29/04/2017
ডা: মো: আব্দুর রাশীদ মোণ্ডল
BDS, MS, BCS
শিশুর দাঁত ও মুখের সমস্যা এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট :
শিশুর বয়স যখন ৪ বছরের কম:
৬ মাস বয়স থেকেই ( দুধ-দাঁত উঠবার পর থেকেই) শিশুর দাঁতে ক্যারিজ দেখা দিতে পারে। বিশেষত যে সব শিশুরা ফিডার খায় তাদের ক্ষেত্রে সমস্যা টা একটু বেশি হয়। প্রথমে এই ক্যারিজ দাঁতের উপর কালো দাগ হিসেবে প্রকাশ পায়। এরপর কালো দাগের জায়গাগুলিতে ছোট ছোট গর্তের ( ক্যাভিটি) তৈরী হয়। এই অবস্থায় চিকিৎসা করা না হলে ধিরে ধেরে তা গভীর হতে থাকে। যখন তা দঁতের ডেন্টিন পর্যন্ত এই ক্যারিজ বিস্তার হতে পারে ; শুরু হয় ডেন্টিন সেনসিটিভিটি। তখনি শুরু হয় শিশু জীবনের কষ্টের অধ্যায় -
১. গভীর ডেন্টাল ক্যাভিটি বা ক্যারিজ:
এই অবস্থা হলে শিশুরা পানি বা খাবার বা ফিডার খেতে চাইবে না। পানি বা খাবার মুখে নিয়ে ফেলে দেয় বা প্রচন্ড রকম খাবার ভীতি কাজ করে। অথচ সে ভীষণ ক্ষুধার্ত বা তৃষার্থ। বাচ্ছা ঘনঘন দাঁতে হাত দিতে পারে ( ক্যাভিটিতে খাবার জমা হয়ে থাকলে), হঠাত হঠাত কেঁদে উঠা, ঘুমাতে না চাওয়া, কোন কিছু ভাল না লাগা বা অস্থির আচরণ করা, সবার প্রতি খারাপ আচরন করা, কথা না শোনা, ঘুমিয়ে দেওয়ার পরপরই কাঁন্না দিয়ে জেগে উঠা, ঘুমের মধ্যে কান্নাকাটি করা বা অন্যকে বার বার কামড় দেওয়া । আর এক সাথে একের অধিক দাঁতে বা পাটিতে এ সমস্যা দেখা দিলে তা শিশুদের খুব কষ্টকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
একে তো অবুঝ।। কথা বলার ক্ষ্মমতা নাই ( বয়স ৩ বছর পর্যন্ত) বা কথা বলতে শিখলেও সমস্যা টা বুঝিয়ে বলতে পারে না। কান্নাকাটিই একমাত্র ভরসা যার দ্বারা তারা তাদের বাবা-মাকে সমস্যা বুঝিয়ে দিতে চায়।
কারন : ডেন্টাল ক্যারিজের গভীরতা বৃদ্ধি পেলে সেখানে যে খাবার ও ব্যাকটেরিয়া জমা হয় তাদের থেকে যে এসিড তৈরী হয় সেই এসিডের কারনে বা খাবার চিবানোর সময় ডেন্টিনের উপর সরাসরি খাদ্যের চাপের করনে এই ডেন্টিন সেনসিটিভিটি তৈরী হয়।
২. পল্পাইটিস :
দাঁতের গভীর ক্যারিজ যদি দন্তমজ্জা পর্যন্ত বিস্তার করে তাহলে শুরু হয়ে যায় প্রচন্ড ব্যাথা।। এই ব্যাথা অসহনীয় বা অসহ্য ( নিজের দাঁতের ব্যাথার কথা চিন্তা করুন)।। আক্রান্ত শিশু প্রচণ্ড রকম কান্নাকাটি করে বা খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দেয়।। প্রচন্ড রকম অস্থিরতায় ভোগে।। এর সাথে উপরের উল্লেখিত উপসর্গগুলি আরও প্রকট হয়ে দেখা দেয়। এর সাথে শরীরে সবসময় হালকা জর থাকতে পারে।
এ সমস্যা যদি একাধিক দাঁতে দেখা দেয় তাহলে সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারন করে। যে শিশুরা শুরু থেকেই চিনিযুক্ত খাবার খায় বা বিস্কুট বেশি খায় বা ফীডার খায় ( বা ফীডার খাওয়ার পর যাদের দাঁতের পরিচর্যা করা হয় না) তারা বেশি আক্রান্ত হয়।
গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুদের বা যে পরিবারের মানুষেরা নিয়মিত মুখের যত্নের বিষয়ে উদাসীন বা কর্মব্যস্ত চাকরীজীবী মায়েদের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে প্রায় এরকম সমস্যা দেখা যায়।
অনেকক্ষেত্রে , কোন কোন শিশুর উপরের পাটিতে বা নীচের পাটিতে ; ডানপাশে বা বাম পাশে একসংগে অনেকগুলি দাঁতে সমসা দেখা দিতে পারে। সেই ক্ষেত্রে সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারন করে। কয়েকদিন পর পরই দাঁতব্যাথা হতে পারে। এই সপ্তাহে ডানপাশে ব্যথা তো পরের সপ্তাহে বামপাশে ব্যথা ; এই মাসে উপরের পাটিতে ব্যথা তো পরের মাসে ব্যথা।
দাঁতব্যথার পাল্পাইটিজ স্টেজের বিশেষত্ব হচ্ছে, এ অবস্থায় কোন ব্যথানাশক ঔষধ বা কোন এন্টিবায়োটিক তেমন কাজ করে না। উচ্চ-শক্তিমাত্রার ব্যথানাশক ঔষধ বেশি পরিমানে দিলেই কেবল সাময়িক ব্যথা উপসম হতে পারে। এইরুপ উচ্চ-শক্তিমাত্রায় ব্যথার ঔষধ ব্যবহার কখনই কাম্য হতে পারে না ; কারন এতে শিশু- স্বাস্থের মারাত্মক ঝুকি সৃস্টি হয়। এতে শিশুর পাকস্থালীতে এসিডিটি বেড়ে যেতে পারে বা অনেকক্ষেত্রে তা থেকে চাইল্ডহুড গ্যাস্টক আলসার জাতীয় নতুন সমস্যার জন্ম নেয়। আর এই গ্যাস্ট্রিক এসিডিটির কারনে খাওয়ার পরপরেই বমি করে খাবার বের করে দেয়। তখন এই খাবার বের করে দেওয়ার অপরাধে অনেক মা তার প্রিয় সন্তানকে গালি দেন, বকাঝকা করেন বা পিটুনি দেন ( অবুঝ, কথা বলতে না পারা ছোট্ট মনের মানুষটির ব্যথা নিরবে সহ্য করা ছাড়া কি করার থাকে)।
বর্তমান বিশ্বের প্রায় ৬০% শিশুর জীবনে প্রথম তীব্র ব্যথা হচ্ছে দাঁত-ব্যথা যা তাদের শরীর ও মনকে ভীষণভাবে বিষিয়ে তোলে। আধুনিক খাদ্যাভ্যাস ও খাদ্যপ্রক্রীয়াকরন ব্যবস্থা বিশেষত রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেটের ব্যবহার এ সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বেবি ফিডিং সিস্টেম যেমন অনেক মানুষের আধুনিক জীবনকে সহজ করে দিয়েছে বা শিশুর পুস্টির নিশ্চয়তা বিধান করেছে ; তেমনি এর বিপরীত প্রতিক্রিয়াও কম নয়।
আমাদের বাংলাদেশে এইরুপ সমস্যা দিনে দিনে প্রবল আকার ধারন করিতেছে। চাকরী বা কর্মক্ষেত্র পেশাজীবী মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ার সাথে সাথে বেবি-ফিডিং বাড়িতেছে বা বিস্কিট ও চকলেট বা অন্য কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার শিশুদেরকে বেশি দেওয়ার কারনে শিশুদের ডেন্টাল ক্যারিজ বা ডেন্টাল পেইন অনেক বেড়ে গেছে। ফিডিং করার পদ্ধতি, বেবির টুথব্রাশ করার নিয়ম, শিশুর দাঁত ও মুখের যত্ন ইত্যাদি বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষা বা জ্ঞানের অভাবই শিশুদের ডেন্টাল ক্যারিজ বা ডেন্টাল পেইনের জন্য দায়ী।
