13/01/2026
প্রসঙ্গ: বাড়িতে প্রেসার মাপা ভালো না খারাপ?
উত্তর হলো বাড়িতে রোগী যদি নিজের প্রেসার পরিমাপ করে তাহলে সেটা ভালো। এতে করে রোগীর নিজের হাইপ্রেসারের চিকিৎসা সম্পর্কে দায়িত্ব বাড়ে, ঔষধ খাবার প্রয়োজনীয়তা বাড়ে এবং রোগী সব সময় চিকিৎসা নেন।
উপরের কথাগুলো উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসার বিভিন্ন গাইডলাইন এর কথা। এখন ধরুন আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে যদি আমরা রোগীদের বলি যে বাড়িতে প্রেসার মাপবেন, তাহলে কি কি হয় সেটা ব্যাখ্যা করছি।
১) রোগীরা প্রেসার মাপবে ফার্মেসীতে অথবা যারা ডাক্তার নন (পিসি, কোয়াক) এদের কাছে, অথবা বাড়ির কোন সদস্য। প্রথমত প্রেসার পরিমাপের যে যন্ত্র সেটা কেমন হবে, কতদিন পর পর এই যন্ত্রের Calibration করতে হয়, কখন প্রেসার পরিমাপ করতে হবে, কখন করা যাবে না, প্রেসার বেশি পেলে কি বিষয় চেক করতে হবে বা পরামর্শ দিতে হবে; প্রেসার কম পেলে কি পরামর্শ দিতে হবে তা উনাদের জানা নেই। সেকারণে প্রেসার বেশি পেলে তেঁতুল খাওয়া বা প্রেসারের ঔষধ দেয়া বা ডাবল ডোজ ঔষধ খাওয়া এবং প্রেসার কম পেলে খাবার স্যালাইন, ডিম খাওয়া বা আইভি স্যালাইন দেয়াই প্রধান পরামর্শ হয়। উপরের অধিকাংশই সঠিক নয়।
২) এবারে আসি বাড়িতে যারা প্রেসার মাপেন তাদের ক্ষেত্রেও উপরের সমস্যা গুলো পরিলক্ষিত হয়। এছাড়াও পরিবারের সদস্যরা সকাল- বিকেল প্রেসার মাপেন, এতে করে প্রেসারের যদি নরমাল ভ্যারিয়েশন হয় সেটা দেখে উনারা ভয় পান এবং এরপর হয় প্রেসারের ঔষধ দুইবার খান অথবা ঔষধ বন্ধ করে দেন। এগুলোর কোনটিই সঠিক নয়।
৩) উন্নত বিশ্বে অটোমেটেড (আমরা বলি ডিজিটাল) বিপি মেশিন ইউজ করার পরামর্শ দেয়া হয়। এগুলোর অনেক সুবিধা আছে। এসব দেখে আমাদের দেশের অনেকেই এই মেশিন কিনে প্রতিদিন প্রেসার পরিমাপ করে। বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে যে মেশিনগুলো পাওয়া যায় সেগুলোর অধিকাংশ ভালো ব্রান্ডের নয়। যেগুলো ভালো ব্রান্ডের সেগুলোর দাম অনেক এবং ভালো ব্রান্ডের মেশিনগুলোও মাঝে মাঝে চেক করতে হয়। যেগুলো ভালো মেশিন নয় সেগুলো সঠিক রেকর্ডিং দেয় না।
ব্লাড প্রেসার একটি ভ্যারিয়েবল সংখ্যা, একেক সময় একেক রকম হবে এটাই স্বাভাবিক। কোন সময় বেশি হবে, কোন সময় কম হবে তা একজন চিকিৎসকই বুঝতে পারবেন। অবস্থাভেদে প্রেসার বেশি থাকলেও কোন সমস্যা নেই আবার অবস্থাভেদে কম হলেও সমস্যা নেই। একজন মানুষ যিনি চিকিৎসক নন তিনি যদি দেখেন যে তার প্রেসার একেক সময় একেক রকম তাহলে উনার ভয় পাওয়া স্বাভাবিক।
তাই সঙ্গত কারনে আমি মনে করি একজন রোগীর বা নন মেডিকেল মানুষের প্রেসার বাসায় পরিমাপ করলে এসব বিষয়ে পড়াশোনা করে তারপর করা উচিত। অন্যথায় প্রেসার পরিমাপ করা ঝামেলা বাড়াবে।
দুটি ঘটনা দিয়ে শেষ করি- আমার চাচাতো বোন ফোন দিয়েছে যে উনার স্বামীর প্রেসার অনেক বেশী, আমি যে ঔষধ দিয়েছি তার ডোজ বাড়িয়ে দিয়েছে, আমি জিজ্ঞাসা করলাম কে প্রেসার মেপেছে, বললো- গ্রামের ডাক্তার। আমি বললাম- আজকের রাতটা যাক, কাল নিয়ে আয়। পরের দিন যখন আসলো, আমি দেখলাম উনার প্রেসার অনেক কম, উনাকে ভর্তি করে স্যালাইন দিয়ে তারপর প্রেসার নরমাল হয়।
দ্বিতীয় রোগী, প্রায়ই চেম্বারে আসেন বলেন প্রেসার কন্ট্রোল হয় না। কিভাবে বুঝলেন জিজ্ঞাসা করলেন- বাসায় নিয়মিত মাপি, চেম্বারে সব সময় বিপি নরমাল পাই। একদিন মেসেজ দিলেন প্রেসার অনেক বেশি, বললাম সাথে সাথে চেম্বারে আসতে, মেপে দেখলাম নরমাল।
যাহোক, আমার সাজেশন হলো, এতকিছুর পরেও যদি কেউ বাড়িতে প্রেসার মাপেন তাহলে প্রেসার বেশি পেলে, ঘাবড়াবেন না। রেস্ট নিবেন, প্রসাব করে কয়েক ঘন্টা পরে আবারও কয়েকবার মাপবেন। প্রেসার মাপানোর নিয়ম যদি সঠিক হয় এবং প্রত্যেকবারই যদি প্রেসার বেশি হয় তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন। প্রেসার কমে গেলেও বার বার মাপবেন। তবে মনে রাখবেন প্রেসার বেড়ে যাওয়া একটি রোগ, কিন্তু কমে যাওয়া কোন রোগ নয়। এর জন্য ডিম, স্যালাইন খাবার প্রয়োজন নেই। তবে বমি, ডায়রিয়া বা রক্তক্ষরণের পর যদি প্রেসার কমে যায় তাহলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।
ডাঃ রতীন্দ্র নাথ মন্ডল
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
রংপুর স্পেশালাইজড হাসপাতাল।