17/11/2025
চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিশেষায়িত শাখা ফিজিওথেরাপি –
ড. মোঃ ফিরোজ কবির, পিএইচডি Feroz Kabir
সুস্থতার এক স্বতন্ত্র দিগন্ত ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক স্বীকৃত ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা পদ্ধতি। ফিজিও শব্দের অর্থ শরীর, আর থেরাপি শব্দের অর্থ চিকিৎসা। এটি একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াবিহীন অত্যাবশ্যক বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা পদ্ধতি যা আঘাত, অসুস্থতা বা অক্ষমতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শরীরকে পুনরদ্ধার করে। দীর্ঘমেয়াদি ব্যথার চিকিৎসায় ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহারের ঝুঁকি তথা ঔষধের নির্ভরতা কমিয়ে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার এখন বিশ্বব্যাপী গ্রহনযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফিজিওথেরাপি বর্তমানে কেবল পুনর্বাসন নয়, বরং প্রতিরোধ ও কিউরেটিভ চিকিৎসায় এক অপরিহার্য্য অঙ্গ।
আর্থাইটিস, কোমর ব্যথা, ঘাড় ব্যথা, হাঁটু ব্যথাসহ বিভিন্ন অস্থিসন্ধি ও মাংসপেশির ব্যথায় ফিজিওথেরাপি’র কার্যকারিতা অপরিসীম। এই চিকিৎসা আঘাত বা অস্ত্রোপচারের পর দ্রুত গতিশীলতা ফিরিয়ে আনে।
ব্যথা কমাতে ম্যানিপুলেটিভ থেরাপি, ইলেক্ট্রোথেরাপি যেমন টেন্স, শক ওয়েভ থেরাপি, আল্ট্রাসাউন্ড, আইআরআর এবং থেরাপিউটিক এক্সারসাইজের মতো আধুনিক পদ্ধতির ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। এছাড়া স্ট্রোক, প্যারালাইসিস, নার্ভ ইনজুরি, বেলস পালসি (মুখ বেঁকে যাওয়া) ইত্যাদি রোগে স্নায়ু ও মাংস পেশির কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনতে এর অপরিহার্য্যতা বর্ণনাতীত। খেলোয়াড়দের ইনজুরি ম্যানেজমেন্ট ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে, সেরিব্রাল পালসি, অটিজম এবং জন্মগত ত্রুটিযুক্ত শিশুদের চিকিৎসায়, বয়স্কদের ভারসাম্য ও দৈহিক সক্ষমতা বজায় রাখতে, পোড়া রোগীদের মাংসপেশির সংকোচন রোধ ও শ্বাস-প্রশ্বাসের উন্নতিতে, প্রসব পরবর্তী মায়েদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সহায়তা করতে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার গুরুত্ব অপরিসীম।
আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি বিশ্বজুড়ে ফিজিওথেরাপি এখন স্বাস্থ্যসেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশেও এর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। রোগ হওয়ার আগেই জীবনযাত্রার ভুলভ্রান্তি (যেমন ভুল অঙ্গবিন্যাস) সংশোধন করে রোগ প্রতিরোধের ওপর জোর দেওয়া।
ভবিষ্যতে টেলি-রিহ্যাবিলিটেশন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নির্ভর ডিভাইস এবং ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ভিত্তিক পুনর্বাসন পদ্ধতির মাধ্যমে চিকিৎসা আরও সহজলভ্য ও কার্যকর হবে।
গবেষণা অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে সরাসরি ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নিলে চিকিৎসার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ নির্ভরতা কমায় এটি স্বাস্থ্য অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
উন্নত বিশ্বে ফিজিওথেরাপিস্টরা ফার্স্ট কন্টাক্ট প্র্যাকটিশনার হিসেবে কাজ করেন, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশেও সম্পূর্ণ কার্যকর হবে বলে আশা করা যায়। দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও ফিজিওথেরাপি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব রয়েছে। ডিগ্রিবিহীন বা স্বীয় প্রশিক্ষিত ব্যক্তি দ্বারা চিকিৎসা প্রদানের ফলে ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি বাড়ছে।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ফিজিওথেরাপি নিয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এই চিকিৎসা নিতে শুধু স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিধারী (ব্যাচেলর অফ ফিজিওথেরাপি) চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার জন্য মানুষকে উৎসাহিত করা দরকার কারন বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন ২০১৮ অনুযায়ী “ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক মানেই ব্যাচেলর ডিগ্রিধারী ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক”।
ফিজিওথেরাপি একটি সুস্থ, সক্রিয় ও কর্মক্ষম জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ব্যক্তিগত ও জাতীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা গ্রহণ ও এর মানোন্নয়নে সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি। সুস্থ জীবনের জন্য শারীরিক সচলতা বজায় রাখা অপরিহার্য, আর এই সচলতার চাবিকাঠি হলো বিজ্ঞানসম্মত ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা।
সুতরাং ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নিতে হলে অবশ্যই ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা অপরিহার্য, অন্য কারো নয়।
লেখকঃ
ড. মোঃ ফিরোজ কবির, পিএইচডি
সহকারি অধ্যাপক ও ফাউন্ডার চেয়ারম্যান,
ফিজিওথেরাপি এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগ,
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।