01/05/2026
(১) মিতু বরাবরই ঝামেলা এড়িয়ে চলা মানুষ। ওর হিসাবে, জীবন হতে হবে পানির মতো সোজা। কোনোকিছুতে বেশি প্যারা নিতে রাজি না মিতু। অবশ্য একটা ক্ষেত্রে মিতু নিজের এই সূত্র থেকে যোজন যোজন সরে এসেছে। নিজের ক্যারিয়ারের চিন্তায় মিতু বরাবরই রিস্ক টেকিং এবং অ্যাডভেঞ্চারাস। ভীষণ পরিশ্রমী মিতু নিজের জবের ক্ষেত্রে কখনোই অল্পে তুষ্ট নয়। ওর লক্ষ্য থাকে কীভাবে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সম্পন্ন করা যাবে। সবাই যেখানে ফাঁকফোকর খোঁজে, মিতু সেখানে অফিস আওয়ারের আরও আধ ঘণ্টা আগে থেকেই নিজের ডেস্কে গিয়ে ফাইলপত্র গুছিয়ে নেয়। এত ডেডিকেশনের কারণে সমসাময়িক অনেককে টপকে মিতু খুব দ্রুতই উচ্চপদস্থ কর্মীদের দলে নিজের নাম লিখিয়ে নেয়।
অফিসে ওর প্রমোশন হয় ঠিক দু বছরের মাথায়, এবং সত্যিই ও এর যোগ্য হকদার। প্রচণ্ড খেটেছে মিতু। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে প্রতিটা ক্লায়েন্ট মিটিং এর প্রিপারেশন নিয়েছে। এমনকি গর্ভকালীন কোনো ছুটিও নেয় নি।
হ্যাঁ, মিতু প্রেগনেন্ট। বিয়ের পর প্রথম চার বছর ও এবং রাতুল, মানে মিতুর বর, দুজনের কেউই বাচ্চা নিতে চায় নি। ওরা চেয়েছিল দুজন মিলে কাপল লাইফটা এনজয় করবে। এর মাঝে মিতু খুব ভালো একটা জব পেয়ে যায়। আর সেদিকে ফোকাস করতে গিয়ে আরো ফ্যামিলি প্ল্যানিং এ আরো দু বছর দেরি হয়। তবে এখন মিতু প্রেগনেন্ট আর কিছুদিন পরেই ওর বেবি হওয়ার ডেইট।
ডক্টরের কাছে রুটিন চেক আপের সময় সব জেনে নেয় রাতুল আর মিতু। আল্ট্রাসাউন্ডের রিপোর্ট নরমাল। বেবির কোনো কমপ্লিকেশন নেই। ডক্টর পারভীন একজন খ্যাতনামা চিকিৎসক, গাইনী বিশেষজ্ঞ। দেশে তো বটেই, বাইরের দেশ থেকেও নানান সার্টিফিকেট আর অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্ত। উনার আন্ডারে মিতু বেশ নির্ভার বোধ করে।
দেখতে দেখতে ডেলিভারির সময় ঘনিয়ে আসে। পুরো গর্ভাবস্থায় মিতুর কোনো অসুস্থতা ছিল না। চাকরিও কন্টিনিউ করেছে মিতু। এবারের এপয়েন্টমেন্টে ডক্টর পারভীন বলেন, আর দেড় মাস পরেই ডেলিভারি ডেইট। যেহেতু কোনো কমপ্লিকেশন নেই, তাই নরমালেই ট্রাই করা যাবে। এ কথা শুনে মিতু বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ে। ও জানে বাচ্চা হওয়ার সময় প্রচণ্ড ব্যথা হয়। এত কষ্ট করতে চায় না মিতু। ও ডক্টর পারভীনের দিকে তাকিয়ে বলে, আমি চাচ্ছি সিজারে ডেলিভারি করতে।
ডক্টর পারভীনের মতে, মায়েদের উচিত নরমাল ডেলিভারির ট্রাই করা। অন্যান্য ডাক্তারদের মত প্রয়োজন ছাড়া সিজার করার পক্ষপাতী নন তিনি। উনি মিতুকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, মিতু, আপনি ভয় পাবেন না। সৃষ্টিকর্তা এভাবেই মায়ের বডিকে তৈরি করেছেন, যেন মায়েরা সহজে বাচ্চা ডেলিভারি করতে পারে। সাময়িক বিচারে নরমালে বেশি কষ্ট মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটাই বেশি উপকারী।
রাতুলও মিতুকে বোঝানোর চেষ্টা করল, দেখো, প্রয়োজন হলে আমরা অবশ্যই সিজার করব, কিন্তু ডাক্তার যেহেতু বলছেন, সব ঠিকঠাক আছে। তাহলে নরমালের ট্রাই করাই যায়, তাইনা?
