31/01/2022
৩০ জানুয়ারি ২০২২ রবিবার।
সারা বিশ্বে করোনাভাইরাস মহামারিতে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা তুলনামূলক কম। যদিও এই মহামারিতে এ পর্যন্ত ৫৭ লাখেরও বেশি মানুষ মারা গেছে। আর আক্রান্ত হয়েছে ৩৫ কোটি ৩৭ লাখেরও বেশি মানুষ।
#ছবিসমূহ: সংগৃহীত।
ওমিক্রনের যে উপসর্গগুলো প্রথমে দেখা দেয় শিশুদের শরীরে।
বড়দের পাশাপাশি ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হচ্ছে ছোটরাও। তাই স্বাভাবিকভাবেই এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবকদের মধ্যে। এ বিষয়ে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল) এবং লন্ডন স্কুল অব হাইজিন এন্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন শিশুদের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা এবং তাদের মাধ্যমে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়া নিয়ে পরিচালিত পুরো বিশ্বের ৬৩৩২টি গবেষণা মূল্যায়ন করে দেখেছে। এসব গবেষণা মূল্যায়নের পর এই দুটি প্রতিষ্ঠান যে তথ্য দিয়েছে তা হলো,
১) করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির সংস্পর্শে আসলে প্রাপ্তবয়স্ক কোনো ব্যক্তির তুলনায় শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৫৬% কম। এছাড়া,
২) করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলেও মারাত্মক অসুস্থ হওয়া বা মারা যাওয়ার ঝুঁকি শিশুদের কম থাকে।
৩) কোভিড-১৯ মহামারির প্রথম ঢেউয়ের তুলনায় দ্বিতীয় ঢেউয়ের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে বেশি সংখ্যক শিশু সংক্রমিত হয়েছিলো। বর্তমানে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট চালিত করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের ক্ষেত্রেও অনেকটা একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আগে শিশুদেরকে কেবল ভাইরাসের বাহক হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এখন অনেক ক্ষেত্রেই তারা গুরুতর অসুস্থ ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই যাদেরকে (১২ বছর ও তদুর্ধ্ব) টিকা দেওয়া সম্ভব, তাদেরকে অবশ্যই টিকা নিতে পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
#ওমিক্রনের যেসব উপসর্গ শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রয়েছে কি-না সেটি বোঝাটাই অনেক কঠিন। ওমিক্রনে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে যে উপসর্গটি সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে সেটি হলো,
১) ক্লান্তি। এরপর রয়েছে,
২) মাথাব্যাথা,
৩) গলাব্যথা,
৪) নাক দিয়ে পানি পড়া এবং
৫) হাঁচি ও কাশির মতো উপসর্গগুলো।তবে এই মূল উপসর্গগুলো ছাড়াও,
৬) শ্বাসনালীর সমস্যা সংক্রান্ত বেশকিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে শিশুদের ক্ষেত্রে। সেইসঙ্গে দেখা দিতে পারে,
৭) ডায়রিয়াসহ ত্বকে ক্ষত সৃষ্টি হওয়ার মতো উপসর্গ। তবে,
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উপসর্গগুলো বিরল। সবার ক্ষেত্রে এগুলো দেখা নাও দিতে পারে। শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. হেলেনা বেগম বলেন,
"বাংলাদেশে শিশুরা যেসব রোগে আক্রান্ত হয় তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে #শ্বাসতন্ত্রে_সংক্রমণ। আর এর উপসর্গ হচ্ছে নাক দিয়ে পানি পরা, কাশি দেয়া, ঘড়-ঘড় করে শব্দ করা, কোন কোন ক্ষেত্রে গলাব্যথা অথবা কানে ব্যথা। করোনার উপসর্গগুলোও অনেকটা একই রকম। সে কারণে সাধারণ সর্দি-কাশি নাকি শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ না-কি করোনা তা বোঝা যায় না। ফলে, অনেক পরিবারের মানুষেরা বুঝতেই পারেন না যে, তাদের বাচ্চা কোভিড আক্রান্ত কি-না। কারণ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উল্লিখিত লক্ষ্মণগুলোর তাদের কোনো আলাদা উপসর্গ থাকে না।"
