23/05/2026
উত্তরের শান্ত জনপদ রংপুরের বুকে ভোরের সূর্যটা যখন তার লাল আভা ছড়িয়ে দেয়, ঠিক তখন ইয়াশফীন হাসপাতাল এর NVD রুম থেকে আমার প্রথম সন্তানের কান্নার আওয়াজ আমার অশান্ত আত্মাকে যেন এক অন্যরকম প্রশান্তি দান করে।
তড়িঘড়ি করে খুশিতে ভিতরে যেতে ধরবো, ঠিক সেই সময় আমাকে জানানো হলো, "আপনি এই করিডোর দিয়ে যেতে পারবেন না। এটি মেইল রেস্ট্রিকটেড এরিয়া।" আমি বললাম আমি একজন ডাক্তার। তারপরও আমাকে জানানো হলো, "স্যার, বিনয়ের সাথে বলছি, আমাদের এই হাসপাতালে মেইল ডাক্তারদের জন্যও এই করিডোর দিয়ে যাওয়ার অনুমতি নেই। আপনি একটু অপেক্ষা করুন স্যার, আমি আপনার বাচ্চাকে ভিন্ন করিডোর দিয়ে দেখানোর ব্যবস্থা করছি। আর বাচ্চার নানী ও দাদী দুইজনই NVD রুমের সামনে আছেন। দুঃশ্চিন্তা করবেন না স্যার।"
প্রথমে একটু ইতস্তত লাগলেও তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে ভাবতে লাগলাম, আমি তো এতোদিন ধরে এরকম একটি হাসপাতালের স্বপ্নই দেখে আসছি। আল্লাহ তা'আলার অশেষ রহমাতে আজ সেটি বাস্তবে রূপ নিয়েছে যার ফলে উম্মাহ আজ হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় ইসলামের নূর দেখতে পাচ্ছে।
এই দৃশ্য দেখে বছর খানেক আগের কথা মনে পড়ে গেলো। তখন একদিন আমার প্রিয়বন্ধু ডা. আদনানকে বলতেছিলাম, "বন্ধু, ইয়াশফীন হাসপাতাল তো ঢাকায় করতেছ। রংপুরে কি এর কোনো শাখা করবা না?" সে শুধু একটা কথাই বলেছিলো সেদিন, "শুধু রংপুর কেনো, আমার স্বপ্ন তো পুরো বাংলাদেশ।" সেদিন থেকে আমিও সেই স্বপ্নযাত্রার এক অদম্য সহযাত্রী হয়ে গেলাম।
মূলত, এই হাসপাতাল নিয়ে আমার স্বপ্ন দেখার পিছনের মূল শক্তি ছিলো, কুরআনের সেই কালজয়ী আয়াত:
"তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অন্যকে সাহায্য করো..." (সূরা আল-মায়িদাহ: ২)
আমরা চেয়েছিলাম উত্তর অঞ্চলের মানুষেরা যেন ঘরের কাছেই সেই বিশ্বস্ত সেবা পায়, যা ইয়াশফীন হাসপাতাল ঢাকায় দিচ্ছে। ফলে আমাদের এই শাখাটি হবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং ইসলামী শরীয়াহর এক অনন্য মিলনস্থল এবং স্বাস্থ্যসেবায় হবে এক "ইসলামী মডেল"।
আমাদের এই হাসপাতালকে নিয়ে অনন্য স্বপ্নগুলো ছিলো এমন-
পর্দা ও আভিজাত্য:
এখানে নারী ও পুরুষদের জন্য থাকবে সম্পূর্ণ পৃথক জোন। মা-বোনরা যখন চিকিৎসকের কাছে আসবেন, তারা যেন এখানে নিজ ঘরের চেয়েও বেশি নিরাপদ বোধ করেন।
হালাল ঔষধ ও আকিদাহ:
রসুলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, "আল্লাহ তা'আলা রোগও পাঠিয়েছেন এবং ঔষধও পাঠিয়েছেন। তবে তোমরা হারাম দ্বারা চিকিৎসা করো না।" (আবু দাউদ)
এই হাদিসকে পাথেয় করে আমরা ল্যাবরেটরি থেকে ফার্মেসি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে হালাল উৎস নিশ্চিত করার স্বপ্ন দেখে আসছি।
চিকিৎসকের সেবা ও আলিমদের হিকমাহ:
আমাদের হাসপাতালে প্রতিটি রোগীকে কেবল শারীরিক চিকিৎসাই দেওয়া হবে না বরং অভিজ্ঞ ইসলামিক স্কলারদের মাধ্যমে তাদের মানসিক ও আধ্যাত্মিক কাউন্সিলিং করা হবে। কারণ মহান রব্বুল আলামীন ঘোষণা করেছেন:
"আমি কুরআনে এমন কিছু নাযিল করি যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ৮২)
আমাদের স্বপ্ন ছিলো, এমন একটি OT Setup যার মাধ্যমে অপারেশন থিয়েটারে যাওয়ার আগে একজন রোগী যেন মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ 'তাওয়াক্কুল' করতে শিখতে পারে। ডাক্তার হবেন কেবল সেবার ওসিলা আর প্রকৃত আরোগ্যদাতা (আশ-শাফি) হিসেবে আমাদের হৃদয়ে থাকবেন কেবল মহান আল্লাহ তা'আলা।
মানবিকতা ও ইনসাফ:
উত্তরবঙ্গের দরিদ্র ও মেহনতি মানুষের কথা চিন্তা করে আমাদের হাসপাতালে একটি বিশেষ 'সদাকাহ ফান্ড' গঠন করা হবে। রসুলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বাণী অনুযায়ী— "তোমরা জমিনবাসীদের প্রতি দয়া করো, তবেই আসমানবাসী তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।"
আমরা নিশ্চিত করতে বদ্ধ পরিকর যে, অর্থের অভাবে যেন কোনো মানুষ বিনা চিকিৎসায় ফিরে না যায়। আর এই জন্যই আমাদের এই সাদাকাহ ফান্ড।
সর্বোপরি, ইয়াশফীন হাসপাতাল হবে আমাদের আখেরাতের পাথেয় এবং উত্তরবঙ্গের মানুষের জন্য আল্লাহ তা'আলার এক বিশেষ নি'আমত।
চলতে চলতে কোনো এক স্নিগ্ধ বিকেলে হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখবো— কেউ কুরআন পড়ছে, কেউ সুস্থ হয়ে কৃতজ্ঞতার হাসি দিচ্ছে আর আযানের সাথে সাথে হাসপাতালের প্রতিটি কোণ স্রষ্টার স্মরণে মুখরিত হয়ে উঠছে।
আর এভাবেই গড়ে উঠছে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ মিলিয়ে আমার মন মগজে চলমান এক মিশ্র স্বপ্ন
"ইয়াশফীন হাসপাতাল: রংপুর শাখা"
"হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের পক্ষ থেকে এটি কবুল করুন; নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞাতা।"
"আমার চোখে স্বপ্নের হাসপাতাল" প্রতিযোগিতার শর্ট স্টোরি ক্যাটাগরিতে বিজয়ী সাবমিশন।