30/04/2026
আসসালামুয়ালাইকুম, কেমন আছেন আপনারা আশা করি আল্লাহর রহমতে ভালো আছেন আলহামদুলিল্লাহ।
আজকে আমরা হোমিওপ্যাথতে স্তন ক্যান্সার নিয়ে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।
স্তন ক্যানসার জানার আগে আমরা নারীদের ক্যানসারে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বেশি কেন জানি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ ক্যানসারে মারা যায়। বর্তমান বাংলাদেশের মানুষের মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর অন্যতম একটি ক্যানসার। ২০২১ সালে এক বছরে দেশে নতুন করে ক্যানসার রোগী সনাক্ত হয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৭৮১ জন । তাদের মধ্যে মারা গেছেন ১ লাখ ৮ হাজার ১৩৭ জন। দেশে ক্যানসার সনাক্ত ও মৃত্যুর হারে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যাই বেশি।
গবেষাণায় দেখা গেছে,ক্যানসারে আক্রান্ত প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে ৫৯.৫ শতাংশই নারী এবং ৪০.৫ শতাংশ পুরুষ।ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৭৪.৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ২৫.২ শতাংশ শিশু। আবার পুরুষদের তুলনায় নারীদের কম বয়সে ক্যানসার আক্রন্তের হারও বেশি।
পূর্ণ বয়স্ক পুরুষদের মধ্যে মূত্রথলির ক্যান্সারে আক্রান্ত ১০.২ শতাংশ,প্রস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত ৯.৯ শতাংশ এবং মুখগহ্বরের ক্যানসারে আক্রান্ত ৮.৫ শতাংশ। অন্যদিকে নারীদের মধ্যে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত ২৩.৩ শতাংশ,জরায়ুমুখ ক্যানসারে আক্রান্ত ২১.৫ শতাংশ এবং মুখগহ্বরের ক্যানসারে আক্রান্ত ৮.৯ শতাংশ। প্রজননতন্ত্রের ক্যানসারে আক্রান্তের হার পুরুষের ১১.২ শতাংশ এবং নারীদের মধ্যে ৩১.৯ শতাংশ।
হাসপাতাল ভিত্তিক ক্যানসার রেজিস্ট্রেশন নিয়ে ১৬৫৬ জনের ওপর গবেষণা পরিচালিত হয়। এদের মধ্যে পূর্ণবয়স্ক ১২৩৮ জন এবং শিশু ৪১৮ জন। এখানে পুরুষদের ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্তের হার ৯.৬ শতাংশ, লিউকেমিয়ায় আক্রান্তের হার ৯.৪ শতাংশ, লিম্ফোমায় আক্রান্তের হার ৯.০ শতাংশ। নারীদের মধ্যে স্তন ক্যানসারে আক্রান্তের হার ২৮.১ শতাংশ, থাইরয়েড ক্যানসারে আক্রান্তের হার ১৬.১ শতাংশ,জরায়ুমুখে ক্যানসারে আক্রান্তের হার ১২.২ শতাংশ। ছেলে শিশুদের মধ্যে লিউকেমিয়ায় আক্রান্তের হার ৭১.৫ শতাংশ এবং লিম্ফোমায় আক্রান্তের হার ১০.৩ শতাংশ। কন্যা শিশুদের মধ্যে লিউকেমিয়ায় আক্রান্তের হার ৬৬.৫ শতাংশ এবং হাড়ের ক্যানসারে আক্রান্তের হার ১১.৬ শতাংশ। গবেষণার ফলাফলে আরও দেখা গেছে, নারীরা ১৫ বছর বয়স থেকে ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং ৪৬ বছরের মধ্যে বেশি রোগী পাওয়া যাচ্ছে। এদিক থেকে আবার পুরুষদের বেশির ভাগই ২০ বছরের পর থেকে আক্রান্ত হচ্ছেন, আর ৫০ বছর বয়সের মধ্যেই বেশি রোগী সনাক্ত হচ্ছে।
নারীরা কেন বেশি ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, নারীদের মধ্যে আক্রান্ত হওয়ার হার বৃদ্ধির একটি বড় কারণ তাদের জীবন যাত্রার পরিবর্তন। এখন মেয়েরা অনেক বেশি পথে ঘাটে বের হচ্ছেন, কর্মজীবী হচ্ছেন অনেকেই , প্রচুর ফাস্টফুড খাচ্ছেন, সিগারেট বা মদ্যপানে অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন। তাঁরা এখন অনেক বেশি পথে ঘাটে ধোঁয়া ও ধুলার মধ্যে কাজ করছেন। বাচ্চাকে বুকের দুধ না খাওয়ানো, অনিয়মিত খাবার বা ফ্যাটি খাবার খাওয়া ও ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার হার বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।