অন্যদিকে, প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে যে লক্ষণটি প্রথমে দেখা যাচ্ছে সেটি হলো, নাক দিয়ে পানি পড়া। যেসব পরিবারে সদস্যদের করোনা সংক্রমণ হয়েছে, কিংবা করোনা রোগীর সংস্পর্শে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কিংবা যেসব শিশুর বাবা-মায়েদের বাধ্য হয়ে বাইরে যেতে হয়, সেসব শিশুর মধ্যে কোনো ধরণের উপসর্গ দেখা দিলেই তাকে পরীক্ষা করাতে হবে। সেই সাথে পরিবারের অন্য সদস্যদের থেকে তাদেরকে আলাদা করে ফেলতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে,
#শিশুরা কি করোনাভাইরাস ছড়ায়❓
পরিবারে শিশুদের সাথে অন্য সদস্যদের মেলা-মেশায় সাধারণত কোন বিধি-নিষেধ থাকে না। বিশেষ করে পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের সাথে তাদের মেলামেশার পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। শিশুরা কতটা সহজেই করোনাভাইরাস ছড়াতে পারে সে বিষয়ে তেমন কোন পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যায় না।
এ বিষয়ে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল) এবং লন্ডন স্কুল অব হাইজিন এন্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন যে তথ্য দেয় তাতে উল্লেখ করা হয়,
'করোনাভাইরাস সংক্রমণের ৩১টি ক্লাস্টারের উপর চালানো এক গবেষণায় দেখা যায় যে, মাত্র তিনটি ক্লাস্টারে সংক্রমণ শিশুদের থেকে হয়েছে। অর্থাৎ শিশুদের থেকে সংক্রমণ ছড়ানোর হার ১০%। গবেষকরা মনে করেন, যেহেতু শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার হার তুলনামূলক কম তাই তাদের থেকে অন্যদের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও তুলনামূলক কম।'
অনেকটা একই তথ্য দিয়েছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক তাহমিনা শিরিনও। তিনি বলেন,
"পরিবারে কোনো শিশু যদি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয় সেক্ষেত্রে পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যেও ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে।
শিশুদের মধ্যে যদি করোনাভাইরাসের সংক্রমণের উপসর্গগুলো বেশি থাকে তাহলে ঝুঁকিও বেশি থাকে। আর উপসর্গ মৃদু বা উপসর্গহীন হলে সেক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রাটা কমে যায়। যাদের মধ্যে জ্বর এবং কাশি থাকবে তাদের থেকে সংক্রমণের মাত্রাটা বেশি থাকবে। তবে, এক্ষেত্রে বাবা-মা বা যারা সেবা দিয়ে থাকেন তাদের মধ্যে ছড়ানোর ঝুঁকি বেশি থাকে।"
#শিশুদের মাধ্যমে করোনা ভাইরাস অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কতটুকু❓
কোভিড আক্রান্ত শিশুদের থেকে সংক্রমণের ঝুঁকি কতটা তা দুটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে।
#প্রথমটি হচ্ছে, শিশুর হাঁচি-কাশির মতো উপসর্গ বেশি থাকলে তার থেকে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা বেশি থাকবে। আর উপসর্গ মৃদু থাকলে বা কম থাকলে ঝুঁকি কিছুটা কম থাকবে। কারণ এতে ড্রপলেটস নির্গত হওয়ার বিষয়টি জড়িত থাকে।
#দ্বিতীয়টি হচ্ছে, কন্টাক্ট টাইম বা সংস্পর্শে আসার সময় কতটা। অর্থাৎ, যদি কোভিড আক্রান্ত কোনো শিশু দীর্ঘ সময় ধরে বয়স্ক কারো সংস্পর্শে থাকে তাহলে ঝুঁকির মাত্রাটা এমনিতেই বেড়ে যাবে। তবে,
