16/11/2015
যে শিক্ষায় দুনিয়া আখেরাতের সফলতা বিদ্ধমান
সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তাআলার যিনি পবিত্র কুরআন নাযিল করেছেন বান্দার পথ প্রদর্শনের জন্য সর্বশ্রেষ্ট নবী মুহাম্মদ সা. এর উপর, যিনি হলেন উম্মতের রাহবর। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক তারই উপর এবং তার সকল সাহাবীদের উপর।
আল্লাহ তা’আলা মানব জাতির ইহকাল ও পরকালের সর্বপ্রকার মঙ্গল ও সফলতা একমাত্র দ্বীন ইসলামের মধ্যে নিহিত রেখেছেন। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের সাথে বলতে হয় বর্তমান যুগে ইসলামিক মন মানসিকতাকে অনেকেই আধুনিক বলে গণ্য করতে চায়না। তাই অনেকেই তার সন্তানকে সঠিকরূপে ইসলামিক শিক্ষা প্রদান করতে পারে না। ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চায়না। আরবী ভাষা নয়, ইংরেজি ভাষা শিখিয়েই বর্তমানে অনেক বাবা-মা নিজেদের সৌভাগ্যবান ভাবেন, গর্বিত হন। কিন্তু ইসলামে কখনই সময়ের থেকে পিছিয়ে থাকার কথা বলা হয়নি; বরং সর্বকালের সাথে মানিয়ে নিয়েও ইসলামিক নিয়মে চলা সম্ভব। সাধারন শিক্ষার পাশাপশি প্রিয় সন্তানকে বিশুদ্ধ কুরআন তেলাওয়াত, কালিমা, নামায তথা মৌলিক দ্বীন শিক্ষা দেয়া আপনার অবশ্য পালনীয় কর্তব্য এবং তা আপনার সন্তানের অধিকারও বটে। তাই ছোটবেলা থেকেই শিশুদের ইসলামী শিক্ষা তথা কুরআন শিক্ষা, নামায শিক্ষা আদব কায়দা শিক্ষা দেয়া উচিত। শিশুকাল থেকেই আপনার সন্তানকে নামায পড়ায় অভ্যস্ত করে তুলুন এবং অন্যান্য ভাষার পাশাপাশি আরবী ভাষা ও কুরআন পড়ার শিক্ষা দিন। আর প্রত্যেক মুসলিম সন্তানকে বিশুদ্ধভাবে কুরআন পড়তে শিখানোর দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে পিতা মাতার ওপর। যার প্রতিদান মহান আল্লাহ্ পিতা-মাতাকে উপহার দিবেন সূর্যের চেয়ে অধিক জ্যোতির্ময় নুরের মুকুট। তাই মৌলিক দ্বীন শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর ফরজ।
আর কুরআন শিক্ষাকারী ব্যক্তিকে আল্লাহর রাসূল সর্বোত্তম ব্যক্তি বলেছেন। এমন কোনো মা-বাবা খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে তার সন্তান সর্বোত্তম হোক এটা চায় না। তাই উত্তম হওয়ার যে মাপকাঠি তথা কুরআন শিক্ষা করা তা না করে তো কেউই উত্তম হতে পারবে না। কুরআন মাজীদ না শিখে দুনিয়ার সমস্ত জ্ঞান বিজ্ঞান শিখে ফেললেও সেই ব্যক্তিকে সর্বোত্তম বলা যাবে না। তাই সর্বাগ্রে সন্তানকে কুরআন শিক্ষা দেওয়া জরুরী।
প্রত্যেক মুসলিমকে কুরআন পড়া জানতে হবে। যে নিজেকে মুসলিম হিসাবে দাবী করবে তাকে অবশ্যই কুরআন শিক্ষা করতে হবে। কুরআন শিক্ষা করা এতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, আল্লাহ তা‘আলা কুরআন শিক্ষা করা ফরয করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ‘পড় তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন’ [সূরা আলাক : ১]।
কুরআন শিক্ষায় কোন প্রকার অবহেলা করা যাবে না। উম্মতকে কুরআন শিক্ষার নির্দেশ দিয়ে ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘তোমরা কুরআন শিক্ষা কর এবং তিলাওয়াত কর’ [মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবাহ:৮৫৭২]।
সালাত আদায়ের জন্য কুরআন শিক্ষা
