10/12/2020
শিশুর দাঁতের সমস্যা
------------------------
আমি ইদানিং অনেক অভিভাবকদের পাচ্ছি যারা তাদের বাচ্চাদের দাঁতের সমস্যা নিয়ে আমার কাছে আসছেন। বাচ্চাদের দাঁত বলতে আমি মুলত দুধ দাঁত (Deciduous teeth) এর কথা বলছি যা শিশুর জন্মের ৬ মাস থেকে ২ বছর বয়সের মাঝে উঠে যায়। স্বাভাবিক ভাবে শিশুর মুখে ২০ টি দুধ দাঁত উঠে, যা শিশুর বয়স ৬ বছর থেকে শুরু করে ১২ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয় এবং এরপর পড়ে গিয়ে নতুন স্থায়ী দাঁত আসে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিভাবকরা আসছেন শিশুর দাঁতের অত্যাধিক ক্ষয় কিংবা গর্ত নিয়ে , যাকে আমরা বলি ডেন্টাল ক্যারিজ। আমাদের দেশে শিশুদের দাঁতের ক্ষয় বা গর্ত হওয়াকে অনেকেই শিশুদের দাঁতের পোকা বলে। আমাদের দাঁতের উপরিভাগের শক্ত আবরনকে দাঁতের এনামেল বলা হয়। মুলত চিনি বা মিষ্টিজাতীয় খাদ্য শিশুর মুখের ভেতরে একধরনের জীবাণুর সঙ্গে মিশে অ্যাসিড তৈরি করে। এই অ্যাসিড শিশুর দাঁতের ওপরের শক্ত আবরন বা এনামেলকে ক্ষয় করে এবং পরে গর্তের সৃষ্টি করে। বাচ্চাদের দাঁতের ব্যথা হওয়ার অনেক বড় কারন দাঁতের ক্ষয় ।
বিভিন্ন কারনে ডেন্টাল ক্যারিজ বা দাঁতের ক্ষয় হতে পারে।
১। অনেক বাচ্চাই মায়ের বুকের দুধ খেতে খেতে ঘুমায় এবং সেটাকে দীর্ঘস্থায়ী অভ্যাসে পরিনত করে। যেহেতু বাচ্চা দীর্ঘক্ষন ঘুম এ থাকে, এই সময় দুধের মিষ্টি দাঁতের গায়ে এনামেলের ওপর এক ধরনের আবরণ সৃষ্টি করে, যার নাম পেলিক্যাল। এই পেলিক্যালকেই বলা হয় ডেন্টাল প্ল্যাক । এই ডেন্টাল প্ল্যাক লাখ লাখ জীবাণুর সঙ্গে মিশে অ্যাসিড তৈরি করে যা শিশুদের ডেন্টাল ক্যারিজ বা দাঁত ক্ষয় রোগের প্রধান কারণ।
২। অনেক বাচ্চাই ফিডার মুখে দিয়ে ঘুমায়। এদের দাঁত ও একই ভাবে দাঁত ক্ষয় রোগের ঝুকিতে থাকে। এই ক্ষেত্রে মায়ের সচেতনতা অত্যান্ত জরুরি। মা দের সচেতন থাকতে হবে যাতে শিশুর কোন অবস্থাতেই ফিডার কিংবা মায়ের বুকের নিপেল মুখে দিয়ে ঘুমানোর অভ্যাস তৈরি না হয়।
৩। শিশুর দাঁত ঠিকমত ব্রাশ না করলে ডেন্টাল ক্যারিজ হতে পারে। নিয়মিত ব্রাশ করা, বিশেষ করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে এবং সকালে ঘুম থেকে ওঠে নাস্তার পরে দাঁত ব্রাশ করার অভ্যাস করাতে হবে। মনে রাখতে হবে , শিশুকালই কিন্তু ভাল অভ্যাস তৈরি করে দেয়ার উপযুক্ত সময়। শিশু যতদিন পর্যন্ত নিজে ব্রাশ করতে পারবে না, অভিভাবক এর উচিত নরম কাপড় দিয়ে নিয়মিত শিশুর দাঁত পরিষ্কার করে দেয়া।
৪। মিষ্টি সমৃদ্ধ খাবার যেমন চকলেট, আইসক্রিম, কোক, জুস শিশুর দাঁতের জন্য ক্ষতিকর। শিশুরা এ ধরনের খাবার খেতে পছন্দ করে। এগুলো শিশুদের বেশী পরিমানে খেতে দেয়া যাবে না। মাঝে মধ্যে সীমিত পরিমানে খেলেও যাতে সাথে সাথেই দাঁত পরিষ্কার করে ফেলে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
আমাদের অভিভাবকদের অনেকেরই একটা ভুল ধারনা , দুধ দাঁততো পড়েই যাবে, এর বেশি যত্ন নেওয়ার দরকার নেই। কিন্তু দুধদাঁত সুস্থভাবে না পড়লে পরবর্তিতে স্থায়ী দাঁত সঠিক ভাবে বা শ্রেণীবদ্ধভাবে আসে না। উঠতি দাঁতের প্রবনতাই হলো ফাকা স্থান দখল করা। কোন অবস্থাতে যদি শিশুর দুধ দাঁত সময়ের আগে পড়ে যায় কিংবা ক্ষয়জনিত সমস্যার কারনে আগে ভাগে দাঁত ফেলে দিতে হয় সে ক্ষেত্রে শুন্য বা ফাকা স্থান তৈরি হয় । পরবর্তিতে স্থায়ী দাঁত ওঠার সময় দাঁত পাশের ফাকা যায়গায় হেলে পড়ার আশঙ্কা থাকে। ফলাফল হয় স্থায়ী বাকা দাঁত কিংবা দাঁতের উপর দাঁত উঠে যাওয়া । এছাড়াও হাতের বুড়ো আঙ্গুল চোষা, মুখ দিয়ে শ্বাস নেয়া, জিহ্বা দিয়ে ধাক্কা দেয়া, দীর্ঘদিন বোতলের মাধ্যমে খাওয়ালে পরবর্তিতে স্থায়ী দাঁত উচু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
সুতারং শিশুর প্রাথমিক দাঁত বা দুধ দাঁতের ভাল থাকাটা ভবিষ্যতের স্থায়ী দাঁতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর দাঁতের ক্ষয়রোগ এড়াতে শিশুর দুধ দাঁতের যত্ন নিতে হবে। সকল সচেতন অভিভাবকদের উচিত শিশুর বয়স এক বছর হলেই ডেন্টিস্ট কে দেখানো এবং পরামর্শ গ্রহন করা ।
ডাঃসুমি আকতার
মেসওয়াক ডেন্টাল কেয়ার
মিরপুর , ঢাকা