11/05/2026
আকাশ আজ অদ্ভুত প্রশান্ত। ভাগ্যিস জানালার পাশেই যাইনাবের পড়ার টেবিল। এখানেই বসে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে মন-প্রাণ খুলে কথা বলতে পারে। কারো কাছে নয়, তার রবের কাছে। কারণ সে জানে, ওই সাত আসমানের ওপরে, মহান আরশের উপর আছেন তার রব, যিনি সবকিছু শোনেন, দেখেন এবং জানেন।
“...কত স্পষ্টই না তিনি দেখেন, কত স্পষ্টই না তিনি শোনেন। তিনি ছাড়া তাদের আর কোনো অভিভাবক নেই...”
(সূরা কাহফ, আয়াত ২৬)
প্রতি শুক্রবার, ফজরের নরম আলোয়, সূরা কাহফ তিলাওয়াত করতে করতে এই আয়াতটিতে পৌঁছালে যাইনাবের অন্তর ভরে ওঠে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে—যেন সমস্ত অস্থিরতা থেমে যায়।
সপ্তাহের বাকি দিনগুলো যেন তাকে কাবু করে ফেলে—প্রতিদিনের ক্লাস, আইটেম, ওয়ার্ড ।
তার বুকের ভেতর প্রায়ই প্রশ্ন জাগে,
কী উদ্দেশ্য এই জীবনের?
কীসের পেছনে এই অবিরাম দৌড়?
“আমি জ্বিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদতের জন্য।” (সূরা যারিয়াত: আয়াত ৫৬)
কিন্তু এই বাস্তবতা, এই দুনিয়া কেন যেন সেই উদ্দেশ্যটাকেই আড়াল করে রাখে।
» সেদিন মেডিসিনের ফিমেল ওয়ার্ডে ক্লাস চলছিল।
বেডের চারপাশে ভিড়। ছেলে-মেয়ে মিলিয়ে একদল শিক্ষার্থী। পেশেন্টের উরু পর্যন্ত সতর উন্মুক্ত করে পরীক্ষা শেখানো হচ্ছিল। যাইনাবের চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। মুহূর্তেই তার মাথার ভেতর যেন এক অদৃশ্য শব্দ ঘুরতে লাগল—ভোঁ ভোঁ করে।
সে নিজেকে আর সামলাতে পারছিল না। মনে হচ্ছিল এই জায়গা থেকে এক দৌড়ে বের হয়ে যায়।
এটাই কি সেই চিকিৎসাব্যবস্থা, যেখানে মানুষের ইজ্জত, লজ্জা—সবচেয়ে নিরাপদ থাকার কথা?
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “লজ্জা ঈমানের একটি অঙ্গ।” (সহীহ বুখারী, ২৪)
আরেক হাদীস এসেছে, “তোমরা আল্লাহ তাআলাকে যথাযথভাবে লজ্জা করো।”
(তিরমিজি ২৪৫৮)
যাইনাবের হৃদয় যেন প্রশ্ন করে ওঠে, আজ কোথায় সেই লজ্জা? কোথায় সেই সম্মান, যা ইসলাম নারীদের দিয়েছে?
“ইশ! যদি এই সেক্টরেও শরীয়াহর সৌন্দর্য প্রতিফলিত হতো...”
রুমে ফিরে এসে তার মন ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে।
দুনিয়াটা যেন তার চোখে হঠাৎ খুব অপরিচিত মনে হয়।
» “আচ্ছা, এই অবস্থার পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব?”
এই প্রশ্নটা আর তাকে ছাড়ে না।
বাইরে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
দমকা হাওয়ায় বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়ছে তার পড়ার টেবিলে।
সে আকাশের দিকে তাকিয়ে তার রবের সাথে কথা বলতে শুরু করে। নিঃশব্দে, গভীরভাবে, ভেঙে পড়া এক অন্তর নিয়ে দুআ করে।
যাইনাব জানে ইয়াশফীন হাসপাতালের কথা।
একটি স্বপ্ন, একটি সম্ভাবনা, একটি বীজ।
সে দুআ করে, এই দেশের প্রতিটি জেলায় যেন এমন হাসপাতাল গড়ে ওঠে। যেখানে একজন বোন তার অসুখ বলতে সংকোচ বোধ করবে না। যেখানে চিকিৎসা হবে সম্মান রক্ষা করে।
সে দুআ করে, যারা এই কাজের সাথে যুক্ত, তাদের মেহনত, অশ্রু, দুআ সব যেন কবুল হয়।
তার মনে পড়ে, বীজ বপন করা মানে শুধু আজকের জন্য না, বরং ভবিষ্যতের জন্য।
আজ একটি বীজ
আগামীকাল একটি গাছ,
একশ বছর পর—একটি বন।
সেও চায় একটি বীজ বপন করতে। হয়তো এর ফল সে দেখে যেতে পারবে না। কিন্তু আজ থেকে ১০০ বছর পর ঠিকই তা দিগ্বিদিক ছড়িয়ে পড়বে।
যখন জীবনের সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়, যখন এ জীবনের উদ্দেশ্য ঝাপসা হয়ে আসে
সে নিজেকে মনে করিয়ে দেয়—
হয়তো সে কারো দুআর উত্তর।
“আর যখন আমার বান্দারা তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, আমি তো নিকটবর্তী...”
(সূরা বাকারা: আয়াত ১৮৬)
এই পৃথিবীতে তার আগমন অর্থহীন নয়। তার রব তাকে উদ্দেশ্যহীন সৃষ্টি করেননি। সে যে এই পৃথিবীতে তার রবের খলিফা।