07/11/2019
মেডোরিনাম (Medorrhinum)ঃ-
কোন স্ত্রীলোক বিবাহের পূর্বে বেশ সুন্দরী এবং স্বাস্থ্যবতী ছিল। কিন্তু বিবাহের পর থেকে স্ত্রীলোকটি স্বামী-গৃহে স্বামী সংসর্গে থাকার পর থেকে তার দেহে নানারকম জটিলতার সৃষ্টি হয়। সে রুগ্না হয়, তার শরীর ভেঙে পড়ে, ঋতুর গোলযোগ বা সাদাস্রাবে ভুগতে থাকে, ডিম্বাশয়ে ব্যথাবোধ শুরু হয়, স্বামী সহবাস ইচ্ছার অবনতি ঘটে, ক্রমশঃ সে বিবর্ণ ও মোমবর্ণ ধারণ করে। দৈহিক ক্রমাবনতির সঙ্গে মহিলাটি মানসিকভাবে হীনবল হয়ে পড়ে। আমরা এই শ্রেণীর রমণীর স্বামীর ইতিহাস সন্ধান করলে তার রোগের উৎস খুঁজে পাবো অর্থাৎ স্বামীর মধ্যে থাকা সাইকোসিস দোষ স্ত্রীদেহে সঞ্চারিত হওয়ার কারণটি জানা যাবে এবং উক্ত রমণীর রোগটি মেডোরিনাম দ্বারা আরোগ্যলাভ করবে।
কোন শিশুর পিতা যদি কখনো দুরারোগ্য ব্যাধি গনোরিয়ায় আক্রান্ত হন, এবং যদি দেখা যায় শিশুটি কোন জটিল পীড়ায় আক্রান্ত যেমন শীর্ণতাপ্রাপ্তি বা পুঁয়ে পাওয়া শিশু, হাঁপানীদোষ, মস্তকত্বক বা মুখমন্ডলে কেশদাদ বা চর্মরোগ, চক্ষু ও নাসিকার দুর্দমনীয় সর্দিতে আক্রান্ত তাহলে শিশুটিকে মেডোরিনাম দিয়ে তার জটিলতা দূর করতে হবে।
শীর্ণদেহী মোমবর্ণ যুবক যারা তামাকদ্রব্য সেবী বা মাদকাসক্ত, পরিশ্রমকাতর, বায়ুপ্রবাহে অত্যন্ত অনুভূতিশীল, শীতকাতর এবং গনোরিয়ার ইঞ্জেকশন নেওয়ার পর যুবকটি আর সুস্থ হয়ে উঠছেনা, স্বাস্থ্যের ক্রমাবনতি ঘটছে – আপনি তার জন্য মেডোরিনাম ব্যবস্থা করুন।
প্রকৃত কথা হল এই যে, মেডোরিনামের পরিচয় জানতে হলে সাইকোসিস বা বংশগত সাইকোসিসের পাঠ সর্বাগ্রে নিতে হবে। বস্তুতঃ সোরা-সিফিলিস-সাইকোসিস-এই এয়ী একপুরুষে রোগচরিত্রের যে পরিচয় দেয় বংশগতভাবে বা পুরুষানুক্রমে অবস্থার জটিলতায় কিংবা কুচিকিৎসার চাপে পড়ে রোগটি আরো সহস্রগুণ জটিল অবস্থায় উপনীত হয়। রোগের স্বরূপ নির্ণয় করা তখন দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে।
ঠিক এরকমই জটিল ও দুর্বোধ্য অবস্থায় রোগচরিত্র ও তদসদৃশ ঔষধ নির্বাচন কী করে সম্ভব ?
