26/04/2026
আমার বউটা একটু লোভী, খাবার দেখলেই ওর চোখ চকচক করে ওঠে, গাল দুটো টসটসে টমেটোর মতো লাল হয়ে যায়।
এমন না যে, সে অনেক দামী রেস্তোরাঁর ভ্যারাইটি সব খাবার পছন্দ করে। তবে রাস্তাঘাটে যাই দেখে তাই খেতে চায়।
কিছুদিন আগে ওকে নিয়ে একটু বেরিয়েছিলাম, রাস্তার ঝালমুড়ি দেখে সেটা সে খাবে,
দিলাম কিনে, তার পাশে আমড়া সেটাও সে খাবে,খাওয়ালাম।
তার পাশেই একটা জুসের দোকান দেখে, সে এখন জুস খাবে,তাও খাওয়ালাম।
এরপর বললাম, চলো যেখানে যাইতেছি,ওখানে অন্তত যাই।
বাইকে উঠতেই যাবে, ওমনি দেখি দাঁড়িয়ে গেলো, ভুত দেখার মতো, দাঁড়িয়ে রাস্তার ওপর পাশের এক দোকানের দিকে তাকিয়ে আছে, সেখানে গরম গরম পেয়াজু ভাজা হচ্ছে।
বুঝে গেলাম আমার বেগম এখন সেই পেয়াজু খেতে চায়।
তার এমন টুকুর টুকুর লোভে আমি মোটেই বিরক্ত হইনা, বরং আমার মায়া লাগে।
আমি যে একখানা ছোটখাটো স্টক বিজনেস করি, তাতে আসলে খুব বেশি কোন আবদার পূরণের যোগ্য আমি না।
যোগ্য হলে হয়তো আমার বউ কাচ্চি ডাইনের বিরিয়ানি অথবা সুলতানস ডাইনের ঐ চাপ আর পোলাও খাওয়ার বাহানা করতো রোজরোজ।
তার খাবারের প্রতি দূর্বলতা আর ঘুম কাতুরে স্বভাব আমার যারপরনাই পছন্দের।
কিন্তু খারাপ লাগাটা অন্য খানে, ৫ ভাই আর এক বোনের সংসারে আমি সেজো ছেলে।
আমার সব ভাইবোনই প্রতিষ্ঠিত, শুধু প্রতিষ্ঠিত বললে ভুল হবে, একেক জনের অবস্থান গর্ব করার মতো।আমিই শুধু জীবনের খেই হারানো মানুষ।
ভালোবেসে বিয়ে করেছি বেনুকে। সে জন্যেই বোধহয় বাসার কারোরই ওকে তেমন পছন্দ না।
তার উপরে বেনুর মা মারা গেছেন, যখন ওর বয়স সাত বছর। বাবার দ্বিতীয় বিয়ের পরে, বেশ অনেকটা সময় বেনু সৎ মায়ের কাছেই থেকেছে।
থেকে যে খুব বেশি ক্ষতি হয়েছে তা না।
কিছু ক্যালসিয়াম আর আয়রণের ঘাটতি ছাড়া তেমন কিছু হয়নাই। বরং কাজ কর্মে বেশ পটু হয়ে গেছিলো সে।
এসএসসি এর পরে মেয়েটা মামার বাড়িতে গিয়ে ওঠে, নিজে থেকেই যে গিয়েছিলো তা না, বেনুর নানী হেলেনা খাতুন তাকে নিয়ে যায়।
অপুষ্টি,আয়রন আর ক্যালসিয়ামের ঘাটতিতে যখন বেনুর শরীর ধনুকের মতে বেকে যাওয়ার ন্যায়, তখনই তার সহৃদয়বান নানী বেনুকে যত্নে আগলে নিয়ে যান।
বেনুর জীবনে তার নানী হেলেনা খাতুনের অবদান অপরিসীম।
মামা-মামীও যে খুব খারাপ মানুষ ছিলেন তেমনটা না।
তবে বেনুর মামা ছিলেন কৃষক মানুষ। নিজেস্ব অল্প কিছু জমিতে চাষবাস করে নিজের স্ত্রী, ৪ ছেলে, মা আর বেনুর খরচ চালানো কষ্টকর হতো। উপরন্তু বেনুর পড়াশোনার খরচ তো আছেই। আর ছাত্রী হিসেবেও বেনু বেশ ভালো।
