24/03/2026
ইরান কি আসলে ইতোমধ্যেই “নিউক্লিয়ার পাওয়ার”? 🤔
অনেকেই মনে করেন, ইরান এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক শক্তিধর দেশ নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—ইরান এখন এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখান থেকে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম।
বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবেই স্বীকৃত। এই ইউরেনিয়ামকে ৯০% পর্যন্ত সমৃদ্ধ করতে মাত্র ১–২ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। আর এই পরিমাণ ইউরেনিয়াম দিয়ে তাত্ত্বিকভাবে ১০–১১টি পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরি করা সম্ভব।
এই সংঘাত ইতোমধ্যে ২৪ দিন পার করেছে। এই সময়ের মধ্যেই ৬০% থেকে ৯০% সমৃদ্ধকরণ সম্পন্ন করা সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই কাজের জন্য নতুন করে বড় কোনো স্থাপনার প্রয়োজন হয় না। ইরানের হাতে থাকা IR-1, IR-2m, IR-6 সেন্ট্রিফিউজ দিয়েই শুধু কনফিগারেশন পরিবর্তন করে এই কাজ করা যায়।
সাধারণত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সময় প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়, যা বের করার জন্য বড় ভেন্টিলেশন সিস্টেম দরকার হয়। এগুলো অনেক সময় মাটির উপরে টাওয়ারের মতো দেখা যায়। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এগুলো পাহাড়ের ফাঁক বা গুহার প্রবেশপথের মতো করে লুকানো সম্ভব।
২০২৩–২০২৪ সালের স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, ইসফাহান ও নাতাঞ্জের কাছে নতুন টানেল কমপ্লেক্স তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, এই টানেলগুলো প্রায় ৮০–১০০ মিটার গভীরে, যা সাধারণ ‘বাংকার বাস্টার’ বোমা দিয়ে ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইরানের সব মিসাইল সিটির অবস্থান এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। যখন বিশ্বের শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষেও সবকিছু শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি, তখন ধরে নেওয়া কঠিন নয় যে কোথাও গোপনে সম্পূর্ণ আন্ডারগ্রাউন্ড পারমাণবিক স্থাপনাও থাকতে পারে।
অনেকে মনে করেন শুধু ইউরেনিয়াম থাকলেই বোমা বানানো যায় না, ডিজাইন করতে ৬–১২ মাস লাগে। কিন্তু বাস্তবে, ২০০৩ সালের আগেই ইরান ‘Project Amad’ নামে একটি গোপন প্রোগ্রাম চালাচ্ছিল। ২০১৮ সালে উদ্ধার হওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, তারা তখনই গোলাকার নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড ডিজাইন নিয়ে কাজ করছিল।
বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞের মতে, ইরান অনেক আগেই তাদের ওয়ারহেড ডিজাইন সম্পন্ন করেছে। এমনকি কীভাবে এটি মিসাইলের মাথায় বসানো হবে, সেটিও তারা সিমুলেশন করে পরীক্ষা করেছে। ডেটোনেশন সিস্টেম বা এক্সপ্লোসিভ লেন্স নিয়েও পরীক্ষা চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
মিসাইল প্রযুক্তির দিক থেকেও ইরান অনেক এগিয়ে। তাদের খাইবার ও ফাতাহ মিসাইল পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম বলে মনে করা হয়। বিশেষ করে ফাতাহ-২ হাইপারসনিক মিসাইল—এটি আটকানোর মতো কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনও সীমিত।
২০২৬ সালের কিছু গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান তাদের ‘ব্রেকআউট টাইম’ প্রায় শূন্যে নামিয়ে এনেছে। অর্থাৎ তারা সরাসরি বোমা তৈরি না করেও এমন অবস্থায় আছে, যেখানে সব উপাদান আলাদা করে প্রস্তুত রাখা হয়েছে—যা কয়েক দিনের মধ্যেই একত্র করে কার্যকর অস্ত্র বানানো সম্ভব। এটিকেই বলা হয় ‘virtual nuclear state’।
ইরানের কাছে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আছে, বোমার প্রয়োজনীয় উপাদান প্রস্তুত, এবং সেই বোমা বহনের সক্ষম মিসাইলও রয়েছে। তাই এটাকে শুধু “সম্ভাবনা” বলে উড়িয়ে দেওয়া অনেকের কাছে বাস্তবসম্মত মনে হয় না।
এই প্রেক্ষাপটেই ২০২৪ সালের মে মাসে আলী লারিজানি বলেছিলেন—ইরান এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে তারা কয়েক দিনের মধ্যেই পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে সক্ষম।
সম্প্রতি খবর এসেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হয়েছে, যেখানে ইরানকে নিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে ইরান এই ধরনের আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার জানিয়েছেন, এই ধরনের খবর আসলে আন্তর্জাতিক বাজার—বিশেষ করে তেলের বাজার—প্রভাবিত করার একটি কৌশলও হতে পারে। একই সঙ্গে তারা বলেছে, যেকোনো পরিস্থিতির জবাব দিতে ইরান প্রস্তুত।
সব মিলিয়ে, অনেক বিশ্লেষকের মতে—বর্তমান পরিস্থিতি কেবল সামরিক নয়, কূটনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশলেরও অংশ। আর এই সব তথ্য ইঙ্গিত করে যে, ইরান ইতোমধ্যেই একটি শক্তিশালী পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতা অর্জন করেছে এবং তারা সহজে পিছিয়ে আসার সম্ভাবনা কম।
প্রশ্নটা এখন আর “ইরান পারবে কি না” তা না—
প্রশ্নটা হলো: তারা চাইলে কবে করবে?