কিন্তু মিতুর এক কথা সে সিজার-ই করবে। রাতুল একটু পীড়াপীড়ি করতেই ও বলে উঠল, আচ্ছা, তুমি কি টাকা খরচ করতে ভয় পাচ্ছো? ডোন্ট ওয়ারি, আমি নিজের টাকাতেই সিজার করাব। এ কথা শুনে রাতুলের মুখটা নিমিষেই কালো হয়ে যায়। ও খরচের কথা ভেবে না, বরং ডক্টর পারভীনের বক্তব্য শুনেই মিতুকে নরমাল করতে বলছিল। মিতু আবারও বলল, বাচ্চা জন্ম আমি দিব, আর আমি সিজারই করতে চাই।
এরপর আর কোনো কথা থাকে না। ডক্টর পারভীন মিতুর জন্য সিজারের এপয়েন্টমেন্ট ডেইট দেন, আর বলেন, সিজারের আগে যেন একবার এসে সব চেক করিয়ে নেয়।
মিতু বিজয়ীর বেশে হাঁটতে হাঁটতে চেম্বার থেকে বের হয়ে যায়।
(২) সোহেল কিছুদিন হলো নামাজ-কালাম শুরু করেছে। নার্গিস আগে থেকেই পর্দা করতো। বিয়ের পর সোহেলের অসহযোগিতার কারণে নিকাব করতে পারতো না, চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলতো সোহেল।
নার্গিস সবার অলক্ষে চোখের পানি ফেলত আর আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাতো। স্বামীর চেচামেচির সামনে ওর কিছু করার নেই। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে নার্গিস। তালাক নিলে বাপের বাড়িতেও জায়গা হবে না। তাই সোহেলের অন্যায় আচরণ আর রগচটা ব্যবহার মুখ বুজেই সহ্য করে ও।
বাচ্চা পেটে আসার পর অবশ্য নার্গিসের প্রতি সোহেলের আচরণে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আগে ওষুধপত্রও আনতে চাইতো না, এখন দেরি করে হলেও অন্তত ওষুধপত্র কিনে আনে। কিন্তু তার এক কথা, মরে গেলেও সিজার করাব না।
নার্গিস সোহেলের এসব কথাবার্তা শুনে চুপ করে থাকে। ও নিজেও তো নরমালেই চেষ্টা করতে চায়। মা-খালাদের মুখে শুনেছে নরমালে বাচ্চা হলে শরীর ঝরঝরে থাকে। তাছাড়াও আল্লাহ চাইলে ওর আরো সন্তান নেয়ার ইচ্ছা।
শ্বশুরবাড়ির সব কাজ নার্গিস একা হাতেই করে। ননদ ছোট, স্কুলে পড়ে। শাশুড়ি অসুস্থ, উনাকেও দেখাশোনা করতে হয়। সব সামলে নার্গিসের খুব দুর্বল লাগে। মনে হয় যেন ওর শরীরে আর একটুও শক্তি নেই। সোহেল সকালে বের হয়, রাতে ফিরে। ঘরে ফিরেও এদিক থেকে সেদিক দেখলে কথা শোনাতে ছাড়ে না।
আস্তে আস্তে নার্গিসের শরীর ভারি হতে থাকে। চোখের নিচে কালি পড়ে। পুষ্টিকর খাবার-দাবারের অভাবে চামড়া ফ্যাকাশে হতে শুরু করে। একদিন মনে সাহস জড়ো করে বলেই ফেলে, আমার শরীরটা আজকাল অনেক কাহিল লাগে। পাশের বাসার ভাবির থেকে শুনলাম একটা ছুটা বুয়া আসে, যদি দুইটা মাসের বুয়া জন্য রাখা যায়, তাহলে খুব উপকার হয়।
সোহেলের টাকাপয়সার অভাব আছে তেমন না, ধনী না হলেও স্বচ্ছলতা আছে। একটা কাজের লোক রাখা তার জন্য কঠিন কিছু না। কিন্তু গর্ভবতী বউয়ের মুখে কাজের লোকের কথা শুনেই সে তেড়ে ওঠে, সারাদিন ঘরে বসে শুয়ে থেকে সিজার করাইতে চাও? আমাদের মা-খালারা বাচ্চা পেটে নিয়ে কামকাজ করে নাই?
