23/04/2026
'ভাই! কিস্তি তুলতে চাই! ডিভোর্স দিবো।'
ঘাম মুছতে মুছতে এক যুবক আমাদের অফিসে এসেছে। আমার ডেস্কে এসেই বললো, 'ভাই! কিস্তি তুলতে চাই! বউকে ডিভোর্স দিবো।'
ভ্রু বাঁকা করে বললাম, “আপনি কিস্তি তুলবেন মানে? কিস্তি তো আমরা তুলি। বলুন লোন তুলতে চাই। আগে কথা বলাটা শিখুন, তারপর সংসার ঠিক করবেন।”
- “সরি ভাই। ভুল হয়ে গিয়েছে। দুই লাখ টাকা লোন নিতে চাচ্ছিলাম। লোন নিতে কী কী লাগবে বলেন?“
তাকে লোনের জন্য Eligibility Criteria হাতে ধরিয়ে দিলাম। কিন্তু সে বুঝলো বলে মনে হয় না। হাঁ করে তাকিয়ে আছে।
শর্টকাটে বললাম, “আমাদের প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ১০,০০০- ৩,০০,০০০ লাখ পর্যন্ত লোন দিয়ে থাকে। কত টাকা লোন নিতে চাচ্ছেন এবং কতদিন মেয়াদে শোধ করতে চাচ্ছেন। সেটার উপর নির্ভর করে ১০-১৫% সুদের হার। ২ লাখ টাকার জন্য ১৫% সুদ। লোন পরিশোধের মেয়াদ ২ বছর। প্রতি মাসে কিস্তি ১০ হাজার টাকার মতো পড়বে। NID আর একজন গ্যারেন্টার লাগবে।“
- “গ্যারেন্টার কোথায় পাবো ভাই? কসম! আমি লোন নিয়ে সঠিক সময়ে পরিশোধ করে দিবো।“
“আপনার পেশা কী? মাসিক আয় কত?“
- “১৫ হাজার টাকা। ছোট খাটো একটা চাকুরী করি।“
“আমরা এত স্বল্প আয়ের কাউকে লোন দেই না। বিশেষ করে চাকুরী করে এমন লোকদেরকেও না। ছোট খাটো দোকান, ব্যবসা, জমি আছে এমন কৃষক কিংবা পশু আছে এমন খামারিদেরকে লোন দিয়ে থাকি। আপনি আমাদের Criteria জন্য Eligible না।“
লোকটি নাছোড়বান্দা। আমার হাত চেপে ধরে বললো, যেভাবেই হোক তাকে বাঁচাতে। লোন দিতে। লোন পেলেই দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করে লাথি মেরে, আপদ ঘর থেকে বিদায় করবে সে।
বললাম, “আপনার বেতন তো মাত্র পনেরো হাজার টাকা। মাসিক কিস্তিই আসবে ১০ হাজারের মতো। বাকী ৫ হাজার টাকা দিয়ে চলবেন কীভাবে? বাড়ি ভাড়া, খাওয়াদাওয়া, যাতায়াত খরচ? হুট করে অসুস্থ হয়ে গেলে ডাক্তার ফি, মেডিসিন খরচ? আপনার চাকুরী চলে গেলে কী করবেন?
