28/02/2026
"পর্নো দেখলে মস্তিষ্কের 'লোকাস সেরুলিয়াস' নামক জায়গা থেকে অ্যাড্রেনালিন নিঃসৃত হয়। এতে বুকের ধুকপুক বেড়ে যায়—শুধু পর্নো দেখার সময়ই নয়, দেখার আগে শুধু ভাবলেও। আর পর্নো দেখে যে যৌন তৃপ্তি পাওয়া যায়, তার কারণ মস্তিষ্কের 'ভেন্ট্রাল টেগমেন্টাল এরিয়া' থেকে ডোপামিন নিঃসরণ। এই ডোপামিন গিয়ে মস্তিষ্কের প্রধান আনন্দকেন্দ্র 'নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্স'-কে উত্তেজিত করে।"
— ডোনাল্ড এল হিলটন জুনিয়র, হি রিস্টোরেথ মাই সোল
কাউন্সিলিং টেবিলের গল্প
পর্ব: ৫৫৬
শিশুর পর্নোগ্রাফি আসক্তি
“আমার ছেলে কি আমার কাছ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে?” ভদ্রমহিলার দুই চোখ বেয়ে আকুল অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। হাত দুটি কাঁপছে।
" ওর বয়স মাত্র সাত বছর। ওর ট্যাবে কী দেখছে, সেটা চেক করতে গিয়ে আমার মাথায় বাজ পড়ল। একটা ছেলে আর মেয়ে... ওভাবে... ওর বয়সী একটা শিশুর জন্য এগুলো দেখা... ছি ছি..... এত নোংরা আপনি বিশ্বাস করতে পারবেন না। আমার ধারণা ছিল না যে শিশুরা পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়। এখন ওর ঘুম নাই, নাওয়া খাওয়া কিছুই নাই। নেশার মত মোবাইলের সাথে আটকে আছে। মোবাইল সরিয়ে নিলেই উইথড্রল সিমটম হচ্ছে। আমি যেহেতু ডাক্তার বুঝতে পারি। অথচ বিশ্বাস করেন ও এখনো বোঝে না ও কী দেখছে। আমি বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছি যে এটা ভুল। আমি কীভাবে ওকে বাঁচাবো? আমার ছেলেটা কী আমার কাছ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে?”
মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করলাম।
ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিক।
অনেকটা যেন মিঠে মিঠে রোদ।
একটু একটু গরম পড়ছে।
কিন্তু ভদ্রমহিলা প্রচন্ডভাবে ঘামছেন।
রোজা রেখেছেন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
চোখ মুখ শুকনো।
"একটু স্পষ্ট করে বলবেন বাচ্চাটি কেমন আচরণ করছে? " মৃদু কন্ঠে জানতে চাইলাম।
"মাঝখানে ওর ট্যাব নিয়ে নিয়েছিলাম বলে আমার গায়ে হাত তুলেছে, আগে কথা শুনতো এখন একটা কথা বলা যায় না, সামান্যতম দায়িত্ব জ্ঞান যেটা তার বয়সের সাথে মানানসই সেটা নষ্ট হয়ে গেছে, হাতের কাছে ওর মোবাইল না থাকলে মেজাজ খিট্খিট হয়ে যায়, আগে সবার সাথে খুব মিশতো এখন নিজেকে ঘরের কোণে আটকে ফেলছে দিনে দিনে। আমার ছোট বোনের সাথে ওর খুব ভালো সম্পর্ক ছিল, তার কাছে নাকি বলেছে যে নিজের জন্মটাই দূষিত। বাচ্চাটা যে হীনমন্যতায় ভুগে সেটা টের পাই! নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না সেটাও টের পাই! এখন রীতিমতো এমন এমন মিথ্যা কথা বলে যেটা সাত বছরের একটা বাচ্চার মুখ দিয়ে বেরুবে ভাবা যায় না! আমি এখন কি করবো? " ভদ্রমহিলার ঝুলিতে আছে চিকিৎসা বিজ্ঞানের দেশে-বিদেশে একাধিক পোস্ট গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি। দাম্পত্য সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর। সেই সাথে বাপের বাড়ি এবং শ্বশুর বাড়ি প্রচন্ড সহযোগিতা পূর্ণ। বাবা, দাদা, নানা, ফুপা, ফুপু, মামা, খালা, চাচা ঈর্ষণীয় শিক্ষিত। একসাথে টেবিলে বসলে দেখা যায় পিএইচডি নয় পোস্ট ডক্টরেটের ছড়াছড়ি। দুই পরিবারের আন্তরিকতা এবং মার্জিত আচরণ আভিজাত্যপূর্ণ। আলোচ্য শিশুটির নানী দাদী দুজনেই শৈশবের বন্ধু এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। বাড়ির একটাই বাচ্চা। ফলে দারুন আদরের। সবাই মিলেই বাচ্চাটিকে কোয়ালিটি সময় দেন। কাজেই অবহেলা বা চাইল্ডহুড ট্রমার কোন দৃশ্যমান ইতিহাস নেই।
প্রশ্নটা হল, তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
ইদানিং আমরা, বাচ্চাদের হাতে তুলে দেই, ডিজিটাল দুনিয়ার একাধিক গ্যাজেট। তোতা পাখির মত শুধু বলি, স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কিন্তু এই কথা যে কতটুকু সুপারফিসিয়াল লেভেলের মুখস্ত বুলি আওড়ানো সেই জায়গাটা নিয়ে এখন সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
কারণ অনলাইনের অ্যালগরিদমগুলা এখন এমন ভাবে বাচ্চাকে হুক করে, সেই আলোচনা এখনো প্রচলিত চিকিৎসা বিজ্ঞানের বইয়ে উঠে আসেনি। কিন্তু সেই আলোচনাটা এখন শুরু হওয়া ভীষণ জরুরী।
কাজেই মুখস্ত কাউন্সিলিং বিদ্যা এখন অনেকটাই, "পুঁথিগত বিদ্যা আর পরহস্তে ধন নহে বিদ্যা নহে ধন হলে প্রয়োজন" প্রবচনের ইঙ্গিতবাহী। মানসিক স্বাস্থ্য জগতে এত নতুন নতুন সমস্যা তৈরি হচ্ছে, আমরা জানি না একে কিভাবে সামাল দিতে হবে। মুশকিলটা হচ্ছে, আমরা যে জানিনা, সেই জায়গাটাও আমরা জানি না !!
