05/05/2026
#রোগীদের_জানা_ভালো
পোস্টটিতে খুব সহজ ভাষায় দাদ সম্পর্কিত কিছু তথ্য দেয়ার চেষ্টা করছি।
Q. দাদ কি?
দাদ বা দাউদকে মেডিকেলের ভাষায় টিনিয়া বলে থাকি আমরা। ইংরেজীতে একে Ringworm বলে। যেহেতু এর সংক্রমণে স্কিনে রিং এর মতো র্যাশ ওঠে সেজন্য ইংলিশ ম্যানরা এর নাম দিয়েছে Ringworm।
এই Ringworm এর শেষের শব্দটি worm থাকায় অনেকে মনে করেন এটি ক্রিমি, কিন্তু এটি কোন ক্রিমি না। দাদ হলো স্কিনের একটি ফাঙ্গাল ইনফেকশন বা ছত্রাকজনিত সংক্রমণ। মানে এটি ফাঙ্গাস দিয়ে হয়ে থাকে। ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া শয়তান যেমন বডিতে রোগ সৃষ্টি করে, ফাঙ্গাস ও সেই রোগ সৃষ্টিকারী গ্রুপের অন্যতম সদস্য। স্কিনে দাদ সৃষ্টিকারী এই শয়তান ফাঙ্গাসটির নাম ডার্মাটোফাইট।
Q. ফাঙ্গাসটি দেখতে কেমন?
খালি চোখে এই ফাঙ্গাসটিকে দেখা যায় না। এদের যেরকম সংক্রমণ স্টাইল তাতে খালি চোখে দেখতে পাওয়া গেলে যার হতো তার কাছে কেউ যেত না। যাইহোক, এটিকে মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখা যায়। মাইক্রস্কোপের নিচে এটি দেখতে প্যাচানো সুতার মতো। দেখতে সুতার মতো হালকা হলেও একে হালকাভাবে নেয়ার কোন সুযোগ নেই। এর একটি ‘পাওয়ার টুল’ আছে যার নাম কেরাটিনেজ এনজাইম। আরেকটু পড়লেই এই পাওয়ার টুলটির ব্যাপারে জানতে পারবেন।
Q ফাঙ্গাসটির বাড়ি কোথায়?
ফাঙ্গাসটির বাড়ি বেশি দূরে না, আপনার বাড়িতেই। সে থাকে আপনার ব্যবহৃত তোয়ালায়, আপনার ঘামে ভেজা শার্টে, আপনার ইনার ওয়্যারে, আপনার পা-মোজায়, আপনার জুতা বা স্যান্ডেলে।
Q ফাঙ্গাসটি শুধু স্কিনেই কেন সঙ্গক্রম ঘটায়?
আমাদের স্কিন অনেক কয়টি স্তরের সমন্বয়ে গঠিত। এর মধ্যে সব থেকে বাহিরের স্তরটি যেটি আমরা খালি চোখে দেখি, যেটিতে লোম থাকে, সেটির নাম স্ট্রাটাম কর্নিয়াম। এই লেয়ারটি কেরাটিন নামক এক ধরনের প্রোটিন দিয়ে তৈরি। এই কেরাটিন ফাঙ্গাসটির খুবই পছন্দের খাবার। সে তার কাছে থাকা কেরাটিন এনজাইম দিয়ে এই লেয়ারটিকে ভাংতে থাকে এবং খেতে থাকে। যখনই সে এই স্তরটিকে ভাঙ্গতে শুরু করে তখনি আমরা চুলকানি অনুভব করতে থাকী। শরীরের ভেতরে কেরাটিন নাই যেটি ওর খাবার এবং শরীরের ভেতরে ইমিউন সিস্টেম অনেক শক্তিশালি।
