকা থাকলে ভালো কনজিউমার হোন, সমস্যা নেই। কিন্তু জেনেশুনে কেনো শরীরে বিষ ঢুকাবেন? আর না জেনে থাকলে নিচের অংশ পড়ে নিন।
------------------------------
সংগৃহীত-
সোডিয়াম লরেল সালফেট, ফ্লোরাইড, ট্রাইক্লোসান এবং আর্টিফিশিয়াল সুইটনার দিয়ে টুথপেস্ট বানানো হয়। টুথপেস্টের এসব কেমিক্যাল শরীরে প্রবেশ করে নানা নেতিবাচক রদবদল ঘটাতে শুরু করে। পেস্ট ফেনার সাথে মুখ থেকে ফেলে দিই আমরা। কিন্তু দাঁত মাজার সময়েই ক্ষতিকর কেমিক্যালস মুখ বেয়ে শরীরের অন্দর মহলে পৌঁছে যায়। টুথপেস্ট ব্রান্ডগুলো এমনভাবে ভিজ্যুয়াল গ্রাফিক্সের বিজ্ঞাপন প্রচার করে যা দেখে মনে হবে সব টুথপেষ্টই ওরাল হেলথের জন্য অত্যন্ত ভালো, অত্যন্ত দরকারী। বিজ্ঞাপন দেখে অনেকের ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়– বেশি করে পেস্ট দিয়ে দাঁত মাজতে হবে। অথচ বাস্তবে দাঁত পরিষ্কার করে ব্রাশের ব্রিসল, পেস্ট সহায়ক। কিন্তু সহায়ক উপাদানের সাথে যে টক্সিন শরীরে প্রবেশ করে সেদিকে খেয়াল করে না কেউ।
নামিদামি প্রায় সব ব্রান্ডের টুথপেস্টে কমবেশি মারাত্মক ক্ষতিকর সোডিয়াম ফ্লোরাইড, ট্রাইক্লোসান, সোডিয়াম লরেল সালফেট এবং স্যাকারিন থাকে। আমরা টুথপেস্টের বিজ্ঞাপন থেকে দাঁত নিয়ে যতরকম জ্ঞান অর্জন করেছি তা হলো– ফ্লোরাইড ক্যাভিটি থেকে সুরক্ষা দেয়, মাড়ি ভালো রাখে, ট্রাইক্লোসান মুখের সজীবতা বাড়ায়, অ্যাকটিভ ইনগ্রেডিয়েন্টস তাজা নিঃশ্বাস আনে ইত্যাদি। আশ্চর্যের বিষয় হলো এই ধারনা বাতিল হয়ে গেছে সেই ১৯৮৭ সালের দিকে! অথচ আমরা এখনো ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার করছি!
টুথপেস্টের রাসায়নিক উপাদানগুলো হলো– অ্যালুমিনিয়াম হাইড্রোক্সাইড, ক্যালসিয়াম হাইড্রোজেন ফসফেটস, ক্যালসিয়াম কার্বোনেট, হাইড্রেটেড সিলিকা, হাইড্রোক্সাপাটাইট, সোডিয়াম ফ্লোরাইড, স্ট্যানাস ফ্লোরাইড, সোডিয়াম মনোফ্লুরোফসফেট, সোডিয়াম লরিল সালফেট (SLS), ট্রাইক্লোসান, জিঙ্ক ক্লোরাইড, ক্যালসিয়াম ফসফেট, গ্লিসারল, জাইলিটল, সরবিটল, পলিথিন গ্লাইকোল, প্রোপিলিন গ্লাইকল, স্ট্রনশিয়াম ক্লোরাইড, পটাসিয়াম নাইট্রেট, আরজিনাইন, সোডিয়াম পলিফসফেট, জিঙ্ক সাইট্রেট, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড, সোডিয়াম স্যাকারিন সহ আরো অনেক রকম সিন্থেটিক কেমিক্যাল।
ট্রাইক্লোসান, সোডিয়াম লরেল সালফেট (SLS) এবং সোডিয়াম লরেথ ইথার সালফেট (SLES) এই তিনটি কেমিক্যালই ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন (EU) ব্যান করেছে।
• সোডিয়াম লরেল সালফেট
