07/12/2025
সব দোষ ভাতের
পর্ব -০১
আমাদের অঞ্চলে ধান চাষ কবে শুরু হয়েছে জানেন? আজ থেকে নয় হাজার বছর পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশে ধানের চাষ শুরু হয়।ভারতের উত্তর প্রদেশের লাহুরাদেওয়া নামক স্থানে খিস্টপূর্ব ৭০০০-৮০০০সালের পুরনো ধানের দানা ও খোসার চিহ্ন পেয়েছিলো। গঙ্গা নদীর উপত্যকায় খিস্টপূর্ব ৬০০০-৫০০০সাল থেকেই নিয়মিত ধান চাষ হতো।আগে মনে করা হতো হরপ্পা সভ্যতার শহরগুলোতে শুধু গম-যব চাষ হতো কিন্তু এখন প্রমাণিত যে খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০-১৯০০ সাল নাগাদ সেখানেও অনেক ধান চাষ হতো এবং ইট বানানোর জন্য ধানের খোসা ব্যবহৃত হতো।
এই অঞ্চলের মানুষ গঙ্গার তীরে বুনো ধান দেখতে পেয়ে প্রথমে শুধু কুড়িয়ে খেতো। এরপর তারা ধান বীজ বুনে জন্মানোর চেষ্টা করে ও সফল হয়। তাই এই অঞ্চলেই ধানের প্রথম চাষ আরম্ভ হয়।
আমাদের এখানকার বুনো ধান থেকে প্রথম যে ধান তৈরি হল ,সেটা ছিল লম্বা সরু দানার ,যেটা ইন্ডিকা ধানের আদি রূপ।তারপর অনেক পরে চীনের গোল মোটা জাপোনিকা ধানের সঙ্গে মিশে গিয়ে বর্তমানের ইন্ডিকা ধান(বাসমতী,সোনা মসুরি,গোবিন্দভোগ ইত্যাদি)এর স্বাদ আর চেহারা পেল।
ঋগবেদের শ্লোকে ব্রীহি দ্বারা ধানকে বুঝিয়েছে।এছাড়াও অর্থববেদ,শতপথ ব্রাহ্মণ এইসব গ্রন্থেও ধান বোনা,কাটা,মাড়াই করার মত বিষয়গুলোর নিয়ম-কানুন লেখা আছে। মৌর্যযুগে গ্রিক দার্শনিক মেগাস্থিনিস লিখেছেন এই দেশের মানুষ দিনে দুই বার ভাত খায়।আর কৌটিল্য অর্থশাস্ত্রে উল্লেখ আছে ধানই রাজ্যের সবচেয়ে বড় ফসল আর সবচেয়ে বেশি কর আসে ধান থেকে।এত কিছু লেখার কারণ হচ্ছে আমাদের সঙ্গে ধানের সম্পর্ক কত পুরাতন তা জানানো। আমাদের পূর্বপুরুষরা যে ভাত খেয়েই টিকে ছিলো এই বিষয়টা বোঝানো।
আমাদের মুখের লালায় একটা এনজাইম আছে যেটার নাম অ্যামাইলেজ। এই এনজাইমটি ভাত রুটি খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্টার্চতে গ্লুকোজে ভাঙতে আরম্ভ করে।এই এনজাইম তৈরির কারখানা হলো AMY1 নামের একটি জিন।যার তেহে যত বেশী AMY1 জিনের কপি ,তার দেহ তত বেশী এনজাইম উৎপন্ন করতে পারে এবং ভাত সহজে হজম করতে পারে।
আমাদের অঞ্চলের মানুষেরা ১১০০০ বছর ধরে ভাত খাচ্ছে ,তাই আমাদের দেহে AMY1 জিনের কপি বেড়ে গিয়ে ৮-১০ টা হয়ে গেছে।কিন্তু যারা কম শর্করা খেয়েছে (যেমন- উত্তর মেরুর ইনুইটরা শুধু মাছ মাংস চর্বি খায়) তাদের দেহে AMY1জিনের কপি মাত্র ২-৪ টা। দেখা যাচ্ছে আমরা জন্ম গ্রহণ করি ভাত হজমের সুপারপাওয়ার নিয়ে।
ভাত খাওয়ার কারণে আমাদের দাঁতের আকারও বদলে গেছে।দক্ষিণ এশীয়দের দাঁত গোঁড়া থেকে একটু ছোট আর চ্যাপ্টা ধরণের হয়ে গেছে কারণ ভাত চিবোতে বেশী জোর লাগে না। অন্যান্য কৃষি প্রধান অঞ্চলের জন্যেও এটা সত্য।
