12/12/2021
শীতে শিশুর ডায়রিয়া
ডা. ফাহিম আহমাদ
ডায়রিয়া
পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়ায় (diarrhoea) আক্রান্ত হয়নি এমন শিশু পাওয়া কঠিন। এক সময় পাতলা পায়খানায় আক্রান্ত হয়ে শত শত শিশু মারা যেত। বাংলাদেশি একজন চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী ডাঃ রফিকুল ইসলাম খাবার স্যালাইন আবিষ্কারের পর থেকে দ্রুত এই মৃত্যু কমে এসেছে। তবে, এখনো এটা বিশ্বব্যাপী ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর ২য় সর্বোচ্চ কারণ। মৃত্যু ছাড়াও শিশুদের পাতলা পায়খানার কারণে বাবা-মাএর (এবং অবশ্যই শিশুটির) শারীরিক, মানসিক কষ্ট এবং আর্থিক ক্ষতি হয়ে থাকে। কাজেই, এর গুরুত্ব এখনো কমেনি। তবে, সাধারণ কিছু জিনিস জানলে ও মানলে শিশুদের পাতলা পায়খানা হওয়া কমানো সম্ভব এবং হয়ে গেলে দ্রুত সুস্থ করে তোলা সম্ভব।
শিশুদের পাতলা পায়খানার কারণ কি?
ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানার অনেক রকম কারণ আছে। বিভিন্নরকম জীবানুর কারণে হতে পারে, এলার্জির জন্য হতে পারে এমনকি কিছু বিশেষ ধরণের রোগের কারণে হতে পারে। তবে, শিশুদের ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানার প্রধান কারণ ভাইরাস। বিশেষ করে বয়স ২ বছরের আশেপাশে হলে প্রায় ৮৭% ক্ষেত্রেই ভাইরাস দিয়ে হয়ে থাকে।
শিশুর ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা হয়েছে কিভাবে বুঝবেন?
সাধারনভাবে বলা হয় দিনে ৩ বার বা তার বেশি তরল পায়খানা হলে ডায়রিয়া/পাতলা পায়খানা হয়েছে। তবে, শিশুর পাতলা পায়খানা হয়েছে কিনা তার সবচেয়ে বড় বিচারক হচ্ছে তার মা। যদি মায়ের মনে হয় শিশুর পাতলা পায়খানা আছে তাহলে তার পাতলা পায়খানা আছে। শিশুর পাতলা পায়খানা হলে ভয় পাবেন না। অনেক ক্ষেত্রে পায়খানার সাথে মিউকাস (আম), রক্ত যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে শরীর হালকা গরম থাকতে পারে। তবে, ভাইরাস দিয়ে ডায়রিয়া হলে সাধারণত জ্বর থাকে না।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন?
জ্বর হলে। হালকা একটু গরম গরম লাগতে পারে। কিন্তু ১০০.৪ ডিগ্রীর উপর তাপমাত্রা থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। পায়খানার সাথে রক্ত গেলে, শিশু দুর্বল হয়ে পড়লে, বেশি ঘন ঘন পাতলা পায়খানা ও বমি হলে। খিচুনি হলে। শিশুকে যেকোন কারণে বেশি অসুস্থ মনে হলে।
ডায়রিয়ার চিকিৎসা।
শিশুর পাতলা পায়খানা হলে একজন এমবিবিএস চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। যাকে আপনি খুব সহজেই ইউনিয়ন সাবসেন্টার, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে পেয়ে যাবেন।
প্রথমঃ খাবার স্যালাইন হচ্ছে ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানার মুল চিকিৎসা। বাজারে এসএমসির খাবার স্যালাইন পাওয়া যায়। এটাকে ৫০০মিলি পানিতে মিশিয়ে প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর খাওয়ানো হয়। মুল উদ্দেশ্য হলো পানিশুন্যতা প্রতিরোধ করা। যদি বাচ্চার পানিশুন্যতা না হয় পাতলা পায়খানা ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যায়।
দ্বিতীয়ঃ জিংক (Zinc)। ১৪ দিন পর্যন্ত জিংক খাওয়ালে ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানার তীব্রতা ও দৈর্ঘ্য কমায়। একই সংগে পরবর্তী ডায়রিয়াকেও প্রতিরোধে সাহায্য করে।
খাবার স্যালাইন তৈরি করার সঠিক পদ্ধতি।
খাবার স্যালাইন সঠিক নিয়মে তৈরি করাটা জরুরি। বেশি ঘন বা বেশি পাতলা ভাবে তৈরি করে খাওয়ানো হলে শিশুর শরীরে লবণ কম বা বেশি হতে পারে (hypernatremia or hyponatremia)। সহজ উপায় হলো ৫০০ মিলি স্বাভাবিক তাপমাত্রার (গরমও না আবার ঠান্ডাও না) পানির বোতলের মধ্যে একটি প্যাকেট মিশিয়ে নেয়া এবং সেখান থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক পরিমান মত বা বাচ্চার চাহিদা অনুযায়ী খাওয়ানো। একবার তৈরি করা খাবার স্যালাইন স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ৬-৮ ঘন্টা ব্যবহার করা যায়। এর পর ফেলে দিয়ে নতুন করে তৈরি করে নিতে হবে। খাবার স্যালাইন খাওয়ানোর জন্য চামচ, কাপ বা গ্লাস ব্যবহার করতে হবে। ফিডারের মাধ্যমে খাওয়ানো যাবে না।
তৃতীয়ঃ খাবার। ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানার রোগীকে বেশি বেশি তরল খাওয়াতে হয়। সাধারণভাবে, সহজপাচ্য এবং স্বাভাবিক রান্না করা (লবণ, মসলা ও তেল পরিমিত পরিমানে থাকবে) সব খাবারই খাওয়ানো যাবে। তবে, কিছু খাবার এড়িয়ে চলতে হয়। ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তেল, চর্বি, মসলাসমৃদ্ধ খাবার; শরবত, কোক বা অন্য চিনিসমৃদ্ধ খাবার; ফলের রস ইত্যাদি এড়িয়ে চলতে হবে।
কিভাবে পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়া প্রতিরোধ করা যায়?