সোহেলের মা পাশের ঘর থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। উনি নিজে চলাফেরা করতে পারেন না। ছেলের মেজাজের সাথে তিনি পরিচিত। জোরে আওয়াজ করে বলেন, বউমা সারাদিন কামকাজই করে। তুই একটা ছুডা বুয়া রাখ। এই সময়ে এত ধকল শইল্লে সয় না।
সোহেলও কম যায় না। চিৎকার করে বলতে থাকে, আম্মা, আপনে যা জানেন না তা নিয়া কথা কয়েন না। আমি কোনো ছুটা বুয়া রাখব না। নার্গিসের এখন শরীর নাড়ানো দরকার। নাহলে পরে সিজার করানো লাগবে। গরুছাগল নরমালে বাচ্চা দেয় না? ওদের বাচ্চা পেটে আসলে কি গোয়ালে বসায় রাখা লাগে?
নার্গিস ফ্যালফ্যাল করে সোহেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর বলতে ইচ্ছা করে, ও কি গরুছাগল? কিন্তু সোহেলের নোংরা কথার ভয়ে ও কথাটা আবার গিলে নেয়। মনে মনে ভাবে, এই মানুষটার কারো প্রতি কোনো সম্মান নাই। না মায়ের সাথে, না বউয়ের সাথে।
একদিন প্রচণ্ড ব্যথা ওঠে নার্গিসের। সকাল থেকেই ও কাতরাতে থাকে। কোনোমতে সোহেলকে ফোন করে জানায়। সোহেলে অফিস থেকে অনুমতি নিয়ে, ভীড় ঠেলে বাসায় পৌঁছাতে প্রায় বিকাল হয়ে যায়। এরপর নার্গিসকে নিয়ে হাসপাতাল যেতে যেতে সন্ধ্যা গড়ায়।
হাসপাতালে পৌঁছাতেই ডাক্তার চেক করে জানায়, নার্গিসের পানি অনেক আগেই ভেঙে গেছে। বাচ্চার অবস্থা শোচনীয়। এক্ষুণি সিজার করাতে হবে, তা নাহলে মা ও বাচ্চা উভয়ের জন্য রিস্ক।
ডাক্তার নার্সকে ডেকে ওটি রেডি করতে বলবে, ঠিক তখনই সোহেল তেড়েমেড়ে বলে ওঠে, নরমালে পারলে করেন, নাহয় আমি অন্য হাসপাতালে যাব। আমার বউকে সিজার করাব না, ব্যস।
সোহেলের উগ্র মেজাজ গোণার সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নেই। ডাক্তার-নার্স সবাই যার যার কাজে চলে যায়। সোহেল খিস্তিখেউড় দিতে দিতে আরেকটা সিএনজি খুঁজতে থাকে। নার্গিস সোহেলের হাত ধরে শেষ বারের মতো বলে, আপনে আমার সিজার করান। আমি আর সহ্য করতে পারতেসি না। কিন্তু সোহেল এক ধমক দিয়ে আবারও সিএনজি ডাকতে থাকে। ওদিকে নার্গিস এতক্ষণ কাতরানোর পর হঠাৎ করেই চুপ হয়ে যায়। মনে হয় বেহুঁশ হয়ে গেছে। সোহেল বেশি ভাড়াতে একটা ক্যাবে উঠে পড়ে।
নার্গিসের শরীর পুরোপুরি ছেড়ে দেয়। ক্যাবের ভাড়া মিটিয়ে কোনোরকমে হাঁচড়ে-পাচড়ে নার্গিসকে টেনে বের করে সোহেল। যে আশায় আরেক হাসপাতালে আসা, তা মাঠে মারা যায়। এখানকার ডাক্তার সাফ জানিয়ে দেয় পেশেন্ট শকে চলে গেছে, অবিলম্বে সিজার করাতে হবে। এদিকে সোহেলও দমার পাত্র নয়। সে নরমালেই বাচ্চা চায়। যা হয় হোক। এসব সিজারে সে বিশ্বাসী না। গরুছাগলের তো সিজার ছাড়াই বাচ্চা হয়। আজকালকার মেয়েদের যত নতুন ভঙ - সিজার করানো লাগবে। সব ষড়যন্ত্র। এইগুলা কানে দেয়ার কী আছে?
