12/11/2025
কিডনি রোগীরা কি খাবেন? কি খাবেন না?
মানুষের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো কিডনি।
দেখতে ছোট হলেও এই দুটি অঙ্গ আমাদের শরীরের সমস্ত বর্জ্য, অতিরিক্ত পানি, ও বিষাক্ত পদার্থ ছেঁকে বাইরে বের করে দেয়।
এটি শরীরের রক্ত পরিশোধন করে, শরীরে পানি ও খনিজের ভারসাম্য রক্ষা করে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং রক্তে প্রয়োজনীয় ইলেকট্রোলাইট ঠিক রাখে।
যদি কিডনি ঠিকমতো কাজ না করে, তাহলে শরীরে বিষাক্ত পদার্থ জমতে থাকে।
এই জমে থাকা বর্জ্য ধীরে ধীরে রক্তে মিশে শরীরের অন্যান্য অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে শুরু করে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে বলা হয়, কিডনির ব্যর্থতা শরীরের “Silent Killer”।
কারণ প্রাথমিক অবস্থায় কিডনির সমস্যা প্রায় বুঝাই যায় না।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রায় ২০ জনের মধ্যে ১ জন কিডনি রোগে আক্রান্ত।
এর বড় কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত লবণ খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি না পান করা, অতিরিক্ত ওষুধ সেবন ও দেরি করে ঘুমানো।
কিডনির সমস্যা একবার শুরু হলে খাদ্যাভ্যাসই সবচেয়ে বড় চিকিৎসা।
ঠিকভাবে খাবার বেছে নিতে পারলে কিডনির কাজ অনেকটাই সহজ হয়, এবং রোগের অগ্রগতি থেমে যায়।
প্রথমেই জেনে নেওয়া দরকার, কিডনির রোগ মানেই কেবল পানি বন্ধ নয়।
এটি রক্তে ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন, সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও ফসফরাসের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।
তাই খাবার নির্বাচনের সময় এই উপাদানগুলোর নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি।
যাদের কিডনি দুর্বল, তারা প্রথমেই অতিরিক্ত প্রোটিন এড়িয়ে চলবেন।
কারণ প্রোটিন ভাঙার সময় তৈরি হয় নাইট্রোজেনজাত বর্জ্য, যা কিডনির মাধ্যমে বের হয়।
যখন কিডনি দুর্বল হয়, তখন এই বর্জ্য রক্তে জমে গিয়ে শরীরে ক্লান্তি, বমি ভাব ও মুখে দুর্গন্ধ তৈরি করে।
তবে প্রোটিন পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না।
অল্প পরিমাণে উচ্চমানের প্রোটিন খাওয়া দরকার, যেমন ডিমের সাদা অংশ, মাছের ছোট টুকরো, বা ডালপানি।
কিন্তু লাল মাংস, গরু বা খাসির মাংস, অতিরিক্ত ডিমের কুসুম ও চর্বিযুক্ত খাবার একদম এড়িয়ে চলা উচিত।
যাদের কিডনি রোগ আছে, তারা সোডিয়াম বা লবণ কম খাবেন।
অতিরিক্ত লবণ রক্তচাপ বাড়ায়, ফলে কিডনির রক্তনালী সংকুচিত হয়।
এটি ধীরে ধীরে “Nephron” ধ্বংস করে, যেগুলো কিডনির মূল কার্যকর কোষ।
লবণ যত কম খাবেন, তত ভালো।
বাজারের প্যাকেটজাত খাবার, আচার, সস, পটেটো চিপস, ফাস্টফুড—এগুলো লবণে ভরপুর, তাই সম্পূর্ণভাবে পরিহার করতে হবে।
