14/04/2026
আমাদের প্রিয় ডা মো কামাল উদ্দিন ভাইয়ার চমৎকার একটি লেখা।
"অভাব শুধু খাবারের না,স্বপ্নেরও হয়"
তখন ১৯৯৯ সাল। আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। আমাদের বাড়িটা ছিল মাটির ভিটের ওপর টিনের একচালা কাচাঘর। বর্ষায় চালের ফুটো দিয়ে পানি পড়ত, শীতের রাতে হু হু করে ঢুকত হাওয়া। বাবা দিনমজুর। যেদিন কাজ জোটে সেদিন ভাত, যেদিন জোটে না সেদিন আধপেটা। মায়ের চোখের নিচে অভাবের কালি স্থায়ী হয়ে বসেছিল।
সেই বছর প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় আমি তৃতীয় হলাম। ফলাফলের দিন ক্লাশটিচার সাজু স্যার নাম ডাকলেন, “মোঃ কামালউদ্দিন, তৃতীয় স্থান।” প্রথমে আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। সারা ক্লাস হাততালি দিল। বাড়ি ফেরার পথে বুকের ভেতর একটা অচেনা আলো জ্বলছিল। মা শুনে কাঁদলেন। কান্নাটা আনন্দের না দুঃখের, আমি সেদিনও বুঝিনি। শুধু দেখলাম আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে আম্মা বললেন, “আমার পোলাডা মনে হয় মানুষ অইব।”
কিছুদিন পর খবর এলো। স্থানীয় এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নাম 'প্রত্যয়' আমাদের স্কুলের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতি ব্যাচের প্রথম তিনজনকে সম্মাননা দেবে। তারিখ দেওয়া হলো শুক্রবার। আমার জীবনের প্রথম মঞ্চ।
সেদিন আম্মা তাঁর পুরোনো শাড়ির ভাঁজে লুকিয়ে রাখা পাঁচ টাকার নোটটা বের করে দিলেন। “হাইট্রা যাইয়োনা বাজান, পায়ে ব্যথা করবো, টেম্পুতে করে যাইয়ো। যাওয়া আসা দুই দুগুনে চার আর এক ট্যাহা দিয়া কিছু খাইয়ো।” বাবা বাহির থেকে ফিরে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “যাইন বাজান, মাথাডা উঁচা কইরা যাইন।” প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আমার আব্বা আমাকে বাজান আর আপনি বলে সম্বোধন করতেন। আব্বার কণ্ঠে কোনদিন 'তুই' সম্বোধন শুনিনি।
তখনকার সময়ে সবচেয়ে ব্যস্ত মিলনায়তন ছিলো লাল ইটের তৈরি টাউন হল যেন এক বিশাল গাম্ভীর্য, আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের প্রতিক। আমাদের জন্য সেটাই ঠিক করা হয়েছিলো। গিয়ে দেখি টাউন হল মাঠে সামিয়ানা টানানো। মাইকে দেশাত্মবোধক গান বাজছে। আমাদের স্কুল ছাড়াও শহরের অন্যান্য স্কুলের ছেলেমেয়েরাও এসেছে। আমরা চৌদ্দ কি পনেরোজন ছেলেমেয়ে লাইন ধরে দাঁড়ালাম। নাম ডাকা হলো। আমি কাঁপা কাঁপা পায়ে মঞ্চে উঠলাম। একজন সাদা পাঞ্জাবি পরা ভদ্রলোক আমার হাতে তুলে দিলেন একটা সনদপত্র। শক্ত বোর্ডের কাগজ, ওপরে লাল কালিতে লেখা “সম্মাননা সনদ”। চারপাশে সোনালি বর্ডার। আমি জীবনে অমন সুন্দর কাগজ দেখিনি। পরে জেনেছি তিনি ময়মনসিংহ পৌরসভার মেয়র জনাব মাহমুদ আলনূর তারেক।
