21/02/2026
ইদানিং আমি যখন কোন গল্প বা উপন্যাসে কথোপকথন লিখি তখন একটা সমস্যায় পড়ে যাই। যদি সমসাময়িক সময়ে মানুষের উক্তিগুলো বাংলায় লিখি মনে হয় লেখাটা ঠিকঠাক হচ্ছেনা বা মিলছে না সময়ের সাথে, মিলছে না মানুষের ভাষার সাথে। কারণ, এখনকার মানুষ তো এভাবে কথা বলেনা! তারা কথার মাঝে প্রতিটা বাক্যে দু-চারটা ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে। তারা বাংলা বলেনা, তারা কথা বলে বাংলিশ ভাষায়। বলাই বাহুল্য, সেই দোষে দুষ্ট হয়েছি নিজেও। এইসব মানুষের মাঝে আমিও আছি। তবে, শুধু একুশে ফেব্রুয়ারি বা পহেলা বৈশাখে বাংলা বাংলা বলে রব তোলার সাথে আমিও একমত নই।
বাংলা তো আমাদের মাতৃভাষা। এই ভাষা শেখার জন্য আমাদের কোন বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় বা কোন প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়নি। এই ভাষা শেখার জন্য আমাদের কোন প্রশিক্ষণও নিতে হয়নি। কখনো হবেও না। তাই বাংলাকে শুধু বাংলা করে রাখার জন্য প্রয়োজন সচেতনভাবে অন্য ভাষার মিশ্রণ বর্জিত বাংলা ভাষার প্রয়োগ। আর সেটা করতে চাইলে আমাদের প্রতিদিন সচেতনভাবে চর্চাটা চালিয়ে যেতে হবে। তাইতো চিকিৎসা বিজ্ঞানে আমার সব পড়াশোনা ইংরেজিতে হলেও, রোগীর ব্যবস্থাপত্র ইংরেজিতে লিখতে হলেও বাকি সবকিছু আমি বাংলায় লিখতে চেষ্টা করি। বইগুলোতে আমার নাম লেখা থাকে বাংলায়। রোগীর ব্যবস্থাপত্রে তাদের নাম, বয়স, তারিখ, পরামর্শ লিখি বাংলায়। আর সেটাই তো হওয়া উচিৎ, সেটাই তো স্বাভাবিক, সুন্দর।
তবে বর্তমান সময়ে যখন সবকিছু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চলে গেছে তখন ইংরেজি ভাষা বলতে ও লিখতে শেখারও কোন বিকল্প নেই। সে ব্যাপারে আমাদের অবস্থান কেমন?
প্রতিটি বাক্যে আমরা বাংলার সাথে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করতে পারলেও ইংরেজিতে আমাদের অধিকাংশের কথা বলাটা হয় দেখার মত। বিদেশি অতিথিরা এলে এ অবস্থা আমরা প্রায়শঃই দেখতে পাই। তখন ইংরেজির মাঝে আবার বাংলা ঢুকিয়ে ফেলি কিংবা চরম হাস্যকর ইংরেজি বলি।
তাই বাংলা বললে পুরোটাই বাংলা আর ইংরেজির সময় পুরোটাই ইংরেজি বলাটা হলো নিজেদের ব্যক্তিত্ব, দক্ষতা ও ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা। যে জাতি নিজেদের মাতৃভাষা রক্ষার জন্য জীবন দিতে পারে, তারা সকল ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সক্ষম নয় এ আমি বিশ্বাসই করিনা। আমাদের শুধু প্রয়োজন সচেতন চেষ্টা।
এই যে আমি লেখাটা লিখলাম, এখানেও বেশকিছু ইংরেজি শব্দ চলে আসতে চাচ্ছিল৷ কিন্তু আমি সচেতনভাবে তা এড়িয়ে গেলাম। আচ্ছা শুধু বাংলা শব্দে লেখাটা কি কোনদিক থেকে খারাপ হয়েছে? কিংবা তথাকথিত unsmart?
মাতৃভাষাকে আমরা সবাই ভালবাসি। অবচেতনভাবেই ভালবাসি। আসুন না সবাই বাংলায় কথা বলি। প্রয়োজনে ইংরেজিতেও কথা বললো, যখন প্রয়োজন সুন্দর ইংরেজিতে কথা বলবো।
মনে রাখবেন, একুশে ফেব্রুয়ারি একসময় শুধু আমাদের ছিল। অমর একুশে ও শহীদ দিবস ছিল। এখন তার সাথে একুশে ফেব্রুয়ারি মানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আর যতবার এই দিবসের ইতিহাসের দিকে তাকানো হবে ততবারই ভাষার জন্য আমাদের মায়া, ভালবাসা, আত্মত্যাগ সারা পৃথিবীর কাছে দৃষ্টান্ত হিসেবে ধরা দেবে।
সেই আমরাই কি ভাষার শুদ্ধতা, মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হতে দিতে পারি? "আমার ভাইয়ের রক্তে রঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?"
লেখা: একুশে ফেব্রুয়ারি, ২০১৯
#একুশে_ফেব্রুয়ারি #ভাষা #ডা_রামিম #মাতৃভাষা