ভদ্রমহিলার দিকে স্থির ভাবে তাকিয়ে ভাবছি কি বলবো? কারণ এই একটি প্রশ্নের উত্তরে শুধু মায়ের সান্নিধ্যর প্রয়োজনীয়তাই যথেষ্ট নয়, পরিবারের কোয়ালিটি টাইম দেয়াই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন আরো সুগভীরে। যেখানে সমাজ ও বিজ্ঞানের, কঠিন বাস্তবতার নিরিখে, মনোজগৎকে কি প্রভাবিত করছে, সেই স্পষ্ট ধারণা বিনির্মাণ অসম্ভব দরকার। প্রয়োজন পরিবারের প্রত্যেক সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
ভাবনার এই পর্যায়ে এসে একটু বিরতি নিলাম। নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলাম, আমিই আসলে কতটুকু জানি? গুটি কয়েক জার্নাল এর রেফারেন্স সম্বল। পাঠ্যপুস্তকে কতটুকুইবা পড়েছি এ প্রসঙ্গে? ছোট থেকে বেড়ে ওঠার ধাপে ধাপে আমার সমাজ কি শিখিয়েছে আমাকে? আমি কি ফিল করছি?
অনেকটা যেন সুকুমার রায়ের কবিতার মত,
" রোদে রাঙা ইঁটের পাঁজা তার উপরে বসল রাজা—
ঠোঙাভরা বাদামভাজা খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না ৷"
হাস্ হাস্ ব্যাপার। চুপ করিয়ে রাখা, চুপ করে থাকা। এটাই তো ছিল চিরায়ত চালচিত্র।
কি উত্তর দেব?
আমার নিৎশের কথা মনে পড়ল। তিনি সেই সব পণ্ডিতদের সমালোচনা করেছেন যারা মনে করেন তারা সব জানেন। নিৎশের মতে, তথাকথিত 'জ্ঞানী' ব্যক্তিরাও আসলে তাদের নিজস্ব সীমাবদ্ধতা বা অজ্ঞানতার জালে আটকা পড়ে থাকেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের প্রথম ধাপ হলো নিজের ভেতরের এই গভীর অজ্ঞানতাকে স্বীকার করা। তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের জ্ঞানের দম্ভ, "আমি বেশি জানি" বলে "নিজেকে বিশেষজ্ঞ দাবি" করা! এখনো নিৎশের এই ধারণার সাথে বহুল প্রাসঙ্গিক। নিজেকে বিশেষজ্ঞ দাবি করাটা যে কতটা হাস্যকর এই সহজ সত্য উপলব্ধি করার সক্ষমতা খুব সামান্য কিছু মানুষের থাকে। কারন নিৎশে 'Will to Truth' (সত্যের ইচ্ছা) এর বিপরীতে 'Will to Ignorance' (অজ্ঞতার ইচ্ছা) নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার মতে, আমাদের মস্তিষ্ক জগতকে সহজভাবে বোঝার জন্য অনেক জটিলতাকে এড়িয়ে যায় বা অস্বীকার করে। এই অজ্ঞানতা আমাদের একটি স্থিতিশীল জগত কল্পনা করতে সাহায্য করে। ফলে, তথাকথিত "পুথী সর্বস্ব বিশেষজ্ঞদের", নিজেকে বিশেষজ্ঞ ভেবে গর্বিত বোধ করা সেই অজ্ঞতার ইচ্ছারই অংশ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন, কিভাবে অজানার প্রতি এই কৌতূহলই মানুষের মনুষ্যত্বকে পূর্ণতা দেয়।
"আমাদের এত চমৎকার একটা পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক বন্ধন, বাড়িতে একটাই মাত্র বাচ্চা! ভুলটা কোথায় হল? সমাধান কি? " ভদ্রমহিলা নিজের আবেগ সামলে স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন। বুঝতে পারছি ওনার চিন্তার জায়গাটা সক্রিয় হচ্ছে।
হঠাৎ বুকের মধ্যখানটায়, কোথায় জানি মনে হল অসীম শূন্যতা পাক দিয়ে উঠলো। কিছু একটা যেন হৃদপিণ্ডকে শীতল তীব্র নখে খামচে ধরল। মনে হল অনু পরিমাণ পরিমাণ ভদ্রমহিলার ব্যথা অনুভব করলাম। বহু বছর আগে আমার সুপারভাইজার বলেছিলেন, "সানজিদা প্রত্যেকটা সেশনে, আমরা আমাদের আত্মার একটা অংশ দিয়ে দেই।" নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম, আবেগে ভেসে না যেয়ে আমার কতটুকু দক্ষতা আছে এই মাকে পেশাগতভাবে সাহায্য করার?
আমি কি সন্তানকে হারিয়ে ফেলার বেদনা অনুভব করতে পারি? একটা জীবিত সন্তান ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে! অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যাপিত জীবনের থেকে! এই যাতনা কেমন?
তারপর সেই কাউন্সিলিং টেবিল এর গল্প।
আলোচ্য বালকটি পর্নোগ্রাফি আসক্তিতে ভুগছে।
গত দশ বছরে শিশু-কিশোরদের কাছে পর্নো পৌঁছে যাওয়া এতটাই বেড়েছে যে এটা এখন জনস্বাস্থ্য সমস্যা বলে পরিগণিত হচ্ছে। ইদানিং এই সমস্যা আরও বেড়েছে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে। ৯০% পর্নো এখন মোবাইল ফোনেই দেখা হয় । যদিও ডিএসএম-৫-টিআর-এ ইন্টারনেট ব্যবহারের সমস্যাকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়নি, তবুও আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন পর্নোগ্রাফি দেখাকে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয় বলছে।
শিশু ও পর্নোগ্রাফি আসক্তি: বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিসংখ্যান অনুযায়ী ইন্টারনেটের প্রসারের সাথে সাথে অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে পর্নোগ্রাফি দেখা একটি বৈশ্বিক মহামারিতে পরিণত হয়েছে। দ্য ল্যানসেট চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট হেলথ-এ প্রকাশিত একটি মেটা-অ্যানালিসিস জানায়, বিশ্বে প্রতি ১২ জন শিশুর মধ্যে ১ জন (৮.১%) কোনো না কোনোভাবে অনলাইন যৌন শোষণ বা পর্নোগ্রাফির সংস্পর্শে আসে । অনুন্নত বলে এশিয়ায় শিশু সন্তানকে নিরাপদ ভাবার কোন কারণ নেই। এশিয়ার প্রেক্ষাপটেও চিত্রটি উদ্বেগজনক, কারণ এশিয়াতে দ্রুত ডিজিটালাইজেশন এবং সচেতনতার অভাবে শিশুরা সহজেই অশ্লীল কনটেন্টের শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সেন্টার ফর মেন অ্যান্ড মাস্কুলিনিটিস স্টাডিজ-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সী স্কুলছাত্রদের মধ্যে ৬১.৬৫ শতাংশই পর্নোগ্রাফি দেখে এবং ৫০.৭৫ শতাংশ ছাত্র ইন্টারনেটে সরাসরি পর্নোগ্রাফি খোঁজে । গবেষণাটি আরও জানায়, ৬৩.৪৫ শতাংশ ছাত্র প্রথমবারের মতো বন্ধুদের সাথে মোবাইল ফোনে পর্নোগ্রাফি দেখে এবং ৭০.৫৫ শতাংশের মেয়েদের প্রতি যৌন হয়রানির প্রবণতা তৈরি হয়। ইদানিং বাংলাদেশের পত্রিকাগুলো খুললে এই ধারার প্রভাব সুস্পষ্ট।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সমস্যা নিয়ে গবেষণাও বেড়েছে বৈশ্বিক চালচিত্রে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মধ্যে পর্নো দেখা ও যৌন আগ্রাসনের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণার কৌতুহল তৈরি হচ্ছে। যদিও পর্নো দেখার সঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন আচরণের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা পর্যালোচনাগুলো এখনও স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। কারণ, ছোটদের কাছ থেকে এসব সংবেদনশীল তথ্য নেওয়া আর নৈতিক কারণে পরীক্ষা চালানো খুব কঠিন। তবে একটা বিষয় বারবার দেখা গেছে: সহিংস পর্নো দেখার সঙ্গে যৌন সহিংসতার সরাসরি সম্পর্ক আছে। আর যারা স্বভাবে একটু শীতল, অবিশ্বাসী ও রুক্ষ (যাদের সহমতের মাত্রা কম), তাদের ওপর এর প্রভাব আরও খারাপ হয়।
ইতিহাসের প্রথম নথিভুক্ত ঘটনা:
শিশুদের দ্বারা পর্নোগ্রাফি দেখা বা এতে জড়িত হওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত করার ইতিহাস অনেক পুরনো নয়, তবে আইনি পরিসরে এর স্বীকৃতি বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে স্পষ্ট হয়। ১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় 'পিপল বনাম পিটস' মামলাটি (পিপল ভি. পিটস, ১৯৯০) একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। এই মামলায় প্রাপ্তবয়স্কদের একটি চক্র ছোট শিশুদের ব্যবহার করে পর্নোগ্রাফি তৈরি ও বিতরণের সাথে জড়িত ছিল, এবং সেই শিশুরাই শুধু ভুক্তভোগী নয়, বরং তারা যা দেখতে বাধ্য হতো, তা তাদের মানসিকতায় গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। এটি প্রমাণ করে যে, শিশুদের ওপর পর্নোগ্রাফির প্রভাব কেবল বর্তমানের বিষয় নয়, বরং গত কয়েক দশক ধরেই এটি একটি গভীর সামাজিক ও মানসিক সমস্যা হিসেবে স্বীকৃত।