শিশুদের বেশিরভাগ পাতলা পায়খানা হয় ভাইরাস দিয়ে। অন্যান্য ভাইরাসজনিত রোগ (করোনা ভাইরাসসহ) যেভাবে প্রতিরোধ করা যায়, পাতলা পায়খানাও একইভাবে প্রতিরোধ করা যায়।
পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা। ঘন ঘন সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়া। বিশেষ করে শিশুকে কোলে নেয়া বা খাবার খাওয়ানোর আগে।
পায়খানা বা প্রস্রাব করার পর ভালো করে (সাবান – পানি দিয়ে) হাত ধোয়া।
নিরাপদ খাবার বা পানি ব্যবহার করা। খাবার বা পানি ঢেকে রাখা এবং বাসি/পচা খাবার এড়িয়ে চলা। রাস্তার পাশে খোলা জায়গায় বিক্রি হয় এমন খাবার এড়িয়ে চলা। শিশুদের ডায়রিয়ার বেশিরভাগ করে রোটা ভাইরাস। কাজেই এর বিরুদ্ধে টিকা দেয়ার মাধ্যমে ডায়রিয়া কমানো সম্ভব।
পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়া কি করোনার লক্ষণ হতে পারে?
হতে পারে। তবে, এটা খুবই আনকমন। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে আরো আনকমন। যদি এমনটা সন্দেহ হয় তবে আপনার/আপনার বাচ্চার চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করুন। তিনি নিশ্চিত করতে পারবেন।
কিছু সাধারণ জিজ্ঞাস্যঃ সংক্ষেপে
ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা কি?
দিনে ৩ বার বা তার বেশিবার তরল পায়খানা হওয়াকে ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা বলা হয়। অন্যদিকে, শিশুর মা যদি মনে করে পাতলা পায়খানা আছে, তবে তার পাতলা পায়খানা আছে (mother knows best!)
পাতলা পায়খানার লক্ষণ কি?
ঘন ঘন পায়খানা হওয়া, তৃষ্ণা, দুর্বলতা ইত্যাদি। কখনো কখনো আমাশায়, জ্বর, রক্ত যাওয়া, বমিও থাকতে পারে।
পাতলা পায়খানার চিকিৎসা কি?
শিশুদের ডায়রিয়ার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খাবার স্যালাইন, জিংক ছাড়া অন্য কোন চিকিৎসা লাগে না। তবে, চিকিৎসকের পরামর্শই চুড়ান্ত।
পাতলা পায়খানা হলে কি এন্টিবায়োটিক প্রয়োজন আছে?
সাধারণত শিশুদের ডায়রিয়ার চিকিৎসায় এন্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না। কিছু ক্ষেত্রে লাগতে পারে। সেটা আপনার শিশুর চিকিৎসক নির্ধারণ করতে পারবেন। কাজেই, তার সঙ্গে পরামর্শ না করে কোন এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করবেন না।
পাতলা পায়খানা হলে কি খাওয়া উচিত?
সাধারণ সব খাবারই শিশু খেতে পারবে। তবে, বেশি বেশি তরল খেতে উৎসাহিত করা উচিত।
পাতলা পায়খানা হলে কি খাওয়া উচিত না?
শরবত, সফট ড্রিঙ্কস ইত্যাদি চিনিসমৃদ্ধ খাবার; ফলের রস; অতিরিক্ত তেল, চর্বি ও মসলাসমৃদ্ধ খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
ডাঃ পরিচিতি!
ডাঃ ফাহিম আহমাদ
২০০৬ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রী লাভ করেন। সরকারী বিধি অনুযায়ী দুই বছরের অধিক সময় গ্রামে কাজ করার পর শিশু রোগ সম্পর্কে উচ্চতর পড়াশুনা শুরু করেন। প্রায় ৪ বছর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু রোগ বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে এমডি(শিশু) শেষ করার পর শিশু বিভাগে কর্মরত আছেন।
বিঃদ্রঃ চিকিৎসা সেবা প্রতি মুহুর্তে পরিবর্তিত হচ্ছে। কাজেই, আজ যে তথ্য সঠিক, তা আগামীতে শতভাগ সঠিক নাও হতে পারে।
এই পেইজে প্রদত্ত সকল তথ্য স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সাধারণ জ্ঞানের উন্নতির জন্য উপস্থাপন করা হয়। চিকিৎসা প্রদান করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়।
সর্বশেষ সম্পাদনা: ২ ডিসেম্বর ২০২১, বিকাল ০৫:৫৬