29/01/2026
এই আর্টিকেলে জানতে পারবেন জীন-যাদুর বাস্তবতা?
জ্বীনের আছর, বদনজর, হাসাদ ও কালো যাদু: কুরআন–হাদীসের আলোকে বাস্তবতা, লক্ষণ, প্রতিকার
ভূমিকা
বর্তমান যুগে শারীরিক ও মানসিক রোগের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। অনেক সময় রোগীরা ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি, প্যানিক অ্যাটাক, ঘুমের সমস্যা, অতিরিক্ত ভয়, পরিবারে অশান্তি, বা হঠাৎ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হন এবং কারণ খুঁজে পান না। এই অবস্থায় অনেকেই সন্দেহ করেন—জ্বীনের আছর, বদনজর, হাসাদ বা কালো যাদুর প্রভাব আছে কি না।
ইসলাম এই চারটি বিষয়ের বাস্তবতা অস্বীকার করেনি; বরং পথ দেখিয়েছে। তবে ইসলাম কখনো অন্ধবিশ্বাস বা অতিরঞ্জন সমর্থন করে না। তাই বিষয়টি ভারসাম্যপূর্ণভাবে বোঝা জরুরি—কোন লক্ষণগুলো সত্যিই রুহানী সমস্যা হতে পারে, আর কোনগুলো মেডিক্যাল/সাইকোলজিক্যাল সমস্যা হতে পারে।
---
জ্বীনের আছর (Possession)
জ্বীন আছর বাস্তব কি?
কুরআন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে জ্বীন মানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
কুরআনের দলিল
“যারা সুদ খায় তারা সেইভাবে দাঁড়াবে যেভাবে আছরগ্রস্তকে শয়তান স্পর্শ করে।”
— সূরা বাক্বারাহ ২:২৭৫
➤ এখানে “শয়তান স্পর্শ করা” শব্দটি জ্বীন-আছরের বাস্তবতা প্রমাণ করে।
“আমি মানুষের বুকে কুমন্ত্রণা দিই সে শয়তানের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই।”
— সূরা নাস
হাদীস
এক সাহাবী শিশু জ্বীনের আছরে আক্রান্ত হলে রাসুল ﷺ তার মাথায় হাত রেখে রুকইয়াহ পড়তেন।
— মুসনাদ আহমাদ
সম্ভাব্য লক্ষণ
বর্তমান যুগের ক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জ্বীন আছর সন্দেহ হলে সাধারণত দেখা যায়:
হঠাৎ অকারণে প্রচণ্ড রাগ, ভয় বা কান্না
শরীর অবশ হয়ে যাওয়া, শ্বাস আটকে আসা
বুক ভারী লাগা, কারণ ছাড়া দুঃস্বপ্ন
কুরআন শুনলে বিরক্তি, অথবা মোচড়ানো ব্যথা
হঠাৎ কোনো স্থানে যেতে ভয়, মানুষের সাথে কথা বলতে অনীহা
মনে হয় কেউ পাশেই আছে বা দেখছে
চিকিৎসা করেও কারণহীন ব্যথা না কমা
সতর্কতা: এগুলো সবসময় জ্বীনের আছর না-ও হতে পারে। এগুলো অনেকসময় মানসিক চাপ, ট্রমা, নিউরো–ইমব্যালেন্স, থাইরয়েড বা ভিটামিন D/B12 ঘাটতির কারণেও হয়। এজন্য ইসলাম চিকিৎসাকে অস্বীকার করেনি।
---
বদনজর (Evil Eye)
ইসলাম কি বদনজরকে স্বীকার করে?
