03/02/2020
"সুখ" মানুষের জীবনের অন্যতম চাওয়া গুলোর মধ্যে একটি; আবার কখনো কখনো একমাত্র চাওয়াও। সুখের আশায় মানুষ সবকিছু করতে রাজি থাকে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক Daniel Gilbert এর মতে, আমাদের জীবনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনেকাংশেই নির্ভর করে, সেই সিদ্ধান্তের ফলে আমরা আনন্দ পাব, তৃপ্ত হব কিংবা ভালো থাকতে পারবো কিনা তার ওপরে।
কিন্ত ছোটবেলা থেকেই দেখা যায় যে, আমরা জীবনের সাফল্য আর খুশি থাকাকে অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করি। অর্থাৎ, সফলতা পেলেই খুশি হব বা খুশি থাকার জন্য সফল হতে হবে, এমনটা আমরা অনেকেই মনে করে থাকি। যেমন, স্কুলে প্রতিবছর ভালো ফলাফল করতে হবে, এইচএসসি- এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেতে হবে, ভালো ভার্সিটি ভর্তি হতে হবে, ভালো একটি চাকরি পেতে হবে ইত্যাদি। এভাবে জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে এক একটি মাইলফলক আমরা তৈরি করি কারণ আমাদের মনে হয়, এগুলো অর্জন করলেই আমরা সুখে থাকবো, আর ব্যর্থ হলে জীবন অর্থহীন হয়ে পড়বে।
কিন্ত সত্যিই কি সফলতার সাথে সুখে থাকার সম্পর্ক রয়েছে? সফলতা পেলেই কি আমরা সুখী হব?
আসলে, জীবনের এক একটা মাইলফলক আমাদেরকে খুশী করবে এরকম আশা করলেও, এই প্রতিটা অর্জন এর সাথে আমরা কতটা সুখী হচ্ছি, তার তেমন কোন সম্পর্ক নেই। আমরা যখন কোন লক্ষ্য অর্জন করি, তখন কিছু সময়ের জন্য আমরা খুশি থাকি ঠিকই, কিন্ত এরপরই আমরা এর থেকে বড় কোন সাফল্যের পিছে ছুটতে থাকি যাতে সুখের এই অনুভূতিটি আবার পাওয়া যায়। এভাবে সাফল্যের পিছনে ছুটতে ছুটতে আমরা অনেকসময় খুশি থাকতেই ভুলে যাই।
২২৫ টি গবেষণা পর্যালোচনা করে Psychological Bulletin এ প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায় যে, সুখে থাকা বা খুশি থাকা সফলতা কে অনুসরণ করে না। অর্থাৎ, সফলতা অর্জন করলেই একজন মানুষ সুখে থাকবে, এমনটি নয়। Sonja Lyubomirsky ও তার সহকর্মীরা গবেষণায় দেখেন যে, সফলতা পেলে খুশি হওয়া নয় বরং খুশি থাকলে সফল হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তার কারণ হলো, সুখে থাকা মানুষগুলো বেশিরভাগ সময় ইতিবাচক অনুভূতির মধ্য দিয়ে যায়। এই ইতিবাচক অনুভূতিগুলো তাদের লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থেকে কাজ করতে অনুপ্রেরণা দেয়। আবার খুশি থাকলে মানুষ অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী, আশাবাদী এবং কাজে সক্রিয় থাকে। সেইসাথে হাসিখুশি মানুষগুলোর সাথে অন্যান্য মানুষও কাজ করতে, যোগাযোগ রাখতে আগ্রহী হয়, যারা তাদের সফল হবার পথকে আরও সুগম করতে সাহায্য করে।
Sonja Lyubomirsky, ২০০৮ সালে আরেকটি গবেষণায় দেখেন যে, আমাদের সুখে থাকার ক্ষমতা আমাদের নিজেদের মধ্যেই রয়েছে। সুখী হবার জন্য দুনিয়া কাঁপানো সফলতা পাবার প্রয়োজন নেই বরং দৈনন্দিন জীবনের কিছু অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমেও সুখী হওয়া সম্ভব। যেমন,
- কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা
- চ্যালেঞ্জিং কোন কাজের অভ্যাস করা
- কাজে গড়িমসি না করা
- কৌতুহলী হওয়া
- নতুন অভিজ্ঞতার জন্য প্রস্তুত থাকা
- সহানুভূতিশীল হওয়া
- নিজের সম্পর্কগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া
১৯৩৮ সাল থেকে ৮০ বছর ধরে ২৬৮ জনের উপর করা এক গবেষণায় সুখ কিসের উপর নির্ভরশীল তা বোঝার জন্য জীবনধারা থেকে রাজনৈতিক মতাদর্শ সব কিছুই দেখা হয়। দেখা যায় যে, আমাদের জীবনের সম্পর্ক গুলো এবং এসব সম্পর্ক নিয়ে আমরা কতটা খুশি রয়েছি সেটি সুখে থাকার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ঘনিষ্ঠ সম্পর্কগুলো সাফল্য, টাকা বা খ্যাতির থেকেও অনেক বেশি কিছু। কেননা, জীবনের নেতিবাচক অনুভূতি থেকে এই সম্পর্কগুলোই আমাদেরকে নিঃশেষিত হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে।
অর্থাৎ, আমাদের সুখে থাকা বাহ্যিক সফলতার উপরে নির্ভরশীল নয়, সুখে থাকা নির্ভর করে আমাদের নিজেদের উপর। আর্থিক বা সামাজিক সাফল্য নয়, বরং আমরা জীবনকে কিভাবে দেখি, নিজেকে কতটা সুখী ভাবি, সেটাই সুখে থাকার জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ।