10/05/2026
আমার ব্যাক্তিগত একটা গল্প শেয়ার করি ।
প্রায়ই আমি সকালে কারাতে ক্লাস থেকে দেরী করে ফেরার কারনে ভার্সিটির ক্লাসে যাবার যথার্থ প্রস্তুতি, যথা সময়ে নিতে পারতাম না।
হুলুস্থুলে রেডি হয়ে, না খেয়ে বেরিয়ে যেতে গেলেই, আম্মা ছুটে আসতেন-
ঃ 'খেয়ে যা, ভাত রান্না হয়ে গেসে'
ঃ 'সময় নাই, ক্লাসে দেরি হয়ে যাবে'।
ঃ 'তাহলে তুই রেডি হতে থাক, আমি খাওয়ায়ে দেই' !
আমার আম্মা ‘দস্যু বনহুর’ এর ভক্ত ছিল ।
আমাদের কোন গৃহ পরিচারিকা ছিলনা । নিজের হাতে সব কাজ শেষ করে, দুপুরে আমাদের সবার খাওয়া দাওয়া পর্ব শেষ হলে আম্মা বিছানায় উপুড় হয়ে ‘বনহুর' পড়তে পড়তে কখনো কখনো উত্তেজিত হয়ে উঠে বসতেন !
আমরা রেডিওতে ‘World Music’ শুনতে শুনতে আড় চোখে তাকিয়ে দেখতাম আর
ভাবতাম ‘কি বইরে এটা! এই বই তো আমাদের পড়া লাগবেই’।
একেতো পড়াশোনার বাইরের ‘আউট বুক’ তার উপর ‘প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য’ সিল দেওয়া,
কোথায় লুকিয়ে রেখেছে , খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলাম কি না চাল রাখার ড্রামের ভিতর !
চা বাগানের সামনে পাহাড়ের উপর আমাদের বাড়ি।
অত উপরে টানাটানির ঝামেলায়, আব্বা একবারে ২/৩ মাসের চাল কিনে বড় ড্রামে তুলে রাখত ।
আমাদের দুই বিচ্ছু বোনের হাত থেকে বই লুকানোর মোক্ষম জায়গা হিসাবে আম্মা সেই ড্রাম বেছে নিয়েছিল।
সবাই ঘুমালে রাত জেগে কাঁথার নিচে টর্চ জ্বেলে দুই বোন মিলে সেই চোরাই বই পড়ে তো আমরা হতাশ !
অনেকটা ‘রবিন হুড’ এর ধরন, একটুখানি রোমান্টিক কথাবার্তা,
স্বামী বনহুরের এই বিপদজনক জীবনে স্ত্রীর দুশ্চিন্তা, আকুলতা আর একটু action,
তাতেই আম্মা হেসে, কেঁদে হয়রান !
ধুর…’প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য’ সিলের দিকে তাকিয়ে দুই বোন হতাশায় ঠোঁট উলটে বই আবার চালের ড্রামে পাচার।
সিনেমা দেখতে বসে আম্মার রানিং কমেন্ট চলত,
ভিলেনকে বকাবকি করে সারা, মারামারি দৃশ্যে দুষ্ট লোককে আরও কেন নাজেহাল করা হোল না তাই নিয়ে আফসোস আর শাবানার কান্নার সাথে নিজেই কেঁদে কেটে চোখ মুছে আঁচল ভিজিয়ে ফেলা।
'কি যে করেন, আম্মা ! এইগুলা সব অভিনয়' !
'‘জানি’ এই বলে আম্মা ধরা পড়া মিষ্টি হাসি দিয়ে আবার যেই কে সেই !
বড় পাতিলে ভাত রাঁধত আম্মা।
বলত- 'আমার ৬ বাচ্চা,
তাদের বন্ধুরা কে কখন এসে ‘ক্ষুধা লাগসে’ বলবে, তখন রাঁধতে গেলে দেরি হবে, ওদের কষ্ট হবে।’
সিলেট মেডিকেলে আমার বড় দুই ভাই বোনের হোস্টেলের সব সতীর্থরা দিনে, রাতে যে কোন সময় হানা দিয়ে খাওয়া দাওয়া করে যেত, এমনকি একেক সময় ভাইয়া আর আপুর অনুপস্থিতিতেই ।
আমরা সবাই অভ্যস্ত ছিলাম এতে।
মাঝে মাঝে বলতাম- ‘এই ভাত, ডাল, শাক, ভর্তা খাবার জন্য এত কষ্ট করে পাহাড় বেয়ে আসলেন?
তারা হেসে বলত- 'নাহ, বাড়ির জন্য মন খারাপ হলে খালাম্মার কাছে আসি, উনার আদরের ডাল, ভাতও অমৃত মনে হয়।’
আমরা ভাবতাম, এটা কিছু হইল?