Q. কিভাবে এটি স্কিনে প্রবেশ করে?
অনুজীবরা প্রানীদেহের ভেতরে যেভাবে থাকে, প্রানীদেহের বাহিরে সেভাবে টিকতে পারে না। প্রানীদেহের বাহিরে এরা খুবই আটোসাটোভাবে থাকে। প্রানীদেহের বাহিরে টিকে থাকতে এরা কিছু স্ট্রাটেজি ফলো করে। মহান আল্লাহ এদের এমন একটা শক্তি দিয়েছেন যে শক্তির মাধ্যমে এরা নিজেদের বডি পার্টসগুলো খুলে ফেলতে পারে। আরও সহজ করে বললে, রোবোটিক স্টাইলে তারা তাদের হাত, পা, মাথা খুলে ফেলে এবং সেগুলোকে আলাদা আলাদা প্যাকেট করে রাখতে পারে। প্যাকেটকৃত একটা হাত বা মাথা যখন আবার কোন প্রানীদেহে প্রবেশ করে তখন আবারও একটি পূর্ণাঙ্গ ফাঙ্গাস হতে পারে। এইযে প্রানীদেহের বাহিরে নিজেদেরকে প্যাকেট করে রাখা এই প্যাকেটটিকে স্পোর বলে। ফাঙ্গাস মূলত স্পোর অবস্থায় স্কিনে প্রবেশ করে এবং স্কিনে ঢুকে সে আবার নিজেকে এসেম্বল করে।
এই স্পোর আর অন্যকোথাও না, এটি থাকে আপনারই ব্যবহৃত তোয়ালায়, আপনার ঘামে ভেজা শার্টে, আপনার ইনার ওয়্যারে, আপনার মোজায়, আপনার জুতা বা স্যান্ডেলে।
Q. আমার স্কিনে চুলকানি। কিভাবে বুঝবো এটি দাদ?
শুরুতেই যে এটি রিং এর মতো করে দেখা দিবে বিষয়টি এমন না ।
১। প্রথম দিকে এটি দেখতে খুবই ছোট একটি স্পট আকৃতির। মনে হবে মশার কামড়, হালকা চুলকাবে।
২। কিন্তু দিন যত গড়াবে এই ছোট্ট স্পটটি আস্তে আস্তে রিং এর আকৃতি ধারণ করবে, চুলকানি বেড়ে যাবে।
৩। এবং আশেপাশের স্কিনের তুলনায় ওই আক্রান্ত স্থানের স্কিনটুকু খসখসে ও শুষ্ক দেখাবে এবং সেখান থেকে চামড়া উঠে আসবে।
Q. পুরুষ এবং মহিলাদের স্কিনের কোথায় এর সংক্রমণ বেশি হয়?
সহজ করে বললে, পুরুষের কুচকিতে এর সংক্রমণ সবথেকে বেশি।
আর এর কারন, আগেই বলেছি ফাঙ্গাসটির গরম ও আদ্র পরিবেশ খুবই পছন্দের । আর এনাটমিক্যালি পুরুষদের কুচকিতে তাপ বেশি থাকে, ঘাম বেশি হয় এবং স্কিন ফোল্ড (চিপাচাপা) বেশি।
মহিলাদের ক্ষেত্রে স্তনের নিচের অংশে সংক্রমণ বেশি। কারন পুরুষদের মতোই।
Q. আক্রমনের পর থেকে চুলকানি শুরু হতে কতদিন লাগে?
এটা এক কথায় বলা যায় না। এটা ডিপেন্ড করে কতগুলো ফাঙ্গাস আপনার স্কিনে আক্রমণ করেছে, আপনার ইমিউনিটি কত শক্তিশালি আর আপনি কি রকম আদ্র পরিবেশে আছেন।
তবে, আক্রমণের ৪-১৪ দিনের মধ্যে লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে।
