22/03/2026
চোখের সামনে সতর্কবার্তা থাকার পরও কিছু মানুষ তা গ্রহণ করতে চায় না—এই ঘটনা আমাকে সেটাই বুঝালো।
মিশরের কায়রো শহরে থাকি আমি। ৪৬ বছরের এই জীবনের অর্ধেকটা জুড়ে রয়েছে অসংখ্য মৃত-নারীকে গোসল করিয়ে দেয়ার অভিজ্ঞতা। কাজটা আমি করি শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। দুনিয়ার জীবনটা, নিজের দেহটা কত যে ঠুনকো—মৃতদেহ গোসল করাতে গেলে শিরায় শিরায় উপলব্ধি করা যায়। এই কাজ করতে গিয়ে অনেক অনেক অস্বাভাবিক-অলৌকিক ঘটনা দেখেছি চোখের সামনে। তাই আমি দাওয়াতি কাজ করারও চেষ্টা করি। অন্যদেরকে আল্লাহর পথে চলতে উৎসাহ করার কারণে আমার মৃত্যুটাও যেন সুন্দর হয়—এটাই কামনা।
আজ যেই ঘটনাটি শেয়ার করব, সেটার বেশি দিন হয়নি। শহরের অনেকেই জানে, আমি নারীদের লাশ গোসল করিয়ে দেই, তাই নানা জায়গা থেকে ডাক আসে। চেনা-অচেনা, সব জায়গা থেকে। সেদিনও একজন ডেকে নিয়ে গেল। আমার পরিচিত কেউ নয়, তবে পরিচিতের পরিচিত। গেলাম তার সাথে। মৃতার বয়স বেশি নয়, ৩১-৩২ বছর। তিনটি সন্তানও আছে।
ছোটছোট বাচ্চা রেখে, এত কম বয়সের একজন মারা গেল, ভাবতেই খারাপ লাগে।
বাড়িতে পৌঁছে যথারীতি শোকের পরিবেশ পেলাম। ছোট দুজন বাচ্চা নানির পাশে চুপচাপ বসে আছে, হতবাক হয়ে। বড়টা কাঁদছে। পাশেই মৃতার ছোটবোন, সেও খুব কাঁদছে। ওদের কাছে গিয়ে টুকটাক কথা বললাম। সান্ত্বনা দিলাম।
‘কাঁদবেন না, বাচ্চাগুলোর জন্য আপনাদেরকে শক্ত হতে হবে। আল্লাহ আপনার মেয়ের ওপর রহম করুন। বেশি বেশি দুয়া করুন, আল্লাহ যেন তাকে ভালো রাখেন।'
এরপর লাশ কোথায় রাখা হয়েছে, কোথায় গোসল করানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে সে বিষয়ে জানতে চাইলাম। মৃতার ছোট বোন দেখাতে নিয়ে এলো আর বলল সেও আমাকে গোসল করার কাজে সাহায্য করবে।
ভালো! একা একা গোসল করাতে অবশ্য পারি আমি, তবে সাথে একজন থাকলে মন্দ হয় না। কাজটা তাড়াতাড়ি হয়।
মৃতদেহ শুইয়ে রাখা। আমি তখনও পায়ের দিকে পরিষ্কার করছি। সামনে দাঁড়িয়ে মৃতার বোন। হঠাৎ সে বলল, ‘আল্লাহ!’
‘কী হয়েছে?’ জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে তাকাতেই দেখি লাশের মুখ দিয়ে ফেনা বেরুচ্ছে৷ চমকে গেলাম আমি।
চমক আরও বাকি ছিল। ফেনা থেকে পানি, পানি থেকে একেবারে বমি গড়িয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল! একদম জীবিত মানুষের মতো বমি। শুধু তা-ই নয়, লাশটার দেহ ঝাঁকুনি খেল। এরপর পেটের ভেতর গুড়গুড় শব্দ হয়ে বমি বেরুতেই আছে। পেটে মোচড় দিয়ে বমি হলে যেমন হয়। সেই সাথে দমবন্ধকর দুর্গন্ধ।
ভয়ে কাঁপুনি শুরু হয়ে গেল আমার। মৃতার ছোটবোনটাও আতঙ্কে কাঁদতে শুরু করল।
‘আমার বোনের কী হলো! ও এরকম করছে কেন!’
