27/01/2026
আমরা প্রায়ই রোগীদের কাছ থেকে শুনি – ম্যাডাম , গত কয়েক মাস ধরে লক্ষ করছি দূরের জিনিস ঠিক মতো দেখতে পাচ্ছি না। রাস্তার সাইনবোর্ড, বাসের নম্বর, এমনকি দূরের মানুষের মুখও একটু ঝাপসা মনে হয়। আবার টিভি বা ফোন কিছুক্ষণ দেখলেই চোখে যেন ক্লান্তি চলে আসে, মাথাটাও ভারী হয়ে ওঠে।
এমন কথা আমি প্রতিদিনই আমার চেম্বারে শুনি। রোগীরা যখন এই সমস্যাগুলো নিয়ে আসেন, প্রায় ৭০% ক্ষেত্রেই মূল কারণটা হয় মায়োপিয়া—যাকে আমরা সহজ বাংলায় বলি "নিকটদৃষ্টি"।
মায়োপিয়া আসলে কী? চোখটাকে একটা ক্যামেরার মতো ভাবতে পারেন। স্বাভাবিক চোখে আলোটা ঠিক রেটিনার উপর পড়ে, তাই দূর-কাছ সব স্পষ্ট দেখা যায়। কিন্তু মায়োপিয়ায় চোখ সামান্য লম্বা হয়ে যায়, বা কর্নিয়ার কার্ভ বেশি হয়ে যায়, ফলে আলো রেটিনার সামনে পড়ে। তাই দূরের জিনিস ঝাপসা দেখায়, কিন্তু কাছের জিনিস স্পষ্ট দেখা যায়।
✅কেন হচ্ছে এই সমস্যা?
আগে শুধু বংশগত কারণকেই দায়ী করা হতো, কিন্তু এখনকার ডিজিটাল যুগে জীবনযাপনের ভূমিকাও অনেক বড় হয়ে উঠেছে:
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মোবাইল, কম্পিউটার, টিভির স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা
বাচ্চাদের খোলা মাঠে খেলার বদলে ঘরে বসে ভিডিও গেমস বা মোবাইল নিয়ে সময় কাটানো ।
পড়াশোনার সময় বইয়ের সাথে চোখের দূরত্ব ঠিক না রাখা
পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলোয় না থাকা
✅একটা প্রচলিত ভুল ধারণা:
অনেক রোগীই আমাকে বলেন ম্যাডাম, চশমা পরলে কি চোখ আরও খারাপ হয়ে যাবে না?
আসলে ব্যাপারটা ঠিক তার উল্টো। যখন চোখে পাওয়ার আছে কিন্তু আপনি চশমা ব্যবহার করছেন না, তখন চোখ অনবরত চেষ্টা করে ফোকাস করতে। এই অতিরিক্ত চেষ্টা চোখের পেশীগুলোর উপর চাপ দেয়, যা পরবর্তীতে মাথাব্যথা, চোখে ব্যথা এবং দৃষ্টিশক্তি আরও অবনতির কারণ হতে পারে। সঠিক পাওয়ারের চশমা বা কন্ট্যাক্ট লেন্স ব্যবহার করলে এই চাপ কমে, চোখ স্বস্তি পায় এবং দৃষ্টি আরও বেশি নষ্ট হওয়া থেমে যায়।
আশার কথা হলো, এখন সমাধানের অনেক উপায় আছে:
শুধু চশমাই একমাত্র পথ নয়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন নিরাপদ ও কার্যকরী সমাধান দিচ্ছে:
লেজার চিকিৎসা (LASIK/SMILE): এই পদ্ধতিতে কর্নিয়ার সামান্য অংশ লেজার দিয়ে সংশোধন করা হয়, ফলে আলো ঠিক রেটিনার উপর পড়ে। ১৫-২০ মিনিটের এই পদ্ধতির পরেই অধিকাংশ রোগী চশমা ছাড়াই স্পষ্ট দেখতে পান।
ICL সার্জারি: যাদের খুব বেশি পাওয়ার বা পাতলা কর্নিয়া, তাদের জন্য এই পদ্ধতি বেশি উপযুক্ত। এতে চোখের ভেতরে একটি বিশেষ লেন্স স্থাপন করা হয়, যা স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি ঠিক করে দেয়।
অর্থোক্যারাটোলজি: বিশেষ ধরনের কন্ট্যাক্ট লেন্স যা রাতে পরে থাকলে দিনে চশমা ছাড়াই ভালো দেখা যায়, বিশেষ করে শিশুদের মায়োপিয়া নিয়ন্ত্রণে খুব কার্যকরী।
✅কী করবেন আপনি?
১. নিয়মিত চেকআপ: বছরে অন্তত একবার সম্পূর্ণ চোখ পরীক্ষা করানো উচিত। অনেকেই ভাবেন শুধু পাওয়ার চেক করলেই চলবে, কিন্তু রেটিনা, চোখের চাপ, কর্নিয়ার অবস্থা—এগুলোও পরীক্ষা করা জরুরি।
২. স্ক্রিন ব্রেক: ২০-২০-২০ নিয়ম মনে রাখুন। প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিনে কাজ করার পর ২০ সেকেন্ডের জন্য ২০ ফুট দূরের কোনো জিনিসের দিকে তাকান।
৩. আলোর ব্যবস্থা: পড়ার সময় বা কম্পিউটারে কাজের সময় যথেষ্ট আলোর ব্যবস্থা রাখুন। অন্ধকারে মোবাইল বা টিভি দেখা একদমই ঠিক নয়।
৪. বাচ্চাদের জন্য বিশেষ যত্ন: দিনে অন্তত ১-২ ঘণ্টা বাচ্চাদের বাইরে খেলতে উৎসাহিত করুন। প্রাকৃতিক আলো চোখের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৫. বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: চোখে কোনো সমস্যা মনে হলেই দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চক্ষু চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা ভবিষ্যতে বড় কোনো সমস্যা হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে।
আমি প্রায়ই রোগীদের বলি—চোখ আমাদের অমূল্য সম্পদ, কিন্তু দুঃখের বিষয় আমরা গাড়ি বা ফোনের সার্ভিসিংয়ের জন্য যতটা সময় দিই, চোখের যত্নের জন্য তার ভগ্নাংশও দিই না। সামান্য সচেতনতা আর নিয়মিত যত্নই পারে আপনার দৃষ্টিশক্তি সুস্থ ও সুরক্ষিত রাখতে।
বাংলাদেশ আই হসপিটাল
ডা. দিলারা খাতুন
কনসালটেন্ট অফথ্যালমোলজিস্ট ও ভিট্রিও-রেটিনা বিশেষজ্ঞ
রিফ্র্যাক্টিভ সার্জারি ও ফ্যাকো সার্জন
📞 পরামর্শ ও অ্যাপয়েন্টমেন্ট:
১০৬২০, ০৮৯১০২০১০২০, ০১৭১৫০১১৫০৫
#চোখের_চিকিৎসা #মায়োপিয়া #চশমা_মুক্তি #চোখ_পরীক্ষা #বাংলাদেশ_আই_হাসপাতাল #ডা_দিলারা_খাতুন #রেটিনা_সার্জারি #ফ্যাকো_সার্জারি