07/03/2026
নটরডেম ডিবেটিং ক্লাবের অতীতকে বর্তমানের সাথে যুক্ত করার প্রয়াসে, উত্তরাধিকারকে জীবন্ত করে তোলার আকাঙ্ক্ষায়, ৩৩তম সংখ্যার ন্যায় ৩৪তম দ্বৈরথ সংখ্যায়ও যুক্ত হয়েছিল ব্যতিক্রমী সংযোজন, কালের বিবর্তনে এনডিডি, নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাবের স্বর্ণযুগের পথিকৃৎ বিতার্কিকদের সাক্ষাৎকার। এ সংখ্যায় আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম ২০০৭-০৮ সালের এনডিডিসি গোল্ড এর প্রাক্তন বিতার্কিক এবং প্রেসিডেন্ট (এডমিন) নাজমুল হোসেন অভির সাথে। তার হাত ধরেই সূচনা হয়েছিল বর্তমান সময়ের তুমুল জনপ্রিয় টুর্নামেন্ট "ডিবেটার্স লীগের", সেই সাক্ষাৎকারের উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরা হলো।
দ্বৈরথ: নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাবের প্রথম ডিবেটার্স লিগ-এর অন্যতম আয়োজক ছিলেন আপনি, যা আজ দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বিতর্ক প্রতিযোগিতা। যখন ইতোমধ্যে প্রতি বছর ন্যাশনালস-এর মতো বড় আয়োজন হতো, তখন এমন একটি নতুন প্রতিযোগিতার ধারণা কীভাবে এলো? এর পেছনে আপনাদের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?
নাজমুল হোসেন অভি : প্রতি বছর নটর ডেম ডিবেটিং ফেস্টের মূল আকর্ষণ ছিল ন্যাশনালস। আমি আর আমার কয়েকজন বন্ধু যখন ক্লাবে সময় কাটাতাম, তখনই ডিবেটার্স লিগ-এর ধারণা মাথায় এসেছিল। ন্যাশনালস-এর নকআউট সিস্টেম আমাদের খুব পছন্দ ছিল, কিন্তু এটার একটা সমস্যা ছিল। ন্যাশনালস-এ প্রতিটি বিতর্কই নকআউট—একটি ম্যাচ হারলেই বাদ। এতে অনেক ভালো দলও প্রথম রাউন্ডে বাদ পড়ে যেত। অথবা এমন কোনো দল, যারা আরও কয়েকটি বিতর্ক করলে নিজেদের উন্নতি করতে পারত, তারা সেই সুযোগ পেত না। প্রতিটি বিতর্কে তাই প্রচণ্ড চাপ থাকত। এই চিন্তা থেকেই ডিবেটার্স লিগ-এর ধারণা এলো।
আমি ব্যক্তিগতভাবে ফুটবলের ভীষণ ভক্ত। ছোটবেলা থেকে ফুটবল খেলি এবং পছন্দ করি। ফুটবলের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ-এর ফরম্যাট আমার খুব প্রিয় ছিল। তাই আমরা ভাবলাম, বিতর্কে কীভাবে এমন একটা ফরম্যাট আনা যায়? আমরা চেয়েছিলাম, বড় বড় দলের পরিবর্তে কাছাকাছি মানের দলগুলো এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিক। এতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়বে এবং দলগুলোর উন্নতির সুযোগও থাকবে। আমার ধারণা ছিল, একটি প্রতিযোগিতায় যদি একটির বদলে চারটি বিতর্ক করার সুযোগ পাওয়া যায়, তাহলে বাদ পড়ার আগে প্রতিটি দল অনেক কিছু শিখতে পারবে। এভাবেই ডিবেটার্স লিগ-এর ধারণা জন্ম নেয়।
প্রথম ডিবেটার্স লিগ আয়োজনের সময় আমরা পর্যাপ্ত স্পনসর জোগাড় করতে পারিনি। কারণ, সবার আকর্ষণ ছিল ন্যাশনালস-এর দিকে। তাই আমাদের কলেজের আর্থিক সহযোগিতা নিতে হয়েছিল। আমরা প্রায় ২৫-২৬ হাজার টাকার সহযোগিতা নিয়েছিলাম। আমরা কলেজ কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করে বলেছিলাম, যদি একবার ডিবেটার্স লিগ সফলভাবে আয়োজন করা যায়, তাহলে এটা ক্লাবের দ্বিতীয় বড় আকর্ষণ হয়ে উঠবে। আমার মনে হয়েছিল, বাংলাদেশে কলেজ লেভেলে এমন একটি কার্যকর বিতর্ক টুর্নামেন্টের প্রয়োজন ছিল, কারণ এমন কিছু তখন আর কোথাও ছিল না।
