05/11/2025
ক্লাস টেন। প্রথম পার্সোনাল মোবাইল ফোন পেলাম। নোকিয়া এগারোশো।
তবে নতুন না। সেকেন্ড হ্যান্ড। আব্বার বাতিল করা ফোন।
তখন আব্বা একটা নতুন কালার ডিসপ্লে ফোন কিনেছেন, তাই নোকিয়া এগারোশো বাতিল।
বাতিল হয়েই সেই ফোন আমার হাতে চলে এলো। আমার প্রথম ফোন। পার্সোনাল ফোন। আহ্!
কিন্তু শর্ত একটাই। রাত এগারোটায় আব্বার কাছে মোবাইলটা জমা দিয়ে তারপর ঘুমাতে হবে। রাত্রে আমার কাছে ফোন রাখা যাবে না কোনো ভাবেই।
এই শর্তে আমি রাজি হলাম ঠিকই। কিন্তু 'আত্ম-অধিকারবোধে' হালকা আঘাত লাগলো।
একে তো এই জিনিস আব্বার বাতিল করা মাল, তার উপর আবার রাত্রে আমার অধিকার নাই সেই জিনিস পুরোপুরি আমার হয় কিভাবে!
কিন্তু তবুও রাত এগারোটা বাজলেই আব্বার কাছে ফোন দিয়ে দিতাম। কোনো হাংকি পাংকি করতাম না।
আব্বার হাতে ফোনটা দিয়ে বলতাম, আমার গেম খেলা শেষ। গুড নাইট।
নোকিয়া এগারোশোতে সাপের গেম খেলা ছাড়া আমার আর অন্য কোনো কাজও ছিলো না, অনেস্টলি।
আবার সকাল হলেই আম্মার ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে ফোনটা নিয়ে আসতাম।
এই ছিলো আমার রেগুলার রুটিন।
এই পর্যন্ত সব রুটিন মাফিকই আগাচ্ছিল।
কিন্তু সমস্যা বাঁধলো যখন আম্মার মোবাইল ফোনটা নষ্ট হয়ে গেলো। আমি আবার আত্ম-অধিকারহীনতায় ভোগা শুরু করলাম।
কারণ, ওয়ারিশ অনুযায়ী নোকিয়া এগারোশোর মালিক এখন আম্মা! 🙂
সমস্ত সত্ব ত্যাগ করে ফোনটা আম্মাকে হস্তান্তর করে দিতে হবে ভেবে বেশ খারাপ লাগছিল।
কিন্তু আমাদের সবাইকে অবাক করে আব্বা এক কান্ড করে বসলেন। এই যুগে যেটাকে সারপ্রাইজ বলে, আর ওই যুগে ছিলো পাগলামি!
সেদিন বিকেলেই আব্বা একটা টাচ স্ক্রিন ফোন কিনে আনলেন আম্মার জন্য।
কি একটা অবস্থা, কোনো বাটন নেই! শুধু আঙুল দিয়েই কাজ হয়ে যায়। ভাবা যায় নাকি?
আমি আম্মার উপর জেলাস ফিল করা শুরু করলাম।
এই বাসায় টেকনোলজিক্যালি সব থেকে সলভেন্ট আমি। টাচ স্ক্রিন ফোনটা আমার হাতেই সব থেকে বেশি মানাতো!🙄
আফসোস করতে করতেই খেয়াল করলাম, আব্বাও ফোনটার দিকে কেমন কেমন করে যেনো তাকাচ্ছেন!
আমি বুঝে গেলাম এই ফোনের দিকে আব্বারও নজর পড়েছে। 😑
সেই থেকে শুরু এক ফোন, দুই লোভী!
কিন্তু টাচ ফোন নিয়ে আব্বা আর আমি যতটা এক্সসাইটেড, আম্মাকে ততটা এক্সসাইটেড লাগলো না।
কয়েকদিন পরই আম্মা ঘোষণা করলেন তিনি এই ফোন চালাতে পারবেন না। তাকে যেনো নরমাল (বাটনওয়ালা) ফোন দেওয়া হয়।
সমস্যা বেঁধে গেলো। কারণ, আম্মাকে বাটন ফোন আমিও দিতে চাই, আব্বাও দিতে চান।
টাচ ফোনের দাবীদার এখন আমরা দুইজন। আব্বা আর আমি!
