27/04/2019
আপনিতো ডাক্তার, তাই না?
চেম্বারে ঢোকার আগে ও পরে প্লিজ আপনার পরিচয় দিয়েন। নতুন একটা ভয়ংকর ট্রেন্ড চালু হয়েছে। অন্য ডাক্তারের চেম্বারে গেলে নিজের পরিচয় গোপন রাখা। সন্দেহ নাই ডাক্তার পরিচয় দেয়ায় কিছু সিনিয়র চিকিৎসকের কাছে গিয়ে অনেকেই বিব্রতকর পরিস্থিতির স্বীকার হয়েছেন।
প্লিজ তবুও পরিচয় দিয়েন। কেউ এ পরিচয়ের মূল্য দিতে না পারলে সেটা তার প্রবলেম, আপনার না।
আমার চেম্বারে একটা স্পষ্ট নিয়ম আছে..চিকিৎসকের নিজের এবং চিকিৎসকের মা বাবার কাছে কোন ভিজিট নেয়া হয়না। করপোরেট হাসপাতাল হিসেবে এ নিয়ম কার্যকর করা কঠিন। তবুও অথোরিটি আমাকে সে সুযোগ দিয়েছেন আমার ইচ্ছার কারণে। শুধুমাত্র একবার রেজিষ্ট্রেশন করতে হয় ৩০০ টাকা দিয়ে। এরপর আজীবন আর রেজিস্ট্রেশনও লাগেনা। ভিজিট একেবারেই ফ্রি। অপারেশন খরচে হাত দিতে পারিনা। কারণ আমি মূলত বেতনভুক্ত এবং সব অপারেশনের খরচ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ফিক্সড করে দিয়েছে।
আমার সহকারীকে বলে দেয়া আছে, ডাক্তার পরিচয় দেয়া মাত্র ভিজিট নিবেনা..ডাক্তারের মা বাবা হলেও না। এ নিয়ম মেডিকেল স্টুডেন্ট এর জন্যও সমভাবে প্রযোজ্য। এমনকি চেম্বারে ঢোকার পর যদি জেনে যাই তিনি চিকিৎসক, সাথে সাথে আমি টিকেট ক্যানসেল করে ভিজিট ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা করি।
এই নির্দেশের কারণে অনেকে সময় হোমিও, আয়ুর্বেদ এমনকি পল্লী চিকিৎসকরাও ভিজিটমুক্ত হয়ে যান। কারণ চেম্বারের সামনে এসে তারা সিনা টান করে নিজের পরিচয় ডাক্তার হিসেবে দিতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন।
এমনকি কলেজের প্রফেসরও একদিন ভিজিটমুক্ত হয়ে গেছেন। কারণ সহকারীকে তিনি পরিচয় দিয়েছিলেন ড. হেলেনা জাহান হিসেবে। আমার সহকারী ডক্টর আর ডাক্তারের পার্থক্য বোঝেনি।
আপনি যখন নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখেন এবং পরে তা উম্মোচিত হয় তখন আমার খুব বড় রকমের অস্বস্তি লাগে। একটা গ্লানির ছাপ পড়ে আমার চোখেমুখে। কোন এক সিনিয়রের কাছে আপনার বিব্রত হওয়ার দৃশ্যটা আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। নিজেকে সেই সিনিয়রের প্রতিচ্ছবি মনে হয়। কষ্ট লাগে, অপমান লাগে। খুব অস্বস্তি ফিল করি।
আমি ভিজিট নিতে চাইনা, নিজের স্বার্থে। ভিজিট না নিলে আপনার থেকে আমার বেশি লাভ। তাই আমি স্বার্থপরের মত ভিজিট নেইনা।
কারণ..