ডিবেটার্স লিগ-এর সাফল্য অনেকাংশে সম্ভব হয়েছিল ভলান্টিয়ারদের কঠোর পরিশ্রম এবং সিনিয়রদের অক্লান্ত সময় দেওয়ার কারণে। আরেকটা কথা না বললেই নয়—ভিকারুননিসা, হলি ক্রস, ঢাকা কলেজের মতো অন্যান্য ডিবেটিং ক্লাবগুলো আমাদের এই আয়োজনে অনেক সহযোগিতা করেছিল। তাদের ছাড়া ডিবেটার্স লিগ আয়োজন করা অনেক কঠিন হতো। আমার মতে, ডিবেটার্স লিগ-এর মতো টুর্নামেন্ট বিতার্কিকদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের এবং নিজেদের উন্নতির দুয়ার খুলে দেয়।
দ্বৈরথ: ডিবেটার্স লিগ-এ বিতার্কিকদের নিলাম বা অকশন ফরম্যাটের ধারণা কীভাবে এলো? এই উদ্ভাবনী চিন্তার পেছনে কী ছিল?
অভি : অকশনের ধারণাটা আমার মাথা থেকেই এসেছিল। তিনটি ডিবেটার্স লিগ আয়োজনের পর লক্ষ করলাম, লিগটা কিছুটা একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে। কারণ, এতে নতুন বা উদ্ভাবনী কিছু ছিল না। অনেকে বলতে শুরু করলেন, “ন্যাশনালস-এ নটর ডেম আর ঢাকা কলেজের দলগুলো ডিবেট করে, আর ডিবেটার্স লিগ-এও একই দলগুলো। তাহলে নতুনত্ব কোথায়?” এই প্রশ্নটা আমার মাথায় ঘুরতে লাগল।
তখন আমি ইউনিভার্সিটিতে উঠে গেছি। গ্রুপ অফ ডিবেটার্স (G.O.D)-এর হয়ে ফার্স্ট ইয়ারে বিতর্ক শুরু করেছি। সেই সময় অভিষেক জামান ছিলেন বাংলাদেশের একজন তারকা বিতার্কিক—একজন কিংবদন্তি। তিনি আমার দুই বছরের সিনিয়র। আমি তাঁর বিতর্ক দেখে বড় হয়েছি। তাঁর সঙ্গে একই টিমে বিতর্ক করা ছিল আমার জন্য বিশাল ব্যাপার। শুরুতে এটা আমার উপর চাপ সৃষ্টি করলেও, তাঁর সঙ্গে বিতর্ক করতে গিয়ে আমি অনেক কিছু শিখলাম। এই শিক্ষা কলেজে চার-পাঁচটা বিতর্ক করেও পেতাম না। তখন আমার মাথায় এল, “যদি ডিবেটার্স লিগ-কে আইপিএলের মতো করে ফেলি?” আইপিএল তখন দুটি সিজন পার করেছে। সেখানে রঞ্জি ট্রফির খেলোয়াড়রা ধোনির মতো সিনিয়রদের সঙ্গে খেলার সুযোগ পায়। আমার মনে হল, এটা ডিবেটার্স লিগ-এর জন্য চমৎকার মডেল হতে পারে।
এই ধারণা নিয়ে আমি নিলয়, ফারাবী আর সাঈদের সঙ্গে আলোচনা করলাম। তারা তখন এক্সিকিউটিভ প্যানেলে ছিলেন—নিলয় জোসেফাইট, ফারাবী গভর্নমেন্ট ল্যাব, আর সাঈদ মতিঝিল আইডিয়াল থেকে। তাঁরা তিনজনই প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তবে এর আগে আমি আমার পরের ব্যাচের মারজুক আর নির্ঝরের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তারা একেবারেই রাজি ছিল না! বলল, “ভাই, আপনি অনেক এক্সপেরিমেন্ট করছেন। এবার জিনিসটা নষ্ট হয়ে যাবে। এটা পোলাপানের মাথায় ঢুকলে তারা গ্যাম্বলিং করবে, আরও কী কী করবে!” আমি বললাম, “এখানে তো টাকা নেই। আমরা কাল্পনিক মুদ্রা দিয়ে করব।” নিলয়রা কিন্তু এই ধারণায় খুব উৎসাহিত ছিল। কারণ, এটা তাঁদের জন্য একটা সুযোগ ছিল নতুন কিছু প্রবর্তনের। তিন বছর পর আমরা একটা নতুন ফরম্যাট নিয়ে এলাম।