ভালভাবে খাইতে বা পানি পানের অনিহার করনে ( থার্মাল ডেন্টাল সেনসিটিভিটির কারনে) শিশু শরীর ধিরে ধিরে খারাপের দিকে যায়। এর সাথে যোগ হয় ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। ফলে যে শিশুটি জীবনের প্রথমে ছিল নাদুসনুদুস, স্বাস্থ্যবান, হাসিখুশিময়; সে হয়ে ঊঠতে পারে রোগাটে, খিটখিটে মেজাজের।
আমাদের দেশে শিশু চিকিৎসার চিত্র :
আমাদের দেশে অনেক বাবা-মা শিশুকে এই দাঁত ব্যাথা উপসম করার জন্য বারবার ব্যথানাশক বা এণ্টিবায়োটিক ঔষধ দেন। আগেই বলেছি, পাপ্লাটিজের ব্যথা কেবল এইসব ঔষধে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সারে না। এর পর চিকিৎসার জন্য ছুটে যান স্থানীয় পল্লি চিকিৎসকের কাছে; কেও কেও যান এমবিবিএস ডাক্তার বা শিশু-বিশেশজ্ঞের কাছে। উপরোক্ত সব ডাক্তারই প্রায় ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক বা ব্যথার ঔষধ দেন। বাংলাদেশে খুব কম সংখ্যক এমবিবিএস ডাক্তারকেই উক্ত শিশুকে বিশেষজ্ঞ ডেন্টাল সার্জনের কাছে রেফার্ড করতে দেখা যায়। আবার মফস্বলের সব উপজেলাতে ডেন্টাল সার্জনও পাওয়া যায় না ; ফলে এমবিবিএস ডাক্তারগনও বুজতে পারেন না কি করা উচিত। গ্রামের গরীব পরিবারের শিশুকে শহরে নিয়ে ডেন্টাল বিশেশজ্ঞের নিকট চিকিৎসা করা অনেক ব্যায় সাপেক্ষ ; অনেক পরিবারেরই এই টাকা থাকে না। আবার ৯০% মানুষের ( শিক্ষিত বা অশিক্ষত) দাঁতের চিকিৎসা বা শিশু দন্ত-চিকিৎসা সম্পর্কে জ্ঞানগত ধারনা কম বা নাই। ডেন্টাল চিকিৎসায় যেহেতু অনেকদিন ডাক্তারের কাছে যেতে হয় বা অনেকগুলি ফলোআপ ভিজিট লাগে তাই অনেক শিশুর ই পরিপূর্ণ চিকিৎসা হয় না।
ফলে অনেক বাবা-মা তার ছোট্ট সোনামনিকে নিয়ে মুসকিলে পড়ে যান। বিভিন্ন ডাক্তারের নিকট ঘোরাঘুরির কারনে বিভ্রান্ত হয়ে যান। শুরু হয়ে যায় শিশুকে কেন্দ্র করে পারিবারিক অশান্তি। আর কর্মজীবী মায়েদের ক্ষেত্রে এই অশান্তি টা অনেকক্ষেত্রেই চরম আকার ধারন করে।
পূর্বেই বলেছি, পাল্পাইটিজ পর্যায়ের দাঁতের ব্যথা প্রচণ্ড হয়। একসাথে অনেকগুলি দঁতে ব্যথা শুরু হইলে এই ব্যথা সহ্য করতে না পেরে তারা অস্বাভাবিক আচরন করতে থাকে। এমনিতেই এই ব্যাথার কারনে শিশুরা ঠিকভাবে খাইতে পারে না; ফলে শরীর ধিরে ধিরে শুকিয়ে যায়। অধিকন্তু এই ধরনের ব্যথা ঘুমন্ত অবস্থায় বা রাতে বেশী হয়। ফলে শিশু প্রচণ্ড চিৎকার দিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠে ভীষণ কান্নাকাটি করে বা প্রায় গভীর রাতে কান্নাকাটি করে। প্রতুন্ত গ্রামের বা কম শিক্ষিত অনেক বাবা-মা এ অবস্থায় ভাবে যে, তার সন্তাকে জিনে বা ভূতপেত্নী ধরেছে। তাই তারা সন্তানকে জিন তাড়ানোর জন্য কবিরাজ বাড়ী বা জিনের-বাদশার কাছে নিয়ে যান।। অনেক কবিরাজ আবার দাঁতের-পোকা তুলে দেন ; সাথে দিয়ে দেয় কমদামী ব্যথানাশক ঔষধের উচ্চ-মাত্রার "পুরিয়া"। এই সব কবিরাজ বা জিনের-বাদশারা শিশুর উপর বিভিন্ন ধরনের শারীরিক বা মানষিক নির্যাতন চালায় ; ফলে শিশুটি দাঁত ব্যথার কথা ভুলেও আর প্রকাশ করে না। শিশুজীবন হয়ে উঠে দূর্বিসহ।
