20/02/2026
দুটি মৃত্যু ও একটি শোক সংবাদ!
গত এক সপ্তাহের মধ্যে দুটি মৃত্যু সংবাদ হজম করতে হয়েছে। একটি প্রত্যাশিত, অন্যটি অপ্রত্যাশিত; একজনের বয়স ৮০+, অন্যজনের ২০+
আমি কত দ্রুত মানিয়ে নিচ্ছি এই পৃথিবীর সাথে, প্রতিটা মৃত্যু সংবাদ খুব স্বাভাবিক ঠেকছে নিজের কাছে। হাতের কাজ ফেলে কিছুক্ষণ চিন্তা করি, ওরা কোথায় যাচ্ছে, ভবিষ্যতে কখনো ওদের সাথে আমার আর দেখা হবে কি?
কিছুক্ষণ পরেই ফিরে আসি নিজের চেনা জগতে, ব্যস্ত হয়ে পড়ি ভীষণ ক্লান্তিকর এক জীবিকায়। সম্বিৎ ফিরে আসে অবসর সময়ে, উল্টে পাল্টে দেখি মানব মুক্তির লক্ষ্যে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে লেখা পাওলো ফ্রেইরীর লেখা এডুকেশন অফ অপ্রেসড বইটি। যুগে যুগে মানব মুক্তির নানা বার্তাবাহক পৃথিবীতে এসেছিলেন, আমাদের দিয়ে গেছেন আধ্যাত্মিক ও সামাজিক শিক্ষা, অথচ তাদের সকলেই পৌঁছে গিয়েছে একটি গন্তব্যে, মৃত্যু।
মৃত্যু এমন এক অভিজ্ঞতা যা জাতপাত ধর্ম বর্ণ দেশ বিদেশ মানে না, সকল জন্মের মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। অথচ কী অবলীলায় আমি ভুলে যাই সে কথা, আমি ভুলে যাই আমার পূর্ব জন্মের কথা। আমি ভুলে যাই দাদীর কথা, বাবার কথা কিংবা নাম ভুলে যাওয়া বন্ধুর কথা। যার সাথে কাটিয়েছিলাম কোন এক বর্ষার পুরো একটি বিকেল।
ধীরে ধীরে আমি মৃত্যুকে আবদ্ধ করি বৈজ্ঞানিক ব্যাখায়, মেনে নেই অমোঘ নিয়তি হিসেবে। তারপর? আমি শুনে যাই মানুষের গল্প, তাদের রঙিন অনুভূতির বেলুনগুলো আমার সামনে উড়ে যায় নীল আকাশে, মিলিয়ে যায় সময়ের সাথে সাথে। হয়তো এই ভুলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আমি নিজেকে বাঁচিয়ে রাখি প্রিয়তমার জন্য কিংবা অতীতের প্রায়শ্চিত্য করার জন্য।
কোন একটি বইয়ে পড়েছিলাম মানব জীবন মূলত হারানো বেদনা কাটিয়ে উঠার জীবন, আমরা জন্মের পর থেকে মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত গ্রীফ এর মধ্য দিয়ে যাই, যার বাংলা হবে হয়তো শোকাহত মানব জীবন। আমরা প্রতিনিয়ত কিছু না কিছু হারিয়ে ফেলি; কোন প্রিয় বস্তু, কখনো প্রিয় মানুষ, কখনো প্রিয় সম্পর্ক, আবার কখনো কোন অভিজ্ঞতা। প্রতিবার হারানোর বেদনা আমাদেরকে অভ্যস্ত করে তোলে, আমরা মেনে নিতে শিখি। একসময় মেনে নেই হারানোটাই নিয়ম, কোন কিছুই স্থায়ী ভাবে থাকে না। হোক সেটা দামী বস্তু, প্রিয় মানুষ অথবা কোন একটি মুহুর্ত। আমরা হারানোর কষ্ট কাটিয়ে নতুন কিছু খুঁজে নেই যা হারালে আমাদের কম কষ্ট লাগবে।
আমার কাছেও একই রকম লাগতো বিষয়টা, তারপর একদিন আমি দেখতে পাই অপরিচিত এক ছবি; প্রতিটি মানুষের মাঝে জমে থাকা হারানো অনুভূতিগুলো আমি যেনো দেখতে পাই নিজের সামনে। সবচাইতে অদ্ভুত লাগে যখন দেখি একজনের অনুভূতির সাথে আরেকজনের মিল নেই, অথচ হারিয়েছে হয়তো দুজনেই পরস্পরকে। আমার নিজের মাঝেও খেয়াল করেছি হারানোর এক ভিন্ন রকম অনুভূতি, যে জিনিস আমি কখনো পাই নি সেটা আবার হারাই কিভাবে? অথচ কী আশ্চর্য, আমি সেই কাল্পনিক স্মৃতি হারানোর শোক বহন করছি পুরো একটি জন্ম ধরে।
- - -
ফয়সাল রাফি
লালমাটিয়া, ঢাকা
ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৬