25/07/2020
"হসপিটাল ফার্মেসী" শুধুই কি স্বপ্ন নাকি আছে বাস্তবতা?
কিছু সত্য চিরন্তন হলেও তা অপ্রিয়! আর কিছু স্বপ্নের নেই কোনো বাস্তবতা! কিন্তু সেই অবাস্তব স্বপ্নই কি দেখছি আমি,আপনি অথবা দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থীরা? আদৌও কি আছে এর কোনো বাস্তবতা?
১. আমি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক,মাস শেষে বেতন পাই,গবেষণার প্রয়োজনে বিদেশ পাড়ি দিতে পারি, দেশে "হসপিটাল ফার্মেসী" চালু হোক বা না হোক আমার কি?
২. আমি ক্লাসের প্রথম সারির ছাত্র। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তো হয়েই যাবো,“হসপিটাল ফার্মেসী"নিয়ে আমার কি? আর তাছাড়াও দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, সরকারি ভাবে ভালো চাকুরী গুলো আমার জন্য আছে।
৩. আমি তো অত ভালো নয় তবে রেজাল্ট মোটামুটি আছে একটা, জি আর ই, আই ই এল টি এস এসব দিয়ে বিদেশ পাড়ি দিবো,মাস শেষে বড় একটা অংকের টাকা পাবো,আর কি লাগে!
৪. ভার্সিটিতে আমার খুব আহামরি কোন রেজাল্ট নেই, বাইরে যাওয়াও সম্ভব নয়, বাড়ির পাশে স্কয়ার আছে চেষ্টা করে দেখি!
৫. রেজাল্ট এর যা অবস্থা কি আর করার বিসিএস এর জন্য চেষ্টা করে দেখি!
৬. আরে হসপিটাল ফার্মেসী চালু হলে আমরা ডাক্তাররা কোথায় যাবো!
৭. ওহ! আপনার তো অসুবিধে নেই, আপনার ছেলে বা মেয়ে অমুক ভার্সিটির ফার্মেসীতে পড়ে না? দেখেন কোম্পানিতে হয় কিনা, না হলে এলাকাতে একটা দোকান দিয়ে দিয়েন অনেক লাভবান ব্যাবসা!
৮. তুই তো ফার্মেসীতেই পড়িস, শোন আমরা একটা প্রাইভেট ক্লিনিক দিবো, তুই সেখানে ঔষুধ সাপ্লাই দিস। আরে, রিপ্রেজেনটেটিভ হিসেবে না, তুই আবার কিছু মনে করিসনা!
এরকম নিত্যদিনের ঘটনা আর নাই বলি। যেখানে দেশের উঁচু স্তরের মানুষ আমাদের টেকনিশিয়ান বানিয়েছেন,তেমনি বাড়ির পাশে কোম্পানিতেও পাঠিয়েছেন, আর দোকানের কথা নাই বললাম!