আজকাল আবার নতুন সমস্যা সৃস্টি হয়েছে। বাংলাদেশের সর্বত্র অসংখ দাঁতের ডাক্তার ( হাতুড়ে)। এইসব ডাক্তারদের যোগ্যতা হচ্ছে, ১ মাসের ট্রেনিং, ৩ মাসের ট্রেনিং, ১২ মাসের ট্রেনিং, বা ডাক্তারি চেম্বারে কিচুদিন সার্ভিস-বয় হিসেবে চাকরি করা বা ডেন্টাল টেকনোলোজিতে পরা। এই সকল ব্যক্তির চিকিৎসায় হয়ত কিছু রুগী সাময়িক ভাল হচ্ছে ; বিপরীতে বেশীরভাগ মানুষেরই নতুন নতুন সমস্যা দেখা দিচ্ছে ( যা পরবর্তীতে আর জঠিল সমস্যা হয়ে উঠে)। বর্তমান বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ৫ বছর মেয়াদী বিডিএস কোর্স সম্পন্ন করে ১ বছর ইন্টার্নীসিপ করতে হয়। এরপর প্রাইভেট প্রাকটিস করার জন্য পুনরায় একটা "অনুমোদন" পরীক্ষায় পাস করতে হয়। এরপর মানুষের মুখের মধ্যে বা দাঁতের চিকিৎসা করার অনুমতি পায়। কিন্তু আমাদের দেশে মানুষ অনেক সস্তা, শিশুরা আরও সস্তা।। এখানকার মানুষের সবচেয়ে সস্তা অংগ হল দাঁত, যা তারা সহজেই ফেলে দিতে পারে!
শিশু দাঁতের চিকিৎসার গুরুত্ব :
তিন বা চার বছর বয়সে যখন দাঁত ব্যথা হয়, তখন অনেক বাবা-মা ভাবেন যে, এই দাঁতগুলি যেহেতু পরে যাবে তাই বেশি চিকিৎসা বা ভাল চিকিৎসা করা দরকার নাই। কিন্তু দাঁত ব্যথা হলে শিশুর বয়স যাই হোক না কেন অবশ্যই তার চিকিৎসা করাতে হবে। শিশুদের ক্ষেত্রে, সমনের দিক থেকে ১ নং ও ২ নং দাঁতগুলি ৫ - ৭ বছর বয়েসে পড়ে গিয়ে ৬-৮ বয়সে উঠে ; আর পিছনের দাঁতগুলি (৩ নং, ৪নং ও ৫ নং) ৯-১১ বছর বয়সে পড়ে গিয়ে ১০-১২ বছর বয়সে উঠে।
পিছনের দুধ-দাঁতগুলি (৩ নং, ৪নং, ৫ নং) হচ্ছে শিশুর বয়স ১ থেকে ১১ বছর পর্যন্ত খাবার চিবানোর যন্ত্র। কোন কারনে এই দাঁতে ব্যাথা হলে খাবার খেতে প্রচন্ড কষ্ট হয় ; অনেকক্ষেত্রে ব্যথা সারাদিন চলতে থাকে। বাচ্ছা ভাল করে পড়াশুনা করতে চাইবে না; কারন, পড়াশুনা করতে গেলে দাঁতে দাঁতে ঘঁসা লেগে ব্যথা বেড়ে যায়। ডেন্টাল পেইন যেমন স্নায়ুতন্তের বিস্তার এলাকাতে ছড়ায়, তেমনি মুখের চারপাশে বা ভিতরে বা বাহিরে যে মাংসগুলি সেগুলিতেও ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে মেধাবী সন্তানও মেধাহীন হিসেবে প্রকাশিত হবে।
শিশুর দুধ-দাঁতগুলি স্থায়ী দাঁতের "গাইড" হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ স্থায়ী-দাঁতগুলি মুখের ভিতর চোয়ালের কোন জায়গায় উঠবে তা নির্ধারণ করে দেয় এই শিশু-দাঁতগুলি। এই দুধ-দাঁতগুলিতে ক্যারিজ হলে তা স্থায়ী দাঁতে ছড়িয়ে পড়ে বা ছড়িয়ে পড়তে পারে। কোন কারনে আগেভাগে দুধ-দাঁতগুলি নস্ট হয়ে গেলে দাঁত হয়ে যায় " আঁকা-বাঁকা, ঊচুনীচু, ফাঁকাফাঁকা, ঠোঁট উচু বা ঠোঁট ফাকা, নাক বোচা বা থুথনি বোচা ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়। নষ্ট হয়ে যায় দাঁতের বা মুখমণ্ডলের সৌন্দর্য ; নষ্ট হয়ে যায় স্বাভাবিক হাসি।।