বাংলাদেশে নারীরা যেসব ক্যানসারে আক্রান্ত হন তার মধ্যে স্তন ক্যান্সার শীর্ষে রয়েছে। আই এ আর সি বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৩ হাজারের বেশি নারী নতুন করে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন। মারা যান ৬৭৮৩ জন। স্তনের কিছু কোষ অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে গেলে, অতিরিক্ত কোষগুলো বিভাজনের মাধ্যমে টিউমারে পরিণত হয়।
নগরায়ন, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, জীবনযাত্রা নারীদের জীবন মানের ওপর প্রভাব ফেলেছে। মেয়েদের দেরিতে বিয়ে,সন্তান না নেওয়া বা দেরিতে (৩০ বছরের পর) নেওয়ার প্রবণতা, শিশুকে দুধ পান না করানো, পরিবারে স্তন ক্যান্সারের ইতিহাস, দীর্ঘদিন ইস্ট্রোজেনযুক্ত জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবন, এইচ আর টি বা হরমোন থেরাপির মতো বিষয় স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
তবে আশার কথা হলো, একজন নারী সচেতন হলেই এ ক্যানসার থেকে মুক্ত থাকতে পারেন। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিং প্রোগ্রামের মাধ্যমে প্রতিরোধ যোগ্য। স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিংয়ের আওতায় প্রতিটি নারীর নিজে নিজের স্তন পরীক্ষা করার কথা। কিন্তু প্রশিক্ষণ ছাড়া এটি সব শ্রেনীর নারীর পক্ষে সফল ভাবে সম্ভব না হতে পারে। আবার টিউমার কিছুটা বড় হওয়ার পরই ধরা পড়ে। তাই স্তন ক্যান্সার নির্ণয় করতে ম্যামোগ্ৰাম বা আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্রিনিংয়ের বিকল্প নেই। এতে প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার সনাক্ত করা সম্ভব। আর এ পর্যায়ে সনাক্ত করা গেলে তা সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব।
প্রাকৃতিক ভাবে স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করুন। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন। প্রচুর আঁশযুক্ত খাবার ও তাজা শাক-সবজি গ্ৰহন করুন। পরিমিত ব্যায়াম করুন। ফাস্টফুড,চিনি, মিষ্টি, কোমলপানীয়,মদ, ধূমপান থেকে বিরত থাকুন। পারিবারিক ইতিহাসকে গুরুত্ব দিন। মা,খালা,নানি কারও স্তন ক্যানসারে ইতিহাস থাকলে বেশি সতর্ক হোন। সঠিক সময়ে বিয়ে আর সন্তান জন্ম দান, সন্তান জন্মের পর স্তন্যদান করানো জরুরি।
মিনসেস, পিরিয়ড বা মাসিক শুরু হওয়ার ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে একদিন সময় নিয়ে নিজের স্তন নিজে ভালো ভাবে পরীক্ষা করুন।স্তনে যে কোন গোটা,চাকা, অস্বাভাবিকতা, ত্বকের বা নিপলের যেকোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। বছরে বা দুই বছরে অন্তত একবার চিকিৎসকের কাছে স্তন পরীক্ষা করুন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে ৪০ বছর বয়সের পর প্রতিবছর একবার স্তনের আলট্রাসনোগ্ৰাফি বা ম্যামোগ্ৰাফি করা যেতে পারে।
স্তন ক্যানসার (Breast Cancer) ঃ আমাদের শরীরের টিস্যু ছোট ছোট কোষ দিয়ে তৈরি । স্তনের কোষ গুলি অনিয়ন্ত্রিত ভাবে বেড়ে ওঠে এবং এক একটি মাংস পিন্ডে পরিণত হয় তখনই একে স্তন ক্যান্সার বলা যায় । এ মাংসপিণ্ড গুলোকে টিউমার বলা হয়। অনেক সময় টিউমার গুলো ক্যানসারে রূপ নেয়, তখন এদেরকে প্রাথমিক ক্যানসার হিসাবে সনাক্ত করা হয়। কখনো কখনো ক্যানসার কোষ গুলো রক্ত বা লসিকা গ্রন্থির মাধ্যমে অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে, এটাকে সেকেন্ডারি ক্যানসার বলা হয় । স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসা প্রকার ভেদে বিভিন্ন রকম হতে পারে। নারী ও পুরুষ উভয়েই স্তন ক্যান্সার এ আক্রান্ত হতে পারে। তবে নারীদের ক্ষেত্রে এর প্রবনতা বেশি দেখা যায়।
