24/04/2018
থ্যালাসেমিয়া কী ও প্রতিরোধে করণীয়
আবু মিয়া, ১২ বছর বয়সের এক কিশোর। এই বয়সে তার স্কুলে যাওয়ার কথা, ফুটবল বা ক্রিকেট নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে মেতে ওঠার কথা, স্বপ্নে বিভোর থাকার কথা; বড় হওয়ার স্বপ্ন, সুস’ভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। অথচ এসবের কিছুই সে করছে না। কারণ, তার শরীর খুব দুর্বল, তার পেটের দুটো চাকা (Mass) দিন দিন বেড়েই চলেছে। সে একজন থ্যালাসেমিয়া রোগী। ৩ বছর বয়সেই তার এ রোগ ধরা পড়ে। তার ছোট ভাইটিও একই রোগে আক্রান্ত। ডাক্তার বলেছিলেন, এক মাস পর পর নিয়মিত রক্ত দিলে সে সুস্থ থাকবে।
কিন্তু রক্ত দেয়ার জন্য হাসপাতালে যাওয়া-আসা আর নিয়মিত রক্ত জোগাড় করা তার দরিদ্র পিতার জন্য একটা কঠিন কাজ। তাই সে নিয়মিত রক্ত নিতে আসতে পারে না। যখন শরীরের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়, তখন তার পিতা তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। বেশ কিছু দিন ধরে ডাক্তার লৌহ অপসারণকারী ওষুধের কথা বলছেন। কিন্তু এসব দামি ওষুধ কেনা তাদের পক্ষে দুঃসাধ্য। তাই সে আর স্বপ্ন দেখে না। সে এখন ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছে। এই আবু মিয়া আমাদের শিশু বিভাগের একটি পরিচিত মুখ। বাংলাদেশে এরকম আবু মিয়ার সংখ্যা অনেক। এদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
থ্যালাসেমিয়া কী?
থ্যালাসেমিয়া রক্তের এক ধরনের মারাত্মক রোগ। থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুদের শরীরে রক্তের মূল্যবান উপাদান হিমোগ্লোবিন ঠিকমত গঠিত হয় না এবং রক্তের লোহিত কণিকা স্বাভাবিক সময়ের আগে ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে রোগী রক্ত শূন্যতায় ভোগে ও শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে অতিরিক্ত আয়রন জমা হয়ে নানা ধরনের জটিলতার সৃষ্টি করে।
থ্যালাসেমিয়া রোগ কিভাবে বিস্তার লাভ করে?
থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রোগ। যে বংশে এ রোগ আছে, সেই বংশের লোকজনই বংশানুক্রমে এটা বহন করে। পিতা মাতা থেকে সন্তানদের মধ্যে এ রোগ জিনের (Gene) মাধ্যমে প্রবেশ করে।
বাহক (Carrier) কি?
যাদের শরীরে থ্যালাসেমিয়া রোগের জিন আছে, কিন্তু রোগের কোনো উপসর্গ প্রকাশ পায় না, তাদের থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক বলা হয়। এরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। তবে এরা এদের সন্তানদের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া রোগের বিস্তার ঘটায়। পিতা-মাতা উভয়েই বাহক হলে থ্যালাসেমিয়া শিশুর জন্ম হওয়ার সম্ভাভবনা থাকে, নতুবা নয়। যে কেউ থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক হতে পারে। কাজেই বিয়ের আগে সবারই জেনে নেয়া দরকার, তিনি থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক কি-না।
কেউ থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক কি-না তা কিভাবে জানা যাবে?