হ্যাঁ, বদনজর বাস্তব।
হাদীসের প্রমাণ
রাসুল ﷺ বলেন: “বদনজর সত্য।”
— সহীহ মুসলিম
অন্য হাদীসে তিনি বলেন:
“বেশিরভাগ মানুষ বদনজরের কারণে কবরে যায়।”
— সহীহ বুখারী (আল-আদবুল মুফরদ)
সম্ভাব্য লক্ষণ
বর্তমান যুগের রোগীদের মধ্যে বদনজরের সাধারণ লক্ষণ:
হঠাৎ শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া
কোনো কাজ ঠিকমতো চলছিল, হঠাৎ নষ্ট হয়ে যাওয়া
অতিরিক্ত মাথাব্যথা
চোখের চারপাশে ভারী ভাব
কোনো শিশু হঠাৎ কান্না করা বা দুধ না খাওয়া
একজনের সৌন্দর্য বা সফলতা দেখে অন্যের ঈর্ষা হলে সেই প্রভাবে ক্ষতি হওয়া
নোট: এটা অতি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়—হাদীস অনুযায়ী ঈর্ষা ও নেতিবাচক দৃষ্টি বাস্তব ক্ষতি করে।
---
হাসাদ (Jealousy/Evil Jealousy)
হাসাদ বা ঈর্ষা মানসিক এবং রুহানী—দুইভাবেই ক্ষতি করে।
কুরআনের প্রমাণ
“আমি আশ্রয় চাই হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে।”
— সূরা ফালাক, আয়াত ৫
হাদীস
রাসুল ﷺ বলেন:
“হাসাদ ভালো কাজগুলো পুড়িয়ে ফেলে যেমন আগুন কাঠ পুড়িয়ে ফেলে।”
— সুনান আবু দাউদ
হাসাদের লক্ষণ
ব্যক্তির ওপর ধারাবাহিক দুর্ভাগ্য
কাজের বরকত চলে যাওয়া
পরিবারে হঠাৎ অশান্তি
মন খারাপ, অকারণে কান্না
আগে যা আনন্দ দিত, এখন তা আর ভালো না লাগা
নিজেকে মূল্যহীন মনে হওয়া
---
কালো যাদু (Sihr / Black Magic)
কালো যাদু কি সত্য?
হ্যাঁ, কুরআনে যাদুর প্রমাণ আছে।
কুরআন
“তারা শিখতো সেই জাদু, যা হারুত–মারুতের উপর নাজিল হয়েছিল… মানুষ স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর মতো জাদু শিখতো।”
— সূরা বাক্বারাহ ২:১০২
➤ এখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, যাদু পরিবার ভাঙতে পারে, সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে।
হাদীস
নবী ﷺ স্বয়ং লবাধিকের যাদুর শিকার হয়েছিলেন।
— সহীহ বুখারী
তিনি অসুস্থ বোধ করতেন, মনে হতো কাজ করলেও করেননি—এটি যাদুর পরিচিত লক্ষণ।
সম্ভাব্য লক্ষণ
স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে তীব্র ঝগড়া
একে অপরকে দেখলেই রাগ
ব্যবসা বারবার নষ্ট হওয়া
ঘুমের সমস্যা
দুঃস্বপ্ন দেখা
চুল, রক্ত, নোংরা জিনিস ঘরে পাওয়া (কখনো হয়, বেশিরভাগ সময় প্র্যাকটিক্যালি দেখা যায় না)
ভালো চিকিৎসা সত্ত্বেও অকারণে অসুখ
---
রুহানী সমস্যা বনাম মেডিক্যাল সমস্যা: কিভাবে বুঝবেন?
একজন রোগীকে ৩ভাবে পরীক্ষা করা উচিত—
১) মেডিক্যাল মূল্যায়ন
রক্ত পরীক্ষা
থাইরয়েড
ভিটামিন D/B12
স্লিপ ডিসঅর্ডার
মানসিক চাপ
বেশিরভাগ “জ্বীন–বদনজর” ধারণার ৫০–৬০% আসলে এগুলোর কারণে হয়।
২) মানসিক/সাইকোলজিক্যাল মূল্যায়ন
ডিপ্রেশন
প্যানিক ডিসঅর্ডার
PTSD
ট্রমা
রিলেশনশিপ স্ট্রেস
এসব থাকলে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
৩) রুহানী মূল্যায়ন
যখন—
ডাক্তার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না
চিকিৎসা নিচ্ছেন, উন্নতি হচ্ছে না
