01/04/2026
হাম আউটব্রেক ও টিকা সংশয়
হাম বা মিজলস একটি ভাইরাসজনিত রোগ। অত্যন্ত ছোঁয়াচে এই রোগটি শিশুদের জন্য ভয়ানক। হাঁচি কাশির মাধ্যমে রোগটি ছড়িয়ে পড়ে। মিজলস ভাইরাস এতটাই সংক্রামক যে কোনো আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি দিলে ভাইরাস বাতাসে প্রায় দুই ঘন্টা পর্যন্ত ভেসে থাকতে পারে। আন ভ্যাক্সিনেটেড ১০ জনের মাঝে ৯ জনকে আক্রান্ত করতে পারে। মিজলস রোগীর সাথে একই রুমে থাকলেই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হওয়া সম্ভব, একদম কাছেও যেতে হয়না। সুতরাং বুঝতেই পারছেন কেন হামে আক্রান্ত বাচ্চাকে সাধারণ আইসিইউতে রাখা সম্ভব না।
আমাদের দেশে যে গুটিকয়েকটি রোগের বিরুদ্ধে ভ্যাক্সিন প্রোগ্রাম করা হয় তার মাঝে মিজলস অন্যতম। কেন টিকা দেয়া হয়? রোগটা সম্পর্কে জানি চলুন -
ভাইরাস এক্সপোজার হবার ৭-১৪ দিন পর থেকে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়।
হামের লক্ষণ :
⁃ জ্বর (উচ্চ তাপমাত্রা)
⁃ সর্দি
⁃ কাশি
⁃ চোখ লাল হওয়া
⁃ মুখের ভিতর সাদা দাগ
⁃ জ্বরের চতুর্থ দিনে র্যাশ হওয়া (কানের পেছনে হেয়ারলাইন থেকে শুরু হয় - তারপর মুখ,গলা, বুক, পেট হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে)
⁃ র্যাশ হবার পর তাপমাত্রা আরো বেড়ে যেতে পারে
রোগের কমপ্লিকেশন :
⁃ নিউমোনিয়া ( ভাইরাস দ্বারা ফুসফুসের সংক্রমণ। সবচেয়ে ডেডলি, হামে আক্রান্ত বাচ্চাদের মৃত্যুর প্রধান কারণ)
⁃ এনকেফালাইটিস (ব্রেইনের ইনফেকশন। এনকেফালাইটিস থেকে খিঁচুনি, শ্রবণশক্তি হারানো এবং পরবর্তীতে intellectual disability হতে পারে)
⁃ ডায়রিয়া
⁃ কানে ইনফেকশন হওয়া
⁃ মৃত্যু
সবচেয়ে রেয়ার কমপ্লিকেশন - Subacute Sclerosing Panencephalitis (SSPE)। মিজলস আক্রান্ত রোগী সুস্থ হয়ে যাবার ১০ বছর পরেও এই কমপ্লিকেশন দেখা যেতে পারে। যদি দুই বছর বয়সের আগে আক্রান্ত হয় তাহলে এই কমপ্লিকেশন হবার চান্স বেশি।
চিকিৎসা :
⁃ ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় হামের চিকিৎসা স্কোপ কম।
⁃ এক্সপোজড হবার ৭২ ঘন্টার মাঝে ভ্যাক্সিন দিলেও কিছু উপকার হতে পারে।
⁃ ইমিউনোগ্লোবিউলিন দিলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে ( অনেক এক্সপেনসিভ)
⁃ সিম্পটম্যাটিক ট্রিটমেন্ট দিতে হবে।
⁃ র্যাশ হবারও ৪ দিন পর পর্যন্ত ভাইরাস ছড়াতে পারে। সুতরাং আপনার বাচ্চার হাম হলে তাকে আইসোলেট করুন।
এজন্যই টিকা দেয়ার জন্য উৎসাহিত করা হয়। এক ডোজ টিকার মাধ্যমে ৯৩% ও দুই ডোজ টিকার মাধ্যমে ৯৭% প্রিভেনশন গ্রহণ করা সম্ভব। বাংলাদেশে ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে দুইটি ডোজ দেয়া হয়। একবার টিকা নিলে লাইফলং ইমিউনিটি পাওয়া যায়। যেসব জায়গায় আউটব্রেক হয় সেখানে বুস্টার ডোজ দেয়া যেতে পারে।
হামের টিকা নিলে কি হাম হবেনা?
হামের টিকা নিলেও হাম ভাইরাসে এক্সপোজ হলে হামে আক্রান্ত হওয়া সম্ভব। তবে টিকা নেবার কারণে শরীরে যেহেতু আগে থেকেই এন্টিবডি থাকে, রোগের প্রকোপ ও কমপ্লিকেশন তখন অনেক কমে যায়। এজন্য এত বছর আমরা আশেপাশে হামের লক্ষণ ও কমপ্লিকেশনের ভয়াবহতা দেখতে পাইনি।
এখন কেন দেখতে পাচ্ছি?