মজার ব্যাপার, প্রথম অকশনে আমিই ছিলাম সবচেয়ে দামি বিতার্কিক। কিন্তু এটা আমার জন্য একটা বিপদও হয়ে দাঁড়াল। আমরা A+, A, B ক্যাটাগরির বিতার্কিকদের একটা তালিকা তৈরি করেছিলাম। আমাকে তখন তারান্নুম আপা কিনেছিলেন। তিনি আমাকে এত বেশি দামে কিনেছিলেন যে বাকি দুজন বিতার্কিক কেনার জন্য তাঁর কাছে পর্যাপ্ত মুদ্রা ছিল না। তিনি আমাকে টিমে নিতে খুব আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু এতে আমার উপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে গেল। আমার সঙ্গে যে দুজন বিতার্কিক দেওয়া হলো, তাঁদের নিয়ে আমাকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছিল। আমরা ছয়টা বিতর্ক করেছি, কিন্তু মাঝখানে আমি প্রচণ্ড চাপ অনুভব করছিলাম। কারণ, আগের দুটি ডিবেটার্স লিগ-এ আমি চ্যাম্পিয়ন এবং সেরা বিতার্কিক হয়েছিলাম। তাই আমাকে ঘিরে অনেক প্রত্যাশা ছিল।
আমি বলব না, আমার সঙ্গের দুজন বিতার্কিক খারাপ ছিলেন। একজন পরে বুয়েটে বিতর্ক করেছেন, আরেকজন নটর ডেমের ব্লু টিমে ছিলেন। তাঁরা খারাপ ছিলেন না। কিন্তু অন্য টিমগুলো একটা ভারসাম্যপূর্ণ দল গঠন করেছিল। তারা স্টার বিতার্কিকদের পেছনে না গিয়ে ব্যালেন্সড টিম তৈরি করে ভালো করেছিল। যাই হোক, সেই টুর্নামেন্টে আমি ছয়টা বিতর্ক করেছিলাম। প্রথমে কিছুটা হতাশ ছিলাম, কিন্তু পরে দেখলাম, ডিবেটার্স লিগ-এর মূল লক্ষ্য—নতুন বিতার্কিকদের শেখার সুযোগ দেওয়া—পূরণ হচ্ছে। আমার সঙ্গে যে দুজন বিতর্ক করেছিলেন, তাঁরা অনেক উপকৃত হয়েছিলেন। পরে তাঁদের সঙ্গে অনেকদিন ধরে কথা হয়েছে, আড্ডা দিয়েছি। এই বিষয়টা আমাকে খুব আনন্দ দিয়েছিল। জেতাই আমার একমাত্র লক্ষ্য ছিল না; নতুন বিতার্কিকদের শেখার সুযোগ তৈরি করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
পরের ডিবেটার্স লিগ-এ আমরা নটর ডেম গোল্ডের তুরাগ, ফাহমি আর আবিরের কাছে ফাইনালে হেরে গিয়েছিলাম। এরপর সিদ্ধান্ত হলো, মিক্সড টিম আর করা হবে না, কারণ ভালো ভারসাম্যপূর্ণ টিম গঠন করা কঠিন। তাই আমরা ডিবেটার্স লিগ-কে ইন্টার-ক্লাব ফরম্যাটে নিয়ে গেলাম। এতে আমার মতো কয়েকজন বিতার্কিকের একচেটিয়া আধিপত্য কমে গেল। আমি প্রায়ই টুর্নামেন্টের সেরা বিতার্কিক হতাম বা ফাইনালে যেতাম, কিন্তু এই ফরম্যাটে গ্রুপ অফ ডিবেটার্স আর নটর ডেম গোল্ড ফাইনালে মুখোমুখি হলো। আমার টিমে ছিলাম আমি, ইয়াসিন শাফি আর সৌরভ ভাই। আমরা নটর ডেম গোল্ডের কাছে হেরে গেলাম। এটা গোল্ডের জন্য রেগুলার ছিল। কলেজে থাকতেও আমরা নটর ডেমের হয়ে যেমন বড় ক্লাবদের হারিয়ে এসেছি এখন জিওডি থেকে এসে গোল্ডের কাছে হেরেছি। প্রথমে খারাপ লাগলেও, দুই-তিন সপ্তাহ পর ভালো লাগল। কারণ, নটর ডেম থেকে এত ভালো টিম উঠে আসছে।
দ্বৈরথ: ডিবেট ক্লাবের প্রতি আবেগ এবং ভালোবাসা কেমন কাজ করে? ক্লাবের মধ্য থেকে যে সম্পর্কগুলো গড়ে উঠেছিল, এগুলো এখনো টিকে আছে কি? তাছাড়া, জীবনের এই পর্যায়ে এসে যখন মূল্যায়ন করেন, এনডিডিসি থেকে কী পেয়েছেন?
