15/01/2026
মাথা ব্যাথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর গতকাল সকালে মৃত্যুবরণ করেছেন সরকারের একজন কর্মকর্তা । বয়স তাঁর কত হবে ? ধারণা করছি ৩৭ বা ৩৮ বৎসর হবে । এর চেয়ে বেশি নয় । হঠাৎ মৃত্যুর অনেক কারণ থাকলেও মানুষের সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটে হার্ট অ্যাটাক বা ব্রেন স্ট্রোকে । যাদের বয়স ৩০-এর আশেপাশে, তারা মনে করেন তাদের তেমন কোনো অসুখ বিসুখ হবে না । Evidence based medicine-এর ফলে আমরা জানতে পেরেছি, ৩০-এর আশেপাশে বয়সী নারীদের মধ্যে গর্ভজনিত জটিলতা, রক্তক্ষরণ এবং পুরুষদের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা তাদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলেও তাদের মধ্যে হার্ট এটাক এবং ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার হার একেবারে কম নয় ।
এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী ?
সুস্থ সুন্দর জীবন যাপন করার জন্য আজকাল জীবনাচরণের পরিবর্তন বা লাইফ স্টাইল মডিফিকেশন (Life style Modification) কে খুব গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ।
এগুলোর মধ্যে গুরুত্বের দিক দিয়ে ক্রমশ উপরে উঠে আসছে ঘুম । ঘুম মানে সুনিদ্রা (Sound sleep) । আরামদায়ক বিছানায়, নরম বালিশে লাইট নিভিয়ে গভীর ঘুম...... । সুনিদ্রা (Sound sleep) মানুষের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে, উচ্চ রক্তচাপ কমায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, মেজাজ ফুরফুরে রাখে, আচরণ ভাল রাখে । সুনিদ্রার অভাবে ব্লাড প্রেসার ও ডায়াবেটিস বৃদ্ধি পায় । রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে । মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকে, আচরণ খারাপ হয়, খাবার হজম ও পরিপাকে বিঘ্ন ঘটে, Cellular aging বাড়ে, দেহ-কোষ বুড়ো হয়ে যায় । ফলে অকালে বার্ধক্য আসে । আয়ু কমে ।
২য় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগহীন জীবন ।
ঘুমের অভাবে মানুষের শারীরিক ও মানসিক যে ক্ষতিগুলো হয়, উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা মানুষের সবগুলো ক্ষতি করে । একই বিষয় হওয়ায় লাভ ক্ষতিগুলোর আর পুনরাবৃত্তি করলাম না । ঝগড়াটে এবং বিষাক্ত আচরণের মানুষ থেকে দূরে থাকতে হবে । তাদের কথা এবং আচরণ অন্যদের মনঃকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায় । এ থেকে ব্লাড প্রেসার এবং ডায়াবেটিস বাড়তে পারে ।
৩য় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল শারীরিক পরিশ্রম / ব্যায়াম । সুনিদ্রার ফলে যে উপকারের কথা লিখেছি, শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করলেও সেই একই উপকার হয় ।
৪.
সুষম ও পুষ্টিকর খাবার (Balanced and Nutritious diet)।
খাবার গ্রহণের সময় আমরা এর স্বাদের কথা ভাবি । কিন্তু পুষ্টিবিদগণ বলেন, খাবার খাওয়ার সময় এর পুষ্টিমানের কথা ভাবুন । খাবার খাওয়ার আগে এর পুষ্টিমান কী, এর ভাল ও মন্দ দিকগুলো কী কী—সে কথা ভাবতে হবে । প্রতিদিন প্রয়োজনীয় পরিমাণ ভিটামিন ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট (Micronutrient) গ্রহণ করতে হবে । এগুলোর অভাবে শরীরে নানা রোগ বাসা বাঁধে ।
চিনি (মিষ্টি), চর্বি, বাড়তি লবণ—এগুলোকে এখন শত্রুজ্ঞান করতে বলা হচ্ছে । যে খাবার আপনি খাবেন, তাতে বাড়তি চিনি বা লবণ থাকতে পারবে না ।
৫.
সুশৃঙ্খল জীবন যাপন (Discipline)
খাবার গ্রহণ, ঘুম, ঘুম থেকে জাগা, কাজ, বিশ্রাম, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা—এ সব ক্ষেত্রে অবশ্যই সুশৃঙ্খল হওয়া প্রয়োজন । বিশৃঙ্খল জ্জীবন যাপন করে দীর্ঘায়ু জীবন তো পাওয়া যাওয়াই না, নীরোগ দেহও পাওয়া যায় না ।
৬.
ওজন নিয়ন্ত্রণ
প্রত্যেক বয়স এবং উচ্চতার একটি ষ্ট্যাণ্ডার্ড ওজন আছে । এর চেয়ে বেশী ওজন হলেই নানা রোগ ডেকে নিয়ে আসে । ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, আরথ্রাইটিস, জিইআরডি-সহ নান অসুখ । এর পরিণামস্বরূপ অল্প বয়সে মৃত্যু ।
৭.
সুস্থ থাকতেই নিয়মিত মেডিক্যাল চেক আপ করা
উন্নত বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ৪০ বৎসর হওয়ার সাথে সাথে বেশ কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে উপদেশ দেওয়া হয় । এর অর্থ, রোগ হওয়ার আগেই রোগ প্রতিরোধ করা । যেমন ধরুন, ব্লাড প্রেসার, রক্তে গ্লুকোজ ও চর্বির পরিমাণ নির্ণয়, ইউরিক এসিডের মাত্রা, হার্ট, কিডনি ও চোখের জন্য কিছু পরীক্ষা । আমাদের দেশে যদি কাউকে এ ধরণের স্ক্রিনিং পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ ভুল বুঝবে । মনে করবে, অর্থ প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো হচ্ছে ।
বাঞ্ছারামপুরের ইউএনও-র মৃত্যুর কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে, তিনি মাথা ব্যথায় ভুগছিলেন । সরকারের একজন অত্যন্ত দায়িত্বশীল কর্মকর্তা—যার উপর বহু ধরণের কাজের চাপ থাকে, তার মাইগ্রেন হওয়াই স্বাভাবিক । এর সাথে থাকতে পারে টেনশন জনিত মাথা ব্যাথা । আমি মনে করি, জেলা এবং উপজেলার অফিস প্রধানদের কাজের পরিমাণ কমানো উচিত । অপ্রয়োজনীয় প্রটোকল প্রদানও শান্তি ও বিশ্রামের প্রতিকূল ।
যে কথাটা আগে বলেছি, হঠাৎ মৃত্যুর বড় কারণ ব্রেন স্ট্রোক (মস্তিষ্কের একেবারে ভেতরে যেখানে ব্রেন স্টেম আছে, সেখানে রক্তক্ষরণ হওয়া), সাব-অ্যারাকনয়েড হিমোরেজ এবং হার্ট অ্যাটাক । এ থেকে বাঁচতে হলে কাজের চাপ কমাতে হবে । দুশ্চিন্তামুক্ত জীবন যাপন করতে হবে । রাত ৯টার পর পরই ঘুমাতে হবে । ঘুমের আদর্শ সময় হল রাত ৯টা থেকে ভোর ৪টা । রাত জেগে টিভি দেখা, টক শো শোনা, আড্ডা দেওয়ার মধ্যে কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণই বেশি ।
Zainal Abedin Tito