আব্বাও টাচ স্ক্রিন ফোনটা চায়, আর আমি তো চাইই।
আব্বার লজিক হচ্ছে, উনি যেহেতু এই ফোন কিনেছেন, ফোনটা ওনারই প্রাপ্য।
আর আমার লজিক, আব্বা টাচ স্ক্রিন ফোন চালাতে পারবেন না। টেকনোলজির দিক থেকে আমিই এগিয়ে। সুতরাং, ওটা আমারই হওয়া উচিত। হুহ।
দুইজনই আম্মার কাছে আমাদের বক্তব্য পেশ করলাম।
সন্ধ্যায় আম্মা তার মূল্যবান রায় দিয়ে সেই টাচ স্ক্রিন ফোন আমার হাতে তুলে দিলেন।
আমার জীবনের অন্যতম 'তোমাকে পাইলাম আমি'ময় আনন্দের দিন।
অনেক খুশি হলাম ঠিকই, তবে সেখান থেকেই সমস্যার শুরু।
টাচ স্ক্রিন ফোন পাওয়ার পরেও আমার উপর সেই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকলো রাত এগারোটার পর আব্বাকে ফোন দিয়ে দিতে হবে।
আব্বা এক ভিলেনী হাসি দিয়ে আমাকে বললেন, এগারোটার সময় আমার ঘরে ফোন রেখে যাবে। আমার কথার যেনো কোনো নড়চড় না হয়।
এই নিষেধাজ্ঞা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারলাম না।
আবার সেই সময় আব্বার মুখের উপর কথা বলার সাহসও আমার ছিলো না।
তাই, অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমি রাত এগারোটায় আব্বার কাছে ফোন রেখে আসতাম।
সারাদিন ফোন আমার কাছেই থাকতো, কিন্তু রাত্রে আব্বার কাছে।
আমি প্রচণ্ড হতাশা নিয়ে ঘুমাতে যেতাম। আর রাত্রে ফোন আমার কাছে থাকলে আমার পড়াশোনায় যে কত উন্নতি হবে সেটা আব্বাকে কিভাবে বুঝাবো ভাবতে থাকতাম।
এভাবে বেশ কিছু দিন চললো।
আমি যখন প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছি তখন আম্মা একদিন আমার কাছে এসে নালিশ দিলেন। তোর বাপ রাত জেগে মোবাইল গুতায়। অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকে। এটা আমার ভালো লাগে না।
অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ যেনো বোঝা না যায় তাই আমি আম্মাকে জিজ্ঞেস করলাম, তাতে কি হয়েছে? মোবাইল চালালে কি হয়?
আম্মা বললেন, হয় অনেক কিছু হয়। তুই সব বুঝবি না।
যেহেতু বুঝবো না বলেছেন, তার মানে আসলে বুঝবো। ক্লাস টেনের ছেলে আবার বুঝে না কেমনে!
আমি বুঝলাম আব্বা ইজ ডুইং সামথিং ফিশি।
আমি আম্মাকে বললাম, আব্বা কি রাত্রে ফোনে কারো সাথে কথা বলে?
আম্মা আমাকে ঝাড়ি মেরে বললেন, বাজে কথা বলিস কেন? একটা চড় মেরে দেবো। ও কারো সাথে কথা বলে না।
আমি একটু হতাশ হয়ে গেলাম এই কথায়। আব্বা যদি কারো সাথে কথা বলতেন, তাহলেই তো ফোনটা আমার হয়ে যেত। ইশশ!
হতাশ হলেও আমি মুখে হাসি রেখে আম্মাকে জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে করেটা কি?
আম্মা বললেন, এই গেম খেলে, রিংটোন চেঞ্জ করে, আবার ডাউনলোড করে। গান শোনে, রেডিও শোনে। এইসব।
আমি আম্মাকে বললাম, করুক না। সমস্যা কোথায়?