Q. বছরের কোন সময়টাতে এর প্রোকোপ বেড়ে যায়?
গরম ও আদ্র পরিবেশ এই শয়তান ফাঙ্গাসটির খুবই পছন্দের। বাঙ্গলাদেশের এসপেক্টে পুরো গৃস্মকাল ও বর্ষাকাল জুড়ে এদের প্রোকোপ থাকে সবচেয়ে বেশি।
Q. ফাঙ্গাস্টির গরম ও আদ্র পরিবেশই কেন এত পছন্দের?
গরমকালে শরীরের ঘাম + আদ্রতা মিলে আমাদের স্কিনে বেশকিছু পরিবর্তন হয়। এসময়ে ঘামে স্কিন ম্যাক্সিমাম টাইম ভেজা থাকে। স্কিন বেশিক্ষন ভেজা থাকলে কেরাটিন লেয়ার নরম হয়ে যায় এবং ফাঙ্গাসের স্পোর খুব সহজেই আটকে যায় স্কিনে। আর ভেজা স্কিনে, স্কিনের ব্যারিয়ার দূর্বল হয়ে যায়। শয়তান ফাঙ্গাসটি ঠিক এই দূর্বলতার সূযোগটিই নেয়।
Q. রাতে বেশি চুলকায় কেন?
রাতে বেশি চুলকানো এটা শুধুমাত্র দাদের ক্ষেত্রে না, অনেক স্কিন কন্ডিশনেই রাতে বেশি চুলকানি হয়। রাতে চুলকানি বেড়ে যাওয়ার অনেক কারনের মধ্যে প্রধান কারন হলো রাতে বডিতে কর্টিসল হরমোনের লেভেল কমে যাওয়া। বলে রাখি, কর্টিসল হরমোন মহান আল্লাহর দেয়া এক মিরাকল হরমোন। এই হরমোন আন্টি-ইনফ্লামেটরি রোল প্লে করে আমাদের বডিতে। আরও সহজ করে বললে, এটি আপনার ব্যাথা, চুলকানি দমন করে। সারাদিন আপনি কত পরিশ্রম করছেন! যত পরিশ্রম ততবেশি সেল-ইনজুরি! আর সেল ইনজুরি মানেই ব্যাথা! জানলে অবাক হবেন আপনি যখন বিছানায় শুয়ে থাকেন তখন মাইনিউট সেল ইনজুরি হয়।
দিনে যেহেতু আপনি বেশি কাজ করবেন সেজন্য দিনে এই হরমনটা বেশি দরকার । ফজরের পর থেকে এই হরমোনের সিক্রেশন বাড়তে থাকে আবার বিকেলের পর থেকে কমতে থাকে। মানে দিনে বেশি থাকে রাতে কম থাকে। আর রাতে এর পরিমান কম থাকার জন্য আমরা রাতে বেশি ব্যথা আর চুলকানি অনুভব করি।
ছোট-খাটো এই ড্যামেজগুলোর প্রতিক্রিয়া থেকে এই কর্টিসল হরমোন আমাদের সেইভ করে যাচ্ছে। মহান আল্লাহ সূরা ফুরকানের ৪৭ নম্বর আয়াতে বলেছেন, “আর তিনিই তোমাদের জন্যে রাত্রিকে করেছেন আবরণ, নিদ্রাকে বিশ্রাম এবং দিনকে করেছেন বাইরে গমনের (জীবিকা অন্বেষণের) সময়।" সুতরাং, দিনে যেহেতু মহান আল্লাহ কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন সেজন্য বডির এলগরিদম তিনি সেভাবেই সেট করে দিয়েছেন।
এছারাও রাতে চুলকানি বেড়ে যাওয়ার অনেক কারন আছে। যেমন, রাতে ডেস্ট্রাকশন কম। আপনার ফোকাস থাকে বেশি।