শিশুর বিকাশশীল মস্তিষ্কে পর্নোগ্রাফির প্রভাব:
একটি শিশুর মস্তিষ্ক অত্যন্ত পরিবর্তনশীল হয়। স্নায়ুবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, পর্নোগ্রাফি দেখার সময় মস্তিষ্কে ডোপামিন, অক্সিটোসিন ও ভ্যাসোপ্রেসিনের মতো রাসায়নিকের নিঃসরণ ঘটে, যা আসক্তির নিউরোলজিক্যাল ভিত্তি তৈরি করে। কিশোরবয়সীদের মস্তিষ্কে যুক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র (প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স) অপরিণত থাকে, অন্যদিকে আবেগ ও পুরস্কার কেন্দ্র (লিম্বিক সিস্টেম) অত্যন্ত সক্রিয় থাকে। ফলে উত্তেজক ছবি দেখার সময় প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে তারা চারগুণ বেশি শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া অনুভব করে এবং মস্তিষ্কে ডেলটাফসবি নামক প্রোটিনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা আসক্তিকে আরও মজবুত করে ।
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, পর্নোগ্রাফি আসক্তি বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা বিকৃত হয়, সম্পর্কের প্রতি অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি হয় এবং সহিংসতার প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যায়। ফলে শিশুর যৌন স্বাস্থ্য জ্ঞান দুর্বল হয়ে যায়। এমনি আমাদের দেশে এ প্রসঙ্গে ট্যাবু বিদ্যমান।
এবার যদি শারীরিক স্বাস্থ্যের দিকে চোখ ফেরাই দেখব, পর্নোগ্রাফি আসক্তি ঘুমের ব্যাঘাত, অতিরিক্ত হস্তমৈথুন ও শারীরিক দুর্বলতা তৈরি করে।
সামাজিক স্বাস্থ্যে বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায় পর্নোগ্রাফি আসক্তি বন্ধু-বান্ধব থেকে বিচ্ছিন্নতা, সহানুভূতিশীলতার অভাব এবং সম্পর্ক গঠনে অক্ষমতা তৈরি করে শিশুর আচরনে।
আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্যের বিচারে, পর্নোগ্রাফি আসক্তি শিশুর অন্তর্নিহিত মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং আত্মসম্মানবোধকে ধ্বংস করে দেয়, তাকে অপরাধবোধ ও লজ্জায় জর্জরিত করে।
আপনার শিশু পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত কিনা, তা শনাক্তের লক্ষণ কি কি:
শিশুর আচরণে কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তন এই সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে, যা বয়সভেদে ভিন্ন হয়।
• ১২ বছরের কম বয়সী শিশু: বয়সের তুলনায় অতি যৌন জ্ঞান (যা জানার কথা নয় এমন শারীরিক সম্পর্কের বিশদ বিবরণ), অন্য শিশুদের সাথে পোশাকের নিচে স্পর্শাকাঙ্ক্ষা বা যৌন আচরণ অনুকরণের চেষ্টা (যেমন ওরাল সেক্স বা যৌনসঙ্গমের অনুকরণ), ইন্টারনেট ব্রাউজ করার সময় অতিরিক্ত গোপনীয়তা বা হিস্টিরি মুছে ফেলা, দেখা যায় এমন অশ্লীল ছবি বা ভিডিও দেখে ভীত বা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়া, নিজের বা অন্যদের যৌনাঙ্গ নিয়ে অতিরিক্ত আগ্রহ ।
• ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী: দেরি করে জেগে অনলাইনে সময় কাটানো, ডিভাইস পাসওয়ার্ড-প্রটেক্টেড রাখা ও হিস্টিরি মুছে ফেলা, রুমের দরজা বন্ধ করে একা থাকা, পড়ালেখায় অমনোযোগী হয়ে পড়া ও ফল খারাপ হওয়া, শখের প্রতি আগ্রহ হারানো, বিপরীত বা সমলিঙ্গের প্রতি অস্বাস্থ্যকর দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা (যেমন: নারীদের প্রতি অসম্মান বা যৌন সহিংসতাকে সমর্থন করা), ডেটিং বা বন্ধুত্বে অনীহা অথবা অতিরিক্ত আগ্রহ, বিষণ্ণতা ও খিটখিটে মেজাজ।
আমার শিশু পর্নোগ্রাফি দেখছে, এখন কী করব?