একজন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরীক্ষা এখানেই যে চিকিৎসক বংশগত সাইকোসিসের যথার্থ পাঠ কতটা নিতে পেরেছেন। আজকাল সরলমতি নিস্পাপ শিশুরা কেন বাত বা হাঁপানি রোগে ভুগছে? কেন মেনিঞ্জাইটিসের মত ভয়াবহ পীড়ায় শিশুরা আক্রান্ত? কেন তারা রিকেটিক বা পুঁয়ে পাওয়া রোগে ভোগে? কেনইবা মধ্যবয়স্ক বা প্রবীণ ব্যক্তিরা ক্যানসার, টিউমার বা অনুরূপ জটিল ও মরণপীড়ায় আক্রান্ত? এই সকল রোগের চিকিৎসার পূর্বে আমাদের সাইকোটিক গনোরিয়ার বিষ থেকে তৈরি মেডোরিনামের চরিত্র অনুধাবন করা উচিৎ। কোন এক পুরুষে গনোরিয়া বিষ যখন সরলভাবে আত্মপ্রকাশ করে তখন মেডোরিনাম ততটা কার্যকরী নয়, কিন্তু যখন তা বংশানুক্রমিকভাবে প্রকাশ পায় তখন তার চরিত্র এমনই দুর্বোধ্য হয়ে দাঁড়ায় যে চিকিৎসকের মনে ধাঁধার সৃষ্টি করে এবং ঔষধ নির্বাচনও কঠিন হয়ে ওঠে। মেডোরিনাম ঠিক এই জায়গায় তার ম্যাজিক দেখাতে সক্ষম। এর ক্রিয়া অতি গভীর এবং বংশগত সাইকোসিসের মুলে পৌছতে সক্ষম।
সাইকোসিস যেমন রক্তকে আক্রমণ করে রোগীকে রক্তশূন্য করে দেয় তেমনি দেহের প্রত্যেকটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আক্রমণ করে ভয়াবহ প্রদাহ বা ব্যথা-বেদনার সৃষ্টি করে। জেনে রাখা দরকার যে, দেহ যেকোন প্রদাহ যখন মারাত্মকভাবে এবং অতি যন্ত্রণাদায়করূপে প্রকাশ পায় তখন তার মুলে সাইকোসিস বা গনোরিয়া বিষ নিশ্চিতভাবে ক্রিয়াশীল থাকে। যারা রোগের প্রকৃত কারণটি অনুসন্ধান না করে শুধুমাত্র সাধারণ কিছু লক্ষণ বিচার করে চিকিৎসা করেন তারা এখনও যে হোমিওপ্যাথির ‘হ’ বোঝেননি তাতে কি সন্দেহ আছে?
রক্তের চাপবৃদ্ধি বা হাইব্লাড প্রেসার, টিউমার, ক্যানসার, গ্রন্থিবৃদ্ধি, হাঁপানি, বাত, ব্রঙ্কাইটিস, মেনিঞ্জাইটিস, ভেদবমি, লিভারপ্রদাহ, জরায়ুপ্রদাহ, কিডনিপ্রদাহ, স্নায়ুশুল, কটিবাত, শিশুর মস্তকে একজিমা, শোথ বা সর্বাঙ্গীন শোথ, মাথাঘোরা, বহুমূত্র, ইত্যাদি পীড়র মূলে প্রমেহদোষ আছে কিনা তা কি বিচার্য নয়?
গনোরিয়া রুদ্ধ হেতু যেকোন পুরাতন রোগের একমাত্র মহৌষধ মেডোরিনাম উচ্চশক্তিতে প্রয়োগ করলে রুদ্ধ গনোরিয়া স্রাব পুনঃপ্রকাশিত হবে। এটা খুব ভালো লক্ষণ, ভয় পেলে চলবেনা। অনেক মহিলার মাসিক ঋতুস্রাবের সময় মুখমন্ডলে ছোট ছোট ফোড়া হয়। আপনার যদি মেডোকে জানা থাকে তাহলে মহিলাদের ঐ রকম ফোড়া নিশ্চিতভাবে ভালো হবে। মনে রাখবেন মুখের বয়ঃব্রনের একটি উত্তম ঔষধ মেডোরিন। অনেক রোগীর রাতে অসাড়ে মূত্রপাত হয়ে যায়। আমি শুধুমাত্র মেডো ব্যবহার করে ঐরকম বহু রোগী ভালো করতে পেরেছি। পুরুষদের ধ্বজভঙ্গে এর অসীম উপকারিতা দেখে আপনি মুগ্ধ হবেন। এক পুরুষরোগীর গুহ্যদ্বারে ভীষণ চুলকানি হত। তার মূত্ৰকষ্টও ছিল। লক্ষণ বিচারে ঔষধ দিয়েও কোন ফল হয়নি। শেষে অনুসন্ধানে জানা গেল যে, রোগীর গনোররিয়া স্রাব চাপা পড়ে তার রোগটি হয়েছিল। মেডোরিনাম সিএম দুটি মাত্রায় রোগীর গুহ্যদ্বারের চুলকানি ভাল হল।
শ্রীমতি রেণুবালা সামন্ত, বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। স্বামী ভদ্রলোক প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক। রেণুবালা শীর্ণদেহী দুর্বল। তিনি দীর্ঘদিন ক্ষতকারক দুর্গন্ধযুক্ত প্রদরস্রাবে ভুগতে থাকেন। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের ইতিহাস নিয়ে জানা গেল যে, তারা গনোরিয়ার ইতিহাসযুক্ত। মেডোরিনাম সিএম দুটি মাত্রা দেওয়া হল। একমাস পরে রোগিণী জানালেন যে, তার মূত্ৰকষ্ট এবং উৎকট গন্ধযুক্ত প্রদরস্রাব দুটিই ভালো হয়েছে।
গনোরিয়া রোগটি স্পর্শাক্রমক। গনোরিয়া রোগটি ঠিক কী তার একটি সহজসরল সংজ্ঞা জেনে রাখা ভালো। মুত্র ও জননযন্ত্রের প্রদাহ তৎসহ মূত্রনালী দিয়ে পুঁজ পড়তে থাকলে তাকে এককথায় গনোরিয়া বলা হয়। পুরুষের প্রষ্টেট গ্র্যান্ড (Prostate gland-মূত্রস্থলীর গ্রীবাসংলগ্ন গ্রন্থি), ইউরেথ্রা (Urethra-মূত্ৰনলী, মুত্ৰমার্গ), ইউরেথ্রার পশ্চাৎভাগ, সেমিনাল ভেসিক্যাল (Seminal Vesicalরেতঃস্থলী মূত্রাশয়), ইপিডাইডিমিস (Epididymis-উপশুক্রাশয়, উপকোষ, অন্ডকোষের উপরের প্রান্ত), ব্লাডার-ইত্যাদি অঙ্গ আক্রান্ত হয়। রমণীদের ফেলোপিয়ান টিউব, ভ্যাজাইনা, সারভিক্স অঞ্চল, ইউরো, বারথ্যালিনাস গ্লান্ড গনোরিয়ার শিকার হয়। শিশুরাও গনোরিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। যৌবনে নারীপুরুষের কু-অভ্যাস ও কুসংসর্গ শেষ পর্যন্ত তাদের শিশুদেরকেও ভোগায়। গনোরিয়া রোগটির ইতিহাস পাঠে জানা যায় যে, সাইকোসিস দোষযুক্ত কোন মাতা পেটে সন্তান বহন করার সময় সন্তানের চক্ষুতে এর পুঁজ যদি লেগে যায় তাহলে উদরস্থ শিশুটি অপথ্যালমিয়া নিউনেটোরাম নামক চক্ষপীড়ায় আক্রান্ত হতে পারে এবং তৎকারণে শিশুটির অন্ধ হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। গনোকক্কাস নামক বিশেষ প্রকৃতির জীবাণুর দ্বারা সৃষ্ট রোগটি দুষ্ট প্রকৃতির। যান্ত্রিক পরীক্ষায় দেখা গেছে গনোকক্কাস জীবাণু অনেকটা উটের মত দেখতে। পতিতালয় থেকে এই রোগটি সাধারণত বিস্তার লাভ করে। এই জীবাণু যদি পুরুষদেহে থাকে তাহলে তা যৌনমিলনের সময় নারীদেহে সংক্রামিত হয়। একইভাবে নারীদেহ থেকে পুরুষ শরীরে তার সংক্রমণ ঘটে। এই রোগজ বিষের পুঁজ অন্য কোথাও মিউকাস মোমব্রেনে লাগলে সেই স্থানটিও আক্রান্ত হয়। পুরুষ মূত্রনালীর পশ্চাৎ দেহে একটি গর্তমত অংশ থাকে যাকে ফসান্যাভিকিউলারিস (Fossa navicularis) বলা হয়। প্রথমে এই অংশটিতে রোগটির সূত্রপাত ঘটে, পরে তা মূত্রথলি, মূত্রনালী বা প্ৰষ্টেটাইটিস এবং মহিলাদের সেলুলাইটিস (Cellulitis - কৌষিক ঝিল্লীর প্রদাহ), মেট্রাইটিস (Metritis - জরায়ুপ্রদাহ), স্যালপিনজাইটিস (Salpingitis - জরায়ুনালীপ্রদাহ), পেলভিক পেরিটোনাইটিস (Pelvic peritonitis - বস্তিকোটরীয় অন্ত্রাবরক প্রদাহ) ইত্যাদি উপসর্গ দেখা যায়।
এই পীড়ার প্রাথমিক অবস্থানটি বোঝার জন্য ঠিক কী কী লক্ষণ দেখা যায়? মূত্রনালীর সম্মুখভাবে ও ভিতরে চুলকায়, সুড়সুড় করে, গরমবোধ হয়, প্রস্রাব লালবর্ণের হয়, মূত্রনালীর মুখে রস জমে পরে পুঁজ নির্গত হয়। গনোকক্কাস জীবাণুর আক্রমণে সাইকোটিক গনোরিয়ার প্রাথমিক অবস্থাকে ইনকিউবেসন পিরিয়ড বলে। পুং জননাঙ্গে ও তার সম্মুখভাগে ক্ষত হয়। মহিলাদের মূত্রনালী ও যোনির চতুপার্শ্বে ঘা হয় ঘা থেকে পুঁজ ঝরে, জ্বালা-যন্ত্রণাও হয়। অনেক সময় লিঙ্গদ্বার স্ফীত হয়, রক্ত
বা রক্তমিশ্রিত পুঁজ নির্গত হয়ে থাকে। এই রোগে আক্রান্ত রোগী মলত্যাগকালে কুন্থন দিলে প্রস্রাবদ্বার দিয়ে সাবুদানার মত হড়হড়ে তরল নির্গত হয়। একে স্পার্মাটোরিয়া (Spermatorrhoea-যৌন উত্তেজনা ছাড়া অনৈচ্ছিক বীর্যস্খলন) বলে। গর্ভবতী মহিলাদের Septic Abortion হতে পারে। যদি কখনো কোন রোগীর মধ্যে প্রস্রাব বন্ধ, তলপেটে ব্যথা এসবের সঙ্গে মূত্রদ্বার দিয়ে পুঁজ পড়া লক্ষণটি পাওয়া যায় তাহলে মেডোরিনাম উচ্চশক্তি দিয়ে রোগটি সারাতে হবে।
জ্বালা মেডোরিনামের নিত্যসহচর এবং এর অন্যতম চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য। বিশেষ করে হস্তপদে জ্বালা থাকবেই। জ্বালা এত ভীষণ যে, আক্রান্ত অঙ্গ রোগী কখনো ঢেকে রাখতে পারেনা এবং ক্রমাগত বাতাস চায় বা ঠান্ডাজল লাগাতে চায়। শুধু কি তাই, হিমাঙ্গ অবস্থাতেও রোগী বাতাস কামনা করে। হাতে জ্বালা, পায়ে জ্বালা, ব্ৰক্ষতালুতে জ্বালা, সর্বাঙ্গে জ্বালা মেডোকে চিনতে বড়ই সাহায্য করে।
এ মেডোরিনামের প্রায় সকল রোগ দিবাভাগে বৃদ্ধি পায়। সিফিলিনামের ঠিক উল্টো অর্থাৎ নিশীথে বৃদ্ধি যেমন সিফিলিনামকে নির্দেশ করে তেমনি দিবসে বৃদ্ধি মেডোরিনামের গুণগত বৈশিষ্ট্য।
অত্যন্ত গরমকাতর।
মেডোরিনামে জ্বালা যেমন ব্যথাও তেমনি। বাত, কটিবাত, গেঁটেবাত, সর্বাঙ্গে ব্যথা বোধ ও কামড়ানি। কামড়ানি ব্যথার জন্য রোগী অঙ্গপ্রত্যঙ্গ টিপে দিতে বলে এবং শয্যাগ্রহণের পর ক্রমাগত পা নাড়াতে থাকে। রোগী পর্যবেক্ষণে লক্ষণগুলি লক্ষ্য করার মত।