তিনি মাইক হাতে বললেন, “এই সনদ যত্ন করে রাখবে। এটা দিয়ে তোমাদের চাকরি হবে। একটা সার্টিফিকেটের দাম লাখ টাকার চেয়েও বেশি। এটা যোগ্যতা। এটা সবাই পায় না।”
কথাগুলো আমার বুকের ভেতর গেঁথে গেল। চাকরি। অভাব শেষ। মায়ের ছেঁড়া শাড়ি বদলাবে। বাবার খালি পা জুতো পাবে। আমাদের ঘরে সেদিন প্রথমবার আশা এলো, অতিথি হয়ে।
বাড়ি ফিরে আমি কী করব বুঝতে পারছিলাম না। সনদটা এত দামি, কোথায় রাখি? আলমারি নেই, ট্রাঙ্ক নেই। শেষে মা একটা পলিথিন দিলেন। আমি খুব যত্নে সনদটা মুড়িয়ে সুতলি দিয়ে বাঁধলাম। তারপর কাচাঘরের বাঁশের আড়ার সাথে, চালের ঠিক নিচে, ঝুলিয়ে রাখলাম। যাতে পানি না লাগে, ইঁদুর না কাটে, চুরি না হয়।
এরপর শুরু হলো আমার নতুন রুটিন। দুদিন পরপর আমি টুলের ওপর দাঁড়িয়ে সনদটা নামাতাম। পলিথিন খুলে দেখতাম ঠিক আছে কিনা। একটা কোণা ভাঁজ পড়ল কিনা, রং জ্বলে গেল কিনা। দেখে আবার নিশ্চিন্তে ঝুলিয়ে রাখতাম। মা হাসতেন। “পাগল পোলা আমার।” আমি গম্ভীর হয়ে বলতাম, “এইডা দিয়া চাকরি নিমু আম্মা। তোমার আর কষ্ট থাকব না।”
এভাবে দিন গেল। মাস গেল। বছর গেল। আমি সপ্তমে উঠলাম, অষ্টমে উঠলাম। অভাব যেন আমাদের পিছু ছাড়ল না। বাবার কাশিটা বাড়ল। মায়ের চোখের কালি গাঢ় হলো। কিন্তু চালের সাথে ঝোলানো সনদটা ছিল আমার বিশ্বাস। আমার প্রার্থনা। রাতে ঘুমানোর আগে আমি তাকিয়ে দেখতাম। মনে হতো ওটা একটা আলো, একদিন ঠিকই আমাদের অন্ধকার তাড়াবে।
দেখতে দেখতে চার বছর কেটে গেল। আমি তখন দশম শ্রেণিতে। সামনে এসএসসি পরীক্ষা। স্যার বলেছেন ভালো করলে শহরে কলেজে ভর্তি হতে পারব। আমি রাত জেগে পড়ি। কুপির তেলে টান পড়ে, তবু পড়ি। কারণ আমার একটা সনদ আছে। চাকরির চাবি।
তারপর এলো সেই দিন। চৈত্রের শেষ। দুপুর থেকেই আকাশটা ভার। বাতাস থমকে আছে। বিকেল না হতেই চারিদিক কালো করে এলো কালবৈশাখী। প্রথমে দমকা বাতাস। তারপর শোঁ শোঁ শব্দ। গাছের ডাল ভাঙার আওয়াজ। আম্মা আমাকে আর আমার বোনের ছোট ছেলেটাকে বুকে চেপে ধরলেন। বাবা দৌড়ে গিয়ে আমাদের পালের ছাগলগুলোকে ঘরে তুললেন।
হঠাৎ প্রচণ্ড এক ঝাপটা। কাচাঘরটা কেঁপে উঠল। তারপর আরেকটা। মনে হলো কোনো দানব চাল ধরে টানছে। আমরা চিৎকার করলাম। পরের মুহূর্তে বিকট শব্দ করে উড়ে গেল আমাদের টিনের চাল। বৃষ্টির সাথে হুড়মুড় করে ঢুকল ভাঙা বাঁশ, গাছের পাতা, ধুলো।