স্তন ক্যানসার হবার কারণ ঃ
১ । প্রথমত আমাদের জীবন যাত্রার আমুল পরিবর্তন।
২ । বর্তমান নারীরা কর্মজীবী হচ্ছেন।
৩ । প্রচুর ফাস্টফুড গ্ৰহন।
৪ । সবুজ শাকসবজি কম খাওয়া।
৫ । শারীরিক পরিশ্রম কম করা।
৬ । অতিরিক্ত স্থুলতা স্তন ক্যান্সারের প্রধান কারণ।
৭ । মানসিক উৎকন্ঠা যা স্নায়ুকে দূর্বল করে ক্যানসার আক্রমনের পথ খুলে দেয়।
৮ । শারীরিক গঠন ঠিক রাখতে দেরিতে সন্তান নেয়া।
৯ । বুকের সৌন্দর্য্য ধরে রাখতে শিশুকে দুধ পান করাতে অনীহা।
১০ । বর্তমান সিগারেট, ইয়াবা, ফেনসিডিল গ্ৰহণ।
১১ । মদ্যপান পান।
১২ । পথে ঘাটে ধোঁয়া ও ধুলার মধ্যে কাজ করা।
১৩ । অনিয়মিত খাবার বা ফ্যাটি খাবার খাওয়া।
১৪ । নগরায়ন কারণে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন।
১৫ । নারীদের জীবন মানের ওপর প্রভাব।
১৬ । দেরিতে বিয়ে করা।
১৭ । সন্তান না নেওয়া বা দেরিতে সন্তান (৩০ বছরের পরে) নেয়ার প্রবণতা।
১৮ । পরিবারে স্তন ক্যান্সারের ইতিহাস।
১৯ । দীর্ঘদিন ইস্ট্রোজেনযুক্ত জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবন।
২০ ।এইচ আর টি বা হরমোন থেরাপি।
২১ । ব্যায়াম না করা।
২২ । আঁশযুক্ত খাবার কম খাওয়া।
২৩ । অতিরিক্ত কোমলপানীয় পান।
২৪ । অল্প বয়সে বিয়ে।
২৫ । আধিক সন্তান গ্ৰহন ।
২৬ । আঘাত জনিত কারণে।
২৭ । স্তনের সৌন্দর্য ধরে রাখতে বিভিন্ন কসমেটিক ব্যবহার।
২৮ । বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন।
২৯ । যৌন নির্যাতনের শিকার।
৩০ । পারিবারিক নির্যাতন।
৩১ । সমকামিতা।
৩২ । ভ্যাকসিন বা টিকা গ্ৰহনের মাধ্যমে ক্যান্সার সৃষ্টির পথ তৈরি করা।
৩৩ । অল্প বয়সে ঋতুমতী হওয়া।
৩৪ । দেরিতে মেনোপজ হওয়া।
৩৫ । পূর্বে এন্ডোমেট্রিয়াম,ওভারিতে ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে।
৩৬ ।বার বার রেডিয়েশনের ইতিহাস থাকলে।
৩৭ । প্রথম সন্তান ধারণের পূর্বে অতিরিক্ত রাত্রি জাগরণ
৩৮ । বগলে চাকা দেখা দেয়া ছাড়াও বিবিধ কারণ আছে।
স্তন ক্যান্সারের জটিলতা ঃ যদি স্তন ক্যান্সারের জীবাণু শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে তার লক্ষণ সমূহ যেমন ঃ
১ । যকৃতে ছড়ালে পেটে ব্যথা বা জন্ডিস দেখা দেয়।
২ । ফুসফুসে ছড়ালে কাশি হওয়া এমনকি কাশির সঙ্গে রক্ত আসা।
৩ । হাড়ে ছড়ালে সেখানে তীব্র ব্যথা অনুভব হওয়া।
স্তন ক্যান্সারের লক্ষণ বা উপসর্গ ঃ
১ । স্তনে ফোলা বা টিউমার।
২ ।বগলে ব্যথা বা গ্ল্যান্ড ফোলা।
৩ ।স্তন লাল হওয়া ।
৪ । অনেক দিন ধরে শরীরের তাপমাত্রা উঠানামা করে।
৫ । চেহারা ফ্যাকাসে বা মলিন হয়ে যায়।
৬ । রক্ত স্বল্পতা দেখা দেয়।
৭ । স্তনে প্রচুর পরিমাণে ব্যথা ও জ্বালাপোড়া।
৮ । স্তনে চাকা দেখা দেয় এবং চাকা গুলো অনেক শক্ত হয়ে যায়।
৯ । স্তনের চামড়ার রং পরিবর্তন হওয়া বা চামড়া মোটা হওয়া ( কমলা লেবুর খোসার মতো) ।
১০ । নিপল বা স্তনের বোঁটা ভেতরে ঢুকে যাওয়া।
১১ । নিপল দিয়ে রক্ত বা পুঁজ পড়া ।
১২ । স্তনের বোঁটার চারপাশে উদ্ভেদ।
১৩ । স্তনের সাইজ অস্বাভাবিক বড় হওয়া বা শুকিয়ে যাওয়া ।
১৪ । এ ছাড়াও বিবিধ কারণ আছে।
ডাঃ মোঃ সাইফুল ইসলাম ডি এইচ এম এস ঢাকা।
চেম্বার ঃ সিফাত হোমিও হল , শালবন মিস্ত্রিপাড়া, হারাগাছ রোড, রংপুর ।০১৫৭৫৩৬০৬৮৮.
চলবে।