25/10/2025
"যেখানে প্রতি রাতে চলে জীবন মৃত্যু নিয়ে দরকষাকষির খেলা..."
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের সিসিইউতে ভয়ানক কয়েক ঘণ্টা
বুধবার রাত ১১টা।
হঠাৎ করে হাসপাতালের সিসিইউ রুমের গেটের দিকে শোরগোল। দ্রুত ট্রলি নিয়ে ছুটলেন কয়েকজন সেদিকে। তাতে তুলে আনা হলো মাঝবয়সী এক যুবককে। পরনের জামাকাপড় দেখে বোঝা গেল দরিদ্র ঘরের সন্তান। হার্ট অ্যাটাক করেছে সে। মৃত্যুর একেবারে কাছাকাছি অবস্থায়। ডাঙায় পড়ে যাওয়া পুটি মাছের মতো ছটফট করছিল সে। বাঁচবে যে, তেমন আশাও নেই।
ইতোমধ্যে স্বজনরাও মহাকান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে। নার্স-ডাক্তাররা কয়েকজনকে রুম থেকে বের করে দিলেন। এরপর যা শুরু হলো, তা দেখে একজন সুস্থ মানুষও অজ্ঞান হবার দশা। একজন জওয়ান পুরুষ নার্স তার বুকের ওপর জোরে জোরে চাপ দিতে শুরু করলেন। একজন সুস্থ মানুষকে ওভাবে আঘাত করলে সে নির্ঘাত দম বন্ধ হয়ে মারা যেত।
যাই হোক, এই ধুরুমধারুম আঘাত চলল প্রায় দশ মিনিট। এরপর কাজ না হওয়ায় নিয়ে আসা হলো কাপড় ইস্ত্রি করার মতো দুটি শক দেওয়ার যন্ত্র। এই জিনিস আমি শুধু সিনেমাতেই দেখেছি। এরপর সেটি দিয়েও চলল সেই “নির্যাতন”। একদিকে যমে টানছে যুবকটিকে, আরেকদিকে বাংলাদেশের হাসপাতালের কয়েকজন অসহায় নার্স— তাদের নেতৃত্বে একজন ডাক্তার।
এ কাজ করতে গিয়ে ঘেমে নেয়ে একাকার সবাই। বাইরে পাল্লা দিয়ে চলল যুবকটির পরিবারের কান্না।
আমি অনেক শক্ত মানসিকতার মানুষ। কিন্তু তারপরও ভেতরে ভেতরে চুরমার হচ্ছিলাম। তবে বুঝতে দিচ্ছিলাম না। কারণ আমার পাশেই আমার নিজের রোগী — তিনি আমার শাশুড়ি। তিনি যদি বুঝতে পারেন আমার নিজেরই এই অবস্থা, তিনি ভেঙে পড়বেন। তাই তাকে সাহস যোগাচ্ছিলাম।
এদিকে শুনতে পেলাম নার্সরা বলাবলি করছে — “এ যাত্রা বেঁচে গেলো ছেলেটি।” আমিও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।
আমি তখন চিকিৎসক-ভলান্টিয়ার দলটির দিকে তাকালাম। দেখলাম সবার মুখে বিজয়ের হাসি চিকচিক করছে। মনে হচ্ছিল তারা এইমাত্র এভারেস্টের চূড়া জয় করে ভোরের তাজা আলোর আভা সারা মুখে মেখেছে। জানতে পারলাম, এভাবেই সারারাত ধরে নতুন কোনো রোগীর সেবায় দৌড় শুরু করে তারা।
⸻
[আমরা যারা প্রতিদিন নিশ্চিন্তে ঘুমাই, ঠিক সেই মুহূর্তে রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের সিসিইউতে প্রতি রাতে চলে জীবন-মৃত্যু নিয়ে “দরকষাকষির খেলা”। প্রতিরাতে গড়ে কমপক্ষে চারজন মারা যায়। আমরা কখনো কখনো সে খবর পত্রিকায় পড়ি, কিন্তু আমাদের ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমে যে আরও ২০-৩০ জন বেঁচে যায়, তাদের গল্প কোনোভাবে পত্রিকার পাতায় জায়গা পায় না।]
ভালোবাসা— এই সমস্ত নিবেদিত প্রাণ ডাক্তার ও নার্সদের প্রতি।
© (বাস্তবিক ঘটনা — একজন ডাক্তারের লেখা অনুভূতি)