ঝড় থামল এক ঘণ্টা পর। তখন চারিদিক নিস্তব্ধ। ভাঙা ঘরের মেঝেতে দাঁড়িয়ে আমি প্রথম খুঁজলাম তাকে। আমার সনদ। পলিথিনে মোড়া আমার ভবিষ্যৎ। পেলাম না। উঠানে ছুটে গেলাম। কাদা, পাতা আর ভাঙা টিনের মধ্যে খুঁজতে লাগলাম পাগলের মতো। বাবা পেছন থেকে ডাকলেন, “বাজান আইয়া পড়েন।” আমি শুনিনি।
অবশেষে পেলাম। নদীর পাড়ে কাঁঠাল গাছের ডালে আটকে আছে। ছিন্নভিন্ন। পলিথিন ছিঁড়ে সনদটা তিন টুকরো হয়ে গেছে। সোনালি বর্ডার কাদায় মাখামাখি। কালো কালির “সম্মাননা সনদ” শব্দটা বৃষ্টিতে ধুয়ে আবছা। আমি কাঁপা হাতে টুকরোগুলো বুকের কাছে জড়ো করলাম।
আম্মা দৌড়ে এলেন। আমার হাতের দিকে তাকিয়ে তিনি আর দাঁড়াতে পারলেন না। হাঁটু ভেঙে বসে পড়লেন কাদায়। তারপর দুহাতে মুখ ঢেকে এমন করে কাঁদলেন, যেন আজ তার ছেলের মৃত্যু হয়েছে।
আব্বা কিছু বললেন না। শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার চোখে পানি ছিল না। ছিল শূন্যতা। যে শূন্যতা শুধু প্রান্তিক বাবারা চেনে।
আমি সেদিন একটা শব্দও করিনি। চিৎকার করিনি। শুধু বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিল। চার বছর ধরে যে কাগজটাকে আমি চাকরি ভেবেছি, যে কাগজটাকে আমি মায়ের নতুন শাড়ি ভেবেছি, বাবার ওষুধ ভেবেছি, তা এখন আমার হাতে কাদা মাখা তিন টুকরো মৃত কাগজ।
সেই রাতে আমরা ভাঙা ঘরে, খোলা আকাশের নিচে বসে রইলাম। বৃষ্টি থেমে গেছে। কিন্তু আমার ভেতরে তখনও ঝড়। আমি বুঝে গেলাম, অভাব শুধু ভাতের হয় না। স্বপ্নেরও অভাব হয়। আর স্বপ্ন ভাঙার শব্দ পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর শব্দ।
পরদিন সকালে আমি টুকরোগুলো আর খুঁজিনি। জোয়ারের পানি এসে হয়তো ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। আমার শৈশব, আমার বিশ্বাস, আমার প্রথম অর্জন। সব।
আজ আমি বড় হয়েছি। চাকরিও করি। আমার ঘরে এখন ফাইলের পর ফাইল সার্টিফিকেট। কিন্তু বিশ্বাস করো, ষষ্ঠ শ্রেণির সেই পলিথিনে মোড়া সনদটার মতো দামি কিছু আর পাইনি। ওটার ভেতর লেখা ছিল না কোনো নম্বর, কোনো গ্রেড। ওটার ভেতর লেখা ছিল এক প্রান্তিক ছেলের চার বছরের ঘুমহীন রাত, এক মায়ের শাড়ির আড়ালে লুকানো পাঁচ টাকা, এক বাবার নীরব প্রার্থনা।
কালবৈশাখী সেদিন শুধু আমার ঘরের চাল উড়িয়ে নেয়নি। উড়িয়ে নিয়েছিল আমার শৈশবের সবচেয়ে দামি সম্পদ। আর রেখে গিয়েছিল একজীবনের কান্না, যা আজও চৈত্রের আকাশ কালো করলে আমার চোখে নেমে আসে।
~ ডা. মো. কামাল উদ্দিন
ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