একইভাবে কিডনি রোগীরা পটাশিয়ামযুক্ত খাবারেও সতর্ক থাকতে হবে।
পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, কিন্তু কিডনি দুর্বল হলে অতিরিক্ত পটাশিয়াম শরীরে জমে যায়।
এর ফলে হৃদস্পন্দন অনিয়মিত হয়ে হঠাৎ মৃত্যুও হতে পারে।
পটাশিয়াম বেশি থাকে কলা, ডাবের পানি, কমলা, আলু, টমেটো, বিট, কাঁঠাল, আনারস, খেজুর ও অ্যাভোকাডোতে।
এই ফলগুলো কিডনি দুর্বল ব্যক্তিদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
অন্যদিকে, আপেল, পেয়ারা, নাশপাতি, পেঁপে, তরমুজ, স্ট্রবেরি বা কলমিশাকের মতো ফল ও সবজি তুলনামূলক নিরাপদ।
তবে সবসময় ডাক্তারের পরামর্শে খাবারের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে।
ফসফরাসও কিডনির জন্য বড় একটি সমস্যা।
যখন কিডনি ঠিকমতো কাজ করে না, তখন রক্তে ফসফরাস জমে গিয়ে হাড় দুর্বল করে দেয়।
এর ফলে হাত-পা ব্যথা, হাড় ভাঙা, দাঁত নরম হয়ে যাওয়া, এমনকি ত্বক চুলকানির সমস্যা দেখা দেয়।
ফসফরাস বেশি থাকে দুধ, দই, চিজ, বাদাম, বীজ, মাছ ও মাংসে।
তাই কিডনি রোগীরা এসব খাবার সীমিত পরিমাণে খাবেন।
আরেকটি বিষয় হলো, পানি।
অনেকে ভুল করে কিডনি রোগ মানেই পানি পুরো বন্ধ করে দেন।
আসলে তা নয়।
শরীরের ইউরিন আউটপুট অনুযায়ী পানি খেতে হয়।
যদি প্রস্রাব স্বাভাবিক থাকে, তাহলে দিনে ১.৫ থেকে ২ লিটার পানি খাওয়া যায়।
কিন্তু যদি ফোলা বা প্রস্রাব কমে যায়, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শে পানি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
যাদের কিডনি রোগের প্রাথমিক ধাপ চলছে, তারা দিনে অল্প অল্প করে পানি খাবেন।
খালি পেটে একসাথে বেশি পানি খাওয়া কিডনির ওপর চাপ ফেলে।
চা, কফি, সফট ড্রিংক বা কার্বনেটেড পানীয় কিডনির সবচেয়ে বড় শত্রু।
এগুলো শরীরে ফসফেট ও কৃত্রিম রাসায়নিক যোগ করে, যা কিডনিকে দ্রুত নষ্ট করে।
বিশেষ করে কোলা বা এনার্জি ড্রিংক একেবারে এড়িয়ে চলতে হবে।
যারা ডায়াবেটিসে ভোগেন, তাদের জন্য কিডনি সমস্যা আরও গুরুতর।
কারণ রক্তে অতিরিক্ত গ্লুকোজ কিডনির ক্ষুদ্র রক্তনালীকে নষ্ট করে দেয়।
তাই তাদের জন্য নিয়ন্ত্রিত শর্করাযুক্ত খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত জরুরি।
আবার উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ক্ষেত্রেও কিডনি সমস্যা দ্রুত বাড়ে।
রক্তচাপ বেশি হলে কিডনির ক্ষুদ্র রক্তনালীতে চাপ পড়ে, যা ধীরে ধীরে ফিল্টার নষ্ট করে দেয়।
তাই নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ ও ওষুধ সেবন অপরিহার্য।
কিডনি রোগীরা খুব বেশি প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকবেন।
কারণ এসব খাবারে থাকে “Preservative Sodium Phosphate”, যা কিডনির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
তবে সব খাবারই নিষিদ্ধ নয়।
কিছু প্রাকৃতিক খাবার আছে যা কিডনিকে পুনরুজ্জীবিত করতে সাহায্য করে।