#সবমিলিয়ে শিশুদের থেকে বড়দের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি খুব বেশি না।
ইতোমধ্যেই টিকা নেওয়া শিশুরা ওমিক্রনে আক্রান্ত হলে তাদের মধ্যে সাধারণ সর্দি-কাশির বাইরে তেমন গুরুতর কোনো উপসর্গ দেখা যাচ্ছে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের খুব একটা কাবু করতে পারছে না এই ভাইরাস। তবে শিশুরা যেহেতু চঞ্চল এবং নিয়মের বেড়াজালে তাদেরকে আটকে রাখা কঠিন, তাই যাদের ক্ষেত্রে টিকাকরণ সম্ভব, তাদেরকে অবশ্যই টিকা দিতে হবে। মাস্ক পরার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। মেনে চলতে হবে অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টিকর খাবার খেয়ে গড়ে তুলতে হবে প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা।
#ঝুঁকি কমাতে হলে করণীয়।
শিশুদের থেকে বয়স্কদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে হলে কিছু পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, শিশু বিশেষজ্ঞ এবং ভাইরোলজিস্টরা। এর মধ্যে রয়েছে-
১) শিশুদের সচেতন করা।
কোভিড সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে হলে শিশুদের মধ্যেও সচেতনতার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং বুঝিয়ে বলতে হবে। এক্ষেত্রে যেসব পরিবারে কোভিড রোগী রয়েছে সেসব পরিবারের বাচ্চাদের কিছু কিছু অভ্যাস #মিনা_কার্টুন এর মতো বুঝিয়ে বলার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেমন, শরীরের কোথায় কোথায় স্পর্শ করা যাবে না, কোন কিছু যেনতেনভাবে ফেলে রাখা যাবে না, কোথায় যাওয়া যাবে না। সেই সাথে শিশুদেরকে বুঝিয়ে বলতে হবে যে কী কী খাবার বেশি খেতে হবে।কোন কোন কাজগুলো বেশি বেশি করতে হবে।
২) শিশুদের আলাদা রাখা।
শিশুরা যেহেতু সংক্রমণ ছড়ানোর বিষয়ে খুব বেশি কিছু বোঝে না তাই পরিবারের অন্য সদস্য বিশেষ করে যারা বয়স্ক এবং যাদের অন্য কোন স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে তাদেরকে যতটা সম্ভব দূরে রাখতে হবে। প্রয়োজনে দরজা বন্ধ রাখতে হবে যাতে শিশুরা কাছে আসতে না পারে।
৩) বাইরে থেকে এসে সরাসরি শিশুদের সংস্পর্শে না যাওয়া।
বিভিন্ন ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেহেতু বন্ধ তাই শিশুদের বাইরে যাওয়ার মাত্রাও কম। তাই সেক্ষেত্রে তাদেরকে করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত রাখতে পরিবারের প্রাপ্ত বয়স্ক সদস্য যারা বাইরে যান তাদের থেকে শিশুদের দূরে রাখতে হবে। সম্পূর্ণভাবে ভাইরাস মুক্ত না হয়ে বা বাইরে থেকে এসে শিশুদের সংস্পর্শে যাওয়া যাবে না।
৪) আক্রান্ত শিশুদের হাসপাতালে আইসোলেশন করা।
শিশুরা কোভিড আক্রান্ত হলে প্রয়োজনে তাদেরকে হাসপাতালে আইসোলেশনে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে হাসপাতালে আলাদা ইউনিট বা ব্যবস্থা করা যেতে পারে যেখানে শুধু শিশুদেরই আইসোলেশনে রাখা হবে। এক্ষেত্রে সব শিশুদের মধ্যে উপসর্গ থাকবে বলে তারা নিজেরা নিজেদের জন্য ঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হবে না।
৫) পরিবারের অন্য সদস্যদের মাস্ক পরা।
যেহেতু শিশুদের সব সময় মাস্ক পরিয়ে রাখা সম্ভব নয় সেক্ষেত্রে পরিবারের অন্য সদস্যদের মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া অন্য স্বাস্থ্যবিধিগুলো কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। বিশেষ করে বয়স্কদের আলাদা করে ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে।
#সূত্র:
১) ডয়চে ভেলে, জার্মানি,
২) টাইমস অফ ইন্ডিয়া,
৩) আনন্দবাজার পত্রিকা।