আতঙ্কিত না হয়ে একটি ধাপে ধাপে ও বয়স-উপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
• ১২ বছরের কম বয়সী শিশু: শান্ত ও নন জাজমেন্টাল ভঙ্গিতে কথা বলুন। যাতে শিশু তার মন খুলে আপনার সাথে কথা বলতে পারে। মনে রাখবেন শিশু কিন্তু একটা জায়গায় বুঝতে পারে যে কাজটি ঠিক হচ্ছে না। তাকে দোষারোপ করবেন না; বরং "ভালো ছবি" ও "খারাপ ছবি"-এর পার্থক্য বোঝান। তাকে প্রতিশ্রুতি দিন যে এসব দেখলেই সে আপনাকে জানাবে এবং আপনি রাগ করবেন না। ট্যাব বা ফোন শুধুমাত্র অভিভাবকের সামনে (লিভিং রুমের মতো খোলা জায়গায়) ব্যবহার করতে দিন এবং প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সক্রিয় করুন । স্কুল-পরবর্তী সময়ে শিশুর একাকীত্ব দূর করতে ইতিবাচক রুটিন তৈরি করুন । সন্তানকে কোয়ালিটি টাইম দিন। শুধু মায়ের উপর সন্তানের দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন না পরিবারের সবাইকেই যৌথভাবে সন্তানকে এই সর্বনাশা নেশা থেকে টেনে বের করতে সক্রিয় হতে হবে।
• ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী: তাদের সাথে খোলামেলা ও বিচারহীন ভঙ্গিতে কথা বলুন। পর্নোগ্রাফির ক্ষতিকর দিকগুলো (মস্তিষ্কে প্রভাব, সম্পর্ক নষ্ট, আইনি ঝুঁকি) নিয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে বোঝান। আবেগ চেনার ও তা মোকাবিলার কৌশল শেখান, কারণ একাকীত্ব ও দুঃখবোধ থেকেই মূলত আসক্তি শুরু হয় । ইন্টারনেট ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ করে দিন এবং ৩-৬ মাসের জন্য রাতের বেলা ডিভাইস ব্যবহার বন্ধ রাখুন। প্রয়োজনে ফিচার ফোন ব্যবহার করান । মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং সাইকোথেরাপিস্টের সাহায্য নিন। যারা তাকে আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও ট্রিগার মোকাবিলার কৌশল শেখাবেন বিজ্ঞানসম্মত প্রচেষ্টায়। দীর্ঘমেয়াদি সাইকোথেরাপি পুনরায় আসক্তির হার মাত্র ২%-এ নামিয়ে আনে ।
• গবেষণায় শিশু-কিশোরদের ওপর পর্নোগ্রাফি আসক্তির যে নেতিবাচক প্রভাবের কথা বলা হয়, তার অনেকগুলো মানসিক আঘাতের (ট্রমা) প্রভাবের মতো।
• ট্রমা-বিজ্ঞানের ভাষায়, মানসিক আঘাতের ঘটনা এমন কিছু যা একজন মানুষ সামলাতে পারে না। তখন ঘটনাটি অর্থহীন ও ভয়ংকর মনে হয়, কারণ তা বুঝতে পারে না। পিটার ও ভালকেনবার্গ ইন্টারনেট পর্নোর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন, এগুলো পেশাদার বা সাধারণের তৈরি ছবি বা ভিডিও যা যৌন উত্তেজনার জন্য তৈরি। পর্নোতে সাধারণত অন্বেষণ, নিয়মকানুন, সীমাবদ্ধতা বা সম্মতি—এসব কিছুই থাকে না, তাই এর বিষয়বস্তু অনেক সময় হিংস্র হয়ে ওঠে। পর্নো সাইটগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে সুস্থ যৌন কৌতূহল নিয়ে ঘুরতে থাকা শিশু-কিশোরদের সহজেই ধরা যায়। যাদের নিজের যৌনতা নিয়ে ধারণা এখনও তৈরি হচ্ছে, তাদের জন্য এসব ছবি বোঝা কঠিন, এমনকি এগুলো তাদের মনে বেঁচে থাকার লড়াইয়ের প্রতিক্রিয়াও জাগাতে পারে।
• অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে পর্নো দেখার পর যেসব লক্ষণ দেখা যায়, তার অনেকগুলো মানসিক আঘাত-পরবর্তী লক্ষণের সাথে মিলে যায়। তাই প্রশ্ন জাগে: পর্নো কি শিশু-কিশোরদের বিকাশে বাধা দিয়ে নিজেই একটি মানসিক আঘাতে পরিণত হতে পারে? প্রযুক্তির মাধ্যমে যৌন নিপীড়নের শিকার শিশুদের ওপর সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের নেতিবাচক পরিণতি আশ্চর্যজনকভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার শিশুদের মতোই। এটা আরও গভীর প্রশ্ন তোলে: পর্নো দেখা শিশুরাও কি সহিংসতার সাক্ষীর মতো আচরণ করতে পারে?