০১।
আমি এর মাধ্যমে নিশ্চিত হই, আপনার চেম্বারে যখন আমি যাব আপনি আমার ভিজিট নিবেন না।
০২।
আমি আপনার বাবা মায়ের মুখে একটা খুশীর ঝলক দেখতে চাই। যখন বলি, আপনার ছেলে/মেয়ে ডাক্তার বা হবু ডাক্তার তাই ভিজিট নিবনা। তখন সেই বাবা মায়ের মুখে যে আনন্দের ঝিলিক দেখি তা কোটি টাকায়ও কেনা যাবেনা। চিকিৎসক বা হবু চিকিৎসকের বাবা মা হিসেবে তারা তখন এতোটাই গর্বিত হন যে আমার নিজের বুকটাই আনন্দে ভরে যায়।
০৩।
আপনার মা বাবাকে সম্মানিত করার মাধ্যমে আমি নিশ্চিত হই যে আমার মা বাবাও আপনার কাছে একইভাবে সম্মানিত হবে। বাবা মায়ের মুখে সে গল্প শুনে আমার মনেও খুশীর বান বইবে।
০৪।
আপনি ডাক্তার হলে আমার কাউন্সেলিং খুব সহজ হয়। অল্প কথায় অনেক কিছু বোঝানো যায়। অপারেশনের সম্ভাব্য ঝুঁকি বোঝাতে সুবিধা হয়। সেকারণে আপনাকে আমার টীমেরই অংশ মনে হয়।
০৫।
চিকিৎসা এবং চিকিৎসা পরবর্তী কোন ধরণের জটিলতা তৈরি হলে আমি সহজেই পার পেতে পারি। কারণ রোগীর চিকিৎসক আত্মীয় বিষয়টা সহজে অনুধাবন করে তড়িৎ ব্যবস্থা নিতে সাহায্য করেন।
০৬।
সর্বোপরি আমার চিকিৎসা ও আচরণে সন্তুষ্ট হলে আপনি নিজেই একদিন আমার রোগীর বড় সোর্স হয়ে উঠবেন। একদিন ভিজিট নিয়ে আমি তাই শতদিনের ভিজিট মিস করতে চাইনা।
০৭।
আমি আপনাকেও আমার মত বানাতে চাই। চিকিৎসকের অনেক বাবা মা ভিজিট দেয়ার পক্ষে যুক্তি দেখান.. আমি বিনয়ের সাথে না করে দেই।
আমি বলি, দেখেন আমি আপনার চিকিৎসক ছেলে মেয়েকে শেখাতে চাই, তার চেম্বারে আমি বা আমার বাবা মা গেলে সেও যেন ঠিক একই আচরণ করে।
তবে প্লিজ..
০১।
চেম্বারে আসার পূর্বে সিরিয়াল নিয়ে আসবেন..সিরিয়াল না পেলে আমার সাথে ব্যাক্তিগতভাবে পূর্ব যোগাযোগের ব্যবস্থা করবেন।
আপনি সিরিয়াল নিলে সেটা হবে অধিকার, শুধুমাত্র চিকিৎসক পরিচয়ে ফেবার নিয়ে ঢুকতে চাইলে সেটা হবে অনুগ্রহ। অনুগ্রহের চেয়ে অধিকার অনেক বেশি শ্রেয়।
০২।
আপনি ডাক্তার। আপনার চেয়ে রোগীর কষ্ট আর কেউ বোঝেনা। তাই ডাক্তার পরিচয়ে অন্য রোগীকে অপেক্ষায় রেখে চেম্বারে প্রবেশের চেষ্টা না করাই ভাল। আমি তাই পর্যাপ্ত সময় নিয়েই ডাক্তারের কাছে যাই আমার বাবা মাকে নিয়ে। যাতে করে নিজ পরিচয়ের জোরে আমার থেকেও অধিকতর খারাপ কোন রোগীকে বঞ্চিত করতে না হয়।
এসব চিন্তা একান্তই আমার। এর সাথে আপনার একমত হওয়া জরুরি না। তবে আমি সেই উপদেশটাই পছন্দ করি যেটা আমি নিজে পালন করি।
প্রতিটা মানুষই মৃত্যুদন্ড নিয়ে পৃথিবীতে আসে।
দিনশেষে তাই আপনিও একজন রোগী কিংবা একজন রোগীর লোক!
তারপরেও আপনি ভাগ্যবান। কারণ আপনার জন্মের আগেই উপরওয়ালা ঠিক করে রেখেছিলেন আপনাকে ডাক্তার বানাবেন।
আপনি একজন চিকিৎসক, অনেক গর্বিত এক সৃষ্টি।
পরের জনমে আমি তাই ডাক্তার হয়েই জন্মাতে চাই, আজকের সাকলায়েন হয়েই আবার ফিরে আসতে চাই!!
Courtesy by: Dr. Saklayen Russel
Ass. Professore
Ibrahim Cardiac Hospital