23/04/2026
জীবনে কখনো কি কোনো মৃতদেহকে গোসল করিয়েছেন? যদি সুযোগ পান, তবে একবার অন্তত করাবেন। খুব কাছ থেকে দেখবেন, মৃত্যুর পর মানুষের দেহটা কত অসহায় হয়। যে মানুষটা একদিন দাপটের সাথে পৃথিবী কাঁপিয়েছে, সে আজ কতটা নির্জীব! সুযোগ পেলে রাতে একা কোনো লাশ পাহারা দিবেন; তখন বুঝতে পারবেন পরম প্রিয় মানুষটার লাশও রাতের নির্জনতায় আপনার কাছে কতটা অদ্ভুত আর আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
করোনার সেই বিভীষিকাময় সময়ে আমার সুযোগ হয়েছিল বেশ কয়েকজন মানুষকে দাফন-কাফন করানোর। প্রতিটি মৃতদেহের সাথে আমার অভিজ্ঞতা ছিল আলাদা, কিন্তু একটি স্মৃতি আমার কলিজায় দাগ কেটে আছে।
মাত্র ৪৫ বছরের এক সাধারণ পরিবারের ভদ্রমহিলা। গোসলের সময় যখন তার হাত দুটো ধরলাম, দেখলাম নখ আর আঙুলে লেগে আছে পাতিল ধোয়া আর রান্না করা কালির দাগ। হয়তো সকাল পর্যন্তও তিনি পরিবারের জন্য উনুন পাড়ে বসে ছিলেন। বাইরে অপেক্ষা করছিলেন তার স্বামী আর দুই তরুণ ছেলে (বয়স আনুমানিক ১৮ থেকে ২২)।
গোসল শেষে যখন ছেলেদের শেষবারের মতো মায়ের মুখ দেখার জন্য ডাকলাম, যা দেখলাম তা বিশ্বাস করা কঠিন। স্বামী ফোনে কথা বলছিলেন, এবং ফোনে থাকা অবস্থাতেই অত্যন্ত অবহেলা আর অমনোযোগ নিয়ে স্ত্রীর মুখের দিকে একবার তাকালেন। তার চেয়েও বেশি বুক ভাঙা কষ্ট পেলাম ছেলে দুটোর আচরণে। মায়ের নিথর দেহের সামনে দাঁড়িয়েও তাদের কোনো ভাবান্তর নেই, কোনো শোক নেই। একবার মায়ের মুখের দিকে তাকিয়েই তারা আবার ফোনের ভিডিও গেমে বুঁদ হয়ে গেল।
আমার তখন মনে হলো—এই সেই মা, যিনি হয়তো তিলে তিলে নিজের জীবন শেষ করেছেন এই স্বামী আর সন্তানদের সংসার সামলাতে। যে সন্তানদের তিনি শৈশবে নিজ হাতে খাইয়ে দিয়েছেন, ব্যথা পেলে বুকে টেনে নিয়েছেন—আজ তার চলে যাওয়ার মুহূর্তেও সন্তানদের কাছে ভিডিও গেমের চেয়ে মায়ের শেষ বিদায়টা বড় হলো না!
এই দৃশ্যগুলো আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়—স্বামী, সন্তান, আপনজন যাদের জন্য আমরা আজ হন্যে হয়ে বেঁচে আছি, সবই আসলে ক্ষণিকের। আপনি মনে করছেন আপনার পরিবার আপনাকে ছাড়া অচল? বড়জোর এক সপ্তাহ আপনার জন্য কাঁদবে, তারপর জীবনের প্রয়োজনে সবাই 'Move On' করবে। যে স্বামী আজ আপনার হাতের রান্না ছাড়া খেতে পারেন না, তিনিও আপনার অবর্তমানে নতুন অবলম্বনের কথা ভাবতে শুরু করবেন। এটাই পৃথিবীর রূঢ় নিয়ম। কার জন্য কার জীবন থেমে থাকে?
মাঝেমধ্যে কবরস্থানে গিয়ে নিরবে কিছুক্ষণ দাঁড়াবেন। মনে মনে ভাববেন, এই মানুষগুলো পৃথিবীতে কীসের পেছনে ছুটেছিলেন আর আজ কী নিয়ে শুয়ে আছেন? যাদের জন্য তারা সারা জীবন অন্যায় করেছেন, তারা কি একবারও এই কবরের পাশে আসে?
আমাদের শরীর থেকে প্রাণটা বেরিয়ে গেলে এই দেহের আর কোনো মূল্য থাকে না। অথচ এই সামান্য জীবনের ৪০-৬০ বছরের জন্য আমরা অঢেল সম্পদের লোভে বিভোর থাকি। আমাদের দেশের চিত্র দেখুন—মসজিদ মুসল্লিতে ভরপুর, কিন্তু ঈমানি শক্তি আমাদের কত দুর্বল! রমজান মাসে যেখানে ইবাদতে মশগুল থাকার কথা, সেখানে আমরা একে অন্যকে ঠকানোর ফন্দি করি। দুর্নীতি আর চুরির টাকা দিয়ে কয়েকবার হজ করে বা দান-খয়রাত করে আমরা 'জান্নাত কনফার্ম' করতে চাই।খুবই আশ্চর্য না?
আমাদের সততা আজ সামান্য কয়েকটা টাকার কাছে হেরে যায়। অথচ মৃত্যুর পর যে কঠিন হিসাব শুরু হবে, সেটা যদি আমরা একবার উপলব্ধি করতে পারতাম, তবে আমরা কিছুতেই এত খারাপ হতে পারতাম না। আমরা অন্যের হক মারতাম না, কারো সাথে দুর্ব্যবহার করতাম না।
সবই পড়ে থাকবে—শুধু সাথে যাবে আপনার আমল। মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের সবাইকে এই ধ্রুব সত্যটুকু উপলব্ধি করার এবং সঠিক পথে ফেরার সুযোগ দিন। আমিন।