17/04/2026
বিশাল টিউমারের বোঝা থেকে মুক্তি: সাফল্য এবং কিছু অপ্রিয় বাস্তবতা
উনার ছবিটা দেখে হয়তো অনেকেই আঁতকে উঠছেন, ভাবছেন— "এত বড় টিউমার নিয়ে মানুষ বাঁচে কীভাবে? উনি খাওয়া-দাওয়া বা শ্বাস নিতেন কীভাবে?"
আসলে এই বীভৎস অবস্থা তো আর একদিনে হয়নি। প্রাথমিক অবস্থায় যদি একজন ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জনের শরণাপন্ন হওয়া যেত, তবে হয়তো শুরুতেই নিরাময় সম্ভব হতো; এত বড় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনই পড়তো না।
যাই হোক, প্রায় ৮ মাস আগে এই রোগী বিশাল এই টিউমার নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে এসে ঢাকা ডেন্টাল কলেজের ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি বিভাগে ভর্তি হন। আমরা দ্রুত তার অপারেশনের প্রস্তুতি শুরু করি।
বিশাল এই টিউমারটি সফলভাবে অপসারণের পর শুরু হয় পুনর্গঠন বা রিকনস্ট্রাকশনের কাজ। ভার্চুয়াল সার্জিক্যাল প্ল্যানিং (VSP)-এর মাধ্যমে আগেই আমরা সার্জিক্যাল গাইড তৈরি করে রেখেছিলাম। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী রোগীর বাম পা থেকে ফিবুলা (হাড় ও মাংসপেশি) নিয়ে মাইক্রোভাসকুলার সার্জারির মাধ্যমে নিখুঁতভাবে মুখমন্ডলের অপসারিত অংশটি প্রতিস্থাপন করা হয়। অপারেশন পরবর্তী নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য তাকে আমাদের হাসপাতালের আইসিইউতে (ICU) রাখা হয়।
অপারেশনের পর এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সুস্থ হওয়ার লড়াই চলাকালীনই উনার স্বামী উনাকে ফেলে গ্রামে চলে যান। অসহায় মহিলা যখন অথৈ সাগরে, তখন পাশে দাঁড়ান আমাদের ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক ও নার্সবৃন্দ। সরকারি সাপ্লাইয়ে সব ওষুধ থাকে না, তাই ব্যক্তিগত তহবিল থেকে তারা সাধ্যমতো ওষুধের খরচ ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে গেছেন। কৃতজ্ঞতা জানাই আমাদের এনেসথেসিয়া বিভাগকে, যাদের নিরলস সাপোর্ট ছাড়া এত দীর্ঘ ও জটিল অপারেশন সম্পন্ন করা অসম্ভব ছিল।
সাফল্যের আড়ালে কিছু আক্ষেপ ও দাবি
আজ শুধু সাফল্যের গল্প নয়, কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও বলতে চাই। ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতালের মতো একটি বিশেষায়িত সরকারি টারশিয়ারি লেভেলের হাসপাতালেও আমাদের প্রতিনিয়ত নানান প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়।
আমরা কাজ করতে চাই, কিন্তু এটি একটি টিমওয়ার্ক। পর্যাপ্ত লজিস্টিকস ও জনবল ছাড়া বছরের পর বছর আমরা সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। সামান্য কিছু সাপোর্ট পেলে আমাদের কাজের গতি ও মান কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেত:
আইসিইউ সংকট: কোভিডের আগে আমাদের এখানে ১০টি আইসিইউ বেড ছিল। বিশেষ প্রয়োজনে কিছু বেড ও যন্ত্রপাতি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হলেও তা আর ফিরে আসেনি। বর্তমানে মাত্র ২টি আইসিইউ বেড চালু আছে। এমন লাইফ-চেঞ্জিং সার্জারির পর আইসিইউ সাপোর্ট না থাকাটা আমাদের মনোবল কমিয়ে দেয়। অবিলম্বে বেডগুলো ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছি।
এনেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ সংকট: এই বিভাগে তীব্র চিকিৎসক সংকট রয়েছে। সংকট নিরসন ও ওটি (OT) ফ্যাসিলিটি বাড়ানো হলে আমরা আরও বেশি রোগীকে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে পারব।
সরঞ্জামাদি ও ইকুইপমেন্ট: ওটি-র সরঞ্জাম, সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট এমনকি প্রয়োজনীয় গাউনেরও অপ্রতুলতা রয়েছে। এসব সংকট দূর করলে অপারেশন থিয়েটারের কর্মক্ষমতা বহুগুণ বাড়বে।
আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আমাদের এই বাস্তব সমস্যাগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবেন। আমরা চাই আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে।
সবাই ভালো থাকবেন।
#
dept ddch #মুখেরক্যন্সার