মেডোরিনামে জ্বালা যেমন, ব্যথা যেমন স্পর্শকাতরতাও তেমনি। ক্ষুদ্র অথচ অসাধারণ লক্ষণ হোমিওপ্যাথির যে কতবড় বৈশিষ্ট্য এবং ক্ষেত্রবিশেষে সেসব লক্ষণ যে কি অসাধ্য সাধন করতে পারে তা যারা জানেন তারাই হোমিওপ্যাথির প্রণম্য। যেমন মেডোরিনামের ব্যথা বা স্পর্শকাতরতা, পদতলে ব্যথা ও স্পর্শকাতরতা। মেডোর পদতলের স্পর্শকাতরতা এমনই চমৎকার কথা যে অনেক সময় এই লক্ষণটির উপর নির্ভর করে রোগীদেহে অসাধ্যসাধন সম্ভব হয়েছে। লিভার-কিডনি-জরায়ু-মেরুদণ্ড সবই স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে। মহিলাদের স্তন স্পর্শকাতর হয়। চক্ষুরোগে চক্ষু স্পর্শকাতর হয়, আলোকাতঙ্ক, লক্ষ্য করলে দেখবেন অনেক শিশু আছে যাদের গায়ে হাত দিলে ভীষণ বিরক্ত হয়, ক্রদ্ধ হয়ে ওঠে। আসলে শিশুটি মেডোরিনামের স্পর্শকাতরতায় ভুগছে। দৈহিক ও মানসিক স্পর্শকাতর রোগীদের সুশৃঙ্খলায় ফিরিয়ে আনতে এই নোসোড বন্ধুটির সাহায্য ছাড়া গতি নেই।
মেডোর রোগীর মুখের ভাষাটিও লক্ষ্য করার মত। রোগী প্রায় বলতে থাকে তার দেহের ভিতরটা যেন কাঁপছে। রোগীদেহের এই অভ্যন্তরীণ কম্পনের কারণটি হল তার স্নায়বিক দুর্বলতা। এই দুর্বলতার কারণে মাথা ঘোরে, রোগী কোনরকম শ্রম সহ্য করতে পারেনা, কখনো মুর্ছা যায়। উদ্বেগ আশঙ্কা নৈরাশ্যে রোগীচিত্তে মৃত্যুভয় তৈরি হয়। মনে করে সে মহাপাপ করেছে, সর্বদা এক কাল্পনিক ভাবনায় রোগী ব্যস্ত হয়ে ওঠে। কখনো কোন রোগীর মধ্যে যদি আমরা লক্ষ্য করি যে, রোগী ক্রমাগত তার দেহ নিয়ে, রোগজ্বালা নিয়ে অভিযোগ জানাতে থাকে এমনকি চিকিৎসককে পর্যন্ত বিরক্ত করে মারে। তখন আমরা রোগীটি মেডোর অধিকারভুক্ত কিনা চিন্তা করে দেখতে পারি।
স্মৃতিশক্তিও ভীষণ দুর্বল। নিজের নাম ঠিকানা, নিজের পরিচয়ও বিস্মৃত হয়। পথ ঠিক করতে পারেনা। প্রত্যেক কথা ও কাজে তার ভুল হতে থাকে। মেডোরিনামের একটি মজার লক্ষণ হল রোগের বিবরণী দিতে রোগীর চক্ষুদ্বয় অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। পাঠ্যপুস্তকে মেডোরিনামের এই বৈশিষ্ট্য কে ‘ক্রন্দনশীলতা’ - এই ভাষায় প্রকাশ করা হয়েছে।
সিফিলিনামের মত এখানেও মাদকদ্রব্য সেবনের ইচ্ছা প্রবল। সে মিষ্টি, টক, ঝাল, লবণ, কাঁচা ফলমূল খেতে চায়।
মূত্রস্বল্পতা ও শোথ। চক্ষুর নিম্নপাতায় শোথ।
মাথাঘোরা, মাথাঘোরা প্রায় প্রত্যেক রোগের সঙ্গেই থাকে। ভীষণ মাথাঘোরা, শিশুর মাথায় একজিমা।
বহুমূত্র, মূত্রকষ্ট, মূত্রপাথরি, রক্তমূত্র, তীব্র গন্ধযুক্ত মূত্র। মূত্রত্যাগকালে জ্বালা, কিডনিতে গড়গড় শব্দ।
মহিলাদের ঋতুস্রাব অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। ঋতুর দাগ কাপড়ে লাগে।
কাশি, প্রবল কাশি, শুষ্ককাশি।