আপনার,আমার এ ধরণের চিন্তা ভাবনা টাই আমাদের অধিকার সম্পর্কে আমাদের পরিচয় দেয়নি।
আপনি কি আদৌও জানেন একজন ফার্মাসিস্ট কে,তিনি কি করেন? আমাদের কাজ ঐ দোকানে বসে ঔষধ বেঁচা আর কাস্টমার এর সাথে নাপা এক্সট্রার দাম কেনো দুই টাকা বেড়ে গেলো এই নিয়ে তর্ক করা নয়।
একজন বন্ধু কে সেই প্রথম বর্ষে যখন প্রশ্ন করি আচ্ছা তোদের তো এনাটমি, ফিজিওলজি, ফার্মাকোলোজি, বায়োকেমিস্ট্রির মতো সাবজেক্ট আছে, এগুলো কোন কোন লেখক এর বই পড়িস? উত্তরে পেয়েছিলাম, "আমাদের তো অনেক পড়া তাই শিট পড়ি। কোনো বইয়ের নাম বলতে পারলাম না।"আমি অবশ্যই তার অপরাগের কথা বলছি না,আমি বলছি না আমাদের প্রতি কোর্সে ৩-৪ জন লেখক কখনো বা তার চেয়ে বেশি লেখকের বই পড়তে হয়। সে হিসেবে শুধু থিওরির জন্য যদি ৫টি কোর্স থাকে ৬ মাসের সেমিস্টারে হিসেব টা নিশ্চয়ই আপনি বের করতে পারবেন। আমি শুধু বলছি আপনি কি জানেন আজ থার্ড ইয়ার এ এসে আমি যখন কোনো ঔষুধের জেনেরিক নেইম, সাইড ইফেক্টস, ইনডিকেশনস, কনট্রাইনডিকেশনস, মেকানিজম নির্ধিধাতে বলে দিতে পারি,আমার অনেক ডাক্তার বন্ধু সেখানে অবাক হয় কিভাবে জানলাম! সে তো জানেনা! আমার উদ্দেশ্য মোটেও কাউকেই ছোট করা নয়। কিন্তু ঐ যে আপনি যখন কোনো রুগীর ডায়াগনোসিস করে যেকোনো একটা কোম্পানির ঔষুধ দেন যার জন্য টাকা খেয়েছেন,ঐ ঔষধ টা রুগী কে দেওয়ার দায়িত্ব টা কিন্তু আপনার না। তাকে বুঝিয়ে বলা থেকে শুরু করে তার ডোজ,তার কি ধরণের অসুবিধে হতে পারে এক কথায় এ টু জেড আপনি একজন ফার্মাসিস্টের সাথে আলোচনা ছাড়া এটা দিতে পারেন না।
আপনি যে এন্টিবায়োটিক পেশেন্টকে অহরহ প্রেসক্রাইব করছেন আর পেশেন্ট ও যে পুনরায় একই লক্ষ্মণ দেখা দিলে আবার গিয়ে ঔষুধ কিনছে, এর দায়ভার কার? এন্টিবায়োটিক রেজিসটেন্স এর কথা তো আপনিও জানেন তাইনা? ঔষধ প্রেসক্রাইব করার কথা কি আপনার? আপনি নিশ্চয়ই সাধারণ জনগনের চেয়ে বেশি জানেন,জানেন বাইরের দেশের ও কথা, তারপরেও কেনো নিজের জায়গাটা হারানোর ভয়!
এর আগেও অনেক লিখা লিখি হয়েছে। আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক বৃন্দ ও অনেক চেষ্টা করছেন। অনেক সিনিয়র এমনকি জুনিয়র রাও লিখা লিখি করছেন অন্তত,আমাদের উদ্দেশ্য শুধুই আমাদের অধিকার আদায় নয়,আপনি কি জানেন অনেক দেশে হসপিটাল ফার্মাসিস্টদের “সম্মুখ সারির যোদ্ধা” উপাধি দেওয়া হয়েছে? আমরাও এই দূর্যোগে দেশের পাশে এসে দাঁড়াতে চাই। কলম্বিয়া, চীন এরকম অনেক দেশে হসপিটাল ফার্মাসিস্টরা করোনা কালিন এই দূর্যোগে তাদের সর্বস্বটুকু দিয়েছেন। অন্য দেশের খবর দেখলে এগুলো আমাদের চোখে পরবে। কিন্তু আমাদের দেশের মিডিয়া তে এখনো দেখানো হয় ফার্মেসীর দোকানে নেই কোন ফার্মাসিস্ট, দেখানো হয়না অন্য দেশে ফার্মাসিস্টরা কি