আসুন এবার একটি বাস্তব কাহিনী খুঁজে দেখি :
"I stumbled across indecent images at 17. Now I live with the consequences." (১৭ বছর বয়সে অশ্লীল ছবির সাথে আমার পথচলা, এখন আমাকে তার পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে)
২০২৫ সালে, ব্রিটেনের এক তরুণ লিখেছেন তার আত্মকাহিনীতে উপরের উক্তি। মাত্র ৮ বছর বয়স থেকে তিনি পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়েন। একা থাকার সুযোগে ল্যাপটপে দিনের পর দিন কাটত। আসক্তি এতটাই বাড়ে যে তিনি সবচেয়ে চরম অশ্লীল কনটেন্ট খুঁজতে আসক্ত হয়ে পড়েন। ১৭ বছর বয়সে টুইটারে একটি লিংক পেয়ে তিনি ক্লিক করেন, যেখানে ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী শতশত মেয়ের নগ্ন ছবি ছিল। তিনি অবিলম্বে সাইটটি বন্ধ করে দিলেও কৌতূহল তাকে বারবার টেনে নিয়ে যায়। কয়েক মাস পর পুলিশ তার দরজায় কড়া নাড়ে। তার সমস্ত ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে তিনি শিশু অশ্লীল ছবি রাখার অপরাধে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন। তার সাজা হয় ২৪ সপ্তাহের স্থগিত কারাদণ্ড, ১০০ ঘণ্টা কমিউনিটি সার্ভিস ও জরিমানা। তাকে সেক্স অফেন্ডার রেজিস্টারে নাম নথিভুক্ত করতে হয়। তিনি লিখেছেন, "I feel nothing but guilt and disgust over what I did, but I am no longer that 17-year-old boy." (আমি যা করেছি তার জন্য আমি কেবল অপরাধবোধ ও ঘৃণা অনুভব করি, কিন্তু আমি আর সেই ১৭ বছর বয়সী ছেলেটি নই) ।এই ঘটনা প্রমাণ করে, শৈশবের একটি "নিরীহ" কৌতূহল কীভাবে একজন মানুষের পুরো জীবন ধ্বংস করে দিতে পারে, তাকে অপরাধীতে পরিণত করতে পারে। মনে রাখবেন এই ঘটনা কিন্তু শুধু পাশ্চাত্যে নয়, আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে বাংলাদেশ অহরহ ঘটছে। আমরা যেন একটি পর্নোগ্রাফি আসক্তির বোমার উপর বসে আছি আমাদের সন্তানদের নিয়ে।
আবার আলোচ্য ভদ্রমহিলায় ফিরি। ওনার প্রশ্ন ছিল "আমার ছেলেটা কি আমার কাছ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে?"
সত্যি কথা বলতে কি, এই প্রশ্নের উত্তর সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে অভিভাবকের আজকের পদক্ষেপের ওপর। কাজেই সময় থাকতে সতর্ক হওয়া জরুরী। কারণ একটি হারানো শিশুকে ফিরে পেতে যুদ্ধের চেয়ে তাকে নিরাপদ রাখার জ্ঞানই বড়।
এবার আসুন একটু বোঝার চেষ্টা করি পর্নো দেখার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব কেমন হতে পারে: শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে কী হয়?
অনেকদিন পর্নো দেখলে একটা সময় সহ্য হয়ে যায়। প্রথমে যা দেখে ভালো লাগত, সেটা আর ভালো লাগে না। বরং আরো বেশি নেতিবাচক জিনিসের দিকে ঝোঁক বাড়ে। ধীরে ধীরে আবেগ দেখানোর ক্ষমতা কমে যায়। বাস্তব জীবনের সম্পর্কগুলোতে আর মন বসে না, মানসিক সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে বিকাশমান শিশু মস্তিষ্কের আনন্দ পাওয়ার পদ্ধতিতে প্রচুর ডোপামিন নিঃসৃত হয়। কিন্তু কিছুদিন পর সেটাও আর কাজ করে না। তখন আগের চেয়েও বেশি কঠিন ও তীব্র মাত্রার পর্নো দরকার হয় উত্তেজনা পেতে। মজার মাপকাঠি এত উপরে চলে যায় যে বাস্তব জীবনের সম্পর্কগুলো আর কোনো আনন্দ দেয় না।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া বেশি পর্নো দেখে, তাদের অন্যের কষ্ট বোঝার ক্ষমতা কমে যায়। আর তাদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণও বেশি দেখা যায়। অন্য গবেষণা বলছে, পর্নো দেখার অভ্যাস তরুণ-তরুণী ও বড়দের যৌন মনোভাব ও আচরণ গড়ে উঠতে প্রভাব ফেলে।
'যৌনতার স্ক্রিপ্ট' তত্ত্ব বলে, মিডিয়ায় যৌনতার যে ছবি বারবার দেখানো হয়, তা তরুণদের ধারণা গড়তে প্রভাব ফেলে। পর্নোতে যৌনতাকে একটা নির্দিষ্ট ছাঁচে দেখানো হয়—শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। সেখানে পুরুষের কর্তৃত্ব বেশি, নারী-বিদ্বেষ ছড়ায়, আর জোর করে যৌনাচার, শোষণ ও সহিংসতা খুব স্পষ্টভাবে দেখানো হয়। পর্নোতে আবেগের কোনো জায়গা নেই। দেখে বোঝার উপায় নেই যে যৌনতা আর ঘনিষ্ঠতার মধ্যে গভীর সম্পর্ক আছে।
মনে রাখা দরকার শিশু-কিশোরদের ওপর এসবের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে। মস্তিষ্কের যে অংশ আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে, কৈশোরে সেটা এখনও তৈরি হয়। তাই তরুণরা সহজেই উত্তেজনাপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এছাড়া শিশুরা অনেক কিছু বোঝে না, নিজেকে নিয়ে ভাবার ক্ষমতা কম থাকে, তাই সীমারেখা নির্ধারণ করতে পারে না।
আমেরিকার কলেজ পড়ুয়াদের ওপর এক জরিপে দেখা গেছে, ১২% ছেলে ও ১৮.৭% মেয়ে বলে, ১৮ বছরের আগে পর্নো দেখার সময় তাদের ওপর গভীর মানসিক প্রভাব পড়েছিল। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি জানায়, তারা অবাক বা ধাক্কা খেয়েছিল। আর প্রায় অর্ধেক ছেলে ও এক-তৃতীয়াংশ মেয়ে মনে করেছিল, তারা দোষী বা লজ্জিত।কিশোর-কিশোরীদের মনে তখন দ্বন্দ্ব তৈরি হয়—ভালোবাসা নিয়ে তাদের যত মধুর স্বপ্ন, পর্নোতে যে যৌন অবমাননা দেখে, তার সাথে তার মেলে না।
তবে একটা কথা বলা জরুরি। ১১ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের ওপর দীর্ঘমেয়াদী কিছু গবেষণায় পর্নো দেখার ফলে যে বড় ক্ষতি হচ্ছে—যেমন যৌন নিয়ে অতিরিক্ত খোলামেলা হয়ে যাওয়া, যৌন তৃপ্তি কমে যাওয়া বা মানসিক স্বাস্থ্য খারাপ হওয়া—তা এখনও পুরোপুরি প্রমাণিত নয়। আসলে পর্নো দেখার প্রতিক্রিয়া অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে: কী বয়সে দেখছে, কী ধরনের পর্নো দেখছে, কীভাবে দেখছে (একা না সঙ্গে), আর শিশু-কিশোরটির নিজের বৈশিষ্ট্য কেমন। তাই এই বয়সী শিশুদের নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণার খুব প্রয়োজন।
"আমাদের জন্য যে পর্নো বানানো হয় আর বিক্রি করা হয়, সেটা পুরোপুরি বিকৃত চিন্তা আর বিশ্বাসে ভরা। বাস্তব যৌনতা, ভালোবাসা আর সম্পর্কের ঠিক উল্টো চিত্র দেখানো হয় সেখানে। ভালোবাসার সুস্থ সম্পর্ক গড়ে ওঠে সম্মান, সমতা আর সততার ওপর। কিন্তু পর্নোতে ঠিক উল্টোটা দেখা যায়—সেখানে কর্তৃত্ব, নিয়ন্ত্রণ, অসম্মান আর সহিংসতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে ভালোবাসা আর যৌনতা।
মধুর, স্নেহময়, যত্নশীল সম্পর্কের ছবি বিক্রি হয় না। বরং অপমান আর নির্যাতনের ছবিই বেশি চলে। আর যে শিল্প এটা থেকে লাভ করে, সেটা নিয়ে গভীরভাবে ভাবার বিষয়।" — ওর্জে কাস্তেলানো
আবার আলোচ্য শিশুটিতে ফিরি।
তার চিকিৎসা ঔষধে নয় কাউন্সিলিং লাগবে। অনেকগুলো সেশন লাগবে তাতে সন্দেহ নেই। সেই সাথে বাবা মার জন্য একসাথে বসে প্ল্যান করা দরকার থেরাপিস্টের। কারণ বাবা-মা যাতে পরস্পরের উপর দোষারোপ না করেন অথবা হাল ছেড়ে না দেন। বিপথগামী সন্তানকে ফেরাতে পরিবারের যুথবদ্ধ পদচারণা ভীষণ জরুরী।
এই লেখার উদ্দেশ্য পর্নো দেখার পরিণতি এবং মানসিক আঘাত-পরবর্তী লক্ষণগুলোর মিলগুলো বোঝানো। এখনও পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই বলে এই সম্পর্ক নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, তবে সম্ভাবনাটা বোঝা জরুরি। পর্নোকে সম্ভাব্য মানসিক আঘাত হিসেবে নতুন করে ভাবলে আমরা এর প্রভাব বুঝতে পারব—কেন বয়স অনুসারে শিশুরা ভিন্নভাবে আক্রান্ত হয়, সেটাও পরিষ্কার হবে। আর তখনই আমরা আরও কার্যকর ও বাস্তবসম্মত আইন তৈরি করতে পারব, আরও উপযুক্ত চিকিৎসার পথ খুঁজে পাব। যারা শিশুর দোষ শিশুর ভেতরের মানুষটিকে নয়, বরং সমস্যাটিকে চিহ্নিত করে তার মুক্তির পথ খোঁজেন তাদের প্রতি সশ্রদ্ধ ভালবাসা।
অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া,
চিকিৎসক, কাউন্সিলর, সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার।
ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার, বাংলাদেশ।
(আমার চেম্বারে আসা মানুষটির অনুমতি সাপেক্ষে, মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে, গোপনীয়তা বজায় রেখে প্রকাশ করা হলো।)
তথ্যসূত্র
Alexandraki, K., Stavropoulos, V., Burleigh, T. L., King, D. L., & Griffiths, M. D. (2018). Internet po*******hy viewing preference as a risk factor for adolescent internet addiction: The moderating role of classroom personality factors. Journal of Behavioral Addictions, *7*(2), 423–432.