কোনো রকমে সাহস সঞ্চার করে কাজ শুরু করলাম। বমি পরিষ্কার করছি, আবার বেরুচ্ছে, পরিষ্কার করছি, আবার বেরুচ্ছে। এভাবে করতে করতে টিস্যুর প্যাকেট শেষ হয়ে গেল, নোংরা কাপড়ের স্তুপ জমে গেল। তাও বমি থামে না।
এদিকে আমাদের ক্রমাগত পেরেশানির টোনে কথাবলা, এত এত কাপড় চাওয়া দেখে গোসলখানার বাইরের মানুষজন বুঝল, কিছু ঘটেছে। একেক জন এসে জিজ্ঞেস করতে থাকে—কী হয়েছে। শেষমেশ জানাতেই হলো, লাশ বমি করছে জীবিত মানুষের মতো! থামছেই না!
কাজ করছি, কিন্তু অস্বাভাবিক অবস্থা দেখে মনে খচখচ করছে। মৃতার ছোটবোনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা, তোমার বোন কীভাবে মারা গেল?’
‘স্বাভাবিক ভাবেই।'
‘তার কোনে অসুস্থতা ছিল? হাইপ্রেশার, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার বা অন্য কোনো রোগ?’
‘না। আসলে ও অনেক হার্ডওয়ার্কিং ছিল। প্রায় দুদিন ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাজ করেছে। এরপর কাজ করতেই করতেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। অজ্ঞান হয়ে যায়। হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার বলে ও আর বেঁচে নেই।' ছোটবোনটা আবার চোখের পানি ফেলতে শুরু করল।
আমার কৌতূহল হলো। ‘আচ্ছা, তোমার বোন কী কাজ করত, বলা যাবে?'
‘কেন বলা যাবে না? বিউটি-স্যালনে কাজ করত।’
‘বিউটি-স্যালন! কিন্তু বিউটি-স্যালনে ঠিক কী কাজ করত?'
‘এই...চুল কাটা, রিবন্ডিং—স্যালনে যেসব কাজ হয়, সবই করত। তবে ও এক্সপার্ট ছিল ভ্রু প্লাক আর আইব্রো-ট্যাটু করতে।’ একটু গর্বের সাথেই যেন বলল সে, ‘কাস্টমার যেমন ভ্রু চাইত তেমনই করে দিতে পারত ও। ভ্রু তুলে সুন্দর শেইপ দিত। ট্যাটুর মাধ্যমে ভ্রুর শেইপ দিতেও পারত চমৎকার করে। ওর হাতে যাদু ছিল!’
‘লা হাউলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লাবিল্লাহ!’ শব্দ করেই বলে ফেললাম। এতক্ষণ ছোটবোনের দিকে তাকিয়ে শুনছিলাম, এরপর নিজের কাজে ফিরে গিয়ে বললাম, ‘থাক, আর বলতে হবে না। আমরা বরং কাজ করি, চলো।’
‘ওয়েট! ওয়েট!’ ছোটবোনটা বলল। ‘আপনিই না ওর কাজের বিষয়ে জানতে চাইছিলেন? এখন আবার এমন ভাব করছেন, কেন?’
‘কিছু না!’
‘কিছু না, মানে? কী বলতে চান, বলুন।’
মাথা তুলে বললাম, ‘তোমার বোন জানত না, ভ্রু প্লাক, ট্যাটু করা হারাম? তোমরা কখনও মানা করোনি তাকে? দেখো, তুমি হয়তো জানো—নবিজি ﷺ বলেছেন এসব করা হারাম। ভ্রু প্ল্যাক, ট্যাটু করে নেয়াও জায়েজ না, করে দেওয়াও জায়েজ না।’
‘চুপ করেন!’ আমার কথা শেষ হতে না হতেই মেয়েটি ধমক দিয়ে উঠল। ‘আপনার কাছে এসব কেউ শুনতে চেয়েছে? আপনি কি মুফতি? এখানে ফতোয়াবাজি করতে ডাকা হয়েছে আপনাকে? কোনটা হারাম, কোনটা হালাল—কেউ জানতে চেয়েছে আপনার কাছে? যে কাজ করতে এসেছেন, সেটা করুন।’
আমি বললাম, ‘দেখো, আমি তোমাকে আঘাত দিতে চাইনি। আমি শুধু হাদিসের কথাটা তোমাকে জানালাম। নসিহত মনে করতে পারো।'
‘রাখেন আপনার নসিহত!’