অভি : ক্লাবের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা বোঝানোর জন্য একটা ঘটনা বলি। আমি যখন ইউরোপে পিএইচডি করছিলাম, তখন একদিন ক্লাবের ফেসবুক পেজে দেখলাম যে নটর ডেম কলেজ নাকি আর ইন্টার-ক্লাব টুর্নামেন্ট করবে না। এটা আমাকে খুব মর্মাহত করেছিল। ভাবলাম, তাহলে আমরা কোথায় দাঁড়াব? নটর ডেম কলেজ যদি ক্লাব ডিবেট না করে, তাহলে আমরা নিজেদের কী-ই বা প্রমাণ করব? আমরা তো প্রতি বছরই ভিকারুননিসা, ঢাকা কলেজের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে চ্যাম্পিয়ন হই। আমার আসল প্রতিদ্বন্দ্বিতা তো বুয়েটের বুয়েটডিসি বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওডি’র সঙ্গে। এই খবরে আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। তখনই আমরা কয়েকজন সিনিয়র একটা জুম কলে জয়েন করেছিলাম। কারন আমরা এই ক্লাব নিয়ে এতটাই আবেগপ্রবণ। এখনো সেই অনুভূতি একই রকম।
কিন্তু না এসে, না যোগাযোগ করলে কী হয়? সেই অনুভূতিগুলো ধীরে ধীরে কমতে থাকে। যেমন বলা যায়, out of sight, out of mind। তবে কিছু সম্পর্ক এখনো অটুট আছে। যেমন, মিনহাজ—২০০৭-০৮ সালের প্রচার ও প্রকাশনা সভাপতি—গতকাল আমার বাসায় ছিল। ও ইউএস থেকে এসেছে। আমরা একসঙ্গে ফ্যামিলি টাইম কাটিয়েছি। ও জানতে পেরে খুব উৎসাহিত হয়েছে যে আমি আজ কলেজে আসছি। বলল, “তুই আমাকে আগে বলিসনি কেন? তাহলে আমি কালকের সময়টা ফ্রি রাখতাম, তোর সঙ্গে যেতাম।” আমি বললাম, “তুই ইউএস থেকে এসে এত কম সময়ের মধ্যেও আমার সঙ্গে দেখা করতে ভুলিসনি।” এভাবেই এই সম্পর্কগুলো কাজ করে। এত বছর দূরে থাকলেও কিছু বন্ধন এখনো টিকে আছে।
এনডিডিসি আমাকে কী দিয়েছে? নটর ডেম গোল্ডে বিতর্ক করার সময় আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসরদের সঙ্গে চা খেয়েছি, আড্ডা দিয়েছি। তারা আমার সঙ্গে বিতর্ক নিয়ে কথা বলতেন না। বাংলাদেশের রাজনীতি, উন্নয়ন, পলিটিক্স নিয়ে কথা বলতেন। কলেজ ছাত্র হিসেবে সেখানে আমার যে শিক্ষা হয়েছে, তা আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমেও পাইনি।
আমি যখন অনির্বাণ ভাইয়ের সঙ্গে আড্ডা দিতাম—ডিএফআইডির প্রাইভেট সেক্টর অ্যাডভাইজার, নটর ডেম গোল্ডের অন্যতম সেরা বিতার্কিক—তিনি আমার সবকিছুর মেন্টর ছিলেন। অনির্বাণ ভৌমিকে ভাই কে দেখে আমি ঠিক করেছিলাম, উন্নয়ন খাতে চাকরি করব। এবং বিপ্লব কুমার দত্ত ভাইকে দেখে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ইকোনমিকসে পড়বো নটর ডেম গোল্ডে থাকতে আমি অনির্বাণ ভাই, বিপ্লব ভাইদের দেখতাম। তারা ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সেমিনারে যেতেন, পেপার পাবলিশ করতেন, এত ভালো বিতার্কিক ছিলেন। আমি ভাবতাম, তারা যদি নটর ডেম গোল্ড থেকে এটা করতে পারে, তাহলে আমিও পারব।
বিতর্ক আমার ক্যারিয়ারে সাহায্য করেছে। যদি কোনো জুনিয়র আমাকে দেখে মনে করে, “আমিও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় কাজ করতে পারি,” সেটাই আমার আসল অর্জন। আমার আজকের এই অবস্থানে আসার জন্য এবং এত অভিজ্ঞতার সঙ্গে নটর ডেম কলেজ এবং এই ক্লাবের অবদান জড়িত.