নিদ্রাকালে জিভ কামড়ে ফেলা মেডোরিনের মজার কথা।
হৃৎপিন্ডের দুর্বলতাবশতঃ বামহস্ত অসাড়বোধ বা ব্যথা।
গোড়ালীতে ব্যথা বা গোড়ালীর স্পর্শকাতরতা সাইকোসিসের একটি বৈশিষ্ট্যগত লক্ষণ। সুতরাং মেডোরিন এক্ষেত্রে চমৎকার সাড়া দেবে।
আমরা সিনা অধ্যায় পাঠে দেখেছি সিনার রোগী হলে সে ক্রমাগত নাকের ভিতরে আঙুল দিতে থাকে কারণ তার নাক সড়সড় করতে থাকে। ক্রিমি যখন রোগীকে কুরে কুরে খেতে থাকে তখন সিনা ঐরকম আচরণ করে। কিন্তু যদি এমন দেখা যায় যে রোগীর নাকের ডগা বা অগ্রভাগ সড়সড় করে এবং তজ্জনিত কারণে সে নাকের ডগায় হাত বুলায়, ক্রমাগত নাকের ডগা ঘষতে থাকে তাহলে আপনি একবার মেডোকে স্মরণ করবেন। কথাটি অতি সাধারণ মনে হলেও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় এ এক অসাধারণ বৈশিষ্ট্য।
চল্লিশোর্ধ জনৈক সুদর্শন এক পুরুষের চিকিৎসায় আমি ঠিক করতে পারছিলাম না রোগী সাইকোটিক না সিফিলিটিক মায়াজমভুক্ত। চিন্তায় পড়ি। কী করা যায় ভাবছি এমন সময় দেখি রোগী তার নাকের অগ্রভাগ ঘষছে। একবার দুবার তিনবার বারবার সে একই কাজ করছে। জিজ্ঞাসা করলাম আপনি ওরকম করছেন কেন ? রোগী উত্তর দিলেন, “ওটা আমার অভ্যাস', আসলে রোগী যাকে অভ্যাস বলছেন সেটা যে মেডোরিনকে নির্দেশ করছে চিকিৎসক হিসাবে সেকথা যেন আমরা ভুলে না যাই।
হস্তপদের অঙ্গুলির গাঁটগুলি ফুলো ফুলো। হস্তপদাঙ্গুলির ছোটছোট হাড়ের উপর লিডাম; বেঞ্জয়িক অ্যাসিড খুব ক্রিয়াশীল ঔষধ। কিন্তু লক্ষ্য রাখা উচিৎ রোগী সাইকোটিক ধাতুর হলে মেডোরিন এবং তদসদৃশ ব্যবস্থাই কাম্য।
অন্ধকারভীতি, মৃত্যুভয়, আত্মহত্যার চিন্তা, অস্থির, খিটখিটে স্বভাব। ক্রন্দনশীল।
হোমিওপ্যাথির সূক্ষ্মতা সম্পর্কে ডাঃ নরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় বলেন, আড়াআড়িভাবে দক্ষিণ উর্ধাঙ্গে এবং বাম নিম্নাঙ্গে রোগাক্রমণ কিংবা বাম হইতে দক্ষিণ (ল্যাকে)। এইরূপ অসাধারণ লক্ষণগুলি সর্বাপেক্ষা মূল্যবান, মেডোরিন সম্পর্কে ডাঃ বন্দোপাধ্যায়ের এই উক্তি প্রয়োগে যে যে রোগীতে সাফল্য পেয়েছি তাকে শুধু অসাধারণ বলাই যথেষ্ট নয়, অসাধারণের অসাধারণ বলা উচিৎ।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক যন্ত্রণাকাতর রোগিণীকে, তার ডানহাতের উর্ধাঙ্গ ও বাম পায়ের নিম্নাঙ্গ আড়াআড়ি রোগাক্রমণ দেখে আমার উত্তর পাড়ার এক ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করলাম রোগিণীকে কী ঔষধ দিতে হবে। ছাত্রটি চটজলদি জবাব দিল অ্যাগারিকাস, আড়াআড়ি বা কোনোকোনি রোগাক্রমণ হলে অ্যাগারিকাসকে সে মনে রেখেছে। কিন্তু রোগী পর্যবেক্ষণে ছাত্রটির মস্তিস্কে এই বুদ্ধিটি আসেনি যে