এটা জানতে হলে রক্তের বিশেষ ধরনের পরীক্ষা করাতে হবে। আমাদের দেশে যে পরীক্ষা দ্বারা এটা নির্ণয় করা হয়, তাকে ‘হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস’ বলা হয়।
থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধের উপায়
আধুনিক বিশ্বে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতির ফলে অনেক রোগকে নিরাময় এবং অনেক রোগকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। এই থ্যালাসেমিয়া রোগও প্রতিরোধ করা সম্ভব। এই জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নিতে হবে-
১. দেশের প্রতিটি নাগরিককে এই রোগ সম্বন্ধে সচেতন করে তুলতে হবে। এজন্য বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম যথা- টেলিভিশন, রেডিও, খবরের কাগজ ইত্যাদিতে প্রচার কার্যক্রম চালাতে হবে। তাছাড়া বিশেষ ক্রোড়পত্র, পোস্টার, লিফলেট ইত্যাদি নিয়মিত বিতরণ করতে হবে। কেননা সচেতনতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রচারের চেয়ে ভালো অন্য কোনো বিকল্প নেই।
২. থ্যালাসেমিয়া মহামারি হতে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, এ রোগের বাহকদের শনাক্ত করা। এজন্য ব্যাপক স্ক্রিনিং কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। বাহকদের চিহ্নিত করে তাদের প্রত্যেককে বংশবিষয়ক পরামর্শ দিতে হবে। দুজন বাহক যদি একে অন্যকে বিয়ে না করে তাহলে কোনো শিশুরই থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জš§গ্রহণ করা সম্ভব নয়।
৩. যদি কোনো কারণে দুজন বাহকের মধ্যে বিয়ে হয়েও যায়, তাহলে সন্তান গর্ভধারণের অনতিবিলম্বে বিশেষ ধরনের পরীক্ষার দ্বারা নির্ণয় করা যায় গর্ভস্থিত সন্তান সুস্থ হবে, না-কি থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হবে। এই পরীক্ষাকে ‘প্রি-নেটাল ডায়াগনোসিস’ বলে। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ও ঢাকা শিশু হাসপাতালে এই পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে। এটা গর্ভাবস্থার ১৬ সপ্তাহ বা এর পর করা যায়।
এই পরীক্ষার ফলে যদি দেখা যায়, সন্তান থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে তবে তারা আগত সন্তানের মারাত্মক পরিণতির কথা চিন্তা করে গর্ভপাত করানোর সুযোগ গ্রহণ করতে পারে। এভাবে আক্রান্ত সন্তান প্রতিরোধ করা সম্ভব।
যদি উপরোল্লিখিত পদক্ষেপসমূহ আমাদের দেশে নেয়া হয়, তবে হয়তো একদিন আমাদের দেশ থেকে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে। উদহারণ স্বরূপ বলা যায়, সাইপ্রাসে এক সময় থ্যালাসেমিয়া খুব বেশি ছিল। উপযুক্ত প্রচার এবং প্রতিরোধের ফলে তা আজ প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে।
উপদেশ এবং বংশবিষয়ক পরামর্শ
যে সমস্ত পরিবার থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক কিংবা রোগে আক্রান্ত, তাদের নিম্নলিখিত পরামর্শগুলো অবশ্যই মনে রাখতে হবে এবং মেনে চলতে হবে। (১) থ্যালাসেমিয়া বংশগত রোগ। পিতা-মাতা থেকে সন্তানদের মধ্যে জিনের মাধ্যমে প্রবেশ করে। যে বংশে এই রোগ থাকে, সেই বংশের লোকজনই বংশানুক্রমে এটা বহন করে।
(২) যে পরিবারে থ্যালাসেমিয়া রোগ আছে, সেই পরিবারের পিতা-মাতা, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়ে ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন সবাইকে হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস করার জন্য পরামর্শ দিতে হবে।
(৩) যারা থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক, তাদের নিজের বংশের কাউকে, যেমন- চাচাত, ফুফাত, মামাত, খালাত ভাই-বোনকে জীবন সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করা উচিত হবে না। যাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিবে সে ক্ষেত্রেও সাবধানতা অবলম্বন করা শ্রেয়। সম্ভব হলে বিবাহের পূর্বে রক্ত পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে, তারা থ্যালাসেমিয়া রোগ থেকে মুক্ত কি না।
(৪) মনে রাখতে হবে, যারা থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক তারা যদি অন্য একজন থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহককে বিবাহ করেন তবে রোগাক্রান্ত সন্তান জন্ম হওয়ার আংশকা থাকে। এই কারণেই তাদের উচিত হবে বাহক নয় এমন কারো সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। তাহলে রোগাক্রন্ত সন্তান জন্ম হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না।
(৫) যদি স্বামী এবং স্ত্রী উভয়ই থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক হয় এবং স্ত্রী যদি গর্ভবতী হয়, ‘প্রি-নেটাল ডায়াগনোসিস’ করার পরামর্শ দিতে হবে। আসুন, আপনি, আমি, সকলে মিলে থ্যালাসেমিয়া রোগের বিরুদ্ধে গড়ে তুলি সর্বময় প্রতিরোধ।
লেখক: ডা. মুজিবুল হক
সহকারী অধ্যাপক, শিশু বিভাগ
সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ।
মানবকণ্ঠ/এফএইচ