কৃষক মামার টানাটানির সংসারে খাওয়া-পরার অভাব থাকলেও, নানীর ভালোবাসা ছিলো অফুরান।
ক্যালসিয়াম আর আয়রনের ঘাটতি পূরণ না হলেও নানী হেলেনা বেগম, বেনুর ধনুকের মতো বাকানো শরীরকে ঠিকই সোজা করেছেন, হৃষ্ট-পুষ্ট না হলেও খারাপ ছিলোনা বেনু।
কিন্তু বেনুর সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি, বছর পাঁচেকের মাথায় হেলেনা খাতুন বেনুকে একা রেখেই স্রষ্টার কাছে পারি জমান।
আবারো বেনুর আয়রণ ক্যালসিয়াম ঘটতির দিন শুরু।
আমি যখন বেনুকে বিয়ে করার আগ্রহের কথা বাসায় বলি, আমার মা বলেছিলেন- ওমন হা-ভাতে ঘরের মেয়ের সাথে কোন ভাবেই আমার বিবাহ সম্ভব না।
আমি মায়ের অমান্য হইনি,মেনে নিয়েছিলাম তবে এও জানিয়েছিলাম ঐ মেয়ে ছাড়া আমার পক্ষে কাউকেই বিয়ে করা সম্ভব না।
অনেক কাঠখড় পুরিয়ে আমার ভাই ও বোনদের প্রচেষ্টায় আমি বেনুকে বিয়ে করি।
আমার বাবা মা,আমার বিয়েতে পর্যন্ত যান নাই।
তাতে আমার সত্যিই আফসোস নাই, আমার জীবনটা আমি যারসাথে কাটাতে চাই সে অন্তত আমার পছন্দের হোক।এটাই চেয়েছিলাম আমি।
বেনুকে বিয়ের পরে বুঝেছি, সঙ্গি নির্বাচনে আমি মোটেও ঠকিনি।
বেনু একটা দারুণ মেয়ে। বিয়ের পরদিন থেকেই সংসারের সবকিছু যেন সে নিজের হাতে তুলে নিয়েছে।
সবকিছু বলতে দায়িত্ব না, বরং সমস্ত কাজ।
একা হাতেই বাড়ির সব কাজ বেনু করে।
আমি ভেবেছিলাম এতে বুঝি আমার বাবা - মা খুশি হবেন।কিন্তু না হলো উল্টো।বেনুকে তারা বাসার কাজের মেয়েই ভাবতে আরাম্ভ করলো যেন, আর নানান কটুকথা তো আছেই।
আমার বেনু কিছুই বলতোনা, কটু কথা শোনার আর বাড়ির কাজ করার অভ্যাস তো তার আগের থেকেই আছে,তবে আমার নিজেকে অসহায় লাগতো, বেনুর জন্য আমি কিছুই করতে পারিনা।
অথচ মেয়েটা আমাকে ভালোরাখতে সব করে, প্রচন্ড ভালোবাসে সে আমাকে।আগলে রাখে,যত্ন করে,বিশ্বাস করে। ওর সমস্তটা দিয়ে আমাকে খুশি করার চেষ্টা আমার চোখ এড়ায় না, আর করবে নাই বা কেন! আমি ছাড়া ওর আছে কে?
মাঝেমাঝে বেনু ঘুমিয়ে গেলে আমি শুধু ওর দিকে তাকিয়ে থাকি, কি মায়াময় চেহারা, কি সুন্দর নাক, চোখ,ঠোট,সাদা ধবধবে বকের মতোন আমার বেনু ।
আল্লাহ কতইনা যত্নে বানিয়েছেন, না জানি কত সময় ধরে বানিয়েছে, কিন্তু ভাগ্যটা কেন সময় নিয়ে লিখলেন না?কেন যত্ন করে লিখলেন না ভাগ্যটা?
যদি এক ফোটাও যত্ন করতেন, তবে কি সেই ৭ বছর থেকে একটা মানুষের ভাগ্য শুধু অবহেলা,কান্না, কুৎসিত কথা শোনা আর কাজ করাই লেখা থাকে?