Q. দাদ থেকে বাচতে কি করা উচিত?
দাদের মূল সমস্যা যেহেতু গরম+আদ্রতা, সেজন্য আপনি চেষ্টা করবেন অন্তত আদ্র পরিবেশ এড়িয়ে চলতে। আপনি যা করবেন-
১। শরীরের ঘাম মুছে ফেলুন।
২। ঘামা কাপড় বদলান।
৩। টাইট-ফিটিং কাপড় পরবেন না।
৪। যারা ইউনিভার্সিটির হলে অথবা কলজের হোস্টেলে থাকেন তারা চেষ্টা করবেন অল্প কিছুদিন পর পর ওয়াশরুমের স্যান্ডেল বদলানোর।
৫। একজন আরেকজনের তোয়ালা অথবা লুঙ্গি ব্যবহার করবেন না।
৬।তোশক কিছুদিন পর পর রোদে দিবেন। বালিশের কভার এবং বেডশিট পরিস্কার রাখবেন।
Q. দাদে আক্রান্ত হলে কি করবেন?
১। সবার আগে স্কিনের ডাক্তার দেখাবেন।
২। আক্রান্ত স্থান বেশি চুলকাবেন না। বেশি চুলকালে সেখানে ক্ষত সৃষ্টি হবে। আর ক্ষত হলে সেখানে সেকেন্ডারি ইনফেকশন ডেভেলপ করবে। মানে আগে ছিলো শুধু ফাঙ্গাস এখন সেখানে ব্যাকটেরিয়া বাসা বাঁধবে।
Q. দাদ কি পুরোপুরি নির্মূল হয়?
জ্বী, সঠিক চিকিৎসা এবং প্রোপার হাইজিন মেনে চললে দাদ নির্মূল হয়।
Q. দাদ রোগীরা কি কি ভুল করেন যার কারনে দাদ সাড়ে না?
দাদ রোগীদের ৩ টি গুরুত্বপূর্ণ ভূল করে থাকেন, যা করা উচিৎ না।
১। দাদ না সাড়ার সবচেয়ে বড় কারন, রোগীরা একটু চুলকানি শুরু হলেই চুলকানি বন্ধের জন্য ফার্মেসি থেকে স্টেরয়েড মিক্সড ক্রিম কিনে ব্যবহার শুরু করেন। এই দমন সাময়িক। স্টেরয়েড যন্ত্রণা কমায় ঠিকই কিন্তু সে আসল কালপ্রিটকে মারতে পারে না। ফাঙ্গাসের বংশবিস্তার চলতে থাকে ফুল স্পিডে।
২। অনেকেই ডাক্তারের কাছে যান, ডাক্তার এন্টিফাঙ্গাল দেন, চুলকানি অনেকটা কমে যায় আর মনে করেন ভালো হয়ে গেছি। কিন্তু কিছুদিন পর আবার চুলকানি শুরু হয়। এর কারন রোগীরা খুব তাড়াতাড়ি ট্রিটমেন্ট বন্ধ করে দেন।
৩। হাইজিন প্রোপারলি মেইনটেইন না করা। দেখা গেলো দাদের মেইন কারনটাই ছিলো স্যাতস্যাতে আদ্র পরিবেশ, সেই পরিবেশেই বসবাস।
Q. কাদের দাদ এ আক্রান্ত হওয়ার চান্স বেশি ?
১। খেলোয়ার, কৃষক ও দিনমজুর বেশি আক্রান্ত হয়। কারন তাদের শরীরে ঘাম হয় বেশি।
২। ডা্যাবেটিসের রোগী
৩। যাদের ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দূর্বল।
৪। যাদের ওজন বেশি। মোটা-সোটা মানুষদের দাদ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
৫। গাদাগাদি পরিবেশের বাসিন্দা হলে।
আপাতত দাদ সম্পর্কিত কিছু প্রাথমিক তথ্য তুলে ধরলাম।
দাদ সম্পর্কিত আপনার প্রশ্ন কমেন্টে লিখুন। ধন্যবাদ।
#দাদ #দাউদ #টিনিয়া #কুচকিতে_চুলকানি #স্তনের_নিচের_অংশে_চুলকানি #বগলের_নিচে_চুলকানি