⁃ এন্টি-ভ্যাক্সিন ক্যাম্পেইন (সোশ্যাল মিডিয়ায় নানারকম কনস্পিরেসি থিউরির কারণে)
⁃ ভাইরাস মিউটেশন ও নতুন স্ট্রেইনের উৎপত্তি
⁃ কমিউনিটি লেভেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া (খাদ্যাভ্যাস ও দূষণের কারণে)
একজন সচেতন মুসলিম টিকা নিবেন কিনা?
প্রথমত, মিজলস ভ্যাক্সিন তৈরিতে Live attenuated ভাইরাস ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ ভাইরাসকে দুর্বল কিন্তু জীবিত অবস্থায় শরীরে প্রবেশ করানো হয়। এতে শরীরের কোষগুলো ভাইরাসকে চিনে ও তার বিরুদ্ধে এন্টিবডি বানায়। পরবর্তীতে শক্তিশালী ভাইরাস আক্রমণ করলেও শরীরের কোষগুলো সেই এন্টিবডি বের করে যুদ্ধ করে।
এই জীবিত দুর্বল ভাইরাসগুলোকে একত্রে রাখার জন্য স্ট্যাবিলাজার হিসেবে জেলাটিন ব্যবহার করা হয়। এই জেলাটিন সাধারণত পোর্সাইন অর্থাৎ শূকরজাত। তবে ভ্যাক্সিন তৈরির সময় এই জেলাটিন অনেকবার হাইড্রোলাইসিস হয়, পরিশোধিত হয়। শেষ পর্যন্ত মূল ভ্যাক্সিনে সেই জেলাটিন অনেক ছোট ছোট অণুতে পরিণত হয়। সুতরাং এই ভ্যাক্সিনের উপাদান হালাল কিনা তা নিয়ে কিছুটা বিতর্ক রয়ে যায়।
মেডিকেল ফিক্বহ অনুসারে ট্রিটমেন্টের ক্ষেত্রে একটি নীতিমালা রয়েছে, তা হলো - ‘তাদাউয়ি বিল মুহাররম’ তথা হারাম বস্তু দিয়ে চিকিৎসা জায়েয হয় মরণাপন্ন অবস্থায় বা অত্যন্ত জরুরি চিকিৎসায়। বর্তমানে মিজলস যেভাবে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে মিজলস ভ্যাক্সিন না দিলে তার কনসিকোয়েন্স কি কি হতে পারে তা আমরা দেখতেই পাচ্ছি। সুতরাং হালাল বিকল্প না থাকাতে এবং জীবন রক্ষার নিমিত্তে এই ভ্যাক্সিন গ্রহণ করা অনুমোদনযোগ্য।
ভ্যাক্সিন কি তাওয়াক্কুল পরিপন্থী?
অসুস্থ হলে আল্লাহর উপর ভরসার পাশাপাশি চিকিৎসাও গ্রহণ করতে হবে। রোগব্যাধিতে চিকিৎসা নেয়া মানেই যে আল্লাহর উপর যথেষ্ট ভরসা রাখা হয়নি, তা নয়। কেননা চিকিৎসা হলো রোগ নিরাময়ের আসবাব (উপায়-উপকরণ) মাত্র, যা আল্লাহর নির্দেশেই কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, গরম লাগলে আমরা ফ্যান ছাড়ি, ঠাণ্ডা লাগলে গরম কাপড় পড়ি, ক্ষুধা লাগলে খাবার খাই, তৃষ্ণা লাগলে পানি পান করি- এর কোনটিকে কি আমরা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী মনে করে ছেড়ে দিই? না।
তবে এসব উপকরণ গ্রহণ করার পাশাপাশি আমাদের এই আক্বীদা ও বিশ্বাস রাখতে হবে যে, এসব উপায়-উপকরণ আল্লাহরই সৃষ্টি এবং তা কেবলমাত্র আল্লাহর আদেশেই কাজ করে; এদের নিজস্ব কোন শক্তি বা ক্ষমতা নেই রোগ সারানোর। আল্লাহ যদি ইচ্ছা করেন তাহলে সুস্থতা আসবে, অন্যথায় নয়। তাই কেউ যদি রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপর রাগান্বিত বা বিরক্ত না হয়ে তাক্বদীরের উপর সবর করে এবং সেই সাথে আল্লাহর দেয়া বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে চিকিৎসা করায় এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর উপরই ভরসা করে; তাহলে সেই চিকিৎসা গ্রহণ করা সবর ও তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী হবেনা, বরং এটাই হচ্ছে শরিয়তের বিধান।
এবার সিদ্ধান্ত নেবার পালা।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের বলেছেন 'পড়ো'। আপনি কি সিদ্ধান্ত নিবেন তা জেনে বুঝে পড়ে দেখে শুনে নিবেন। কোনো সেলিব্রিটির লেখা পড়ে নয়, কোন প্রমাণছাড়া কনস্পিরেসি থিউরি নয়। বরং রিসার্চ বেইজড নলেজ থেকে সিদ্ধান্ত নিন।
আল্লাহ আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করুন। আমীন।
ডা: সাদিয়া হোসেন
এমবিবিএস (এএফএমসি)
এফসিপিএস পার্ট টু ট্রেইনি (শিশুস্বাস্থ্য)