আল্লাহ তা‘আলা ঈমানদার বান্দাদের উপর প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। কুরআন তেলাওয়াত ছাড়া সালাত আদায় হয় না। সালাত আদায় করার জন্যও কুরআন শিখতে হবে। কুরআনে বলা হয়েছে, ‘অতএব তোমরা কুরআন থেকে যতটুকু সহজ ততটুকু পড়। [সূরা আল-মুযযাম্মিল: ২০]।
সন্তানকে যদি মা-বাবা কুরআন শিক্ষা দেন তাহলে আখিরাতে তারা অশেষ মর্যাদার অধিকারী হবেন। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, উসমান ইবন আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম যে কুরআন শেখে এবং (অপরকে) শেখায়। [বুখারী : ৫০২৭] অন্য হাদীসে বার্ণিত হয়েছে, হযরত মুআয জুহানী রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কুরআন শরীফ পড়বে এবং এর উপর আমল করবে তার পিতা-মাতাকে কিয়ামতের দিন এমন এক মুকুট পরানো হবে যার আলো সূর্যের আলো হতেও উজ্জ্বল হবে; যদি সে সূর্য তোমাদের ঘরের ভিতর হয়। (তবে তা যে পরিমাণ আলো ছড়াবে সে মুকুটের আলো উহা হতেও অধিক হবে।) তাহলে সে ব্যক্তি সম্পর্কে কী ধারণা যে স্বয়ং কুরআনের উপর আমল করেছে? [সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৪৪৮]
যাকে এই কুরআন শেখার তাওফিক দেওয়া হবে সে বিশাল মর্যাদা ও ফযীলতের অধিকারী হবে। আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব থেকে একটি আয়াত পড়বে, তার জন্য একটি নেকী লেখা হবে। আর নেকীটিকে করা হবে দশগুণ। আমি বলছি না একটি হরফ। বরং ‘আলিফ’ একটি হরফ, ‘লাম’ একটি হরফ এবং ‘মীম’ একটি হরফ’। [তিরমিযী : ২৯১০]
আবূ হুরায়রা রা. কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সন্তানকে সুসন্তান ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার আরেক উত্তম পদ্ধতির নাম হল সৎসঙ্গ। এজন্য প্রথমেই সন্তানকে ভাল সংশ্রবে রাখা দরকার। কুরআন মাজীদে আল্লাহ পাক বলেন, তোমরা সত্যবাদীদের সাথে থাক। [সূরা তাওবা : ১১৯] এর রহস্য হল, সত্যবাদীদের সাথে থাকলে সত্যবাদী হওয়া যায়, আর মিথ্যাবাদীদের সাথে থাকলে মিথ্যাবাদী হওয়ার আশংকা রয়েছে। এটা কুরআন-হাদীস, বিজ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দ্বারাই প্রমাণিত ও অতি বাস্তব কথা। দুষ্ট প্রকৃতির ছেলে মেয়েদের সাথে কখনো নিজ সন্তানকে মিশতে দেয়া ঠিক নয়। সেজন্য সংশ্রবের ব্যপারে সতর্ক থাকা জরুরী। মন্দ সংশ্রবের কারণে বাচ্চাদের মধ্যে মন্দ স্বভাবের প্রভাব পড়ে।
সন্তান ভালো হবে না খারাপ হবে তা নির্ভর করে পিতা-মাতার কাছে। সন্তান যে পরিবেশে বড় হবে তা-ই সে শিখবে। পিতা-মাতা যদি আদর্শবান হন এবং ধর্মীয় নিয়মকানুন অনুযায়ী চলেন এবং সন্তানকে সুশিক্ষা দিয়ে গড়ে তোলেন তাহলে সন্তান অবশ্যই ভালো হবে। আল্লাহ তাআলা এ পৃথিবীতে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে থাকেন পরীক্ষা করার জন্য। অনেককে আল্লাহ তাআলা প্রচুর ধন-সম্পদ দান করেন ঠিকই কিন্তু সেই ধন-সম্পত্তির সঠিক ব্যবহার না করার ফলে দেখা যায় সে ধ্বংস হয়ে যায়। আবার কাউকে সন্তান-সন্ততি দেন ঠিকই কিন্তু তাদের সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত না করার ফলে এই সন্তান তার জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। যেমনটি হয়েছিল ঐশী নামের মেয়ের ক্ষেত্রে।