লোন নিলে তো হবে না। শোধ করার ক্ষমতা তো থাকতে হবে। টানা দুই বছর আপনি সার্ভাইভ করতে পারবেন?“
- “পারবো ভাই। ব্যাচেলরদের মেসে চলে যাবো। খাবার খরচ কমিয়ে দিবো। পায়ে হেটে অফিস যাবো, আমি পারবো। আমাকে পারতেই হবে।“
“বুইঝেন কিন্তু। পরে কিন্তু আমাকে দোষ দিতে পারবেন না।“
- “আপনাকে অভিযোগের সুযোগ দিবো না ভাই। আমাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করেন।“
“দেখুন। আমাদের কোম্পানী আপনাকে লোন দিবে না। আপনি লোন পাওয়ার যোগ্য নন। তবে আমার সন্ধানে একজন আছেন। উনি লোন দিবেন। গ্যারেন্টার লাগবে না। কিন্তু উনি মানুষ ভালো নন। উনি খুবই ড্যাঞ্জারাস ব্যক্তি। একটা কিস্তি মিস করলে খবর করে ছাড়েন। মাফিয়া টাইপের মানুষ।“
- “ভাই! আপনি আমার স্ত্রীকে চিনেন না, সে আরও ড্যাঞ্জারাস। দুনিয়াতে আমার স্ত্রীর চেয়ে ড্যাঞ্জারাস মানুষ হয় না। বেশী শিক্ষিত, পন্ডিত বিয়া কইরা এখন পস্তাইতাছি। আমি তার থেকে মুক্ত হতে চাই। ব্যাস।“
মনে মনে বললাম, ১৫ হজার টাকার বেতনে এই যুগেও কোন মহিলা আপনার সংসার করতেছে। সেই মহিলা ড্যাঞ্জারাস না হয়ে তো পারে না।
আমি ড্রয়ার থেকে একটা টেনিস বল আর ভিজিটিং কার্ড বের করলাম। লোকটাকে ভিজিটিং কার্ডটি দিয়ে বললাম, এই নিন উনার ঠিকানা। আশা করি, লোন পেয়ে যাবেন। আমার নামও বলতে হবে না। আর এই টেনিস বলটা সাথে রাখেন। কাজে দিবে।
- “ভাইজান! আমি যেই স্ট্রেসে থাকি, এসব টেনিস বল চাপ দিয়ে কখনও সেই স্ট্রেস দূর হবে না। নাজিয়াকে ঘর থেকে লাথি মেরে বের করতে পারলেই সকল স্ট্রেস দূর হয়ে যাবে।“
আমি তারপরেও বলটা জোর করেই হাতে ধরিয়ে দিলাম। মনে মনে বললাম, রেস্ট্রিকশন না দিলে, আরও দামী বল হাতে ধরিয়ে দিতাম।“
যুবকটি আমাকে সালাম দিয়েই বিদায় নিয়ে চলে গেলো।
আমাদের আর দেখা হয়নি প্রায় দুই বছর হয়ে গেলো। শুনেছি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে টেনিস বল হাতে নিয়ে প্রায়ই আমাদের অফিসে এসে কান্নাকাটি করে। আমাকে খুঁজে। কিন্তু আমি আর ঐ অফিসে কাজ করি না। ট্রান্সফার নিয়ে অন্য শহরে চলে এসেছি। বলেছি বেশী ঝামেলা করলে বলবা, আমি স্ট্রোক করে মরে গিয়েছি। তাহলে আর জ্বালাতে আসবে না।
আজকে দুপুরে নাজিয়া খাতুন নামের এক মেধাবী নারী উদ্যোক্তাকে সম্মাননা জানানোর অনুষ্ঠানে এসেছি। আমাদের কোম্পানী থেকে অনেক বড় Investment পেয়েছে সে। স্টেজে উঠে অশ্রুসিক্ত অবস্থায় জীবনের গল্প বলতে শুরু করলো, হুট করে স্বামী ডিভোর্স দিলে অথৈ সাগরে পড়ে যায়। কিন্তু নিজের মেধা ও পরিশ্রম এক করে দেনমোহরের মাত্র দুই লাখ টাকাকে কাজে লাগিয়ে আজকে সে দেশসেরা উদ্যোক্তা। অনেক লম্বা পথ পেরিয়ে আজকে মেয়েটি এই জেলার লাখো নারীর জন্য আদর্শ।
'কিস্তি তুলে ডিভোর্স' দিতে চাওয়া যুবকের নামটা জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গিয়েছি। তবে তার স্ত্রীর নামটা এখনও স্মরণে আছে। 'নাজিয়া।' যার অর্থ গর্বিত।
গর্ব করা যায় এমন নারীই হলো নাজিয়া। 'ড্যাঞ্জারাস নাজিয়া।'
- অন্তর মাশঊদ