রোগিণী সাইকোটিক ধাতুর এবং মেডোরিনের মধ্যে ঘোরাঘুরি করছে। কটি স্নায়ুশুল, প্রস্রাবজ্বালা, ঋতুর গোলোযোগ, মাথাঘোরা, হস্তপদে জ্বালা, সূর্য উদয়ের পর রোগবৃদ্ধি-অনুসন্ধানে মেডোরিনের সবকটি লক্ষণই পাওয়া গেল। এবার রোগিণীর মনস্তত্ত্বটি লক্ষ্য করতে দেখা গেল তার অহমবোধ ষোলকলায় পূর্ণ। তার চক্ষুরচাহনি, দেহের পোষাক, কণ্ঠহার, হাতের অলঙ্কার এবং সর্বপরি তার অঙ্গভঙ্গি পূর্ণমাত্রায় অরাম মেটালিকামে পূর্ণ। সুতরাং রোগিণীকে মেডোরিন সিএম দুটি মাত্র দিয়ে অরাম মেট দুদিন অন্তর খেতে দেওয়া হল। চল্লিশদিন পরে রোগিণী যখন পুনরায় এলেন, তার ব্যাগে ছিল পুকুরের কাতলা মাছ, অন্য ব্যাগে ফল ও মিষ্টির প্যাকেট। তার অভিব্যক্তি ছিল ভিন্ন রকমের। মেডো-অরামের ছোয়ায় যেন সে নবজীবন পেয়েছে। আমার পদযুগল স্পর্শ করে, বারবার ধন্যবাদ জানিয়ে রোগিণী তার একদশকের রোগযন্ত্রণা ও লক্ষ লক্ষ টাকা খরচের ইতিহাস বলতে লাগলো। বিজ্ঞান অর্থ যদি পরীক্ষালব্ধ প্রমাণিত সত্য হয় তাহলে রোগীদেহে রোগ আরোগ্যের ক্ষেত্রে আমাদের সিফিলিনাম-মেডোরিনাম-ব্যাসিলিনাম ইত্যাদি ঔষধাদি যে তারই চুড়ান্ত পরিণতি সে কথা আমি চিৎকার করে বলতে পারি। মেকিয়ানা আমাদের মজ্জায় জায়গা করে নিয়েছে বলেই সত্যের অমৃতসুধা পানে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি।
একটি মাঝবয়সি মহিলা মারাত্মকভাবে বাতরোগে আক্রান্ত হয়। গনোরিয়াস্রাব রুদ্ধ হয়ে তিনি পীড়িত হন। মহিলাটি দুই সন্তানের জননী। তার পদতল ও এঙ্কেল প্রদেশ বাতাক্রান্ত হওয়ায় তিনি চলঃশক্তিহীন হয়ে পড়েন। এমনকি প্রস্রাব পায়খানা করাও তার জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। গ্রন্থিসমূহ আড়ষ্ঠ ও বেদনাতুর হয়ে ওঠে এবং পদতল এত স্পর্শকাতর হয়ে পড়ে যে, কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকাও তার পক্ষে সম্ভব হয়না। এই শ্রেণীর রোগীর জন্য এন্টিম ক্ৰড একটি মহাদামি ঔষধ এবং বহুক্ষেত্রে এই ঔষধ প্রয়োগে আমি কাক্ষিত ফল পেয়েছি। কিন্তু এক্ষেত্রে ঔষধটি কার্যকরী না হওয়ায় আমাকে রোগিণীর অতীত ইতিহাসের সন্ধান নিতে হয়। অনুসন্ধানে জানা যায় যে, মহিলাটির স্বামী একসময় গনোরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল। এই ইতিহাস জানার পর রোগিণীকে মেডোরিন সিএম দুটি মাত্রা দিলাম। মেডোরিনের এই দুটি মাত্রাই রোগিণীর পদতল ও এঙ্কেল প্রদেশের বাত রোগটি সম্পূর্ণভাবে ভালো হয়। এখানে একটা কথা খুব করে মনে রাখা দরকার যে, যে কোন প্রাচীন পীড়ায় রোগীর অতীত ইতিহাসটি কৌশলে বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন করে জেনে নিতে হয়। অভিজ্ঞতা মানুষকে অনেক, অনেককিছু শিখতে সাহায্য করে। গনোরিয়াজনিত বাতের পীড়া বা গনোরিয়া রুদ্ধহেতু বাতের চিকিৎসায় মেডোরিন ছাড়া যে গতি নেই তা সর্বদা মনে রাখা উচিৎ।