মেয়েটির চিল্লাচিল্লিতে মনে হচ্ছিল, গোসলের কাজ বাকি না থাকলে আমাকে তখনই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিত।
মেয়েটির চিৎকার-চ্যামামেচিতে আশেপাশের মানুষ দরজায় এসে জড়ো হলো। সে তাদেরকে জানিয়ে দিলো, আমি ভ্রু প্লাক-ট্যাটু হারাম হওয়ার বিষয়ে বলেছি। এ কথা শোনার পর মেয়েটির মাও তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল, ‘হ্যাঁ! ওই মহিলার সাহস কীভাবে হয় আমার মেয়েকে নিয়ে কথা বলার? এজন্য হুজুর টাইপের লোকজনকে দেখতে ইচ্ছা করে না। এরা খালি সবসময় “এটা হারাম, ওটা হারাম” বলতে থাকে। যে কাজ করতে ডাকা হয়েছে, সে কাজ করবে; এত কথা কীসের?'
বাইরে মায়ের গজগজ, ভেতরে মেয়ে চুপ কিন্তু চোখ দিয়ে জ্বালিয়ে দিবে এমন চেহারায় তার সাথে অবস্থান করে গোসল শেষ করলাম। কাফন দিয়ে চেহারা ঢেকে দিলাম, কিন্তু তখনও বমি বেরুনো বন্ধ হয়নি পুরোপুরি। আমার জীবনেও এমন কিছু আর দেখিনি। লাশকে বসিয়ে, পেটে চাপ দিয়ে ময়লা উগড়ানোর চেষ্টা করা হয়, কিন্তু সেই ময়লা আর এই ময়লার মধ্যে পার্থক্য আছে। এটা একদম বমি। আর সেই বমি বন্ধই হচ্ছিল না।
অনেক মন খারাপ নিয়ে সে বাড়ি থেকে চলে আসি সেদিন। পরে আমি জানতে পারি, ছোটবোনটা বিউটি-স্যালনে বড়বোনটার পার্টনার ছিল। মানে সেও বড়বোনের মতো ভ্রু প্লাক, আইব্রো-ট্যাটু বানানোর কাজ করত। তাই সে আমার কথা শুনে এভাবে জ্বলে উঠেছিল। আমার নসিহত উল্টো ব্যাকফায়ার করে।
অথচ আমার উদ্দেশ্য ছিল ভালো কাজে উৎসাহ ও মন্দ কাজে নিষেধ করা। ভেবেছিলাম, নিজের বোনের লাশের এমন অবস্থা দেখে হয়তো তার অন্তর নরম হবে। নিজে কোনো নাজায়েজ কাজে জড়িত থাকলে ফিরে আসবে। কিন্তু উল্টো আমার উপরই রাগ দেখাল। যারা এসব কাজের সাথে জড়িত তাদের সবার জানা উচিত,
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদিসে এসেছে—
‘আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক সে সব নারীদের উপর যারা—
১. শরীরে উল্কি (ট্যাটু) আঁকে এবং আঁকিয়ে নেয়,
২. যারা ভ্রু তুলে ফেলে এবং তুলে ফেলায়,
৩. যারা সৌন্দর্যের জন্যে সম্মুখের দাঁত কেটে সরু করে, দাঁতের মধ্যে ফাঁক তৈরি করে,
যা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে পরিবর্তন আনে।’ [সহিহ বুখারি ৫৯৩১]
#দাগ
#প্রস্থানের_পথে
লেখা : Mahbuba Upoma
[সত্য ঘটনা অবলম্বনে ]