দ্বৈরথ: বিতর্ক অঙ্গনে দেখা যায় জুনিয়রদের উপর সিনিয়রদের ছায়া থাকে, হতে পারে সেটা স্নেহের কিংবা কিছুটা কর্তৃত্বের। এই বিষয়ে আপনি কী মনে করেন?
অভি : আমার কথা খুব সহজ। সিনিয়রদের প্রভাব কোনো ভালো জিনিস নয়। ফুলস্টপ। এখানে কোনো তর্ক নেই। সিনিয়ররা যদি প্রভাব ফেলে, তবে সেটা ক্লাবের জন্য ভালো না, এক্সিকিউটিভ কমিটির (ইসি) জন্য ভালো না, এমনকি কলেজের জন্যও ভালো না। তবে মনে রাখতে হবে, সিনিয়রদের ইতিবাচক প্রভাব খারাপ নয়। এটা মাথায় রাখো। আমি তোমাদের একটা সহজ উদাহরণ দিই।
আমরা একটা স্ট্যান্ডার্ড জাজমেন্ট শিট চালু করেছিলাম। দেখো, আমি তখন কাজ করছিলাম এই ভেবে যে বিতর্ক সার্কেলে জাজমেন্ট শিট একেক জায়গায় একেক রকম। নটর ডেমে এক রকম, ভিকারুননিসায় আরেক রকম, এক ভার্সিটিতে আরেক রকম। আমার পরিকল্পনা ছিল, সবকিছু সরিয়ে সব জায়গায় পার্লামেন্টারি বিতর্কের জন্য একটা স্ট্যান্ডার্ড জাজমেন্ট শিট তৈরি করা। এজন্য আমি একটা জাজেস সামিট আয়োজন করেছিলাম। এটা আমার প্ল্যান ছিল। আমরা সেই জাজমেন্ট শিট পাবলিশ করে ক্লাবের কনস্টিটিউশনে যুক্ত করেছিলাম। জানি না, এখনো সেটা কনস্টিটিউশনে আছে কিনা। কিন্তু পয়েন্ট হলো, জাজমেন্ট শিট হওয়া উচিত একটা স্ট্যান্ডার্ড জাজমেন্ট শিট।
এই ধরনের চিন্তা আমরা ছোটবেলা থেকেই শিখেছি। বড় করে ভাবতে শিখেছি। বিতর্কের বাইরে, টপিকের বাইরে, কে চ্যাম্পিয়ন হলো বা হলো না, তার বাইরে। জাজমেন্ট শিট পরিবর্তন করা একটা কৌশলগত চিন্তাভাবনা। এই ধরনের সকল কাজে সিনিয়ররা অনেক সাহায্য করেছেন। ক্লাবের যত টুর্নামেন্ট হতো, সেগুলোতে সিনিয়র ভাইয়ারা বড় স্টেকহোল্ডার ছিলেন। তাঁদের ছাড়া টুর্নামেন্টগুলো আয়োজন করা সম্ভবই ছিল না।
কিন্তু কখনো কখনো মনে হতো, তাঁদের প্রভাব এত বেশি যে আমরা নিজেরা কাজ করতে পারছি না। কিছু ঘটনায় সিনিয়রদের আচরণে কষ্টও পেয়েছি। তবে দিনশেষে এই সিনিয়ররাই আমাদের ভুল ধরিয়ে দিতেন। বলতেন, “অভি, এই জায়গাগুলোয় কাজ কর, এখানে সুযোগ আছে।” বা “তারেক, হাসান, মিনহাজ, তোমরা এই জায়গাগুলোয় কাজ করো।” তখন আমরা বুঝতাম, আসলেই তো, এই জায়গাগুলোয় কাজ করার সুযোগ আছে। তাই আমরা সেটা করতাম।
তাই আমি মনে করি, হয়তোবা সিনিয়রদের অতিরিক্ত প্রভাব ভালো না। কিন্তু তাঁদের ইতিবাচক নির্দেশনাগুলোই তোমাকে ভালো কিছু করতে উৎসাহিত করবে, সেটা অবশ্যই মূল্যবান।
