22/12/2025
যারা দীর্ঘমেয়াদী হাড়ের ক্ষয় জনিত সমস্যায় ভুগছেন, সময় নিয়ে আমার লেখাটি পড়তে পারেন। যুক্তরাজ্যের NICE (National Institute for Health and Care Excellence) ২০২২ সালে একটি নির্দেশিকার আলোকে হাড় ক্ষয় জনিত রোগের চিকিৎসা সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
অস্টিওআর্থ্রাইটিস যেটিকে আমরা হাড়ের ক্ষয় রোগ বলে থাকি যা ১০০ টিরও বেশি ধরনের হয়ে থাকে। সাধারণ মানুষের কাছে এই রোগটি বাত রোগ বলে বেশি পরিচিত, যেখানে হাড়ের আর্টিকুলার কার্টিলেজ বা উপরের নরম আবরণ ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়, জয়েন্টের মধ্যেকার গ্যাপ কমে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে জয়েন্টের চারপাশে অতিরিক্ত হাড় গঠিত হতে দেখা যায়। এই রোগটি সাধারণত 40 বছর বা তার বেশি বয়সের মানুষের বেশি হয়। অস্টিওআর্থ্রাইটিস সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ওয়েট বেয়ারিং জয়েন্ট যেমন: হাঁটু, এবং হিপ জয়েন্টে। এছাড়াও স্পাইন শোল্ডার সহ অন্য যেকোনো জয়েন্টে এ রোগটি হতে পারে।
এ রোগটি সাধারণত হাড় ক্ষয় জনিত কারণে হয়ে থাকে, এছাড়াও কোন এক্সিডেন্টাল হিস্ট্রি, খেলাধুলায় আঘাত, অতিরিক্ত ওজন সহ আরো অনেক কারণে হতে পারে। অস্টিওআর্থ্রাইটিস এর ফলে জয়েন্টে ব্যথা অনুভূত হয়, জয়েন্ট ফুলে যেতে পারে, জয়েন্ট স্টিফ হয়ে রেনজ-অফ- মোশন কমে যেতে পারে। হাটু অথবা হিপ জয়েন্টে অস্টিওআর্থ্রাইটিস হলে নিচে বসতে, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে নামতে, ও বসে নামাজ পড়তে ব্যথা অনুভূত হয়। এছাড়াও হাঁটু ভাঁজ ও সোজা করার সময় হাঁটুর মধ্যে কটকট আওয়াজ হতে পারে।
অস্টিওআর্থ্রাইটিস (Osteoarthritis) বা অস্থিসন্ধির ক্ষয়জনিত রোগের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনার জন্য যুক্তরাজ্যের NICE (National Institute for Health and Care Excellence) ২০২২ সালে একটি নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। এই নির্দেশিকার প্রধান দিকগুলো নিচে সহজভাবে তুলে ধরা হলো:
চিকিৎসার মূল ভিত্তি (Core Treatments)
নির্দেশিকায় ওষুধ ব্যবহারের চেয়ে জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। NICE নির্দেশিকা অনুযায়ী, অস্টিওআর্থ্রাইটিস ব্যবস্থাপনায় ফিজিওথেরাপি এবং ব্যায়াম কেবল চিকিৎসার একটি অংশ নয়, বরং এটি চিকিৎসার মূল ভিত্তি। এছাড়াও, ওজন কমানো বা ওজন নিয়ন্ত্রণকেও চিকিৎসার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে হাঁটু এবং কোমরের অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
1. কেন ব্যায়াম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?