সোডিয়াম লরেল সালফেট (SLS) বা সোডিয়াম লরেথ ইথার সালফেট (SLES) এর মতো সারফ্যাক্ট্যান্ট (ফেনা উৎপাদনকারী) যৌগ জিহ্বার ফসফোলিপিডগুলো ভেঙে মিষ্টি স্বাদ গ্রহণকারী রিসেপ্টরকে সাময়িক অকার্যকর করে দেয়। এদেশের অধিকাংশ টুথপেস্টেই বেশি মাত্রায় SLS থাকে।
ফেনা সৃষ্টি করার জন্য সাবান, শ্যাম্পু এবং স্যানিটাইজারেও SLS ব্যবহার হয়। বেশ কিছু টুথপেস্টে ফেনা তৈরির জন্য SLS এর পাশাপাশি ডায়েথেনোলেমিন (DEA) থাকে। এই কেমিক্যালটির কারণে লিভার ও কিডনির সর্বনাশ হতে পারে। এটি শরীরে অনেকগুলো হরমোনের ক্ষরণ হতে বাধা দেয়।
• ট্রাইক্লোসান
মুখের তথাকথিত জীবাণুদের মারতে টুথপেস্টে দেয়া থাকে ট্রাইক্লোসান নামক পেস্টিসাইড। গবেষণায় পাওয়া গেছে ট্রাইক্লোসানের কারণে বিশ্বজুড়ে থাইরয়েড সমস্যার প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ট্রাইক্লোসানকে ২০১৬ সালে ইউএস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন(এফডিএ) এর নিষিদ্ধ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
গবেষকরা ১৮৪৮ জন নারীর উপর পরীক্ষা চালিয়ে সিদ্ধান্তে এসেছেন– টুথপেস্টের রাসায়নিক নারীদের হাড় ক্ষয়ের জন্য দায়ী। ক্লিনিক্যাল অ্যান্ডোক্রিনোলজি অ্যান্ড মেটাবলিজম জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখানো হয়েছে ট্রাইক্লোসানের সঙ্গে অস্টিওপোরোসিসের সরাসরি যোগসূত্র আছে। এই যৌগ হাড়ে মিনারেলের ঘনত্ব কমিয়ে দেয়।
শ্যাম্পু, ওয়াশিং পাউডার, ডিটারজেন্ট, ডিওডোরেন্ট, সাবান, স্যানিটাইজার, টুথপেস্ট এবং মাউথওয়াশে ট্রাইক্লোসান থাকে।
দ্য কেমিক্যাল রিসার্চ ইন টক্সিকোলজি জার্নালের রিসার্চে দাবি করা হয়েছে ট্রাইক্লোসান শরীরে ক্যান্সার জন্ম দিতে সক্ষম৷
• সোডিয়াম ফ্লোরাইড
সোডিয়াম ফ্লোরাইড জলে দ্রবণীয় বর্ণহীন অজৈব যৌগ যার রাসায়নিক সংকেত–NaF। এই যৌগটি ফার্মাসিউটিক্যালের ওষুধ, টুথপেস্ট, মেটাল ইন্ডাস্ট্রির ফ্লাক্স, কীটনাশক এবং ইঁদুর মারার বিষ তৈরিতে ব্যবহার হয়। কিছু ইন্সট্যান্ট জুস, কার্বনেটেড বেভারেজ এবং বেবিফুডেও ফ্লোরাইড থাকে। ফ্লোরাইড ক্ষতিকারক হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ এটি শরীরে জমতে থাকে। শরীরে প্রতিদিন প্রবেশ করতে থাকা ফ্লোরাইড হাড় এবং মস্তিষ্কে জমা হয়। আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক ডেন্টিস্ট্রি থেকে বলা হয়েছে– টুথপেস্টের ফ্লোরাইড মানব শরীরে বিষক্রিয়া ঘটায়।
১৯৩৮ সালে আমেরিকান ডেন্টিস্ট এইচ ট্রেন্ডলি ডিন দাবি করে বসে– ফ্লোরাইড মেশানো পানি দাঁতের ক্ষয়রোধে সাহায্য করে।