আম্মা বললেন, সমস্যা আছে। রাত জেগে সকালে দেরি করে ওঠে। আর আমার সাথে খিটখিট করে। তুই আজকে থেকে আর মোবাইল রেখে যাবি না।
আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। তবে কি সত্যি মেঘ না চাইতেই ফোনটা আমার হয়ে যাচ্ছে! স্বপ্নের মত লাগছিল।
আব্বা একটু গাইগুই করলেও আম্মার রায়ই ছিলো চূড়ান্ত। আজকে থেকে টাচ স্ক্রিন ফোন আমার কাছেই থাকছে।
আব্বার সামনে এমন একটা ভাব দেখালাম যে আমার কোনো ইচ্ছা নেই, কিন্তু আম্মার কথা আমি কিছুতেই ফেলতে পারবো না।
সেই রাত্রেই আমার ফোন প্রথম আমার কাছে। বালিশের পাশে মোবাইল রেখে ঘুমানোর যে কি তৃপ্তি সেটা আপনারা কখনো বুঝবেন না। আমার কাছে ওই ফিলিংটা ছিলো একদম আনরিয়েল!
তারপর তো অনেক বছর কেটে গেছে। সবার হাতে এন্ড্রোয়েড ফোন চলে এসেছে। বিয়ে শাদী করেছি, বাচ্চা কাচ্চা হয়েছে। আব্বা, দাদা হয়ে গেছেন। কিন্তু ঘটনা সেটা না।
এতক্ষণ ধরে এতো কিছু বলার পেছনে আরেকটা ঘটনা আছে।
ঘটনা হলো, গতকাল নাস্তার টেবিলে সবাই বসে চা খাচ্ছিলাম। আব্বার এক হাতে চায়ের কাপ, আরেক হাতে মোবাইল।
আমরা সবাই গল্প করলেও আব্বার কানে তখন ছিলো হেডফোন।
এইটা একটা রেগুলার সিন। কিন্তু গতকাল আম্মা হঠাৎ করে বিষ্ফোরণ ঘটিয়ে বসলেন।
আব্বার কান থেকে টান দিয়ে হেডফোনটা বের করে ফেললেন। পাইসো কি তুমি? সারাদিন ফোন হাতে থাকে কেন তোমার?
আব্বা সহজ স্বীকারোক্তি করে বললেন, খবর দেখছিলাম।
আম্মা বললেন, আজকে থেকে তোমার মোবাইলে খবর দেখা বন্ধ। টিভিতে খবর দেখবে।
আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, সারা রাত ইউটিউবে ভিডিও দেখে। দুইটা কথা বলা যায় না তোর বাপের সাথে।
আমি চুপ করে থাকলাম। এমন সিচুয়েশনে কোনো সাইড না নেওয়াই ভালো।
আম্মা আবার বললেন, আজকে থেকে রাত্রে পৃথুলের কাছে ফোন জমা দিয়ে তারপর শুতে যাবে।
আমি বললাম, আমার কাছে কেনো রাখা লাগবে আম্মা? আপনার কাছে রাখলেই তো হয়।
না, আমার কাছে রাখলে ও আবার নিয়ে নিবে। তোর কাছেই রাখতে হবে।
আপনারা তো জানেনই, আমি আম্মার কথা কিছুতেই ফেলতে পারি না।
রাত এগারোটায় আব্বাকে মেসেঞ্জারে নক দিয়ে বললাম, আব্বা, এগারোটা বেজে গেছে, ফোনটা আমার কাছে দিয়ে যান।
এই মেসেজ পাঠায়ে একটা ভিলেন মার্কা প্রতিশোধের হাসি দিলাম।
স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললাম, বুঝলা, লাইফ একটা বুমেরাং! ফিরে ফিরে আসে।😁
ও বললো, এতো হাইসো না। তোমারও কিন্তু একটা ছেলে আছে। আর তুমি তো জানোই লাইফ একটা বুমেরাং! 🙃
©Nishad R Prithul