09/04/2026
হবিট: শরীরের ভেতরে 'জীবন্ত ফার্মেসি'
কল্পনা করুন, আর কোনো দিন সকালে উঠে ওষুধের বাক্স খুলতে হবে না। ডায়াবেটিস, এইচআইভি বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগের জন্য প্রতিদিন ইনজেকশন নিতে হবে না। শরীরের ভেতরে বসানো একটি ক্ষুদ্র যন্ত্র নিজেই ওষুধ তৈরি করে রক্তে ছেড়ে দেবে। ঠিক যখন দরকার, ঠিক যতটুকু দরকার!
এই কল্পনাকে প্রায় বাস্তবে রূপ দিয়েছে একটি নতুন গবেষণা। আমেরিকার তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা মিলে তৈরি করেছেন হবিট (HOBIT) নামের একটি ইমপ্ল্যান্ট, যার ভেতরে আছে জীবন্ত কোষ।
এবং সেই কোষগুলিই শরীরের ভেতরে বসে ওষুধ তৈরি করে। গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে চলতি বছরের ২৭ মার্চ।
একটি চুইংগামের আকারে তিনটি ওষুধ
হবিট দেখতে একটি ভাঁজ করা চুইংগামের মত। ত্বকের নিচে বসিয়ে দেওয়া যায়, কোনো বড় অস্ত্রোপচার লাগে না।
ভেতরে থাকে তিনটি অংশ: জেনেটিকভাবে পরিবর্তিত কোষ রাখার প্রকোষ্ঠ (একটি বিশেষ ঘর বা পাত্র যেখানে ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা কৃত্রিম বা পরিবর্তিত জীবন্ত কোষগুলdকে রাখা হয়), একটি ক্ষুদ্র অক্সিজেন উৎপাদক এবং ওষুধের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের জন্য ওয়্যারলেস ইলেকট্রনিক্স।
নামটি কাকতালীয় হলেও বিষয়টি বেশ কৌতূহল জাগানিয়া। ব্রিটিশ লেখক জে. আর. আর. টোলকিনের বিশ্বখ্যাত উপন্যাস 'দ্য হবিট'-এ হবিটরা ছোটখাটো, নিরীহ দেখতে এক জাতি। কিন্তু যে অসাধ্য সাধন বড় বড় বীরেরা করতে পারেনি, তারা সেটা করেছিল।
এই ইমপ্ল্যান্টটিও ঠিক তেমন, চুইংগামের মত ছোট। কিন্তু যে কাজ বড় কোনো কারখানা, হাসপাতাল বা ওষুধের বাক্স পারেনি, এই চুইংগাম সেটা করছে।
ইঁদুরের ওপর পরীক্ষায় দেখা গেছে, হবিট একসঙ্গে তিন ধরনের ওষুধ তৈরি করতে পারে। এইচআইভি প্রতিরোধী একটি অ্যান্টিবডি, ক্ষুধা ও বিপাক নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন লেপটিন এবং ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি ওষুধ, যা ওজেম্পিকের মত একই শ্রেণির।
ওষুধগুলির মেয়াদ খুব কম হওয়া সত্ত্বেও হবিট প্রযুক্তি সেগুলিকে শরীরে এক মাস পর্যন্ত সক্রিয় এবং কার্যকর রাখতে পেরেছে। যার ফলে বার বার ওষুধ নেওয়ার ঝামেলা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
যে সমস্যাটি আগে সমাধান হয়নি
এই ধরনের 'জীবন্ত ফার্মেসি'র ধারণা নতুন নয়। কিন্তু বরাবর সমস্যা একটাই ছিল—কোষ বাঁচে না।
সমস্যাটা শুধু যন্ত্র বা শুধু টেকনিক্যাল বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর ফলে বড় ধরনের ক্ষতি বা বিপদ হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের একটি বড় অংশ নিয়মিত ওষুধ খান না। কেউ ভুলে যান, কেউ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় বিরক্ত হন, কেউ খরচ সামলাতে পারেন না।
এর পরিণতিতে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন বা মারা যান। ইমপ্ল্যান্ট এই সমস্যার মূলেই আঘাত করে। রোগীকে আর মনে রাখতে হয় না। ইমপ্ল্যান্ট রোগীর ভুলে যাওয়ার সমস্যার সমাধান করে।
কিন্তু এখানেও বাধা ছিল। কোষ বাঁচাতে অক্সিজেন চাই। ছোট ইমপ্ল্যান্টের ভেতরে অনেক কোষ একসাথে থাকলে অক্সিজেনের টানাটানি শুরু হয়, কোষ মরতে থাকে, ওষুধ উৎপাদন কমে যায়। আগের যন্ত্রগুলি এক সপ্তাহের মধ্যেই ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছিল।
হবিটের বিজ্ঞানীরা এর সমাধান করেছেন অভিনব উপায়ে। ডিভাইসটি নিজেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করে পার্শ্ববর্তী পানির অণু ভেঙে সরাসরি অক্সিজেন তৈরি করে। ঠিক যেখানে কোষগুলি আছে, সেখানেই। নতুন এই পদ্ধতিটি ব্যবহার করে আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ কোষ এক জায়গায় রাখা সম্ভব হয়েছে।
এক মাস পরে হবিটের ৬৫ শতাংশ কোষ জীবিত ছিল। পুরনো পদ্ধতিতে মাত্র ২০ শতাংশ কোষ জীবিত থাকত।