সোহেলের চোখের সামনে নার্গিস নিস্তেজ হতে থাকে। শ্বাসপ্রশ্বাস কমে যায়। সোহেলের গোয়ার্তুমি তবু যায় না। গলার রগ ফুলিয়ে হাসপাতালের স্টাফদের সাথে রাগারাগি করতে থাকে সে। আরো একটা হাসপাতালে নিবে, কিন্তু সেখানে পৌঁছে জানতে পারে নার্গিস আর বাচ্চা কেউই আর বেঁচে নেই। কষ্ট পেতে কখন যেন দুজনেরই রুহ পরপারে পাড়ি জমিয়েছে।
সোহেল এখনও গোঁয়ারের মতো ভাবে, বউ-বাচ্চার মৃত্যুতে তার কোনো দায় নেই। ওটি বয় আর পুরুষ ডাক্তারের সামনে শরীর খোলার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো।
(৩) তিন্নি ভীষণ স্বাস্থ্য সচেতন। বাচ্চা পেটে আসার পর থেকেই ও নিয়মিত ব্যায়াম করে, পুষ্টিকর ফলমূল আর খাবার-দাবার খায়। এসব নিয়ে অনেক বইপত্র ঘেটেছে। পরিচিত সবার সাথে কথা বলেছে। ও জানে, নরমাল ডেলিভারির কোনো বিকল্প নেই। ওর হাজবেন্ড শিহাবও ওকে সবসময় সাপোর্ট করে। দুজনেরই ইচ্ছা নরমাল ট্রাই করার।
ওরা অনেক খোঁজ নিয়ে ডক্টর সালেহার কথা জানতে পারে। উনি একজন নামকরা গাইনী বিশেষজ্ঞ। সমসাময়িক অসৎ অনেক ডাক্তারদের ভিড়ে একজন খাঁটি মানুষ। তিনি ডাক্তারি পেশাকে শুধু ব্যবসার নজরে দেখেন না, বরং কী করলে পেশেন্টের ভালো হবে সেটাই উপদেশ দেয়ার চেষ্টা করেন। তিন্নির বেশ কিছু বান্ধবী ডক্টর সালেহার আন্ডারে থেকে নরমালে ডেলিভারি করেছে, তাদের সবার অভিজ্ঞতাই চমৎকার। সেই ভরসায় তিন্নিও উনার কাছেই নিয়মিত চেক-আপ করায়।
দেখতে দেখতে তিন্নির চল্লিশ সপ্তাহ পার হয়ে যায়, কিন্তু ওর ব্যথা ওঠার কোনো নামগন্ধও নেই। খালি মাঝেমধ্যে পেটটা হালকা শক্ত হয়ে ওঠে। ডক্টর সালেহা ওকে আশ্বস্ত করে বলেন, অনেক সময় নরমাল পেইন উঠতে আরো দুই-এক সপ্তাহ বেশি সময় লাগতে পারে। আপনি ভয় পাবেন না, আর সাবধানে থাকবেন।
ডক্টর সালেহার কথাই সত্যি হয়। এর পরের সপ্তাহেই তিন্নির পেইন ওঠে। তীব্র ব্যথায় ছটফট করতে করতে ওরা হাসপাতালে এসে শোনে, ডক্টর সালেহা ইমার্জেন্সি কাজে ছুটি নিয়েছেন। তিন্নির সাথে ডাক্তারের আন্তরিক সম্পর্ক থাকায় ও ব্যথায় ছটফট করতে করতেই ফোন দেয়। কিন্তু জানতে পারে, তিনি এখন ঢাকার বাইরে আছেন। ফিরতে কমপক্ষে আরো একদিন লাগবে। উনি তিন্নিকে সাহস যুগিয়ে বেশ কিছু কথা বলেন।
এদিকে ব্যথা বাড়তে থাকে। তিন্নি কষ্টের মধ্যেও ভাবে, নরমাল ডেলিভারির সাইন ওর মধ্যে পুরোপুরি আছে। খানিক পরে একটা কেবিনে শিফট করা হয় ওকে। ওর স্বামী শিহাব পুরোটা সময় ওর পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। এরই মধ্যে দুইজন ডাক্তার চেক করে গেছে, তারা বলে রাস্তা মোটামুটি খুলেছে। আরেকটু খুলতে হবে। তিন্নির ব্যাথাও স্বাভাবিক নিয়মে আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে।