NICE গাইডলাইন অনুসারে, অস্টিওআর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত প্রত্যেক ব্যক্তিকে ব্যায়ামের পরামর্শ দেওয়া বাধ্যতামূলক। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
• ব্যথা কমানো: নিয়মিত ব্যায়াম জয়েন্টের ব্যথা কমাতে ওষুধের চেয়েও দীর্ঘমেয়াদী কাজ করে।
• কার্যক্ষমতা বাড়ানো: ব্যায়ামের মাধ্যমে জয়েন্টের নমনীয়তা (Flexibility) বাড়ে এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম সহজ হয়।
• পেশি শক্তিশালী করা: আক্রান্ত জয়েন্টের চারপাশের পেশি শক্ত হলে তা জয়েন্টের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমিয়ে দেয়।
• কার্টিলেজের সুরক্ষা: ব্যায়াম জয়েন্টের ভেতরে পুষ্টি সরবরাহ বাড়ায় এবং কার্টিলেজ বা তরুণাস্থির ক্ষয় রোধে সাহায্য করে।
A. ব্যায়ামের ধরণ
NICE নির্দেশিকা অনুযায়ী মূলত দুই ধরণের ব্যায়ামের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে:
• লোকাল মাসল স্ট্রেংথেনিং (Muscle Strengthening): নির্দিষ্ট জয়েন্টের (যেমন হাঁটু বা কোমর) চারপাশের পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম।
• অ্যারোবিক ফিটনেস (Aerobic Fitness): পুরো শরীরের সচলতা ও হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য দ্রুত হাঁটা, সাঁতার বা সাইকেল চালানো।
B. ফিজিওথেরাপির ভূমিকা
ফিজিওথেরাপিস্টরা রোগীর অবস্থা বুঝে একটি নির্দিষ্ট টেইলর্ড বা ব্যক্তিগত ব্যায়ামের পরিকল্পনা তৈরি করে দেন। NICE-এর মতে:
• তত্ত্বাবধানে ব্যায়াম: একা ব্যায়াম করার চেয়ে বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে ব্যায়াম করা বেশি কার্যকর হতে পারে।
• ম্যানুয়াল থেরাপি: জয়েন্টের জড়তা কাটাতে ফিজিওথেরাপিস্টের হাতের কৌশল বা ম্যানিপুলেশন কার্যকরী হতে পারে, তবে এটি অবশ্যই ব্যায়ামের সাথে সম্পূরক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে (কেবল থেরাপি দিয়ে কাজ হবে না)।
C. ব্যথার ভয় কাটিয়ে ওঠা
অনেকে মনে করেন ব্যায়াম করলে জয়েন্টের ক্ষতি হবে বা ব্যথা বাড়বে। NICE নির্দেশিকা এখানে বিশেষ পরামর্শ দেয়:
• ব্যায়াম শুরু করার পর শুরুতে কিছুটা ব্যথা বা অস্বস্তি হতে পারে। এটি স্বাভাবিক এবং এতে জয়েন্টের কোনো ক্ষতি হয় না।
• দীর্ঘমেয়াদে ব্যায়াম করলে এই ব্যথা কমে আসে এবং জয়েন্টের স্থায়িত্ব বাড়ে।
2. ওজন কমানোর লক্ষ্যমাত্রা
NICE গাইডলাইন অনুযায়ী, অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত অস্টিওআর্থ্রাইটিস রোগীদের জন্য ওজন কমানোর একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা জরুরি:
• ৫% বনাম ১০% নিয়ম: নির্দেশিকা অনুযায়ী, শরীরের মোট ওজনের ৫% কমালেও উপকার পাওয়া যায়, তবে ১০% কমাতে পারলে ব্যথা কমা এবং জয়েন্টের কার্যক্ষমতা বাড়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি ভালো ফলাফল পাওয়া যায়।
• ধীরে ও সুস্থ উপায়ে ওজন হ্রাস: এটি কেবল ক্রাশ ডায়েট নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী লাইফস্টাইল পরিবর্তনের অংশ হতে হবে।
A. জয়েন্টের ওপর চাপ কমানো
হাঁটু এবং কোমরের ওপর শরীরের ওজনের একটি বড় প্রভাব থাকে।
• গবেষণায় দেখা গেছে, আপনি যদি ১ কেজি ওজন কমান, তবে প্রতিটি পদক্ষেপে আপনার হাঁটুর ওপর থেকে প্রায় ৪ কেজি চাপের সমান বোঝা কমে যায়।
• এই অতিরিক্ত চাপ কমে যাওয়ার ফলে কার্টিলেজ বা তরুণাস্থির ক্ষয় হওয়ার গতি ধীর হয়ে আসে।
B. প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন নিয়ন্ত্রণ (Reduction of Inflammation)
