01/09/2016
১৯৭১ সালে জুলাই অগাস্ট মাস হইব, আমরা উদ্বাস্তু, বিহারী আর পাইক্যারা ঘর ছাড়া করছে, প্রথমে কলতাবাজার নাণীর বাড়িতে কয়েক মাস পরে নানীর বাকী ফরজন্দ আইস্যা ভিড় জমানোতে বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন অন্য কোথাও যাওয়া দরকার, কিন্ত মাতাজী ঢাকা ছাইড়া যাইবো না তার থিওরী “মরলে সবাই একসাথে” আমার বাবার বাড়ির কেউ নাই গ্রামের বাড়িতে আর মাতাজীর পুরা ব্যাটালিয়ান ঢাকা বাসী তাই মাতাজীর জয়।
আমার একমাত্র ফুপু থাকতেন পলাশী ব্যারাকে ৭/৩ নাম্বার বাসায় তিনি কইলেন তার বাড়ির পরের লাইন ঠিক তার বাড়ির পিছনেই এক ভদ্রলোক তার পরিবার গ্রামের বাড়ি পাঠায়া দিছেন তিনি তার ইউনিট টা ভাড়া দিবেন। পিতাজী সেই এক কামরা রান্নাঘর সহ মাসিক ৬০ টাকায় ভাড়া নিলেন, আমরা দুই রিক্সা ভইরা ‘সব মালপত্র’ মানে আমাদের পরনের কাপড় আর কয়েকটা ডেকচি পাতিল বাসন কোসন আর দুইটা বিছানা যা নানীর বাড়ি আসার পরে কেনা হইছিল নিয়া পলাশী ব্যারাকের ১০/৩ (ইয়াল্লাহ নাম্বার টা মনে নাই কেন?!) হাজির হইলাম।
জুলাই থাইকা সেপ্টম্বর পর্যন্ত ছিলাম সেইখানে, এঃহেঃ ধান ভানতে শিবের গীত গাইতাছি! নাহ কিছুটা রেফারেন্সতো আছে।
সেই জুলাই থাইকা সেপ্টম্বর পর্যন্ত সময়টাতে দেশে মুক্তিযুদ্ধ চলছে, ঠিক তখনই হঠাৎ কইরা সবার চোখ লাল হওয়া শুরু হইল। প্রথম গুজব ছড়াইল এইটা পাইক্যারা করছে। প্রায় সব ঘরেই চোখ লাল রোগী! একজনের হয় পুরা বাড়ীর সবার হয় ভীষন চুল্কায়, পানি পরে, জ্বালা পোড়া করে, সকালে চোখ খোলা যায় না পাতা জোড়া লাইগা থাকে সাত আট দিন পরে সাইরা যায়। কিন্ত অসহ্য অত্যাচার, পাইক্যাগো দৌরাত্ব কেউ ডাক্তারের কাছেও যাইতে পারে না, তারপর শুরু হইল এইটার হাতুড়ে চিকিৎসা মানুষ বিভিন্ন লতা গুল্ম আবিস্কার করা শুরু করলো, তার মধ্যে একটার নাম ‘হাতিশুরা পাতা’। কইলো এই পাতা বাইটা রস চোখে দিলে চোখ লাল সাইরা যায়। জানিনা এইটাত কোন বৈজ্ঞ্যানিক কারন আছে কিনা কিন্তু কারো কারো লাল কইমা যাওয়াতে এইটা ধ্বনতরী অষুধ সাব্যস্ত হইল। হয়তো এই রোগ আপনা থাইকাই সাইরা যাইতো কারন এইটা একটা সীমিত সময়ের অসুখ!
আসলে লাল চোখ বা পিংকআই বা কনজাংটিভিটিস এমনিতেই ২/৩ পরে সাইরা যায় কিন্তু তখন দেশের সার্বিক পরিস্থিতি হাজারো গুজবের প্রসুতিঘর ছিল। এমন না যে আগে কনজাঙ্কটিভিটিস কারো হইতো না কিন্তু এমন মহামারী আকারে কেউ কোন দিন দেখে নাই। আজকের বিষয় কনজাইটিভিটিস বা পিংক আই!