দ্বৈরথ: আপনি যখন সিদ্ধান্ত নেন বিতর্ক ছেড়ে দেবেন, তখন আনুষ্ঠানিকভাবে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছিলেন এবং নটর ডেমের টুর্নামেন্টে এসে বিতর্ক থেকে অফিশিয়ালি “রিটায়ার” করেন। সেই গল্পটা জানতে চাই।
অভি : এটা আমার জন্য খুবই বিশেষ ছিল, কারণ আমার শেষ বিতর্কটা ছিল নটর ডেম কলেজে—নটর ডেম ন্যাশনাল টুর্নামেন্টে, ২০১২ সালে। ওটাই ছিল আমার শেষ বিতর্ক। আর আমি কিছু বাজে ট্রেন্ড শুরু করেছিলাম, সেটার দায় আমি নিজেই নেব। আমি বিতর্ক ছেড়ে দেওয়ার আগে একটা রিটায়ারমেন্ট টাইপের ফেসবুক পোস্ট দিয়েছিলাম। আমার মনে হয়, আমিই প্রথম এটা করি। এজন্য আমাকে অনেক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। অনেক সিনিয়র আমাকে বেশ ধোলাই দিয়েছেন!
নটর ডেম টুর্নামেন্ট শুরুর দুই সপ্তাহ আগে আমি লিখেছিলাম, “দুই সপ্তাহ পর এই টুর্নামেন্টে আমার শেষ বিতর্ক হবে। এরপর আমি আর বিতর্ক করব না।” এই পোস্টটা এখনো আছে। সেদিনও একজন বলল, “ভাই, তুমিই এই ট্রেন্ড শুরু করেছ, আর এটা এখনো চলছে!” খারাপ কিছু করেছি আরকি।
ওই টুর্নামেন্টটা আমার জন্য একটা স্বপ্নের মতো ছিল। ফাইনালে হেরিংটনের ২০১ নম্বর রুমে, ভর্তি অডিয়েন্সের সামনে আমি শেষ বক্তব্য দিলাম। পুরো রুম দাঁড়িয়ে গেল স্ট্যান্ডিং ওভেশন দিতে। এটা আমার জীবনের শেষ বিতর্ক বলে নয়, বরং সেদিন আমি আমার জীবনের সেরা বিতর্ক পারফরম্যান্স দিয়েছিলাম। সেই পারফরম্যান্সের জন্যই সবাই দাঁড়িয়েছিল। এমনকি সানা ভাইয়ের মতো সিনিয়ররাও দাঁড়িয়েছিলেন।
সানা ভাই পরে স্টেজে কিছু কথা বলেছিলেন, যেগুলো আমার চিরদিন মনে থাকবে। সানা ভাই ছিলেন আমার মেন্টর, আমার বড় ভাই, G.O.D-এর একজন কিংবদন্তি। তিনি বলেছিলেন, “আজ ছিল অভির দিন। আজ যে কেউ ভালো বিতর্ক করলেও কাজ হতো না।” আমি শেষ বিতর্কটা কোনো স্ক্রিপ্ট ছাড়াই করেছিলাম। শুধু দাঁড়িয়ে কথা বলেছি। সানা ভাই নিজেই বলেছিলেন, “আর এক-দুই মিনিট বেশি কথা বললে আমি নিজেই কেঁদে দিতাম।”
টপিকটা বাংলাদেশের কী নিয়ে ছিল, ঠিক মনে নেই। তবে আমি বাংলাদেশের মানুষকে বেশ ধোলাই দিয়েছিলাম। আর ওই টুর্নামেন্টে আমি বেস্ট ডিবেটারও হয়েছিলাম। যখন অডিটোরিয়ামে পুরস্কার নিতে গেলাম, তুরাগ খুব সিনেমাটিকভাবে ঘোষণা দিল, “আমাদের সবার বিতর্ক এভাবে শেষ হয় না…” তখন আবার পুরো অডিটোরিয়াম দাঁড়িয়ে স্ট্যান্ডিং ওভেশন দিয়েছিল। ছবিগুলো এখনো আছে। শুভজিৎ মজুমদার সেগুলো আপলোড করেছিল। এই কারণে নটর ডেম কলেজ আমার কাছে খুব আবেগের জায়গা।