যারা ভাত-খোর তাদের অন্ত্রে Prevotella(প্রিভোটেল্লা) আর Ruminococcus( রুমিনোকক্কাস) নামের দুইটি ব্যাকটেরিয়ার গোষ্ঠী আছে ,ইউরোপের মানুষদের তুলনায় ৫-১০ গুণ বেশী থাকে।এই দুই দলই স্টার্চ ফাইবার ভাঙ্গার সুপার এক্সপার্ট ,অর্থাৎ ভাত রুটি শাকসবজি এরা দিবি্য হজম করে ফেলতে পারে।
ভাতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এতটা গভীর যে অনেক ধরণের খাদ্য গ্রহণের পরও যদি অল্প ভাত না খাওয়া হয় ,আমাদের মন ভরে না ,অস্থির লাগে।এর পিছনেও রয়েছে জৈবিক কারণ। ভাত খাওয়ার ফলে ইনসুলিন বেড়ে ট্রিপটোফ্যান মস্তিষ্কে যায় ,ফলে সেরোটোনিন বাড়ে।সেরোটোনিন হলো মন ভালো রাখার হরমোন।যখনই আমরা ভাত খাই ,তার ৩০-৪০ মিনিট পরই মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের ঝড় ওঠে,মন হঠাৎ হালকা ,শান্ত ও তৃপ্ত হয়ে যায়।গবেষণায় দেখা যায় ,যারা ছোটবেলা থেকে ভাত খেয়ে বড় হয়েছে ,তাদের মস্তিষ্কের সেরোটোনিন রিসেপ্টর ভাতের শর্করার প্রতি বেশি সংবেদনশীল থাকে।
আমরা যখন দুপুরে ভাত,ডাল ,মাছের তরকারি খাই বা ভাতের সঙ্গে অন্য কোন আইটেম ,তখন পেট ভরার সঙ্গে সঙ্গে চোখও ঢুলতে আরম্ভ করে।এটা আসলে অলসতা না, এটা আমাদের শরীরের পুরোনো অভ্যাস ,যেটা ১১০০০ বছর ভাত খাওয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছে।ভাত খাওয়ার পরই রক্তে স্যুগার বেড়ে যায়,তখন অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নিঃসৃত হয় এবং দেহে একটা গোপন মুইচ অন হয় যেটার নাম প্যারাসিম্প্যাথেটিক সিস্টেম।এই সুইচ চালু হলে শরীর আরাম মুডে চলে যায়। হৃদস্পন্দন হ্রাস পায়,হজমের গতি বাড়ে আর মিষ্টি ঘুমের ভাব চলে আসে।
জাপানিজ, চাইনিজ ,থাই ও ভিয়েতনামিরাও একই কারণে দুপুরে ভাত খেয়ে একটু ঘুমোয়। বাঙালির দুপুরের ভাত খাওয়ার পরের ঘুমের নাম”ভাত ঘুম”।তালিম তেলগু কন্নড়ে বলা হয় অন্নম খেয়ে ১৫-২০ মিনিটের থুক্কু তুক্কু।জাপানিজরা বলে গোহান(ভাত) খেয়ে ইনেমুরি।ইনেমুরি অর্থ অফিসেই ঘুম।চাইনিজরাও “উ ফান বা দুপুরের ঘুম”নেয় ভাত খাওয়ার পর। গবেষণায় দেথা গেছে ,যারা দুপুরে রুটি স্যান্ডউইচ সালাদ খায় তাদের রক্তের স্যুগার তত বাড়ে না ফলে তাদের তন্দ্রা ভাব আসেনা তাই দিব্যি কাজ করে যেতে পারে। বলা যেতে পারে আমাদের পূর্বপুরুষগণ দুপুরে ভাত খেয়ে আরাম করে শুয়েছে তাই সেটা আমাদের রক্ত-মগজে গেঁথে গেছে।
দেখা যাচ্ছে ভাত আমাদের হাজার বছরের পুরাতন খাবার এবং জেনিটিকভাবে আমরা স্টার্চ ভিত্তিক খাবার হজমে অভিযোজিত কিন্তু আধুনিক সময়ে ডায়াবেটিকস,স্থূলতা,হার্টের সমস্যাসহ বিভিন্ন Non-communicable রোগের জন্য ভাত গ্রহণকে দায়ী করা হচ্ছে।কিছু লোকের কথা শুনলে মনে হয় ভাত খেয়ে লোকজন পাপ করতেছে। আর ভাত বাদ দিতে বলা কোন বাস্তবসম্মত কথা না। আমাদের জানতে হবে আমাদের পূর্বপুরুষগণ কীভাবে ভাত খেয়েও সুস্থ ছিলেন,কোন পদ্ধতি অনুসরণ করে ভাত থেকে ভাল পুষ্টি পাওয়া সম্ভব।
পরের পর্বে আরও বিস্তারিত আলোচনা হবে। লেখাটি শেয়ার দিয়ে পাশে থাকুন
লেখক: Probal Kumar Mondal
#ভাত