শুধু কি তাই, আমার বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখেছি গনোরিয়াস্রাব বা তা রুদ্ধহেতু পীড়ায় নয়, মেডোরিনে এর ভিন্ন চিত্রও পাওয়া যায়। একটি পঞ্চাশবর্ষীয় সুঠামদেহী ক্ষেতমজুরের চিকিৎসা করছিলাম। কটিস্নায়ুশুলে আক্রান্ত পঙ্গুপ্রায় শয্যাশায়ী রোগীর অবস্থা ক্রমশঃ খারাপের দিকে যেতে থাকে। প্রস্রাব পায়খানা শয্যায় শুয়ে শুয়ে করতেন। গনোরিয়াস্রাব রুদ্ধ হওয়ার কোন ইতিহাস পেলাম না। সারাদেহ ঘামে ভিজে যেত। ভীষণ দুর্বল। রোগীকে মেডোরিনাম সিএম এবং ক্যালিকার্ব ২০০ শক্তি দুদিন অন্তর একমাত্রা করে খেতে দিলাম। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে রোগীদেহে আশ্চর্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল। রোগীর পরিবারের কাছে ঘটনাটি মিরাক্কেল বলে মনে হলেও আমার বিশ্বাস ছিল মেডোরিন সিএম কি অসাধ্যসাধন করতে পারে।
একটি সাইকোসিস বিষদুষ্ট রোগীর সর্বাঙ্গে ‘পোকা হাঁটার ন্যায় প্রবল অনুভুতি ছিল। কখনো উর্ধাঙ্গে, কখনো নিম্নাঙ্গে, কখনোবা সর্বাঙ্গে ঐরকম পোকা হাঁটার অত্যানুভুতির কারণে রোগী অস্থির হয়ে ওঠে। সে এক জ্বালা, রোগী গৃহস্থ সকলকে অস্থির করে তোলে। ক্রমাগত ডাক্তার বদল করেও কোন ফল না হওয়ায় রোগী মারবে না মরবে-এমন একটি মারাত্মক অবস্থায় উপনীত হয়। আমরা জানি সাইকোসিস বুদ্ধিবৃত্তিকে কীভাবে বিপন্ন করে। প্রথম জীবনে কেন্ট পড়ার সময় মেডোরিন চেপ্টারে রোগীদেহে পোকা হাঁটার অত্যানুভূতির পরিচয় পেয়েছিলাম। সুতরাং আমাকে বিভ্রান্ত হতে হয়নি। উক্ত রোগীর জন্য এই মহান বন্ধুটির ২টি মাত্রা যথেষ্ট হয়েছিল। আপনারা যদি কখনো ঐরকম রোগীর সন্ধান পান তাহলে আমার অভিজ্ঞতা একবার মিলিয়ে দেখুন। প্রসঙ্গত উক্ত রোগীর বায়ু ও কোষ্ঠকাঠিন্যের জন্য মেডোরিনের পর লাইকো দিতে হয়েছিল। যেকোন প্রাচীন পীড়ার ক্ষেত্রে সোরা-সিফিলিস-সাইকোসিসের পরিচয় পেলে আমি অগ্রে ব্যাসিলিনাম, মেডোরিনাম, সিফিলিনাম - এই নোসোডগুলির একটিকে বেছে নিই এবং ঔষধটির সিএম শক্তির দুটি ডোজ ব্যবহার করে তারপর সদৃশ ঔষধ প্রয়োগ করি। মেডোরিন ও তার আশ্চর্য ক্রিয়া সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতার কাহিনী শোনালে সে এক মোটা পুস্তক হবে। আপনারা এই মহান বন্ধুটিকে পুনঃপুনঃ পাঠ করুন। যত পড়বেন আশ্চর্যান্বিত হবেন, আপনার অভিজ্ঞতার ভান্ডার সমৃদ্ধ হবে।
সুত্রঃ হোমিওপ্যাথি ম্যাজিক কিউর অফ ডাঃ এম হাসান