বর্তমানে অনেক মায়েরা অভিযোগ করে থাকেন যে, ছেলে-মেয়েরা ঘরে থাকে না শুধু বাইরে চলে যায়, তাই টিভি কিনে দিয়েছি। জেনে রাখা উচিত, টিভি, ভিসিডি এগুলো চরিত্র ও ঈমান বিধ্বংসী হাতিয়ার। এসব জিনিস দিয়ে সন্তান ধ্বংস হওয়ার অসংখ্য ঘটনা চোখের সামনেই বিদ্যমান। সুতরাং আমাদের নিজেদেরই উপায় বের করতে হবে কীভাবে আমরা সন্তানদের এগুলো থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি। আমাদের সব সময় খেয়াল রাখতে হবে বাড়িতে সন্তান-সন্ততিরা নিয়মিত নামায পড়ছে কিনা, কুরআন তেলাওয়াত করছে কিনা। বর্তমানে যেহেতু বিজ্ঞানের যুগ, আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনে বর্তমান যুগে ইন্টারনেট, টিভি, ক্যাবল সংযোগ, মোবাইল ফোন ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষ যেমন অহরহ সামাজিক অপকর্মে লিপ্ত হতে শুরু করে তেমন নিত্যনতুন নৈতিক পদস্খলন হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তাই এসবের খারাপ জিনিসগুলো বাদ দিয়ে ভালোকে গ্রহণ করতে হবে এবং সন্তান যেন খারাপ কোনো কিছুর দিকে আসক্ত না হয় সেদিকে খুব খেয়াল রাখতে হবে।
মনে রাখতে হবে একটি শিশু জন্মের পর থেকেই সাধারণত মায়ের কাছে থাকে। মা-ই তার প্রথম পাঠশালা। তাই সন্তান আদর্শ ও সৎ হওয়ার পিছনে মায়ের ভূমিকাই বেশি। একটি সন্তান পৃথিবীতে কত বড় হবে, কত ভালো হবে, তার অনেকটাই নির্ভর করে মায়ের উপর। সেজন্য সর্বাগ্রে মা-কে সচেতন হতে হবে। সন্তানকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং তা যথার্থভাবে বাস্তবায়নের প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। সন্তান মা-বাবার হাতে আল্লাহর আমানত, তাঁর দেয়া নেয়ামত। এদেরকে সুশিক্ষা দেয়া হল কি না সে বিষয়ে কিয়ামতের দিন পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হবে।
তাবেয়ী ইবরাহীম আততাইমী রহ. বলেন, তাঁরা (সাহাবীগণ) শিশুকালে কথা বলা শিখলে তাকে কালিমার তালকীন করতেন (মুখে মুখে বলা শিখাতেন)। যাতে শিশুর প্রথম কথা হয় লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ। [মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস ৩৫১৯] দ্বিতীয়ত সাত বছর হলে শিশুকে নামাযের আদেশ দেয়া। দশ বছর হলে নামায না পড়লে প্রয়োজনে প্রহার করা, যা হাদীস দ্বারাই প্রমাণিত। এরপর তাকে কুরআন শিক্ষা দেয়া। সাত বছর বয়সেই কুরআন শিক্ষা দেওয়া উচিত। হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রাহ. বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নামাযের জন্য যখন সাত বছর বয়সকে নির্ধারণ করা হয়েছে, এর থেকে আমার মনে হয় এই বয়সটাই নিয়মতান্ত্রিক লেখাপড়া শুরু করার উপযুক্ত সময়।
উপরোল্লিখিত বিষয়গুলি সন্তান আদর্শবান হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি উপায়। এ ছাড়া মা যদি সন্তানকে প্রকৃত আদর্শবান করে গড়ে তুলতে চান তাহলে তার উচিত ছোট থাকতেই সন্তানকে প্রতিটি কাজে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নতে অভ্যস্ত করে তোলা। এর একটি উপায় হল, তার সামনে নিজে সুন্নতের আমল করা। জায়গায় জায়গায় মাসনূন দুআগুলি পাঠ করা। এতে নিজেরও উপকার হবে সন্তানেরও ভবিষ্যত উজ্জ্বল হবে।
পরিশেষে মহান আল্লাহ তাআলার কাছে এই কামনাই করি, প্রতিটি পরিবার যেন প্রকৃত ইসলামের আদর্শে জীবন পরিচালিত করে আর সন্তান-সন্ততি যেন ইসলামিক আদর্শে গড়ে ওঠে। আমিন।