কনজাংটিভাইটিস (conjunctivitis) আসলে কি?
এইটা চোখের উপরীভাগের পাতলা স্বচ্ছ পর্দার (conjunctiva) পপ্রদাহ বা ইনফ্লামেশন, এই পর্দার ঠিক নিচেই চোখের মণি থাকে চোখের পাতার ভিতরের দিকেও এই পর্দা থাকে
বিভিন্ন কারণে কনজাংটিভাইটিস হইতে পারে, যেমন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া (যৌণরোগ যেম্ন গনোরিয়া, চা ক্ল্যামেইডিয়া) কিছু ক্ষারক্ এর কারন যেমন স্যাম্পু, ধুলা বালি, ধোঁয়া, ও সুইমিং পুলের ক্লোরিন।
এছাড়াও বিভিন্ন রকম এ্যালার্জী যেমন ধুলা, পলেন (পরাগ) অথবা কোন স্পেশাল এ্যালার্জী (কারো কারো কন্টাক লেন্স থাইকাও এ্যালার্জী হইতে পারে)
এই রোগ কিছু ভাইরাস ও ব্যাক্টেরিয়া বাহীত হইলে তা ভীষন ছোঁয়াচে তবে তা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারন না। তবে সদ্য প্রসূত শিশুর কনজাংটিভাইটিস হইলে তা সাথে সাথে চিকিৎসকের দৃষ্টি গোচর করা দরকার কারন এইটা দৃষ্টিশক্তি হারানোর কারণ হইয়া দাড়াইতে পারে।
দেশের প্রায় সবারই কখনো না কখনো এই লালচোখ সংক্রামণ হইছে তাই এর উপসর্গ চেনা জানা তাও লেখার জন্য লেখতাছি চোখের সাদা অংশের রং চেঞ্জ হইয়া যাওয়া লাল অথবা গোলাপী, মাত্রাতিরিক্ত চোখের পানি ঝরা, গাঢ় ঘন হলদে পিচুটি চোখের পাপড়ি জড়াইয়া যায়, বিশেষ কইরা যখন ঘুমাও, সকালে চোখ খোলা যায় না! সাদা অথবা সাদা পিচুটি নির্গত হওয়া, চোখে চুলকানো, জ্বলুনী, ঝাপসা দেখা, আলোর সহনশীলতা কইমা যাওয়া।
হ্যা উপরের কোন একটা বা সবগুলি উপসর্গ দেখলেই ডাক্তারের কাছে যাওয়া দরকার, তিনি হয়তো একটা ল্যাব টেস্ট দিতে পারেন কটন সোয়াব দিয়ে চোখের পানি অথবা পিচুটি নিয়ে পরীক্ষা হবে, কারণ ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস হইলে তা কি ধরণের তা নিশ্চিত করার জন্য কারন যৌণরোগ থাইকাও চোখ লাল হইতে পারে আর তার জন্য জরূরী ভিত্তীতে ভিন্ন চিকিৎসা শুরু করতে হইব।
যদি ব্যাকটেরিয়া কারণ হয় এমন কি যদি তা যৌনরোগ এর সংক্রামণ থাইকাও হয়, এ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগেই চিকিৎসা করা হয় আর তা চোখের ড্রপ/ফোঁটা, মলম/ওয়েন্টমেন্ট বা বড়ি/ট্যাবলেট দ্বারা হইতে পারে। এগুলির কোন এক্টা বা সব যেমন ডাক্তার সাব উচিত মনে করেন তা পাঁচ থেকে সাত দিন গ্রহনে দিন সাতেকেই উপশম হয়, তবে অষুধের কোর্স কমপ্লিট করা উচিত, এমনকি রোগ সাইরা গেলেও।