কয়েক ঘণ্টা পর শিফট বদল হয়। রাতের শিফটে ডাক্তার চেক-আপ করতে এসে জানায়, বাচ্চা পায়খানা খেয়ে নিয়েছে, এখনই অপারেশন করতে হবে।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিন্নি আর শিহাব মেনে নেয়। প্রায় আঠারো ঘণ্টা লেবার পেইন সহ্য করার পর তিন্নির সিজার হয়। জন্ম নেয় এক ফুটফুটে কন্যাসন্তান। মেয়েকে কোলে নিয়ে তিন্নি ওর সব কষ্ট ভুলে যায়।
এক এক করে তিন্নি আর শিহাবের বাবা-মা, ভাইবোন, আত্মীয়-স্বজন বাচ্চা আর মাকে দেখতে আসে। ওদেরকে দেখাশোনা করার জন্য সবাই আছে দেখে শিহাবও নিশ্চিন্ত মনে কেবিন থেকে বের হয়। ফার্মেসি থেকে কিছু কেনাকাটা করতে হবে। ক্যান্টিনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শিহাবের কানে আসে, দুজন নার্স হাসাহাসি করছে আর বলছে, আজকে স্যারের মন ভালো, দুইটা সিজার করাইসে। ওই শুকনা আপাটার তো আর আধা ঘণ্টা হইলে এমনেতেই বাচ্চা হয়ে যাইতো। শুনেই পাশেরজন টিপ্পনী কাটে, দেইখাই বুঝছিলাম এরা মালদার পার্টি। স্যার সিজার না কইরা ছাড়বে না। বাচ্চার পায়খানার কথা শুনেই ওটিতে চইলা গেসে।
আরো কী সব কথা বলে দুইজন হাসাহাসি করতে থাকে। কিন্তু বাকি কথা আর শিহাবের কানে ঢোকে না। ওর মাথাটা হঠাৎ চক্কর দিয়ে ওঠে। টাকার জন্য ও পরোয়া করে না, কিন্তু এতো বড় জুলুম!
এক দৌড়ে ঐ দুইজন নার্সের কাছে ছুটে যায় শিহাব। কিন্তু দুজনেই এক কথায় সব অস্বীকার করে। এমন কোনো কথাই নাকি ওরা বলে নাই। ওরা নাকি ওদের আত্মীয়ের কথা বলছিল, যে অন্য হাসপাতালে ভর্তি। ঝামেলা দেখে কিছুক্ষণের ভেতরই চারপাশে আরো কয়েকজন স্টাফ আর ডাক্তার জড়ো হয়ে যায়। ওরা সবাই একজোট হয়ে শিহাবের সাথে হম্বিতম্বি করতে থাকে। হুংকার দিয়ে বলে, আপনার সমস্যা হলে অন্য হাসপাতালে চলে যান। এইখানে সিনক্রিয়েট করবেন না। এর মধ্যে এক ডাক্তার রিপোর্ট হাতে এগিয়ে আসে, সবাইকে ঠান্ডা করে বলে, দেখেন খালি খালি হইচই না করাই ভালো। এই দেখেন আপনার বউয়ের রিপোর্ট, সিজার না করলে আপনার বউ আর মেয়ে কেউই বাঁচতে পারতো না।
শিহাব জানে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সামনে ও বড় অসহায়। ক্ষমতার জোর ছাড়া এদের বিরুদ্ধে কিছুই করা যাবে না। ও নিজে সত্যিটা জেনেও প্রমাণ দিতে ব্যর্থ। যে ডাক্তাররা মিথ্যা বলে সিজার করাতে পারে, সামান্য রিপোর্ট বদল করে দেয়াটা তাদের জন্য ডালভাত। এখানে ইনসাফের কোনো আশা নেই। ও আচ্ছা, বলে চুপচাপ সরে যায় শিহাব, কিন্তু ওর বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। আল্লাহর কাছেই বিচার দিয়ে রাখে ও। যারা তার স্ত্রী আর কন্যার উপর এই জুলুম করল, তাদেরকে ও কোনোদিনও মাফ করবে না।
এক শহরের তিনটি গল্প
~ আনিকা তুবা!