18/12/2025
ইবনে সিনা, যাঁর পূর্ণ নাম আবু আলি আল-হোসেন ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে সিনা, তিনি ৯৮০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১০৩৭ খ্রিস্টাব্দে প্রয়াত হন। তিনি ছিলেন এক জন বহুমুখী প্রতিভাবান মনিষী—একজন চিকিৎসক, দার্শনিক, বিজ্ঞানী ও লেখক।
ইবনে সিনার চিকিৎসা বিজ্ঞানে অবদান ছিল মূলত প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় পদ্ধতিগুলোর উন্নয়নে, কিন্তু হোমিওপ্যাথি উদ্ভাবিত হয় অনেক পরে, ১৮০০ শতাব্দীতে। তাই ইবনে সিনার দর্শন বা বিজ্ঞান সরাসরি হোমিওপ্যাথির প্রতিষ্ঠাতার ভূমিকায় নয়। তবে, ইবনে সিনার ঔষধের ব্যবহার, রোগ নির্ণয়, এবং প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতির চিন্তাধারা হোমিওপ্যাথির কিছু মৌলিক ধারণার জন্য পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করতে পারে। তাই, ইবনে সিনার চিন্তাধারা হোমিওপ্যাথির বিকাশে একটি পরোক্ষ প্রভাব ফেলেছে বলা যায়।
ইসলামিক চিন্তাভাবনা ও দর্শনে ইবনে সিনার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রাচীন গ্রীক দার্শনিকদের মতবাদকে ইসলামিক দার্শনিক চিন্তার সাথে মেলানোর কাজ করেছিলেন। তার দর্শনে প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের প্রভাব ছিল স্পষ্ট, এবং তিনি তাদের তত্ত্বাবধানের আধুনিকীকরণ করেছেন।
ইবনে সিনার চিন্তাভাবনা মধ্যযুগীয় ইসলামিক দার্শনিকদের জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করে, এবং তার কাজ পরবর্তীতে মুসলিম দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের জন্য প্রেরণা জুগিয়েছে। তাঁর লেখাগুলো আজও ইসলামিক দর্শন ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলছে।
তার চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো তাঁর রচিত “কানুন ফিল তিব্ব” বা “Canon of Medicine”—যা সেই সময়ের চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি মৌলিক গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই গ্রন্থে তিনি বিভিন্ন রোগের নির্ণয়, চিকিৎসা পদ্ধতি, ওষুধের বৈশিষ্ট্য, এবং মানব দেহের অঙ্গ-প্রতঙ্গ সম্পর্কিত বিস্তারিত আলোচনা করেন।
তাঁর কাজের প্রভাব ছিল শুধু চিকিৎসা বিজ্ঞানে নয়, বরং দর্শন, পদার্থবিজ্ঞান, এবং অন্যান্য ক্ষেত্রেও। তাঁর গবেষণা এবং লেখা পরবর্তী শতাব্দীগুলোর চিকিৎসা শিক্ষার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইবনে সিনার অবদান সত্যিই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বহু রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি, ঔষধের সংমিশ্রণ, এবং রোগ নির্ণয়ের নানা দিক নিয়ে বিশদ গবেষণা করেছেন। তাঁর লেখা “কানুন ফিল তিব্ব” চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি মাইলফলক গ্রন্থ, যা পরে বহু চিকিৎসকের জন্য মানদণ্ড হিসেবে কাজ করেছে। এছাড়াও, তিনি মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গ এবং রোগের উপসর্গ নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন, যা আজও চিকিৎসা শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক।
ইবনে সিনা মূলত আধুনিক হোমিওপ্যাথির প্রতিষ্ঠাতা নন, কারণ হোমিওপ্যাথি পরবর্তীকালে, ১৮০০ শতাব্দীতে স্যামুয়েল হানেমান দ্বারা বিকাশিত হয়। তবে ইবনে সিনার চিকিৎসাবিদ্যায় বিভিন্ন ধরনের রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার পদ্ধতি, পাশাপাশি প্রাকৃতিক ওষুধের ব্যবহার, হোমিওপ্যাথির চিন্তার ভিত্তি হিসেবে পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করেছে।আধুনিক হোমিওপ্যাথি মূলত ১৮০০ শতাব্দীতে স্যামুয়েল হানেমানের দ্বারা উদ্ভাবিত হয়, যেখানে রোগ নিরাময়ের জন্য খুবই অল্প পরিমাণে নির্দিষ্ট উপাদান ব্যবহার করা হয়। ইবনে সিনার চিকিৎসা বিদ্যার সাথে এর সরাসরি যোগাযোগ না থাকলেও, প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতির বিভিন্ন ধারণা ও প্রাকৃতিক চিকিৎসার চিন্তাধারা হোমিওপ্যাথির বিকাশে পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলতে পারে।
হোমিওপ্যাথির মূল ধারণা হলো ‘‘সদৃশ দ্বারা সদৃশ নিরাময়’’—অর্থাৎ, যে উপাদান স্বাস্থ্যকে অসুস্থ করে, খুবই অল্প পরিমাণে সেই উপাদানই শরীরকে সুস্থ করতে পারে। হোমিওপ্যাথিতে সাধারণত খুবই পাতলা এবং পরিমিত পরিমাণে ঔষধ ব্যবহার করা হয়, যা প্রাকৃতিক উপাদান, উদ্ভিদ, খনিজ বা অন্যান্য উৎস থেকে নেওয়া হয়। হোমিওপ্যাথির চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যক্তির সার্বিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেয়, এবং চিকিৎসার সময় রোগীর মনের এবং শারীরিক অবস্থার সমন্বয় করা হয়। অনেক মানুষ এটি ব্যবহার করে থাকে তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য।
বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বেশ জনপ্রিয়, এবং বহু মানুষ এটি ব্যবহার করেন। দেশে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার জন্য অনেক ক্লিনিক এবং বিশেষজ্ঞ আছেন, যারা বিভিন্ন ধরনের রোগের জন্য হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা প্রদান করেন। বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথি একটি প্রশস্ত ও জনপ্রিয় চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশে প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা গ্রহণ করেন, অর্থাৎ স্বাস্থ্য বিভাগের মোট রোগীদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই হোমিওপ্যাথির ওপর নির্ভর করেন।
ডাঃ এম এ মামুন ভূঁইয়া,
সিনিয়র কনসালটেন্ট
ইবনে সিনা হোমিও কেয়ার ।