এই ব্যাথার চাইতে আরো বড় এক ব্যাথা আমার ছিলো।
বেনুকে যখন আমি বিয়ে করে নিয়ে আসি, ভেবেছিলাম এইবার আর যাই হোক আমার বউ এর আয়রন আর ক্যালসিয়ামের ঘাটতি আমি মেটাবো।
সেই উদ্দেশ্যেই হয়তো আমি বেনুর জন্য তার পছন্দের গরুর মাংস,মুরগী,ডিম,চিংড়ি,পাবদা,কাতলা মাছ রোজকার খাবারে রাখার চেষ্টা করতাম, আমার বাবা মায়েরও খাওয়া হলো, আমার বেনুরও হলো।
কিন্তু যখনই আমি বেনুকে খেতে দেখেছি, স্বাচ্ছন্দ নিয়ে কখনোই খেতে দেখিনাই,
প্রথম দিকে, আমি ভাবতাম ও লজ্জা পাচ্ছে।
কিন্তু একদিন যখন নিজ কানে শুনলাম, বেনু খেতে বসার সাথে সাথেই, আমার মা বললেন, তুমি মাছের ঐ ভাংগা পিছটা নাও, আর ফ্রিজের কালকের শাক,ডালটা শেষ করো,
সেদিন বুঝলাম আমার বেনু কেন স্বছন্দে খায়না।
বাবা মা কে আমি বেহাত ভালোবাসতাম, আমার ভালোবাসার মানুষের সাথে এই আচরণে আমি দারুণ কষ্ট পেলাম সেদিন।
এরপর থেকে ঘরেই খাবার এনে রাখতাম যেটুকু সম্ভব ছিলো।
আর খাবারের সময়টুকু চেষ্টা করতাম বেনুর সাথে বসে খেতে, যাতে বেনুকে নিজে উঠিয়ে দিয়ে খাওয়াতে পারি।
আমার বেনুটা একটু লোভী কি না!
বাড়িতে কোন দাওয়াত এর কার্ড এলে, দেখতাম বেনু সে কি খুশি!
তার খুশির কারণ গরুর মাংস,পোলাও রোস্ট খাওয়া হবে; এই খুশিতে যেন স্বপ্নেও সে পোলাও এর গন্ধ পেত।
যতদিন যায়, ঝামেলা ততই বাড়ে,আমার বেনুর ক্যালসিয়াম আর আয়রণ ঘাটতির দিন যেন ফুরায় না।
বাড়িতে বেনুর সাথে সাথে আস্তে আস্তে আমাকেও গুণতিতে ধরা বাদ দিলেন আমার প্রিয় বাবা মা।
তাদের অন্যান্য সন্তানেরা বেশ ভালো অবস্থান সম্পন্ন কিনা, এই একজন সন্তান না হলেও তাদের চলবে বোধকরি।
আমি ভাবতাম, আমার বাড়িরলোক অন্য রকম মানুষ, এরা সুশিক্ষিত,মনে মনে কোন ভেদাভেদে নেই।
কতরাত বেনুকে বুকে নিয়ে গর্ব করে বলেছি বেনু আমার বাবা মা রাগী মানুষ হলেও আমার পরিবারের সবারই মন মানুষিকতা অমায়িক।
কিন্তু আমি ভুল ছিলাম, সময় হয়তো সব বদলে দেয়।
বেনুকে আর গর্ব করে কিছু বলতে পারিনা।
আমি হয়তো বুঝে গেছিলাম,শুধুমাত্র বেনু তাদের পছন্দ না, এই জন্য আমাকে তারা বাতিল ভাবছে এমনটা নয়,
বরং আমার আয়,সামর্থ্য ও সম্মান কম জন্য তারা বেনুকে ভালোবাসতে পারেনি,সে জন্যে তারা বেনুকে বাতিলের তালিকায় ফেলেছে।
কিন্তু আমার বেনুর তাতে কোন আফসোস নেই।
আমাদের সংসার দারুণ চলে, ফাকা সময় পেলেই বেনু ঘুম দেয় আর আমার কাছে নানান খাবারের আবদার তো আছেই।
একদিন বেনুকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছি, সে রাস্তার ধারের কোন এক দোকানে পারুটি দেখেছে, তারপর আর কি!সেই পারুটি সে খাবে বায়না ধরলো।
ফেরার সময় খাওয়াবো বলে, যেখানে ঘুরতে যাচ্ছিলাম সেখানে গেলাম আগে,ঘুরে ফিরে চলেও এলাম কিন্তু কারোরই মনে রইলোনা পারুটির কথা।
বাড়ি ফিরে বেনুর সে কি মন খারাপ,ঠোট ফুলিয়ে ঘরের কোণে বাচ্চা মেয়েদের মতো বসে আছে।
আমি অনেক কষ্টে রাগ ভাংগালাম, রাতে পারুটি এনে দেব এই কথা দিয়ে।
রাতেও ভুলে গেলাম। অবশ্য বেনু আর রাগ করেনি।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বেনু পারুটি আর দুধ খাচ্ছে।
আমাকে দেখে দাত কেলিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠলো- "বেনু একটু ওদের পারুটি আর দুধ চুপ করে এনে খাচ্ছে।"
ওর কথা শুনে মায়াও লাগে আবার হাসিও পায়, হায়রে খাওয়া।
২ পিস পারুটি আর একটু দুধের জন্য সেদিন বেনুকে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। খেয়েছে এই জন্য না, মাকে না জানিয়ে খেয়েছে এই জন্য। যদিও মাকে জানালে আর খাওয়া হতোনা।
সেদিন একটু দুধ কম পরে গেছে আমার মায়ের।
অথচ বেনু কখনো শখ করেও দুধ খায়নি এই বাসায়।
সেদিনও আমি ভেঙে গেলাম ভেতর থেকে, আমার বেনু হাসছিলো আর বলছিলো, খেয়েই তো নিছি বকুক এখন।
ওর কোন খারাপ লাগা নাই।
কিন্তু আমার ভীষণ খারাপ লাগলো যে সংসারটায় বেনু সারাদিন শ্রম দেয়, সেই সংসারে কি ও ২ পিস পারুটি আর দুধ না বলে খেতে পারেনা?