উনারা যে যখন একা বা দল বেঁধে আসে,
আম্মা দৌড়াদৌড়ি করে তার নিজের হাতে লালন পালন করে বড় করা মুরগীর খোঁয়াড় থেকে ডিম এনে ভাজে,
আমাকে বাগানের গাছ থেকে কাঁচা মরিচ পেড়ে আনতে বলে,
তারপর খাবার সময় পাশে বসে মাথায় হাত বুলায়ে বাড়ির খবর জিজ্ঞাসা করে,
আরও কেন শুকায়ে যাচ্ছে তা নিয়ে আফসোস করে- এইই তো !
কি আর এমন !
তো এইটুকু কথা আর সাধারণ খাবারের জন্য, এতো কষ্ট করে এতো পথ হেঁটে, পাহাড় বেয়ে আসতে হবে?
এরা ডাক্তারি পড়ে, অথচ এতো বোকা কেন?
আমার স্কুল, কলেজ বন্ধুরাও এসেই আম্মাকে আদেশ দিত - ‘খালা, খেয়ে যাব কিন্তু' !
আম্মা অস্থির হয়ে বলত- ‘ আহা…আগে বলবি না ! আজকে তো ভালো কিছু রাঁধি নাই !’
ওরা মজা করে হুমকি দিত- 'তাইলে জানি না, যাই রেঁধেছেন, আপনার নিজের হাতে খাওয়ায়ে দিতে হবে।'
আমাদের সবার আবদার, রাগ, অভিমান, হতাশা, কষ্টের শেষ আশ্রয় ছিল - আম্মা !
এই যে এত মমতামময়ী একজন মহিলা,
সারাজীবন অন্যের চিন্তায়, অন্যের সেবায় অস্থির হয়ে যেতেন,
কখনো কি তিনি নিজের স্বাস্থ্যের দিকে, সমস্যার দিকে দৃকপাত করেছেন?
আর তার চারপাশের মানুষেরাও কি কখনো তার কষ্টের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন বা সমাধান করার চেষ্টা করেছেন?
প্রায়ই আম্মাকে বলতে দেখতাম,
“আচ্ছা, আমার হঠাৎ হঠাৎ এমন গরম লাগে কেন?
“নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করে কি লাভ হল, দাঁতগুলো সব হঠাৎ করে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে কেন?
“ হুট হাট সারা গায়ে এত ব্যাথা করে কেন?
“ঈশ, রাতে এতবার ঘুম ভেঙ্গে যায় কেন?
“কাপড় ধুতে গেলেই ভেঙ্গে ভেঙ্গে যায়, আমার নখ এত পাতলা হয়ে যাচ্ছে কেন?
“ তেল লাগাই, তাও চামড়া এমন শুকায়ে যাচ্ছে কেন?
সারাজীবন আমাদের সবার আবদার শুনতে, শুনতে, আর তা মিটানোর চেষ্টায় নিজের জীবন বরবাদ করে দিলেও, তার নালিশ, তার আবদার শোনার, বা তা গুরুত্বের সঙ্গে শুনে কোন পদক্ষেপ নেবার মত সময়, জ্ঞান বা সহানুভূতি অন্যদের, এমনকি স্বয়ং আমিসহ তার নিজের সন্তানদেরও ছিল না।
কিন্তু কেন?
কারণ, মানসিকতা !
আমাদের দেশে অধিকাংশ সময়েই একজন মহিলার বয়স ৫০ পার হওয়া মাত্রই, তার শারীরিক কষ্টের সব অভিযোগগুলোকে নিতান্তই বয়সজনিত এবং সমাধান অযোগ্য মনে করা হয়।
আর মানসিক কষ্টের তো কথাই নেই।
জেনে রাখবেন, বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে, তার সাথে দিগুণ গতিতে আগাচ্ছে প্রযুক্তি।
মেনোপজ এবং এ সংশ্লিষ্ট শারীরিক পরিবর্তনগুলোর অনেকখানিই এখন সমাধান যোগ্য এবং আমাদের আয়ত্তের ভিতর।
শুধু প্রয়োজন যথার্থ জ্ঞান এবং উপযুক্ত পদক্ষেপ নেবার আগ্রহ ও সহানুভূতিশীলতা।
সব মায়েদের আন্তর্জাতিক মা দিবসের শুভেচ্ছা
১০/৫/২০২৬
(উপরের লিখাটি বইমেলা ২০২৫ এ প্রকাশিত আমার লিখিত Sick to Strong বই থেকে নেয়া।
কিছু ছবি- আমি আমার মায়ের সাথে
কিছু ছবি- লিও তার মায়ের সাথে )
AGELESS by Tulee
Combat Gym by Tulee