দ্বৈরথ: অনেক বিতার্কিক তাঁদের বিতর্ক ক্যারিয়ারকে দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে যান, কিন্তু আপনি তারকা বিতার্কিক হওয়া সত্ত্বেও ভার্সিটি লাইফে খুব তাড়াতাড়ি বিতর্কের ইতি টেনে ফেলেছিলেন। এর পেছনের কারণ কী?
অভি : বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রুপ অব ডিবেটারস (G.O.D)-এর হয়ে তিন বছরে আমি অনেক বিতর্ক করেছি। তিন বছরে ১৯টি টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছি, ১৭টি ফাইনালে গেছি, দুটিতে রানার্স-আপ হয়েছি, আর ১৫টি চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছি। আমি সেই ধরনের বিতার্কিক ছিলাম না, যে খুব সুন্দর বাংলা বলে মানুষকে মুগ্ধ করে ফেলে। বরং আমি এমন ছিলাম, যে টুর্নামেন্ট জিততে পারে। মেসি রোনাদলোর সাথে তুলনা করলে আমাকে রোনালদোর কাতারে রাখতে পারো!
আমি তিন বছরের বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্ক করিনি। অনেককে দেখেছি, তারা মাস্টার্সের পরেও বিতর্ক করে। এটা আমার ভালো লাগে যে তারা এটাকে পেশাদারভাবে নেয়, কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয়, বিতর্ক ছাড়া তাদের আর কিছু করার নেই।
একটা জিনিস আমি লক্ষ্য করেছি। আমার দেখা ৯৬-৯৭ শতাংশ বিতার্কিক তাঁদের অহংকার থেকে বের হতে পারেন না। এটা খারাপ। আমিও একসময় তেমন ছিলাম। আমি বলব না আমি ধোয়া তুলসীপাতা ছিলাম। আমি নিজেও অনেক অহংকারী ছিলাম। কিন্তু এই অহংকার যদি দীর্ঘদিন চলতে থাকে, তাহলে এটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
সেদিন বিটিভিতে লেবার মার্কেট নিয়ে একটা বিশেষ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। উদ্ভাসের একটা ক্যারিয়ার আড্ডাতেও বাবলা আমাকে ডেকেছিল। এসব জায়গায় গিয়ে বুঝতে পারি, বিতর্কের অভিজ্ঞতা আমাকে পাবলিক প্ল্যাটফর্মে কথা বলতে কতটা সাহায্য করেছে। তবে এটা নিয়ে বেশি গর্ব করা উচিত নয়। কারণ এটা শুধুই একটা “এড-অন”। এড-অনের ওপর ভর করে তুমি জীবনের ২৪-২৫ বছর কাটাতে পারো না। দিনশেষে এটা একটা সহশিক্ষা কার্যক্রম।
আমি অনেক বিতার্কিককে দেখেছি, যারা তাদের কমিউনিকেশন স্কিলের ওপর ভর করে ক্যারিয়ার গড়েছেন। যেমন, কেউ কেউ জাতিসংঘের কমিউনিকেশন সেক্টরে কাজ করছেন, কেউ সাংবাদিকতায়। কিন্তু আমার মনে হয়, বিতর্ক শুধু একটা টুল, পুরো ক্যারিয়ার নয়।
সম্পূর্ণ ইন্টারভিউ পড়তে: https://tinyurl.com/kaler-bibortone-nddc