ভূমিকা রাখছেন আর আমাদের দেশের সম্ভাবনা কি! চীন-ই ভাইরাস ছড়িয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এই নিয়ে ঝড় তুলেছেন যদি এই নিউজ এর তুলনায় আপনি দেখেন কিভাবে এত দ্রুত চীন করোনা মোকাবিলা করলো তারা ফার্মাসিস্টদের নিয়োগ করেছিল যেন হসপিটাল এ রুগী দের শুধু আইসোলেশনে যেতে হয়, বাকিরা যেন ঘরে বসে চিকিৎসা টুকু পায়। তদের যেন হসপিটালে গিয়ে ভিড় করতে না হয়। নিউজিল্যান্ডেও টেলিফোনে পেশেন্ট হানডেল করছে এখনো ফার্মাসিস্টরা। আপনি প্রমাণ স্বরুপ বিভিন্ন জার্নাল-পেপার গুলো গুগলে খুঁজলেই পাবেন।
একথা তো সবার জানা,কেউ যদি খাঁদে পড়ে যায়,তাকে উপর থেকে রশি দিয়ে যেমন টেনে তুলতে হয় তেমনি সেই ব্যক্তির নিজেরও চেষ্টা করতে হয়, সাহায্যের জন্য হলেও ডাকতে হয়। আমাদের আওয়াজ আমাদেরকেই পৌঁছাতে হবে। তবেই হয়তো উপরে বসে থাকা কেউ একজন হাত বাড়িয়ে দিবেন। তবে একা কিছুই সম্ভব নয়, আমি আপনি আমরা যখন দৃষ্টি ভঙ্গি টা বদলাবো, যখন বুঝবো দেশের মানুষের ঝণ আমাদের প্রতিটা কোষে কোষে রয়েছে তখনই এটা কেবল সম্ভব। এক্ষেত্রে আমরা শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, উর্ধতন কর্মকর্তা সরকারি বেসরকারি সহ যারা এর সাথে জড়িত কেউ ই আমরা আমাদের দায়িত্ব এড়াতে পারিনা। আর নিউজ চ্যানেল থেকে পত্রিকা তদেরও উচিত তাদের অবস্থান থেকে এগিয়ে আসা। আমাদের উচিৎ এ বিষয় সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান তদের দেওয়া।
আমাদের প্রথম সুপ্ত মনকে জাগরিত করেছিলেন আমাদের ডিপার্টমেন্টেরই ৫ম বর্ষ ২য় সেমিস্টারের শ্রদ্ধেয় অগ্রজ। তার হাত ধরেই আমাদের হাতেখড়ি।
হয়তো আজ আমি লিখবো, কাল আপনিও লিখবেন, হয়তোবা কখনো বিরক্ত হয়ে থামিয়েও দিবো হয়তোবা অনেক টাকা কামিয়ে পড়ন্ত এক বিকেলে চায়ের কাপে মুখ লাগিয়ে বারান্দায় বসে প্রিয় জনের সাথে আড্ডা ও দিব, ফোন টা হাতে নিলেই দেশের প্রিয় মানুষ গুলোর সাথে কথা হবে কিন্তু রাতের বেলা ঘুমুতে গিয়ে বিবেক আবার প্রশ্ন করবে না তো দেশের মানুষকে কভিড-১৯ এ মেরে আজ তুমি হাওয়া খাচ্ছো? এমনও হতে পারে দেশের মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছা টা সারাজীবন স্বপ্নই থেকে গেলো। জানেন ই তো স্বপ্ন মানুষকে তাড়া করে বেড়ায়!
হসপিটাল ফার্মেসী আমাদের স্বপ্ন। এটা আজ হোক কাল হোক পূরণ হবেই। কিন্তু নিজের ছেলে মেয়ে কে “বাবা/মা আমরাও স্বপ্ন দেখেছিলাম তোমরা এসে সে স্বপ্ন পূরণ করলে” এটা বলার চেয়ে তাদের কে গল্প শোনানো “করোনার ঐ যুদ্ধ তো আমরাই করেছি জয়, আমরাই নিয়ে এসেছি এই পৃথিবীতে করোনা মুক্ত এক নতুন সূর্যদোয়” এটাই অধিকতর শ্রেয়।
আনিকা নাজনীন
বিভাগঃ ফার্মেসী
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
২৫.০৭.২০২০