25/11/2025
পেটের ক্যানসার বাড়ছে দ্রুত চিকিৎসকরা জানালেন চমকে দেওয়া কারণ।
পেটের ক্যান্সার বা গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সার হলো পেটের ভেতরের আস্তরণে অস্বাভাবিক কোষ দ্রুত বেড়ে টিউমার তৈরি করার প্রক্রিয়া। শুরুতে সাধারণত তেমন লক্ষণ দেখা না গেলেও ধীরে ধীরে হজমে সমস্যা, অরুচি, ওজন কমে যাওয়া, বমিভাব ইত্যাদি উপসর্গ ধরা পড়ে। দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে এটি শরীরের অন্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
জীবনযাত্রা যত উন্নত হচ্ছে, তার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নানান জটিল রোগের প্রকোপ। ক্যান্সার তার মধ্যেই অন্যতম ভীতিকর নাম। চিকিৎসা-বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে এখন ক্যান্সারের অনেক প্রকারই নিরাময়যোগ্য বা নিয়ন্ত্রণযোগ্য হলেও, এখনও এই রোগটি মানুষের মনে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে—বিশেষ করে পেটের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে আক্রান্তের সংখ্যা এক ধাক্কায় বেড়ে গিয়েছে। জীবনযাত্রার অবাধ পরিবর্তন, খাদ্যাভ্যাসের পশ্চিমীকরণ, অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস, স্থূলতা বৃদ্ধি, সংক্রমণ—সব মিলেই পেটের ক্যান্সার এখন একটা বড় স্বাস্থ্য-চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে।
কিন্তু আসলে কী এই পেটের ক্যান্সার? কেনই বা এর প্রকোপ এত দ্রুত বেড়ে চলেছে? কোন কোন অঙ্গে এই ক্যানসার হতে পারে? রোগ নির্ণয়ের পরে কোন চিকিৎসা পদ্ধতি বেছে নেওয়া হবে—কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন নাকি অস্ত্রোপচার—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিয়মই বা কী?
পেটের ক্যান্সার নিয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানোর উপর জোর দিয়েছেন। কারণ ক্যান্সার মানেই জীবন শেষ—এই ধারণা ভুল। যথাসময়ে রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনও সম্ভব। কিন্তু এজন্য প্রথম শর্ত হলো—উপসর্গকে অবহেলা না করা।
পেটের ক্যান্সার কী?
পেটের ক্যান্সার বলতে সাধারণত আমরা পাকস্থলির ক্যান্সারকে বুঝি। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যায় বিষয়টি আরও বিস্তৃত। চিকিৎসক আশুতোষ দাগা খুব স্পষ্ট করে বলেন— “পেটের মধ্যে যে যে অঙ্গ রয়েছে, সেখানে যে ক্যান্সার হয় তাকে পেটের ক্যান্সার বলে।”
অর্থাৎ, ‘অ্যাবডোমিনাল ক্যান্সার’ বলতে পাকস্থলির পাশাপাশি থাকে—
লিভারের ক্যান্সার
গলব্লাডারের ক্যান্সার
অগ্ন্যাশয়ের (প্যানক্রিয়াস) ক্যান্সার
ছোট বা বড় অন্ত্রের ক্যান্সার
পেরিটোনিয়াল সারকমা বা টিউমার
অ্যাপেন্ডিক্সের ক্যান্সার
এমনকি কিডনি বা প্লীহা সম্পর্কিত কিছু ক্যান্সারও পেটের ক্যান্সার আওতায় ধরা পড়ে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক ধরা হয় অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারকে। কারণ এই ক্যান্সার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রথমদিকে কোনও লক্ষণ ধরা পড়ে না। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগীকে দেরিতে হাসপাতালে আসতে দেখা যায়।
অন্যদিকে, অন্ত্র পেটের সবচেয়ে বড় অংশ দখল করে থাকে। তাই ছোট অন্ত্র ও বড় অন্ত্র—দু’ধরনের ক্যান্সারই এখন দ্রুত বাড়ছে। পশ্চিমা দেশে বড় অন্ত্রের ক্যান্সার সবচেয়ে সাধারণ হলেও, আমাদের দেশে গত কয়েক বছরে বড় অন্ত্রের ক্যান্সার গ্রাফও উঠতি।
পেটের ক্যান্সার বাড়ার মূল কারণগুলো
দুই চিকিৎসকের বক্তব্যেই উঠে এসেছে—জীবনযাত্রার পরিবর্তন পেটের ক্যান্সারের প্রধান কারণ।
নিচে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিশদে ব্যাখ্যা করা হলো—
১. স্থূলতা (Obesity):
অতিরিক্ত ওজন শরীরে হরমোনাল ভারসাম্য নষ্ট করে। পেটে জমা চর্বি বিশেষভাবে ঝুঁকি বাড়ায়।
স্থূলতার ফলে—
পাকস্থলিতে অ্যাসিডিটি বাড়ে
ইনসুলিন রেসিস্ট্যান্স হয়
প্রদাহজনিত সমস্যা (inflammation) দীর্ঘস্থায়ী হয়
এই তিন মিলেই ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে।
২. ধূমপান এবং তামাক সেবনঃ
চিকিৎসকদের মতে, ধূমপান এখন সবচেয়ে বড় অভিশাপ। ধোঁয়ার রাসায়নিক পদার্থ পাকস্থলির আস্তরণে ক্ষত তৈরি করে এবং ক্রমে কোষের ডিএনএ নষ্ট করে। ফলে ক্যান্সার হওয়ার সুযোগ বেড়ে যায়।
৩. অ্যালকোহল গ্রহণ বৃদ্ধিঃ
মদ্যপান লিভার ও প্যানক্রিয়াস—দুই অঙ্গের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
অতিরিক্ত অ্যালকোহল—
* লিভার সিরোসিস তৈরি করে
* প্যানক্রিয়াসে জ্বালা বাড়ায়
* পাকস্থলির কোষে মিউটেশন ঘটাতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে—“মদ্যপান যত বাড়ছে, তত বাড়ছে ক্যান্সারের গ্রাফ।”
৪. অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসঃ
“জাঙ্ক ফুড বেশি খাচ্ছে, রিফাইন্ড ওয়েস্টার্ন ডায়েটে ঝুঁকছে—এটাই বড় সমস্যা।”
পশ্চিমা খাদ্যাভ্যাসে—
বেশি ফ্যাট,
বেশি চিনি,
অতিরিক্ত প্রসেসড ফুড,
ভাজাপোড়া,
লাল মাংস।
—সবই ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
৫. সংক্রমণঃ
H. pylori, Hepatitis B ও C
হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি (H. pylori) নামের ব্যাকটেরিয়া পাকস্থলির ক্যান্সারের প্রধান কারণ।
অন্যদিকে—
হেপাটাইটিস বি
হেপাটাইটিস সি
লিভার ক্যান্সারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
অসংক্রমিত লিভারের উপর দীর্ঘদিনের প্রদাহ ক্যান্সারের পথ তৈরি করে।
৬. শরীরচর্চার অভাবঃ
আধুনিক মানুষ ডেস্কে বসে কাজ করে, হাঁটার বা নড়াচড়া করার সময় নেই। ফলে শরীরে চর্বি জমে, বিপাকক্রিয়া নষ্ট হয়—যা ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।