11/12/2025
বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে আশার পথে: সিংগুর পুঞ্জির নারীদের গল্প
মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলা, সবুজে ঘেরা পাহাড়, হাওর আর চা-বাগানের এক মনোরম অঞ্চল। এই উপজেলার বরমচাল ইউনিয়নের কোলে অবস্থান খাসিয়া জাতিগোষ্ঠীর সিংগুর পুঞ্জি। দেখতে ছবির মতো সুন্দর হলেও, এই জনপদের মানুষের জীবনযাত্রা চলে এক কঠিন বাস্তবের পথে, যে পথ মেঠো, পিচ্ছিল এবং বাঁশের নড়বড়ে সাঁকোয় বিভক্ত।
এই দুর্গমতার মাঝেও পুঞ্জির নারীরা দৃঢ়তার সঙ্গে ধরে রেখেছেন আশার মশাল, ২০০৮ সালে তারা প্রতিষ্ঠা করেন ‘বানিয়া ট্রেইলাং সমিতি’। দীর্ঘ চার বছর পর ২০১২ সালে সমিতিটি নিবন্ধিত হয়, তার আগে থেকেই সমিতির সদস্যরা পুঞ্জি এবং পুঞ্জির বাইরের মানুষদের জন্য এক নিরলস সামাজিক যুদ্ধে নেমেছেন।
নির্যাতিত নারীদের পাশে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে সেলাই প্রশিক্ষণ, বাল্যবিবাহ রোধে উঠানবৈঠক, এমনকি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবার বিতরণ এবং নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য ঋণদান, সবকিছুই সামলাচ্ছেন তারা।
এই সমিতিরই একজন সদস্য মেরী ধার। এই পুঞ্জির মানুষের সবথেকে বড় সমস্যা ছিল একটি পাকা রাস্তার অভাব। তিনি জানেন, কেবল অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হওয়াই মুক্তি নয়; মুক্তির জন্য প্রয়োজন সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা।
বর্ষায় যখন মেঠোপথ কাদায় ডুবে যায়, তখন এই পুঞ্জি কার্যত বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ব্যবসার পণ্য বাজারে নেওয়া যায় না, শিশুরা নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না, এবং অসুস্থ রোগীদের কষ্ট তখন অসহনীয় হয়ে ওঠে। সবচেয়ে করুণ পরিস্থিতি হয় প্রসূতি মায়েদের। প্রসবের ব্যথা নিয়ে যখন বাঁশের সাঁকো পার হতে হয়, তখন প্রতিটি মুহূর্তে জীবন হাতে নিয়ে চলতে হয়। এই ঝুঁকি এড়াতে অনেক পরিবারকে বাধ্য হয়ে প্রসবের নির্ধারিত সময়ের অনেক আগে থেকে হাসপাতালের কাছাকাছি কুলাউড়া শহরে বা সিলেট সদরে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে বাসা ভাড়া নিতে হয়।
এই মানবিক সংকট আর অর্থনৈতিক বোঝা থেকে মুক্তি পেতে পুঞ্জির প্রধানরা বারংবার স্থানীয় প্রশাসনের কাছে রাস্তার আবেদন করে আসছেন। তারা আবারো পুঞ্জির সকল মানুষের পক্ষ থেকে কুলাউড়ার উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও), জনাব মো: মহিউদ্দিনের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দিলেন, একটি পাকা রাস্তার জন্য, যে রাস্তা হবে জীবনের সঙ্গে সংযোগের সেতু।
আবেদন গৃহীত হওয়ার পর যখন ইউএনও মহিউদ্দিন তাদের কালভার্ট তৈরির বিষয়ে আশ্বস্ত করলেন, তখন সিংগুর পুঞ্জির চোখে মুখে এক নতুন আলোর ঝলক দেখা গেল। কালভার্ট মানে বর্ষার জলের তোড়ে আর সাঁকো ভেঙে যাওয়ার ভয় থাকবে না, মাটির রাস্তা পাকা হওয়ার প্রথম ধাপ।
যদিও পূর্ণাঙ্গ রাস্তার জন্য সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি, তবুও এই আশ্বাস মেরী ধার এবং তাঁর সমিতির জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। কারণ, তাদের কাছে শুধু রাস্তা নয়, এই উদ্যোগটি হলো পরিবর্তনের প্রতি সরকারের অঙ্গীকারের প্রমাণ।
“আমাদের গ্রামে আগে অনেক বাল্যবিবাহ হতো, এখন আমাদের সংগঠনের কারণে কম বাল্যবিবাহ হয়,” হাসিমুখে বলেন মেরী ধার। “উঠানবৈঠকের মাধ্যমে আমরা বাচ্চাদের শিক্ষার দিকে উৎসাহিত করে থাকি, এবং বিভিন্ন নারী আমাদের সেলাই প্রশিক্ষণ পেয়ে আজ উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন।”
বানিয়া ট্রেইলাং সমিতির যৌথ প্রচেষ্টা প্রমাণ করে, পরিবর্তন শুরু হয় ঘর থেকেই। কাঙ্ক্ষিত রাস্তা একদিন হবেই, তবে ততদিন পর্যন্ত, এই সাহসী নারীরা কেবল বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে নয়, নিজেদের স্বপ্নের পথে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যাবেন, এক নতুন, আলোকিত বরমচাল ইউনিয়নের স্বপ্ন নিয়ে।
🔹 নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ) একটি উন্নয়নমূলক কর্মসূচি, যা সুইজারল্যান্ড এবং গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা (জিএসি)-এর অর্থায়নে, জিএফএ কনসালটিং গ্রুপ দ্বারা পরিচালিত।
এই কর্মসূচির আওতায় ডিনেটতাদের ‘নাগরিক সমন্বয়’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
প্রগতি সমাজ উন্নয়ন সংস্থা (PSUS), জনকল্যাণ কেন্দ্র (JKK), নিঃস্ব সহায়ক সংস্থা (NSS), এবং প্রচেষ্টা—DNET- এর এই চারটি অসাধারণ অংশীদার সংগঠন সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে।