11/02/2026
Spaghetti Wrist Injury
জুম্মান হোসেন, ১৯ বছর বয়স, একদিন তার ডান হাতের কব্জীর উপরে কাঁচে কেটে যায়। কাটাটা বেশ গভীর ছিল,যার কারণে বেশ রক্ত বের হচ্ছিল।রক্ত বন্ধ করার জন্য হাতের কনুই এর উপরে শক্ত করে বাধ দেওয়া হয়, এবং নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।সেখানে তাকে অপারেশন এর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।অপারেশন করাও হয় কিন্তু অপারেশন এ সময় লাগে অনেক্ষন।মূলত যিনি অপারেশন করেন তিনি আগে বুঝতে পারেন নাই যে ভিতরের সব রগ কেটে গেছে।তিনি অপারেশন শুরু করার পরে বুঝতে পারেন যে ভিতরের সব রগই কাটা এবং সবগুলোকেই জোড়া দিতে হবে। তখন তিনি তার কাছে যেসব যন্ত্রপাতি ছিল সেটা দিয়ে কাটা রগগুলো জোড়া দেওয়ার চেষ্টা করেন কিন্তু এতে অনেক সময় লেগে যায়।
অপারেশন এর সময় যাতে রক্তপাত না হয় সেজন্য অপারেশন করা হয় কনুইয়ের উপরে বাধ দিয়ে,মেডিকেল এএ ভাষায় এটাকে বলে টর্নিকুয়েট।এটা দুই ধরনের হয়, একটা রাবারের তৈরী আরেকটা ডিজিটাল নিউম্যাটিক টর্নিকুয়েট। ডিজিটাল এর দাম অনেক বেশী হওয়ায় ঢাকার বাইরে এটার ব্যবহার নেই বললেই চলে। হ্যান্ড সার্জারীর জন্য আমরা ব্যবহার করে থাকি অত্যাধুনিক ডিজিটাল নিউম্যাটিক টর্নিকুয়েট মেশিন যেটা শতভাগ রিস্ক ফ্রী।
রক্ত বন্ধ করার জন্য কনুই এর উপর বাধ দেওয়ার কারনে রক্ত বন্ধ হয় ঠিকই কিন্তু রোগী ডেভেলপ করে টর্নিকুয়েট পালসি নামক একটা ভয়াবহ অবস্থা।সাধারণ অনেক্ষন ধরে রক্ত বন্ধ থাকলে যেখানে বাধা হয় তারপর থেকে মাংস, রগ নষ্ট হয়ে যেতে শুরু করে।এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার রোগীদের ভোগান্তি অনেক।হাতের বোধশক্তি এবং পাওয়ার নাই হয়ে যায়, অনেক সময় হাত কেটে ফেলাও লাগে।
জুম্মানের দুর্ভাগ্য ছিল যে তার হাতে এ ধরনের টর্নিকুয়েট পালসি ডেভেলপ করে। এখানেই শেষ নয়, অপারেশন এর পরে তার হাতে ইনফেকশন হয়, এ ইনফেকশনে তার হাতে যেসব রগ জোড়া দেওয়া হয়েছিল সেগুলো ও নষ্ট হয়ে যায়, রগগুলো যেখানে জোড়া দেওয়া হয়েছিল সেটার উপরের মাংস এবং চামড়াও নষ্ট হয়ে গেছিলো।যেটা ছিল রোগীর জন্য এবং একই সাথে সার্জনের জন্য ও খুব দুর্ভাগ্যজনক।এ অবস্থা থেকে মুক্তি একমাত্র আল্লাহর রহমত ছাড়া সম্ভব নয়। এ অবস্থাতে কোন সার্জন নতুন করে এখানে হাত দেওয়ার আগে শতবার ভাববে।
আমার কাছে রোগীকে পাঠানো হল অপারেশন এর ১৯ দিন পর।রোগীর কন্ডিশন দেখে আমিও প্রথমে অপারেশন করতে রাজী হই নাই, কেননা এরকম খারাপ অবস্থায় রোগীর আউটকাম কি আসবে সেটা নিয়ে আমি খুবই সন্দিহান ছিলাম।রেফারিং সার্জন খুব করে আমাকে অনুরোধ করেন অপারেশন এর জন্য।অনুরোধে ঢেঁকি গেলার মত আমি ও রিস্ক নিয়ে অপারেশন করতে রাজী হলাম।
কিন্তু এখানেও বাধলো ঘাপলা,এ অবস্থায় অপারেশন করতে হয় স্টেজ বাই স্টেজ, প্রথম স্টেজ এ নষ্ট হয়ে যাওয়া টিস্যু ফেলে দিয়ে জায়গাটা পেট এর চামড়া দিয়ে ঢেকে রাখা ( groin flap coverage), দ্বিতীয় স্টেজে ফ্ল্যাপ কে আলাদা করা এবং তৃতীয় স্টেজ এ রগের অপারেশন। আমি ৩ টা স্টেজ এ অপারেশন করতে চাইলাম কিন্তু রোগীর আত্মীয় স্বজনরা ধাপে ধাপে না করে যা করার একবারেই করতে অনুরোধ করলেন,সেটা ছিল আরো রিস্কি।কেননা ইনফেকশন,চামড়া লস এর মধ্যে রগের অপারেশন করা মানে মারাত্মক রিস্ক নেওয়া।রোগীর স্বজনদের দাবী তারা বারবার খরচ করতে পারবেন না, যা করার একবারেই করে দিতে।আবার ও রাজী হলাম না ,সার্জন সাহেব আবারো ফোন করলেন এবং তার অনুরোধে মারাত্মক রিস্কটি আমি নিয়েছিলাম।
অপারেশন কালে সব নষ্ট হয়ে যাওয়া টিস্যূ ( চামড়া, মাংস এবং রগ ) ফেলে দেওয়ার পরে দেখা যায় রগগুলোর দুই প্রান্তের মধ্যে বেশ গ্যাপ তৈরী হয়েছে,কোনভাবেই মুখোমুখি জোড়া দেওয়া সম্ভব না।তখন হাতেরই অন্য রগ দিয়ে যেসব রগ খুব বেশী গুরুত্বপূর্ণ সেগুলোর গ্যাপ পূরণ করলাম( tendon grafting. nerve grafting).নষ্ট হয়ে যাওয়া চামড়ার গ্যাপ পুরণ করলাম পাশ থেকেই চামড়াসহ মাংস নিয়ে এসে( Local transposition flap).বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল অপারেশনটা।অপারেশন শেষেও আমি নিশ্চিত ছিলাম না যে অপারেশন এর রেজাল্ট কেমন আসবে।কেননা অন্যান্য হ্যান্ড সার্জারীর মত এটার রেজাল্ট ও নির্ভর করবে ৫০% সার্জনের উপর বাকী ৫০% রোগীর উপর। আমার অংশ আমি যত ভালো করেই করি না কেন রোগীর অংশ রোগী যদি ঠিকমত না করেন তাহলে ভালো রেজাল্ট আসে না।আলহামদুলিল্লাহ আমাদের রোগী যথেষ্ট সিরিয়াস ছিলেন তার হাতের ব্যাপারে,মাঝেমধ্যে ফলো আপ ডেট মিস করলেও ব্যায়াম করেছেন ঠিকমতো।যার কারনে একটা প্রায় মরা হাত আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে।যে হাত নিয়ে রোগীর আত্মীয় স্বজন একেবারেই আশাবাদী ছিলেন না সেই হাত দিয়ে লিখে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে এ গ্রেড পাওয়া বিশাল সাফল্য।আলহামদুলিল্লাহ, সকল প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার।
এ কেইসটা আমি পরবর্তীতে হ্যান্ড সার্জারীর কনফারেন্স এ প্রেজেন্ট করেছি এবং সবাই আউটকাম দেখে বেশ প্রশংসা ও করেছেন।এর মধ্যে একজন ছিলেন অ্যামেরিকান হ্যান্ড সার্জারী সোসাইটির প্রেসিডেন্ট।আমার প্রেজেন্টেশন শেষে উনি দাড়িয়ে বেশ প্রশংসা করেছেন, পরে উনার নিজের প্রেজেন্টেশন এর সময় ও আমার নাম নিয়েছেন।কিন্তু পরে আমাকে আলাদা পেয়ে হালকা বকাও দিয়েছেন কেন আমি ইনফেকশনের মধ্যে রিস্ক নিয়ে এত বড় অপারেশন করলাম! উনি হলে না কি কখনোই করতেন না! উনাকে কেমনে বোঝাই কত সীমাবদ্ধতার মধ্যে আমাদের চিকিৎসা করতে হয়!
বি.দ্র : ছবি এবং ভিডিও টাইম টু টাইম দেওয়ার উদ্দেশ্য হল যে যারা এ ধরনের অপারেশন করাবেন তাদের জন্য এক প্রকার আশার বাণী।সময়ের সাথে সাথে উন্নতি হয় যদি ঠিকমতো ব্যায়াম করা হয়। সুতরাং অপারেশন এর পরে ধৈর্য্য সহকারে রেগুলার ফলো আপে আসতে হবে এবং নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে যদি ভালো ফলাফল আশা করেন।
ডা: এস কে মুরাদ আহমেদ
চীফ হ্যান্ড সার্জন
ঢাকা হ্যান্ড সার্জারী সেন্টার
এস আই বি এল ফাউন্ডেশন হাসপাতাল,
পান্থপথ সিগন্যাল, গ্রীনরোড, ঢাকা।
যোগাযোগ : 0179354614