Ballester, L., Rosón, C., Facal Fondo, T., & Gómez-Juncal, R. (2021). Nueva p***ografía y desconexión empática [New po*******hy and empathic disconnection]. Atlánticas. Revista Internacional de Estudios Feministas, *6*(1), 67–105.
Barchielli, B., Cricenti, C., Lausi, G., Quaglieri, A., Mari, E., Rocca, G., Pizzo, A., & Giannini, A. M. (2024). Exploring the interplay of problematic po*******hy use, s*xism, and r**e myth acceptance: An Italian cross-sectional study. Heliyon, *10*(12), Article e32981.
Euronews. (2025, January 26). 1 in 12 children globally exposed to 'widespread' online s*xual exploitation or abuse.
Fromson, J. A. (2024). Struggling with screen time: A look at internet use disorders.
Gutiérrez Berlinches, J. (2024). La adicción infantil al p***o es una violación psíquica desde el primer momento [Child po*******hy addiction is a psychic violation from the very first moment]. El País.
Hald, G. M., Malamuth, N. N., & Lange, T. (2013). Po*******hy and s*xist attitudes among heteros*xuals. Journal of Communication, *63*(4), 638–660.
Joleby, M., Landström, S., Lunde, C., & Jonsson, L. S. (2021). Experiences and psychological health among children exposed to online child s*xual abuse—A mixed methods study of court verdicts. Psychology, Crime & Law, *27*(2), 159–181.
LBC. (2025, September 8). 'I stumbled across indecent images at 17. Now I live with the consequences,' convicted teenage s*x offender writes.
Liatsou, I., Triantafyllou, K., Malliori, M.-M., Tzavellas, E., & Paparrigopoulos, T. (2025). Problematic internet po*******hy use and s*xist attitudes: An internet-based observational study. S*xuality & Culture, *29*, 1034–1050.
Lim, M. S. C., Carrotte, E. R., & Hellard, M. E. (2016). The impact of po*******hy on gender-based violence, s*xual health and well-being: What do we know? Journal of Epidemiology and Community Health, *70*(1), 3–5.
Medical Republic. (2020, April 16). Down the rabbit hole: Kids scarred by scary po*******hy.
Milas, G., Wright, P., & Štulhofer, A. (2020). Longitudinal assessment of the association between po*******hy use and s*xual satisfaction in adolescence. The Journal of S*x Research, *57*(1), 16–28.
NC Child Treatment Program. (n.d.). Problematic S*xual Behavior – Cognitive-Behavioral Therapy™ (PSB-CBT™).
New Age BD. (2026, February 24). 61pc schoolboys obsessed to p**n.
People v. Pitts, 223 Cal. App. 3d 606 (Cal. Ct. App. 1990).
Psy-Ed. (2025, October 29). P**n addiction in teens: Why is it dangerous, and how can parents deal with it? Advanced Psychology Services.
Qu, S., Li, R., & Wang, J. (2024). Increased sensitivity for negative emotional images in individuals with problematic po*******hy use. Frontiers in Psychology, *15*, Article 1287455.
Rostad, W. L., Gittins-Stone, D., Huntington, C., Rizzo, C. J., Pearlman, D., & Orchowski, L. (2019). The association between exposure to violent po*******hy and teen dating violence in grade 10 high school students. Archives of S*xual Behavior, *48*(7), 2137–2147.
Sahoo, S., & Adarsh, H. (2023). Po*******hy and its impact on adolescent/teenage s*xuality. Journal of Psychos*xual Health, *5*(1), 35–39.
SciMex. (2025, January 20). 1 in 12 kids exposed to online s*xual exploitation or abuse [Press release].
Waterman, E. A., Wesche, R., Morris, G., Edwards, K. M., & Banyard, V. L. (2022). Prospective associations between po*******hy viewing and s*xual aggression among adolescents. Journal of Research on Adolescence, *32*(4), 1612–1625.
Ybarra, M. L., & Thompson, R. E. (2018). Predicting the emergence of s*xual violence in adolescence. Prevention Science, *19*(4), 403–415.