আমি বেনুর জন্য রাতে দুধ আর পারুটি নিয়ে যেতাম মাঝেমাঝে।
বেনু যখন গর্ভবতী হলো, তখন ওর লোভটা যেন আরো বেরো গেলো, যারই ঘ্রাণ পায় তাই খেতে চায়।
এই সময় মেয়েরা বাপের বাড়িতে মায়ের যত্নে থাকে,আমার বেনুর তো কেউ নাই, আমিই ওর সব। যত্নের কোন ত্রুটি রাখতে চাইনি আমি ওর।
মাঝে ওর মামা আর বাবা দেখে গেছেন ওকে,কিন্তু ঐ একবারই।
শেষের সময়টায় এসে বেনু খুব একটা কাজ করতে পারতোনা,
যা নিয়েই বাড়িতে ঝামেলা শুরু হলো।
আমি অধম যা যৎসামান্য ইনকাম করি বেনুকে নিয়ে আলাদা হওয়ার সাহসও নাই আমার। তাই ঝামেলার মাঝেই আমরা ভালো থাকি।
একদিন বেনু মায়ের কথা অমান্য করে ডিমের তরকারি রাধলো, কেননা লোভী বেনুর ডিম দারুণ পছন্দ।
ডিমের তরকারি দিয়ে সে শান্তি করে ভাতও খেলো।
এই নিয়ে সালিশ বসলো বাসায়।
মায়ের কথা- এই সংসার আমার,এখানে আমার অবাধ্য হলে থাকা চলবেনা।
বেনু মাফ চাইলো তাতেও হলোনা,
কারণ মা বললেন- বেনু এর আগেও মাকে না জানিয়ে,দুধ,পারুটি, কলা, নুডুলস, বিস্কুট, খই, চা, সেমাই এসব খেয়ে ফেলেছে, না জানিয়ে রান্নাও শুরু করেছে,মানা করলেও শোনানা।
আমি বেনুর দিকে তাকালাম, এতো কিছু কবে খেলো সে,আমি তো তাকে সব এনে দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করি তবুও কেন এভাবে না বলে খায় ও? রাগ হলো ওর উপরে।
কিন্তু ও দেখি মিটমিটিয়ে হাসে।
সালিশ চললো ৩৫ মিনিট। যদিও সবাই জানে বেনু যা রাধতে চায় যা খেতে চায় তা সবসময়ই মানা করে দেন মা, এই বেনু তারপরেও কেন যে বোঝেনা।
সালিশের শেষ কথা হলো, বেনু মায়ের অমান্য হয়েছে তাই শাস্তি পাবে নইলে নাকি বেনু আবারো এই কাজ করবে।
বেনুর শাস্তি হলো, আজকে যেহেতু দিনের বেলা ডিমের তরকারি দিয়ে সে পেট পুরে সাধ মিটিয়ে ভাত খেয়েছে, তাই রাতে তার খাওয়া বন্ধ।
সালিশ শেষ করে আমি বেনুর দিকে আর তাকাইনি।সোজা ঘরে চলে এলাম,
রাগে আমার শরীর কাপছে,বেনু হয়তো বুঝতে পারেনি আমি এতো রেগে আছি।
সে এসে বলতে আরাম্ভ করলো- আরে আমি খেয়ে তো নিয়েছি এখন বকলে বকুক তাতে কি.....