আর যদি ভাইরাস জণিত কারনে হয় তা সাধারনত সর্দি থাইকা হয়, সর্দি যেমন চাইর থাইকা সাত দিন থাকে এই কনজাংটিভিটিসও তত দিনই থাকে। এই ভাইরাল কনজাংটিভাইটিস খুব ছোঁয়াছে দুইটার মধ্যে। এই ক্ষেত্রে সংক্রামিত রোগীর সাথে স্পর্শ এড়ানোই ভাল। যারাই তার কাছাকাছি আসবে তাদের বার বার সাবান পানি দিয়া হাত ধোয়া দরকার। বিশেষ কইরা রোগীর সংস্পর্শে আসার পরে ও খাওয়ার আগে। কন্টাক্ট লেন্স থাকলে কনজাংটিভাটিস থাকলে সে সময় লেন্সের বদলে চশমা ব্যবহার করা উচিত। লাল চোখের সাথে ঝাপসা দৃষ্টির অভিযোগ থাকলে সাথে সাথেই ডাক্তার সাবের সাথে দেখা করা দরকার।
এ্যালার্জী কারণে চোখ লাল হইলে এ্যালার্জী চিকিৎসা নিলে এ্যালার্জী দুরের সাথে সাথে চোখ লাল ও কইমা যাওয়ার কথা। ডাক্তার মাম্মা ভালো বলতে পারবো তোমার আসলে কোনটা হইছে।
** উপশমের জন্য কি করা যায়?
চোখ ধুলা বালি থাইকা বাঁচায়া রাখতে হইব। মেক আপ এড়ানো ভালো, কন্টাক্ট লেন্স থাকলে তা পরিহার কইরা চশমা ব্যবহার করা যায়। দোকানে ‘আর্টিফিসিয়াল টিয়ার্স’ নামের একটা চোখের ড্রপ পাওয়া যায়, তা দিয়া জ্বলুনী আর চুলকানোর আরাম পাওয়ার জন্য ব্যবহার করা যাইতে পারে। যেই বোতলের ড্রপ আক্রান্ত চোখে দেওয়া হয় সেই বোতল থাইকা অনাক্রান্ত চোখে ড্রপ ব্যবহার উচিত না।
** সংক্রামন এড়ানোর জন্য কি করতে পারি?
আক্রান্ত চোখ ছোয়া যাবে না বা ঘষা যাবে না, যদি ছুঁইতেই হয় তবে সাথে সাথেই সাবান আর ইষৎ গরম পানি দিয়া হাত ধুইয়া ফালাইতে হইব, বিশেষ কইরা খাওয়ার আগে। চোখের পিচুটি তুলার বল দিয়া বা নরম পেপার টাওয়েল দিয়া দিনে কয়েকবার মুইছা ফেলতে হইব, ব্যবহৃত তুলা বা পেপার সঠিক ভাবে ফেলতে হইব যাতে না ছড়ায়, তারপরে সাবান আর গরম পানি দিয়া হাত ধুইয়া ফেলতে হইব।
বালিশএর কভার, চাদর টাওয়েল গরম পানি ও সাবান দিয়া ধুইতে হইব। প্রসাধনী বাদ, নিজের চোখের প্রসাধনী ( কাজল, ম্যাসকারা, আই লাইনার) কারো সাথে শেয়ার করবা না। অন্য কারো কন্টাক্ট লেন্স কখনোই ব্যবহার করবা না। বাচ্চার লালচোখ হইলে তারে স্কুলে যাইতে দিবা না ভালো হইয়া যাওয়ার আগ পর্যন্ত।
সাধারনতঃ কনজাংটিভাইটিস এর একটা **ব্যপ্তিকাল আছে সে তার নির্দিষ্ট সময় আপনা থাইকাই সাইরা যায় অথবা এ্যন্টিবায়োটিকে প্রয়োগে প্রতিকার হয়, তবে যদি তা গনোরিয়া বা ক্ল্যেমেডিয়া থাইকা হয় সঠিক নিরূপণ আর চিকিৎসা না হইলে চোখের কর্ণীয়া ক্ষতিগ্রস্থ হইতে পারে।
তথ্য সূত্র ও কৃতজ্ঞ্যতাঃ WebMD
Brian S. Boxer Wachler, MD.