কুরআন শুনলে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া
দুঃস্বপ্ন, অদ্ভুত ভয়, হঠাৎ শক্তিহীনতা
তখন রুকইয়া করা যায়।
---
রুকইয়া (Ruqyah): ইসলামিক চিকিৎসা
কুরআন–হাদীস সমর্থিত রুকইয়া
১) সূরা ফাতিহা
নবী ﷺ এক আক্রান্ত ব্যক্তিকে শুধু সূরা ফাতিহা পড়ে সুস্থ করেছিলেন।
— সহীহ বুখারী
২) সূরা বাক্বারাহ
“বাক্বারাহ পড়লে ঘরে শয়তান প্রবেশ করতে পারে না।”
— সহীহ মুসলিম
৩) আয়াতুল কুরসি
ঘুমের আগে পড়লে শয়তানকে দূরে রাখে।
— সহীহ বুখারী
৪) সূরা ফালাক + সূরা নাস
যাদু, বদনজর, জ্বীন থেকে সুরক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী আমল।
৫) রুকইয়া দুয়া
“আল্লাহুম্মা রাব্বান-নাস, আদহিবিল-বা’স…”
“বিসমিল্লাহি আরকীক…”
---
রুকইয়া করার সহজ পদ্ধতি (প্রতিদিন)
১. হাত দুটোতে ফুঁ দিয়ে
সূরা ফালাক
সূরা নাস
আয়াতুল কুরসি
সূরা ফাতিহা
পড়ুন এবং পুরো শরীরে মাসেহ করুন।
2. পানি পড়ে পান করুন:
ফালাক
নাস
ইখলাস
ফাতিহা
3. ঘুমের আগে:
আয়াতুল কুরসি
আমানা রাসুলু (বাক্বারাহ ২:২৮৫–২৮৬)
4. ঘর থেকে ছবি/মূর্তি/সংগীত বাদ দিন
— এগুলো শয়তান আকর্ষণ করে (সহীহ মুসলিম)
5. প্রতি শুক্রবার বাক্বারাহের কিছু অংশ পড়ুন।
---
কখন রুকইয়া দরকার? (চেকলিস্ট)
একই দুঃস্বপ্ন বারবার
কুরআন শুনলে ভয়ের অনুভূতি
চিকিৎসা নিলেও কোনো উন্নতি নেই
শরীর ভারী, বুক চাপ
অকারণে কান্না
পরিবারে অশান্তি
হঠাৎ কর্মজীবনে বিপর্যয়
মাথায় চাপ বা আগুন–আগুন লাগা অনুভূতি
তবে অতিরিক্ত সন্দেহবাতিকতা থেকেও বিরত থাকুন।
---
রুগীর জন্য বাস্তব পরামর্শ (আপডেটেড)
১) কুরআন + মেডিক্যাল দুইটাই নিন
ইসলাম চিকিৎসা নিতে নিষেধ করে নাই।
2) জীবনযাত্রা পরিবর্তন
পর্যাপ্ত ঘুম
নিয়মিত দোয়া–যিকির
স্ক্রিন টাইম কমানো
হারাম থেকে বাঁচা
পরিচ্ছন্নতা
পরিবারের সাথে সময় কাটানো
3) মানসিক স্বাস্থ্য
অনেক রোগী আসলে PTSD, ডিপ্রেশন, ট্রমায় ভোগেন। এগুলো রুকইয়ার সাথে থেরাপি নিলে খুব দ্রুত ভালো হয়।
4) NLP/মাইন্ডফুলনেস + রুকইয়া
অনেক রোগীর ক্ষেত্রে (বিশেষত আপনি যেমন কোচিং করতে চান):
Calm breathing
Anchor technique
Cognitive reframing
Thought replacement
এসব রুকইয়ার সাথে দিলে ফল চমৎকার হয়।
---
ভুল ধারণা ও সতর্কতা
ঝাড়–ফুঁক, আগুন–ধোঁয়া, তাবিজ–কবচ — হারাম
কবরের পানি, গাছের ডাল, পীরের তেল— হারাম
নাম না জানা কোনো রুকইয়া/কোড শব্দ পড়া— বিডআত
অতি সন্দেহ— মানসিক রোগ তৈরি করে
---
উপসংহার
জ্বীনের আছর, বদনজর, হাসাদ ও কালো যাদুর বাস্তবতা ইসলামের দৃষ্টিতে প্রমাণিত। তবে বর্তমান যুগে এগুলো নিয়ে অতি ভয়, অন্ধবিশ্বাস ও ভুল চিকিৎসা বাড়ছে। এজন্য একজন সচেতন মুসলিমকে তিনটি পথে চলতে হবে:
১) শরয়ি রুকইয়া
২) মেডিক্যাল ও সাইকোলজিক্যাল চেকআপ
৩) আল্লাহর ওপর ভরসা ও নিয়মিত যিকির
রোগের ধরন শারীরিক, মানসিক বা রুহানী—যাই হোক না কেন, কুরআন–হাদীসের নির্দেশনা মেনে চললে সমাধান অবশ্যই পাওয়া যায়।
আমাদের কাছে রুক্বইয়াহ করতে যোগাযোগ করুন নিচে দেওয়া নাম্বারে
০১৬২১-২৪১৫০৩