আমি মেজাজের খেই হারিয়ে ফেললাম- এতো ছোচা কেন তুমি?এতো খাবারের লোভ কেন? আমি কি খাওয়াই না? না বলে কেন খেয়ে নেও? লজ্জা করেনা কথা শুনতে?তোমার আসলে ছোট থেকে এভাবে থাকতে থাকতে চামড়া মোটা হয়ে গেছে।
কথা শেষ করেই বেরিয়ে আসলাম।
পরে নিজেরই কেমন অপরাধবোধ হচ্ছিলো। মেয়েটার সবটাই তো আমি জানি। ছোট থেকেই তো খাবার কষ্টেই বড় হয়েছে মেয়েটা, কেউ না জানুক আমি তো জানি।
হয়তো খেতে ইচ্ছে করেছিলো তাই খেয়েছে।
এভাবে কেন ওকে বললাম, আমিও তো মায়ের মতো করেই ওকে বললাম, অথচ আমি ছাড়া মেয়েটার কেউ নাই।
ফোনটাও অফ করে রেখেছিলাম।
দ্রুত ফোন অন করে বেনুকে কল দিলাম,ধরলো আমার ছোট বোন।
বেনু হাসপাতালে, আমাকে তাড়াতাড়ি যেতে বললো, ওকে ওটিতে নিয়েছে,সিজার হচ্ছে ,ওর অবস্থা ভালোনা।
আমি দ্রুত গেলাম হাসপাতালে।
আমার একটা মেয়ে হয়েছে, একেবারেই বেনুর মতো ধবধবে সাদা, আংগুল গুলো বেনুর মতো লম্বা, কপাল অব্দি চুল বেনুর মতোই।
কিন্তু আমার বেনু আর আসলোনা।
বেনু আমার কথায় ভীষণ রাগ করেছে, কষ্ট পেয়েছে এতোটা কষ্ট পেয়েছে যে,আমাকে শেষ বার আর দেখলোই না,কথাও বললোনা।
শুনেছি আমি চলে আসার পরপরেই হয়তো বেনু অজ্ঞান হয়ে যায়।অনেক পরে বেনুকে ডেকেও না পেয়ে আমার মা গিয়ে দেখে ও মেঝে পরে আছে।
সেদিন আমার বাবা মা বেনুকে একটু দয়া করেছিলেন,হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমার লোভী বেনু আমাকে অপরাধী করে চলে গেলো।
বেনুর নামের সাথে মিলিয়ে আমি আমার মেয়ের নাম রাখি রেনু "রেহনুমা রেনু"
রেনুকে নিয়ে আমি বেশ বিপাকে পরেছি, এতো ছোট বাচ্চা কিভাবে আমি মানুষ করবো?
তারপরও দিন কি আর বিপাকে পরে থেমে থাকে।
দিন দিনের মতোই যায়, আর আমার ব্যবসা আরো খারাপ হয়।
রেনুকে আমি ছাড়া তেমন ভাবে দেখার কেউ নাই।
আমার মা বোন যে একেবারেই দেখেনা তা না, কিন্তু বিরক্ত হয় বেশি।
রেনু আস্তে আস্তে বড় হয়, আমি ব্যবসার উন্নতির জন্য ব্যস্ত হই,
আর আমার মা রেনুকে সামলাতে না পেরে অথবা বংশের বাতির আশায়, আমাকে নিজের পছন্দ করা মেয়ের সাথে বিয়ে দিতে চান।
এইদিন প্রথম আমি রেনুকে অনেকদিন পরে খুব ভালোভাবে দেখলাম।
ঠিক আমার বেনুর মতো,রেনুও কেমন ধনুকের মতো বেকে যাচ্ছে।আমার রেনুরও আয়োডিন আর ক্যালসিয়ামের ঘাটতি চোখে পরছে আমার।
রেনু এসে আমার হাত ধরে বললো- বাবা আমি পারুটি খাতে চাই!
আমি যেন এক নিমিষেই আমার একমাত্র মেয়ে রেনুর বর্তমান,ভবিষ্যত ও হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মৃত্যু দেখতে পেলাম,
এক নিমিষেই চোখে ভেসে উঠলো আমার রেনুটাও খাবারের প্রতি লোভী হয়ে যাচ্ছে, ক্যালসিয়াম আয়োডিনের ঘাটতি আমার রেনুকেও যেকে বসেছে।
কিন্তু আর কোন বেনুকে তো আমি গড়ে তুলতে পারিনা।এরকম টা হলে তো বেনু জান্নাতেও আমার জন্য অপেক্ষা করবেনা।
যেই সাহস আমার আগেই করা উচিত ছিলো সেই সাহসটা আমি এতদিনে করে উঠলাম।
দুটো ব্যাগে আমার আর রেনুর সমস্ত কিছু গুছিয়ে আমি বাড়ি ছাড়লাম।
আমি চাইনা আমার মেয়ে আয়োডিন আর ক্যালসিয়ামের ঘাটতিতে বড়হোক,আমি চাইনা আমার মেয়েটা লোভী হোক।
লোভী
- রাফিয়া মেহেদী ছোঁয়া
(সংগ্রহীত)