যেমন তুলসী পাতা, বার্লি পানি, ধনেপাতা, করলা রস, আপেল, ওমরার পানি ইত্যাদি।
তুলসী পাতার রস কিডনি থেকে জমে থাকা বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয়।
প্রতিদিন সকালে এক গ্লাস কুসুম গরম পানিতে দুই-তিনটি তুলসী পাতা ফেলে রেখে পান করলে কিডনি অনেক পরিষ্কার থাকে।
ধনেপাতা শরীরে প্রাকৃতিক ডাইইউরেটিক হিসেবে কাজ করে, অর্থাৎ প্রস্রাবের মাধ্যমে বর্জ্য বের করে দেয়।
এটি ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা কমায়, ফলে কিডনিতে পাথর হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
যাদের ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে গেছে, তারা টমেটো, মটরশুঁটি ও পালং শাক কিছুদিন বন্ধ রাখবেন।
কারণ এগুলো ইউরিক অ্যাসিড বাড়ায়, যা কিডনির পাথর বা গাউটের ঝুঁকি বাড়ায়।
আরেকটি আশ্চর্য উপাদান হলো লেবু।
লেবুতে থাকা সাইট্রিক অ্যাসিড প্রস্রাবে “Calcium Oxalate Crystals” ভাঙতে সাহায্য করে।
এটি কিডনি স্টোন গলাতে সহায়ক এবং নতুন পাথর তৈরি রোধ করে।
অতিরিক্ত তেল-মসলা ও ভাজা খাবারও কিডনির ক্ষতি করে।
তেল গরম হলে এতে “Trans Fat” তৈরি হয়, যা রক্ত ঘন করে ফেলে।
ফলে কিডনির রক্তনালীগুলোতে চাপ পড়ে।
যারা দিনে তিনবেলা ভাত খান, তাদের জন্য খাবারের সঙ্গে পর্যাপ্ত সবজি, সালাদ ও লেবু খাওয়া জরুরি।
এগুলো শরীরে অ্যাসিড-অ্যালকেলিন ব্যালান্স বজায় রাখে।
চিকিৎসকরা বলেন, কিডনি রোগীর প্লেটে থাকা উচিত কম লবণ, কম প্রোটিন, বেশি সবজি ও হালকা শর্করা।
এবং খাবারের পর সবসময় অন্তত আধঘণ্টা বিশ্রাম নিতে হবে।
যাদের কিডনি ডায়ালাইসিস চলছে, তারা কখনোই নিজের ইচ্ছেমতো খাবার পরিবর্তন করবেন না।
কারণ প্রতিটি খাবারের মধ্যে থাকা সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও ফসফরাসের হিসাব নির্ভর করে তাদের চিকিৎসা পর্যায়ের ওপর।
একটি কিডনি একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটি পুরোপুরি ঠিক হয় না, কিন্তু সঠিক খাদ্যাভ্যাসে এর কার্যক্ষমতা অনেকটা স্থায়ী রাখা যায়।
তাই আজ থেকেই নিজের খাবারে সচেতন হোন।
কম লবণ খান, পর্যাপ্ত পানি পান করুন, নিয়মিত প্রস্রাব পরীক্ষা করুন এবং অনিয়ন্ত্রিত ওষুধ খাওয়া বন্ধ করুন।
বিশেষ করে ব্যথানাশক, অ্যান্টিবায়োটিক বা স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করবেন না।
প্রকৃতির সব খাবারই ওষুধ, শুধু জানতে হবে কোনটি কখন কতটা খাবেন।
কিডনি সুস্থ রাখতে হলে কৃত্রিমের বদলে প্রকৃতিকে বেছে নিতে হবে।
সুস্থ কিডনি মানে সুস্থ জীবন।
তাই আজ থেকে নিজের খাদ্যতালিকায় রাখুন সেই খাবারগুলো, যেগুলো আপনার কিডনির বন্ধু, শত্রু নয়।
মনে রাখবেন, কিডনি নষ্ট হয়ে গেলে শরীরের ভারসাম্যও নষ্ট হয়। তাই আগে থেকেই যত্ন নিন, সুস্থ থাকুন।
হিজামা রুকিয়াহ সেন্টার নোয়াখালী
Hijama Ruqyah Noakhali