তিন বিজ্ঞানীর গল্প
এই প্রকল্পের নেতৃত্বে আছেন তিনজন গবেষক।
জোনাথান রিভনে বায়োইলেকট্রনিক্স ও কোষ-প্রকৌশলের সংযোগে কাজ করেন। রিভনের ল্যাবরেটরি আমেরিকার সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ প্রজেক্টে কাজ করছে, যেখানে তারা মানুষের শরীরের ভেতরে বসানোর মত একটি ছোট্ট ইলেকট্রনিক যন্ত্র (ইমপ্ল্যান্ট) তৈরি করছে যা মানুষের ঘুমের সময় নিয়ন্ত্রণ করবে। হবিটে তিনি ডিভাইস উন্নয়নের দায়িত্বে ছিলেন।
ওমিদ ভেইসেহ ল্যাবরেটরিতে আবিষ্কৃত নতুন কোনো চিকিৎসা পদ্ধতিকে কীভাবে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রির উপযোগী বা ওষুধের দোকানে পাওয়ার মত পণ্যে রূপান্তর করা যায়, তা নিয়ে কাজ করেন।
তিনি একাধিক বায়োটেক কোম্পানি তৈরি করেছেন এবং গেটস ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে এইচআইভি ও ম্যালেরিয়ার জন্য দুই বছরের বেশি মেয়াদি ইমপ্ল্যান্ট তৈরির কাজ করছেন।
জাহি কোহেন-কার্নি ন্যানোপ্রযুক্তি ও জীববিজ্ঞানের সংযোগে কাজ করেন। ইসরায়েল থেকে পড়াশোনা শুরু করে হার্ভার্ড থেকে পিএইচডি এবং এমআইটিতে গবেষণার পর এখন কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।
বানরের শরীরেও নিরাপদ
মানুষের শরীরে প্রয়োগের আগে প্রাইমেটের ওপর পরীক্ষা চালানো নতুন চিকিৎসা প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। মানুষ ও বানরের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা অনেকটা একই রকম। তাই এখানে নিরাপদ প্রমাণিত হলে মানুষের ক্ষেত্রেও সম্ভাবনা বাড়ে।
সাত বছর বয়সী একটি পুরুষ বানরের শরীরে কোষবিহীন ডিভাইসটি বসানো হয়। এক মাস পর বের করে দেখা গেল, কোনো বড় প্রতিক্রিয়া নেই, কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই।
রিভনে বলেছেন, "বায়োইলেকট্রনিক্স এবং কোষ চিকিৎসা একই প্ল্যাটফর্মে কাজ করতে পারে। এটা আমরা এখন সত্যিই দেখতে পাচ্ছি। প্রযুক্তি আরও পরিপক্ব হলে এ ধরনের ডিভাইস শরীরের ভেতরে প্রোগ্রামযোগ্য ওষুধ কারখানা হয়ে উঠবে।"
এরপর কী হবে
হবিট এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। মানুষের শরীরে প্রয়োগের আগে আরও বড় প্রাণীতে পরীক্ষা দরকার। তবে পথ খোলা।
গবেষকরা লিখেছেন, "এই নতুন পদ্ধতিটি ভবিষ্যতে শরীরের যেকোনো নির্দিষ্ট রোগ খুঁজে বের করে ঠিক সেই জায়গার অসুস্থ কোষগুলিকে সুস্থ করার জন্য ব্যবহার করা যাবে।" পরবর্তী লক্ষ্য, অগ্ন্যাশয়ের কোষ প্রতিস্থাপন করে ডায়াবেটিস রোগীদের শরীরে ইনসুলিন উৎপাদন ফিরিয়ে আনা। টাইপ-১ ডায়াবেটিসে অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন-উৎপাদনকারী কোষগুলি নষ্ট হয়ে যায়।
হবিট সেই কোষ বহন করে শরীরের ভেতরে রাখতে পারলে—এবং সেগুলি দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখতে পারলে—এটি ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে।
চিকিৎসার ভবিষ্যৎ
হবিট যদি একদিন মানুষের শরীরে সফলভাবে কাজ করে, তাহলে চিকিৎসা অনেকটাই বদলে যাবে।
ডায়াবেটিস, স্থূলতা, ক্যান্সার বা এইচআইভি—এই রোগগুলিতে প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে ওষুধ খেতে হয়, ইনজেকশন নিতে হয়। একটি ছোট ইমপ্ল্যান্ট সেই পুরো ঝামেলা দূর করে দিতে পারে।
বার্ধক্যজনিত (বয়স বেড়ে যাওয়ার কারণে যা হয়) রোগের ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা বিশাল: প্রদাহ, বিপাক ও কোষ ক্ষয়, এই তিনটি প্রক্রিয়াকে একই সময়ে একটি ডিভাইস দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে।
আরও দূরের ভবিষ্যতে এই ডিভাইসগুলি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও শরীরের ভেতরের সেন্সরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজেই বুঝবে কখন কতটুকু ওষুধ দরকার। চিকিৎসা তখন আর রোগীর মনে রাখার বিষয় থাকবে না—শরীর নিজেই সেরে উঠবে, নিজের মত করে।