অস্টিওআর্থ্রাইটিস কেবল হাড়ের ঘর্ষণ নয়, এটি একটি প্রদাহজনিত রোগও বটে।
• শরীরের অতিরিক্ত চর্বি (Adipose tissue) থেকে কিছু রাসায়নিক পদার্থ (Cytokines) নিঃসৃত হয় যা শরীরে প্রদাহ তৈরি করে।
• ওজন কমানোর মাধ্যমে এই ক্ষতিকর রাসায়নিকের মাত্রা কমে আসে, ফলে জয়েন্টের ফুলা এবং ব্যথা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
C. ব্যথা উপশম ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন
ওজন কমানোর ফলে অস্টিওআর্থ্রাইটিস রোগীদের মধ্যে সাধারণত নিম্নোক্ত উন্নতিগুলো দেখা যায়:
• ব্যথা কমা: অনেক ক্ষেত্রে ওজন কমালে ব্যথানাশক ওষুধের ওপর নির্ভরতা কমে যায়।
• সহজে চলাফেরা: রোগী দীর্ঘসময় হাঁটতে পারেন এবং সিঁড়ি দিয়ে ওঠা-নামা সহজ হয়।
• অস্ত্রোপচারের সম্ভাবনা কমানো: ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকলে জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট সার্জারির প্রয়োজন অনেক পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।
3. ওষুধের ব্যবহার (Pharmacological Management)
ওষুধের ক্ষেত্রে NICE এখন বেশ সতর্ক। তাদের সুপারিশগুলো হলো:
• প্রথম পছন্দ (Topical NSAIDs): হাঁটুর ব্যথার জন্য খাওয়ার ওষুধের চেয়ে ব্যথানাশক জেল বা ক্রিম (যেমন- ডাইক্লোফেনাক জেল) ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
• দ্বিতীয় স্তর (Oral NSAIDs): জেল কাজ না করলে খাওয়ার ব্যথানাশক ওষুধ (NSAIDs) দেওয়া যেতে পারে, তবে তা অবশ্যই সবচেয়ে কম ডোজে এবং অল্প সময়ের জন্য। এই ওষুধের সাথে পেটের সুরক্ষার জন্য পিপিআই (PPI) বা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ দিতে হবে।
• যা করা যাবে না: রুটিনলি প্যারাসিটামল বা গ্লুকোসামিন (Glucosamine) ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়নি, কারণ এগুলোর কার্যকারিতার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এছাড়া শক্তিশালী ওপিঅয়েড (Strong Opioids) ব্যথার জন্য ব্যবহার না করতে বলা হয়েছে।
4. অন্যান্য থেরাপি ও ইনজেকশন
• ইনজেকশন: স্টেরয়েড ইনজেকশন কেবল স্বল্পমেয়াদী উপশমের জন্য এবং যখন অন্য কোনো উপায় কাজ করছে না, তখন বিবেচনা করা যেতে পারে।
• বর্জনীয়: আকুপাংচার (Acupuncture) বা ইলেক্ট্রোথেরাপি (যেমন- TENS) এখন আর অস্টিওআর্থ্রাইটিসের চিকিৎসার জন্য সুপারিশ করা হয় না।
5. সার্জারি বা জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট (Joint Replacement)
• যদি ব্যায়াম, ওজন কমানো এবং ওষুধ ব্যবহারের পরও জয়েন্টের ব্যথা রোগীর জীবনযাত্রার মানে (Quality of life) বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তবেই তাকে জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট বা হাঁটু/কোমর প্রতিস্থাপনের জন্য বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো উচিত।
• গুরুত্বপূর্ণ: রোগীর বয়স বেশি কিংবা ওজন অনেক বেশি—শুধু এই অজুহাতে কাউকে সার্জারির রেফারেল থেকে বাদ দেওয়া যাবে না।
গাইডলাইন অনুযায়ী মূল বার্তা
• সারাজীবনের অভ্যাস: ব্যায়ামকে সাময়িক কোনো কোর্স হিসেবে না দেখে জীবনের অংশ করে নিতে হবে।
• ব্যক্তিগত পরিকল্পনা: বয়স বা শারীরিক অবস্থা যাই হোক না কেন, সবার জন্যই উপযোগী ব্যায়াম রয়েছে।
• ওজন ও ব্যায়াম: ওজন কমানোর সাথে ব্যায়াম যুক্ত করলে তা দ্বিগুণ দ্রুত কাজ করে।
ডাঃ সোহেল আহমেদ, পিটি
স্পোর্টস ফিজিওথেরাপিস্ট
বিপিটি, এমপিটি ( স্পোর্টস), এমডিএমআর
স্পোর্টস ফিজিওথেরাপিস্ট, বুয়েট মেডিকেল সেন্টার
কনসালটেন্ট এন্ড ফাউন্ডার, আহমেদ ফিজিওথেরাপি এন্ড রিসার্চ সেন্টার