তখন থেকেই পশ্চিমা দেশগুলো পানিতে ফ্লোরাইড মিশাতে থাকে। কোম্পানিগুলো টুথপেস্ট, টুথপাউডারে ফ্লোরাইড যোগ করতে থাকে। কিন্তু অল্পদিন পরেই মানুষের দেহে ফ্লোরাইড বিষক্রিয়া শুরু হয়। ফ্লোরাইডের উপর গবেষণায় নেমে পড়েন বিজ্ঞানীরা। এই বিষয়ে আমেরিকাতে সবচেয়ে বড় গবেষণা হয় ১৯৮৬/৮৭ সালে। তখন বেরিয়ে আসে ভয়াবহ তথ্য। গবেষণায় দেখা যায় ফ্লোরাইড দাঁতের ক্ষয়রোধে ভূমিকা তো রাখেই না বরং জন্ম দেয় অসংখ্য সমস্যার। ফ্লোরাইডে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মস্তিষ্ক ও হাড়। দেহে ফ্লোরাইডের উপস্থিতিতে অ্যালুমিনিয়ামের জৈবিক প্রভাব বেড়ে গিয়ে মস্তিষ্কে দ্বিগুণ অ্যালুমিনিয়াম জমতে থাকে। একসময় দেখা দেয় স্নায়বিক দুর্বলতা, আলঝেইমার্স।
ফ্লেভার দেয়া টুথপেস্ট বাচ্চারা খেয়ে ফেলে। এমনিতে মনে হতে পারে টুথপেস্ট পেটে গেলে কিছু হবেনা। কিন্তু বাস্তবে সামান্য টুথপেষ্টও পেটে গেলে বড় সমস্যা হতে পারে আপনার বা আপনার বাচ্চার। টুথপেস্ট, ফ্লোরিনেটেড পানি, চুইংগাম, মাউথওয়াশ ইত্যাদি থেকে প্রতিদিন একটু একটু করে গ্রহণ করা ফ্লোরাইড মাথাব্যাথা, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, অরুচি, বমিভাব এবং ডায়রিয়ার সমস্যা তৈরি করে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারী ও শিশুরা। তাদের মস্তিষ্ক ও হাড়গোড় এর বারোটা বাজিয়ে দেয় ফ্লোরাইড। টুথপেস্টের ফ্লোরাইড রক্তে মিশে গেলে জয়েন্টে প্রদাহ, আর্থ্রাইটিস এবং স্কেলেটাল ফ্লুরোসিসের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়। ফ্লোরাইড রক্তে মিশে গিয়ে মস্তিষ্কের যে নির্দিষ্ট অংশটি বুদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে সেখানে আঘাত করতে শুরু করে। ফলে ধীরে ধীরে ঐ অংশের কর্মক্ষমতা কমে যায়।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল শ্যাম্পু, টুথপেষ্ট এবং পার্সোনাল কেয়ার প্রোডাক্টের কেমিক্যালগুলোর কারণে মেয়েদের আর্লি পিউবার্টি বা অকাল বয়ঃসন্ধি (আট বছরের আগে স্তনের বিকাশ এবং পিরিয়ড আরম্ভ হওয়া) শুরু হতে পারে। টুথপেস্টের এসপার্টেম, সরবিটল, স্যাকারিন ইত্যাদি সুইটনার শরীরে ক্রমাগত প্রবেশ করতে থাকলে স্থুলতা ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়। এসপার্টেম ব্রেন টিউমারের জন্যও দায়ী। সরবিটল ডায়রিয়া, বদহজম, গ্যাস-অম্বল এবং পেটব্যাথার মতো সমস্যা সৃষ্টি করে। টুথপেস্টের পলিইথিলিন গ্লাইকল হলো অত্যন্ত ক্ষতিকর প্লাস্টিক জাতীয় উপাদান।
রসিদ ভাই
এখন থেকে ঘুম থেকে উঠেই শরীরে বিষ ঢুকাবেন কিনা; সিন্ধান্ত যার যার।
ছবি এবং লেখা: সংগৃহীত